ছবি সংগৃহীত
মোস্তফা কামাল :সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী বন্ধের দিনও সকাল ৯টায় অফিসে পৌঁছে যাচ্ছেন। সহকর্মী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নানা দিকনির্দেশনার পাশাপাশি চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে দিচ্ছেন কঠোর হুঁশিয়ারি। সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ফজরের নামাজ আদায় করেই নেমে পড়ছেন পোস্টার তুলে দেয়াল সাফ করাসহ পরিবেশবান্ধব কাজে। দলীয় বিভিন্ন কর্মসূচিতে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে জিহাদের কথা বলছেন প্রতিদিনই।
মন্ত্রী এবং সরকারি-বিরোধীদলীয় এমপিরা যেখানেই যাচ্ছেন চাঁদাবজির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের কথা শোনাচ্ছেন। পুলিশপ্রধান আইজিপি মধ্যরাতে চলে যাচ্ছেন থানার অবস্থা দেখতে। পুলিশ সদস্যদের বলছেন চাঁদাবাজি শক্ত হাতে দমন করতে। দেশের বিজনেস কমিউনিটি চাঁদাবাজমুক্ত দেশ দেখার প্রত্যাশায়।
দোকানদারসহ ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা গ্যারান্টি দিয়ে বলছেন, চাঁদাবাজি না থাকলে প্রতিটি পণ্য আরো কম দামে বেচতে পারবেন তাঁরা। মোটকথা চাঁদা ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে গোটা দেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে একটি জাতীয় ঐকমত্য।
চাঁদাবাজি কেবল একটি অপরাধ নয়, যেনতেন রোগও নয়, ভয়াবহ নানা রোগ-উপসর্গের সংমিশ্রণ। চাঁদাবাজি একটি সামাজিক ক্ষত—এ উপলব্ধি ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়েরও।
সংগঠনটির প্রশাসক আব্দুর রহিম খান শনিবার একটি সেমিনারে বলছিলেন—১৮ মাসের অনির্বাচিত সরকারের সময়ও চাঁদাবাজি দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রভাব ফেলেছে। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে স্থিতিশীল ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গড়তে চাঁদাবাজি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি। দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে কঠোর পদক্ষেপ চেয়েছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিও (ডিসিসিআই)।
সংগঠনটি বলেছে, কেবল মুখে মুখে নয়, চাঁদাবাজি ও সরকারি খাতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবে কার্যকর না হলে অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হবে। ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, কোনো দেশে ব্যাবসায়িক আস্থা গড়ে ওঠে আইনের শাসন এবং স্থিতিশীল পরিবেশের ওপর।
এমন প্রেক্ষাপটে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি ব্যবসার নিরাপদ পরিবেশের নিশ্চয়তা চান তাঁরা। কারণ গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও সুষুম বাজার ব্যবস্থাপনা ছাড়া আইন-শৃঙ্খলা স্বাভাবিক থাকে না। এর সমান্তরাল বাস্তবতা হচ্ছে, চব্বিশের আগস্ট অভ্যুত্থানে আওয়ামী চাঁদাবাজি অস্ত গেলেও হাজিপাড়া আর কাজীপাড়া এখনো কোনো কোনো না কোনোভাবে চাঁবাজিতে একাকার। অনেক বাসস্ট্যান্ড, টেম্পোস্ট্যান্ড বা বাজার এখনো চাঁদাবাজিমুক্ত হয়নি। এই বাস্তবতা লুকানো বা অস্বীকার করার জো নেই। আর অস্বীকার বা গোপন করা হচ্ছে না বলেই রাষ্ট্রের-সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা আসছে। বাংলাদেশে চাঁদাবাজির দৃশ্যপট বরাবর একই। চাঁদাবাজির কথা মনে হলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে কোনো প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার ছত্রচ্ছায়ায় লোকাল আতিপাতি নেতা বা সংঘবদ্ধ মাস্তানচক্র সাধারণ ব্যবসায়ী, দোকানদার ও হকারদের কাছ থেকে জোর করে টাকা আদায় করছে। আর চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁদের জীবন-জীবিকার ওপর নেমে আসে দমন-পীড়ন, হুমকি। অথবা চাঁদার জন্য আইনের দোহাই দিয়ে আইনের রক্ষক ও প্রয়োগকারী বা সেবাদানকারী কারো তেড়ে আসা। এ ধরনের দুঃখজনক নানা ঘটনার ব্যাপকতায় এর প্রতিরোধে ঐকমত্য আসার বিষয়টি আশা জাগায়। চাঁদাবাজি শুধু বেআইনিভাবে পেশিশক্তির জোরে কিছু ক্ষমতাশালী ব্যক্তির কাজ নয়। বাংলাদেশে চাঁদাবাজি কেবল সামাজিক বা আইন-শৃঙ্খলার অসুখ নয়। অর্থনীতিরও সমস্যা।
বরাবরই অপরাধবিজ্ঞানী ও বিশ্লেষকদের কেউ কেউ চাঁদাবাজিকে রোগ বলতে চান না। তাঁদের মতে, এটি রোগের লক্ষণ বা উপসর্গ। তাই উপসর্গ দূর করে রোগ সারানোর চেষ্টা করলে মূল সমস্যা দূর হয় না। বরং একই রোগ ভিন্ন রূপে কিংবা আরো তীব্রভাবে ফিরে আসে। এবার পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা হওয়ায় আশাবাদও একটু বেশি। কমবেশি সবারই জানা, অনির্বাচিত রাষ্ট্রের কাছে নাগরিকরা মর্যাদা পায় না। কখনো কখনো নির্বাচিত সরকারও অগণতান্ত্রিক চর্চা করলে নাগরিকরা থাকে অসহায় অবস্থায়। নিয়মতান্ত্রিক অর্থনীতি তখন তাদের জন্য পর্যাপ্ত জীবিকার সুযোগ দিতে পারে না।
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন ।সূএ: বাংলাদেশ প্রতিদিন








