ছবি সংগৃহীত
অনলাইন ডেস্ক : এশিয়ান গেমস ক্রিকেটের সেমি-ফাইনালে পাকিস্তানের কাছে বাংলাদেশের ৬ উইকেটের পরাজয় কেবল একটি ক্রিকেটীয় হার নয়, এটি কাঠামোগত ব্যর্থতা ও কৌশলগত দেউলিয়াত্বেরও করুণ নিদর্শন। স্বর্ণ জয়ের স্বপ্ন নিয়ে মাঠে নামা একটি দল যখন মাত্র ১৩ ওভারের সংক্ষিপ্ত ফরম্যাটের খেলায় এমন ছন্নছাড়া ও অপরিণামদর্শী পারফরম্যান্স উপহার দেয়, তখন সেই স্বপ্ন হাওয়ায় মিলিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোনো গতি থাকে না।
নিশিনের মাঠে রোদের আলো থাকলেও বাংলাদেশ দলের মানসিকতায় ছিল ঘোর অমানিশা। পুরো ম্যাচজুড়ে ক্রিকেটারদের শারীরিক ভাষা, সিদ্ধান্তের ভুল এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ের চাপ সামলাতে না পারার চরম অক্ষমতাই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
মাঠের ক্রিকেটে পাকিস্তান যেভাবে ঠান্ডা মাথায় ম্যাচ বের করে নিয়েছে, ঠিক তার বিপরীত মেরুতে অবস্থান করে বাংলাদেশ নিজেরাই নিজেদের পরাজয়ের পথ সুগম করেছে। এক বুক প্রত্যাশা নিয়ে প্রহর গোনা কোটি কোটি সমর্থকের জন্য এই হার যেন এক বিশাল হতাশার চড়। যা দলের দীর্ঘদিনের অগোছালো ভাবমূর্তিকে আবারও উন্মোচিত করে দিল।
বাংলাদেশের এই বিপর্যয়কর হারের নেপথ্যে সবচেয়ে বড় কারণ ছিল টপ অর্ডারের অবিবেচকের মতো ব্যাটিং ও অপরিকল্পিত শট নির্বাচন। ১৩ ওভারের এই সংক্ষিপ্ত ম্যাচে যেখানে উইকেটে মানিয়ে নিয়ে দায়িত্বশীল খেলা দরকার ছিল, সেখানে দলের সিনিয়র ও অভিজ্ঞ ব্যাটাররা একের পর এক আত্মঘাতী শট খেলে সাজঘরে ফিরেছেন। ওভারের শুরুতেই উইকেট পড়ে যাওয়ার পর অধিনায়ক লিটন দাসের ক্যারম বলে সুইচ হিট খেলতে যাওয়া কিংবা ক্রিজে সেট হওয়ার আগেই তানজিদ ও ইমনের অপ্রয়োজনীয় স্লগ শট খেলার সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। টার্ন ও অসম বাউন্সে ভরা উইকেটে প্রতিপক্ষের স্পিনারদের সমীহ না করে অযথা ওভার-অ্যাগ্রেসিভ হতে গিয়ে ২১ রানেই ৩ উইকেট হারিয়ে শুরুতেই ম্যাচ থেকে ছিটকে পড়ে বাংলাদেশ। মধ্যভাগে তাওহিদ হৃদয়ের একক লড়াই এবং মোসাদ্দেক হোসেনের ধীরগতির চরম ব্যর্থতার বৈপরীত্য প্রমাণ করে দলে ব্যাটিং অর্ডারে কৌশলগত সমন্বয়ের কতটা অভাব ছিল। একটি সম্ভাবনাময় পুঁজি গড়ার সুযোগ তৈরি হলেও টপ অর্ডারের দায়িত্বজ্ঞানহীনতার কারণেই বাংলাদেশের স্কোরলাইন শেষ পর্যন্ত ১১১ রানেই আটকে যায়।
তবে ব্যাটিংয়ের চেয়েও বেশি দৃষ্টিকটু ও ক্ষমার অযোগ্য ছিল দলের বোলিং আক্রমণ এবং চরম বিশৃঙ্খল বোলিং অধ্যায়, বিশেষ করে অভিজ্ঞদের বাজে পারফরম্যান্স। দলকে ম্যাচে টিকিয়ে রাখার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব যার কাঁধে ছিল, সেই মুস্তাফিজুর রহমানই দলের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন।
অভিজ্ঞতা ও কাটার-স্লোয়ারের ক্ষমতার জন্য বিখ্যাত এই বাঁহাতি পেসার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ওভারপ্রতি প্রায় ২০ রান করে উপহার দিয়েছেন। যে ওভারে ম্যাচ পাকিস্তানের হাত থেকে কেড়ে নেওয়ার সুযোগ ছিল, সেই দশম ওভারে গিয়ে ২৩ রান অকাতরে বিলিয়ে দিয়ে প্রতিপক্ষকে জয়ের দিকে এগিয়ে দেন তিনি। কেবল মুস্তাফিজ নন, দলের আরেক অভিজ্ঞ স্পিনার নাসুম আহমেদও লেংথ ঠিক রাখতে না পেরে অহেতুক ছক্কা খেয়েছেন, যার ফলে এই দুই বোলার মিলেই ৫ ওভারে দিয়েছেন অবিশ্বাস্য ৭৪ রান। অধিনায়ক লিটন দাসের সিদ্ধান্ত গ্রহণের দুর্বলতা এবং মোমেন্টাম বুঝে বোলিং পরিবর্তনের ক্ষমতার ঘাটতিও এই হারকে ত্বরান্বিত করেছে।
জয় পেতে পাকিস্তানের যখন চার ওভারে ৩৬ রান দরকার, তখন বুদ্ধিদীপ্ত বোলিং ও ফিল্ডিং সাজানোর পরিবর্তে দলনায়ক ও বোলাররা পুরোপুরি প্যানিক মোডে চলে যান। অভিজ্ঞতার বুলি আওড়ানো বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত প্রতিপক্ষের অবিচ্ছিন্ন সামাদ-নাওয়াজ জুটির ঠান্ডা মাথার ব্যাটিংয়ের কাছে কৌশলগত ও মানসিকভাবে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে স্বর্ণ পদকের স্বপ্ন জলাঞ্জলি দিয়ে এখন ব্রোঞ্জের লড়াইয়ে সান্ত্বনা খুঁজতে বাধ্য হচ্ছে।








