আস্থা থাকা না-থাকা

ছবি সংগৃহীত

 

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : মানুষ বিশ্বাস ছাড়া বাঁচে না। এমনকি অবিশ্বাসও তো বিশ্বাসই এক প্রকারের। তবে এটাও সাধারণত দেখা যায় যে ইহজাগতিক ব্যবস্থায় মানুষের আস্থা যতই কমে, পারলৌকিকতা ও প্রতারণায় বিশ্বাস ততই বাড়ে। আস্থা হারিয়ে কেউ চলে যায় ধর্মের দিকে, কেউ বা প্রতারণা-অভিমুখে। প্রতারকদের একাংশ যে ধার্মিক সাজে না, এমনও নয়। বৃদ্ধি পায় আলস্য এবং নেশাগ্রস্ততা। নেশা অবশ্য নানা প্রকারের হয়, হয়ে থাকে।

ছেলেবেলার একটি দৃশ্য আমি কখনো ভুলব না। ঢাকা শহরে ব্যবসাবাণিজ্যের তখনকার প্রধান কেন্দ্র চকবাজারের পাশেই আমাদের বাসা ছিল, বেগমবাজারে। যেতে-আসতে প্রায় রোজই আমার অনিষ্পলক চোখ দুটি পড়ত গিয়ে শর্ষের তেলের একজন আড়তদারের ওপর। তাঁর শরীর-স্বাস্থ্য, বসবার ভঙ্গি, চোখমুখের নিস্পৃহতা সবকিছুর ভিতর থেকেই একটা অলৌকিক আভা ছিল। যেন তিনি এ-জগতের নন, ভিন্নালোকের। অথচ খুবই ইহজাগতিক ছিলেন তিনি। নেতা ছিলেন ঢাকা শহর মুসলিম লীগের। বড় রকমেরই। তার চেয়েও বড় সত্য এই যে সেকালেই শর্ষের তেলের সঙ্গে তিনি মবিল মেশাতেন। জানত সবাই। কিন্তু বড়ই নির্বিকার ছিলেন, দেখেছি আমি। আমার বাবার প্রধান বিনোদন ছিল বাজার করা। বাজার থেকে শর্ষের তেল আনতেন যখন, আমার মনে জিজ্ঞাসা জাগত বিষ কিনে আনেননি তো, যে বিষ ওই আপাত ধার্মিক ভদ্রলোক বেশ করে মিশিয়ে দিয়েছেন তেলের সঙ্গে। এখন বুঝতে পারি ভদ্রলোক নির্ভেজালরূপে বিশ্বাসী ছিলেন। বিশ্বাস ছিল পুলিশ তাঁকে ধরবে না, তাঁর টাকা আছে। তদুপরি তিনি মুসলিম লীগের লোক। বিশ্বাস ছিল পুলিশে ধরলেও আদালত তাঁকে ছেড়ে দেবে, ওই একই কারণে। সেই বয়সে আমি আমার নিত্য দেখা ওই লোকটিকে খুবই ঘৃণা করতাম-ভয় করতাম বোধ করি আরও অধিক। ওই বিশ্বাসীকে আমি এখনো দেখতে পাই। মানসচক্ষে। কিন্তু পরে বুঝেছি-তিনি একা ছিলেন না, অনন্য নন, অনেকের একজন। এরা আস্থাহীন ইহজাগতিক ব্যবস্থায়। এরা বিশ্বাসী প্রতারণায় এবং আবরণ নেয় ধর্মের। সেকাল গেছে চলে, একালে অনেক কিছু বদলেছে, উন্নতি ঘটেছে বহু ক্ষেত্রে, কিন্তু আস্থা জিনিসটা মোটেই বাড়েনি, বরঞ্চ কমেছে। আস্থার বড়ই দুর্দশা এই স্বাধীন বাংলাদেশে। ওই যে বিশেষ দুটি ক্ষেত্রে যাদের ওপর নাগরিকদের জীবনমরণ, উন্নতি অবনতি অনেকাংশে নির্ভর করে; সেই পুলিশ এবং আদালতের ওপর নির্ভরশীলতা ভিতর থেকেই ক্ষয় হয়ে এসেছে।

পুলিশ এ দেশে কখনোই সাধারণ মানুষের বন্ধু ছিল না। এই বাহিনী সৃষ্টিই করা হয়েছিল মানুষকে রাজনৈতিকভাবে নিপীড়ন করার জন্য। সেই নিপীড়ন ব্রিটিশ আমলে ঘটেছে, পাকিস্তান আমলে অব্যাহত থেকেছে, বাংলাদেশ আমলেও বিশেষ কমেনি। ঘুষ নেওয়া তো আছেই, পুলিশ সন্ত্রাসীরূপেও আত্মপ্রকাশ করেছে। অপরাধের শিকার হলে মানুষ অনেক ক্ষেত্রে থানায় যায় না এই ভয়ে যে সেখানে গেলে দ্বিতীয়বার বিপদে পড়বে। মূলত দুর্ভাগ্যজনক বাস্তবতা হচ্ছে তারা চোর-ডাকাতকে যতটা না ভয় করে, পুলিশকে ভয় করে তার চেয়ে অনেক গুণ বেশি। কারণ আছে।

আদালতে ন্যায়বিচার পাওয়া যাবে না। এই ধারণাও পুরোনো। সেখানে টাউটদের রাজত্ব ছিল, টাউটদের দৌরাত্ম্য আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। আইন ও বিচারে এভাবে আস্থা হারালে মানুষ যাবেটা কোথায়? কোথায় খুঁজবে আশ্রয়? খোঁজে ধর্মের কাছে। নিরাপত্তা হারানোর প্রাথমিক কারণটা অবশ্য রয়েছে অন্যত্র। রয়েছে অর্থনীতিতে। সেখানে দেখা যাচ্ছে অল্প কিছু মানুষ উপরে উঠছে অধিকাংশ মানুষকে দলিতমথিত বিধ্বস্ত করে। এই পীড়িত মানুষের জন্য কোনো ইহজাগতিক আশ্রয় নেই, তাই তারা আঁকড়ে ধরে অলৌকিক শক্তিকে, সাহায্য চায়, ক্ষতিপূরণ আশা করে। পরীক্ষায় নকল এ দেশে চিরকালই হতো, কিন্তু সাম্প্রতিককালে পরীক্ষায় যে হারে নকল হয়েছে, তেমনটি আগে এভাবে ঘটেনি। কারণ কী? মূল কারণ হচ্ছে আস্থার অভাব। নকলে কেবল যে পরীক্ষার্থীরা অংশ নিচ্ছে তা নয়, অভিভাবকরাও নৈতিক ও বৈষয়িক সমর্থন জানাচ্ছে। না, এ-ব্যাপারে সবারই এক রাঁ-আমাদের ছেলেমেয়েদের অধিকার দিতে হবে। তাদের এই দাবির পেছনে যে মনোভাবটি কাজ করছে সেটা হলো দেশের সর্বত্র নকল হচ্ছে, আমাদের ছেলেমেয়েরা বঞ্চিত হবে কেন? আর অভিভাবকরা যখন পরীক্ষার্থীদের সহযোগী হয়, নকল সরবরাহ করে, পাহারা দেয়, নকল ধরলে ধাওয়া করে, তখন নকল থামাবে কে? থামানো যাচ্ছে না। আমাদের পরীক্ষাব্যবস্থায় সৃষ্টিশীলতাকে উৎসাহিত করার ব্যাপারটা কখনোই ছিল না। এখনো নেই। পরীক্ষায় মেধার পরীক্ষা হয় না, পরীক্ষা হয় মুখস্থ করার শক্তির। সৃষ্টি করবে না, ভাববে না, না-বুঝে মুখস্থ করবে, তারপর পরীক্ষার খাতায় যা তুমি সংগ্রহ করেছ কিন্তু ভুলেও হজম করনি তা উদ্গিরণ করে দেবে এবং এই কর্মকাণ্ডে কার কতটা দক্ষতা সেটার প্রমাণ দিয়ে নম্বর ও সার্টিফিকেট নিয়ে ঘরে চলে যাবে। এই ছিল ব্যবস্থা। বলা বাহুল্য ওই ব্যবস্থা বদলায়নি। বিদেশি পর্যবেক্ষকরা আমাদের এই স্মরণশক্তিকে বিস্ময়কর বলেছেন। এই দক্ষতাটাও তো আসলে নকলেরই। মনে রাখার নকলটা প্রচ্ছন্ন, কাগজ দেখে নকল করাটা প্রত্যক্ষ; এটাই পার্থক্য। প্রত্যক্ষটা নিন্দনীয় বলে গোপনটা যে প্রশংসনীয় তা নিশ্চয়ই নয়।

এ ক্ষেত্রে অনাস্থা যার ওপর প্রকাশ পাচ্ছে, সেটা হচ্ছে শ্রমশীলতা। আমাদের দেশে শ্রম অত্যন্ত অবহেলিত এবং অবমূল্যায়িত। শ্রমজীবী মানুষ বংশানুক্রমে, জন্মজন্মান্তরে পরিশ্রম করে। করতেই থাকে এবং দরিদ্র থাকে। তারা চাষা ও কুলি, তাদের মর্যাদা দেবে কে? শ্রমের সাহায্যে কেউ ওপরে ওঠে না। ওঠে প্রতারণা ও চাটুকারিতায়। যেজন্য শ্রমের ওপর কেউ আস্থা রাখে না। স্বাধীনতা এ ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনেনি, অবনতি ছাড়া। এবং এটাও স্বাভাবিক যে প্রতারক ও চাটুকাররা পরস্পরের প্রতি আস্থা রাখে না, বিশ্বাসও রাখে না। মানুষের অনেক গুণ, এমনকি অন্য প্রাণীর গুণাবলিও তার মধ্যে রয়েছে; যেমন কুকুরের গুণ। কুকুর বড়ই প্রভুভক্ত এবং পরস্পরের প্রতি হিংস্র। অন্য প্রাণীকে সহ্য করবে, কিন্তু নিজের প্রজাতির অন্য কাউকে দেখামাত্র শোরগোল শুরু করে দেবে। বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রভুভক্তি যেমন দেখা যায়, তেমনি দেখা যায় মারাত্মক রকমের কলহপ্রবণতা। প্রভুর প্রতি আস্থা রাখলেও প্রতিবেশীকে ঘৃণা করে।

ভেজাল বাড়ছে। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর বহু গুণ বেড়ে গেছে। কেউ ধরা পড়ছে না, ধরা পড়লেও শাস্তি হচ্ছে না, আস্থা বাড়ছে টাকার শক্তিতে। টাকায় সবকিছুই কেনা যায়। বড় বড়, এমনকি প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিরাও টাকার ক্রয়সীমার বাইরে নন। ন্যায়বিচার না পেলেও নিজের পক্ষে বিচার কেনা যায়, চিকিৎসা তো প্রকাশ্যে ও পরিপূর্ণরূপেই পণ্যে পরিণত।

সবকিছু মিলিয়ে সত্য ওই একটাই, মানুষের বিশ্বাস নেই নিরাপত্তায় ও সুবিচারে। আস্থা নেই শ্রমে, শিক্ষা কিংবা চিকিৎসায়। কেউ তার নিজের দায়িত্ব পালন করেন না। বিপন্ন জীবনানন্দ দাশ আবহমান ভাঁড়কে দেখেছিলেন গাধার পিঠে-বসা; ভাঁড় এখন সর্বত্র, তবে প্রায় কেউই গাধার পিঠে নেই। তারা রয়েছে বিভিন্ন পদে, গুরুত্বপূর্ণ সব আসনে। আর এটা বললে মোটেই মিথ্যা বলা হবে না যে বেমানান ভাঁড় হোন কিংবা অতিসুচতুর দুর্বৃত্ত হোন, গুরুত্বপূর্ণ লোকদের মধ্যে এমন মানুষ খুব কমই রয়েছেন যারা বাংলাদেশের কোনো ভবিষ্যৎ রয়েছে বলে বিশ্বাস করেন।

দুই. আস্থাহীনতার এই যে নটে গাছ, এ কেন মুড়ালো-তার তথ্যানুসন্ধান করলে দেখা যাবে যে মূল কারণ নেতৃত্বের ব্যর্থতা। জাতীয় জীবনে এমন কোনো স্তর নেই যেখানে নেতৃত্ব সফল হয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো রাজনৈতিক নেতৃত্বের। রাষ্ট্র হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। নিয়ন্ত্রণ তারই হাতে, আদর্শ সেই স্থাপন করে।

নির্বাচিত সরকার এসেছে বটে, কিন্তু প্রকৃত গণতন্ত্র আসেনি। গণতন্ত্রের জন্য নির্বাচন দরকার কিন্তু নির্বাচন থাকা মানেই গণতন্ত্র থাকা নয়। নির্বাচিত সরকারও স্বৈরাচারী হতে পারে বৈকি, যদি তার স্বচ্ছতা না থাকে, না থাকে জবাবদিহি এবং সর্বোপরি অভাব ঘটে দেশবাসীর স্বার্থ দেখার মনোভাব। অতীতে আমরা মাঝেমধ্যে নির্বাচিত সরকার পেয়েছি সত্যি, কিন্তু সত্যিকার গণতান্ত্রিক সরকার পাইনি। এবং যাকে গণতন্ত্র বলা হয়েছে তা আসলে দেখা গেছে টাকার থলির গণতন্ত্র। লোকেরা টাকার জোরে নির্বাচিত হয়েছে এবং নির্বাচিত হয়ে নিজেদের টাকার থলিকে আরও ভরপুর ও মোটা করেছে। টাকার জোর না থাকলে দলীয় মনোনয়ন পাওয়াই অসম্ভব, নির্বাচিত হওয়া তো অনেক দূরের কথা। যারা নির্বাচিত হন নির্বাচন কমিশনকে তাঁরা জানান যে খরচ করেছেন ৩ লাখ, আসলে খরচ করেন ৩ কোটি। ওই টাকা কোথা থেকে এলো তা জানা যায় না, জানতে কেউ চায়ও না। তবে এটা সর্বসাধারণের জানা থাকে অবশ্যই যে ৩ কোটি অচিরেই ৩০ কোটিতে পরিণত হবে। শ্রমের কারণে এই স্ফীতি ঘটবে না, ঘটবে লুণ্ঠনের কারণে। টাকা পাওয়া ও বৃদ্ধি করা সবটাই অলৌকিক, ঐন্দ্রজালিক। কেউ ধনী হয় চোরাচালান করে, কেউ ব্যাংক দখল করে, কেউ ঘুষ খেয়ে, কেউ বা রাজনীতি করে। কিন্তু রাজনীতিকদের কাজটাই সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক। কেননা তাঁরা হচ্ছেন নেতা, তাঁরাই আদর্শ, তাঁরা যে আদর্শ স্থাপন করেন, তারই অনুসরণ চলে, সর্বস্তরে। তাঁদের আশ্রয় ও সমর্থ না-পেলে অন্যরা অচল হতো, সাহসই করত না দুর্নীতির পথে পা বাড়াতে।

একটা নতুন নির্বাচিত সরকার দুই মাস হলো রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে। তারা দীর্ঘ তিক্ত অভিজ্ঞতার পথ পাড়ি দিয়ে এসেছে। ফলে তাদের কাছ থেকে অতীতের সরকারগুলোর বিচ্যুতি, ব্যর্থতা, দুর্নীতি-দুঃশাসনের পুনরাবৃত্তি কেউ প্রত্যাশা করে না। আশা করে-দুর্নীতিমুক্ত সমাজ, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, মানবিক মর্যাদা এবং প্রকৃত গণতন্ত্রের ভিত্তি সুদৃঢ় করার মহান ব্রত গ্রহণ করবে নতুন সরকার। জনগণ সেটাই বিশ্বাসও করে। কারণ বিশ্বাস ছাড়া বাঁচে না মানুষ।

♦ লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সূএ: বাংলাদেশ  প্রতিদিন

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



» বাস-ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে বাসের চালক ও হেলপার নিহত

» সিরিজ বাঁচানোর ম্যাচে টস হেরে ফিল্ডিংয়ে বাংলাদেশ

» বগুড়ায় পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

» এসএসসি পরীক্ষা শুরু মঙ্গলবার, পরীক্ষার্থীদের মানতে হবে যে ১৪ নির্দেশনা

» দেশব্যাপী হামের টিকাদান কর্মসূচি উদ্বোধন করলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী

» পরবর্তী অভ্যুত্থানে নেতা হবেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা : গোলাম মাওলা রনি

» আস্থা থাকা না-থাকা

» পূর্ব শত্রুতার জেরে যুবককে কুপিয়ে জখম

» যাত্রীবাহী বাসে তল্লাশি, গাঁজাসহ স্বামী-স্ত্রী গ্রেফতার

» ইতিহাস গড়তে জাকার্তার পথে বাংলাদেশ নারী হকি দল

 

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ,

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন,

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

 

ইমেল: [email protected]

ফোন নাম্বার : ০১৫৩৫১৩০৩৫০,

Desing & Developed BY PopularITLtd.Com
পরীক্ষামূলক প্রচার...

আস্থা থাকা না-থাকা

ছবি সংগৃহীত

 

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : মানুষ বিশ্বাস ছাড়া বাঁচে না। এমনকি অবিশ্বাসও তো বিশ্বাসই এক প্রকারের। তবে এটাও সাধারণত দেখা যায় যে ইহজাগতিক ব্যবস্থায় মানুষের আস্থা যতই কমে, পারলৌকিকতা ও প্রতারণায় বিশ্বাস ততই বাড়ে। আস্থা হারিয়ে কেউ চলে যায় ধর্মের দিকে, কেউ বা প্রতারণা-অভিমুখে। প্রতারকদের একাংশ যে ধার্মিক সাজে না, এমনও নয়। বৃদ্ধি পায় আলস্য এবং নেশাগ্রস্ততা। নেশা অবশ্য নানা প্রকারের হয়, হয়ে থাকে।

ছেলেবেলার একটি দৃশ্য আমি কখনো ভুলব না। ঢাকা শহরে ব্যবসাবাণিজ্যের তখনকার প্রধান কেন্দ্র চকবাজারের পাশেই আমাদের বাসা ছিল, বেগমবাজারে। যেতে-আসতে প্রায় রোজই আমার অনিষ্পলক চোখ দুটি পড়ত গিয়ে শর্ষের তেলের একজন আড়তদারের ওপর। তাঁর শরীর-স্বাস্থ্য, বসবার ভঙ্গি, চোখমুখের নিস্পৃহতা সবকিছুর ভিতর থেকেই একটা অলৌকিক আভা ছিল। যেন তিনি এ-জগতের নন, ভিন্নালোকের। অথচ খুবই ইহজাগতিক ছিলেন তিনি। নেতা ছিলেন ঢাকা শহর মুসলিম লীগের। বড় রকমেরই। তার চেয়েও বড় সত্য এই যে সেকালেই শর্ষের তেলের সঙ্গে তিনি মবিল মেশাতেন। জানত সবাই। কিন্তু বড়ই নির্বিকার ছিলেন, দেখেছি আমি। আমার বাবার প্রধান বিনোদন ছিল বাজার করা। বাজার থেকে শর্ষের তেল আনতেন যখন, আমার মনে জিজ্ঞাসা জাগত বিষ কিনে আনেননি তো, যে বিষ ওই আপাত ধার্মিক ভদ্রলোক বেশ করে মিশিয়ে দিয়েছেন তেলের সঙ্গে। এখন বুঝতে পারি ভদ্রলোক নির্ভেজালরূপে বিশ্বাসী ছিলেন। বিশ্বাস ছিল পুলিশ তাঁকে ধরবে না, তাঁর টাকা আছে। তদুপরি তিনি মুসলিম লীগের লোক। বিশ্বাস ছিল পুলিশে ধরলেও আদালত তাঁকে ছেড়ে দেবে, ওই একই কারণে। সেই বয়সে আমি আমার নিত্য দেখা ওই লোকটিকে খুবই ঘৃণা করতাম-ভয় করতাম বোধ করি আরও অধিক। ওই বিশ্বাসীকে আমি এখনো দেখতে পাই। মানসচক্ষে। কিন্তু পরে বুঝেছি-তিনি একা ছিলেন না, অনন্য নন, অনেকের একজন। এরা আস্থাহীন ইহজাগতিক ব্যবস্থায়। এরা বিশ্বাসী প্রতারণায় এবং আবরণ নেয় ধর্মের। সেকাল গেছে চলে, একালে অনেক কিছু বদলেছে, উন্নতি ঘটেছে বহু ক্ষেত্রে, কিন্তু আস্থা জিনিসটা মোটেই বাড়েনি, বরঞ্চ কমেছে। আস্থার বড়ই দুর্দশা এই স্বাধীন বাংলাদেশে। ওই যে বিশেষ দুটি ক্ষেত্রে যাদের ওপর নাগরিকদের জীবনমরণ, উন্নতি অবনতি অনেকাংশে নির্ভর করে; সেই পুলিশ এবং আদালতের ওপর নির্ভরশীলতা ভিতর থেকেই ক্ষয় হয়ে এসেছে।

পুলিশ এ দেশে কখনোই সাধারণ মানুষের বন্ধু ছিল না। এই বাহিনী সৃষ্টিই করা হয়েছিল মানুষকে রাজনৈতিকভাবে নিপীড়ন করার জন্য। সেই নিপীড়ন ব্রিটিশ আমলে ঘটেছে, পাকিস্তান আমলে অব্যাহত থেকেছে, বাংলাদেশ আমলেও বিশেষ কমেনি। ঘুষ নেওয়া তো আছেই, পুলিশ সন্ত্রাসীরূপেও আত্মপ্রকাশ করেছে। অপরাধের শিকার হলে মানুষ অনেক ক্ষেত্রে থানায় যায় না এই ভয়ে যে সেখানে গেলে দ্বিতীয়বার বিপদে পড়বে। মূলত দুর্ভাগ্যজনক বাস্তবতা হচ্ছে তারা চোর-ডাকাতকে যতটা না ভয় করে, পুলিশকে ভয় করে তার চেয়ে অনেক গুণ বেশি। কারণ আছে।

আদালতে ন্যায়বিচার পাওয়া যাবে না। এই ধারণাও পুরোনো। সেখানে টাউটদের রাজত্ব ছিল, টাউটদের দৌরাত্ম্য আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। আইন ও বিচারে এভাবে আস্থা হারালে মানুষ যাবেটা কোথায়? কোথায় খুঁজবে আশ্রয়? খোঁজে ধর্মের কাছে। নিরাপত্তা হারানোর প্রাথমিক কারণটা অবশ্য রয়েছে অন্যত্র। রয়েছে অর্থনীতিতে। সেখানে দেখা যাচ্ছে অল্প কিছু মানুষ উপরে উঠছে অধিকাংশ মানুষকে দলিতমথিত বিধ্বস্ত করে। এই পীড়িত মানুষের জন্য কোনো ইহজাগতিক আশ্রয় নেই, তাই তারা আঁকড়ে ধরে অলৌকিক শক্তিকে, সাহায্য চায়, ক্ষতিপূরণ আশা করে। পরীক্ষায় নকল এ দেশে চিরকালই হতো, কিন্তু সাম্প্রতিককালে পরীক্ষায় যে হারে নকল হয়েছে, তেমনটি আগে এভাবে ঘটেনি। কারণ কী? মূল কারণ হচ্ছে আস্থার অভাব। নকলে কেবল যে পরীক্ষার্থীরা অংশ নিচ্ছে তা নয়, অভিভাবকরাও নৈতিক ও বৈষয়িক সমর্থন জানাচ্ছে। না, এ-ব্যাপারে সবারই এক রাঁ-আমাদের ছেলেমেয়েদের অধিকার দিতে হবে। তাদের এই দাবির পেছনে যে মনোভাবটি কাজ করছে সেটা হলো দেশের সর্বত্র নকল হচ্ছে, আমাদের ছেলেমেয়েরা বঞ্চিত হবে কেন? আর অভিভাবকরা যখন পরীক্ষার্থীদের সহযোগী হয়, নকল সরবরাহ করে, পাহারা দেয়, নকল ধরলে ধাওয়া করে, তখন নকল থামাবে কে? থামানো যাচ্ছে না। আমাদের পরীক্ষাব্যবস্থায় সৃষ্টিশীলতাকে উৎসাহিত করার ব্যাপারটা কখনোই ছিল না। এখনো নেই। পরীক্ষায় মেধার পরীক্ষা হয় না, পরীক্ষা হয় মুখস্থ করার শক্তির। সৃষ্টি করবে না, ভাববে না, না-বুঝে মুখস্থ করবে, তারপর পরীক্ষার খাতায় যা তুমি সংগ্রহ করেছ কিন্তু ভুলেও হজম করনি তা উদ্গিরণ করে দেবে এবং এই কর্মকাণ্ডে কার কতটা দক্ষতা সেটার প্রমাণ দিয়ে নম্বর ও সার্টিফিকেট নিয়ে ঘরে চলে যাবে। এই ছিল ব্যবস্থা। বলা বাহুল্য ওই ব্যবস্থা বদলায়নি। বিদেশি পর্যবেক্ষকরা আমাদের এই স্মরণশক্তিকে বিস্ময়কর বলেছেন। এই দক্ষতাটাও তো আসলে নকলেরই। মনে রাখার নকলটা প্রচ্ছন্ন, কাগজ দেখে নকল করাটা প্রত্যক্ষ; এটাই পার্থক্য। প্রত্যক্ষটা নিন্দনীয় বলে গোপনটা যে প্রশংসনীয় তা নিশ্চয়ই নয়।

এ ক্ষেত্রে অনাস্থা যার ওপর প্রকাশ পাচ্ছে, সেটা হচ্ছে শ্রমশীলতা। আমাদের দেশে শ্রম অত্যন্ত অবহেলিত এবং অবমূল্যায়িত। শ্রমজীবী মানুষ বংশানুক্রমে, জন্মজন্মান্তরে পরিশ্রম করে। করতেই থাকে এবং দরিদ্র থাকে। তারা চাষা ও কুলি, তাদের মর্যাদা দেবে কে? শ্রমের সাহায্যে কেউ ওপরে ওঠে না। ওঠে প্রতারণা ও চাটুকারিতায়। যেজন্য শ্রমের ওপর কেউ আস্থা রাখে না। স্বাধীনতা এ ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনেনি, অবনতি ছাড়া। এবং এটাও স্বাভাবিক যে প্রতারক ও চাটুকাররা পরস্পরের প্রতি আস্থা রাখে না, বিশ্বাসও রাখে না। মানুষের অনেক গুণ, এমনকি অন্য প্রাণীর গুণাবলিও তার মধ্যে রয়েছে; যেমন কুকুরের গুণ। কুকুর বড়ই প্রভুভক্ত এবং পরস্পরের প্রতি হিংস্র। অন্য প্রাণীকে সহ্য করবে, কিন্তু নিজের প্রজাতির অন্য কাউকে দেখামাত্র শোরগোল শুরু করে দেবে। বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রভুভক্তি যেমন দেখা যায়, তেমনি দেখা যায় মারাত্মক রকমের কলহপ্রবণতা। প্রভুর প্রতি আস্থা রাখলেও প্রতিবেশীকে ঘৃণা করে।

ভেজাল বাড়ছে। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর বহু গুণ বেড়ে গেছে। কেউ ধরা পড়ছে না, ধরা পড়লেও শাস্তি হচ্ছে না, আস্থা বাড়ছে টাকার শক্তিতে। টাকায় সবকিছুই কেনা যায়। বড় বড়, এমনকি প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিরাও টাকার ক্রয়সীমার বাইরে নন। ন্যায়বিচার না পেলেও নিজের পক্ষে বিচার কেনা যায়, চিকিৎসা তো প্রকাশ্যে ও পরিপূর্ণরূপেই পণ্যে পরিণত।

সবকিছু মিলিয়ে সত্য ওই একটাই, মানুষের বিশ্বাস নেই নিরাপত্তায় ও সুবিচারে। আস্থা নেই শ্রমে, শিক্ষা কিংবা চিকিৎসায়। কেউ তার নিজের দায়িত্ব পালন করেন না। বিপন্ন জীবনানন্দ দাশ আবহমান ভাঁড়কে দেখেছিলেন গাধার পিঠে-বসা; ভাঁড় এখন সর্বত্র, তবে প্রায় কেউই গাধার পিঠে নেই। তারা রয়েছে বিভিন্ন পদে, গুরুত্বপূর্ণ সব আসনে। আর এটা বললে মোটেই মিথ্যা বলা হবে না যে বেমানান ভাঁড় হোন কিংবা অতিসুচতুর দুর্বৃত্ত হোন, গুরুত্বপূর্ণ লোকদের মধ্যে এমন মানুষ খুব কমই রয়েছেন যারা বাংলাদেশের কোনো ভবিষ্যৎ রয়েছে বলে বিশ্বাস করেন।

দুই. আস্থাহীনতার এই যে নটে গাছ, এ কেন মুড়ালো-তার তথ্যানুসন্ধান করলে দেখা যাবে যে মূল কারণ নেতৃত্বের ব্যর্থতা। জাতীয় জীবনে এমন কোনো স্তর নেই যেখানে নেতৃত্ব সফল হয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো রাজনৈতিক নেতৃত্বের। রাষ্ট্র হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। নিয়ন্ত্রণ তারই হাতে, আদর্শ সেই স্থাপন করে।

নির্বাচিত সরকার এসেছে বটে, কিন্তু প্রকৃত গণতন্ত্র আসেনি। গণতন্ত্রের জন্য নির্বাচন দরকার কিন্তু নির্বাচন থাকা মানেই গণতন্ত্র থাকা নয়। নির্বাচিত সরকারও স্বৈরাচারী হতে পারে বৈকি, যদি তার স্বচ্ছতা না থাকে, না থাকে জবাবদিহি এবং সর্বোপরি অভাব ঘটে দেশবাসীর স্বার্থ দেখার মনোভাব। অতীতে আমরা মাঝেমধ্যে নির্বাচিত সরকার পেয়েছি সত্যি, কিন্তু সত্যিকার গণতান্ত্রিক সরকার পাইনি। এবং যাকে গণতন্ত্র বলা হয়েছে তা আসলে দেখা গেছে টাকার থলির গণতন্ত্র। লোকেরা টাকার জোরে নির্বাচিত হয়েছে এবং নির্বাচিত হয়ে নিজেদের টাকার থলিকে আরও ভরপুর ও মোটা করেছে। টাকার জোর না থাকলে দলীয় মনোনয়ন পাওয়াই অসম্ভব, নির্বাচিত হওয়া তো অনেক দূরের কথা। যারা নির্বাচিত হন নির্বাচন কমিশনকে তাঁরা জানান যে খরচ করেছেন ৩ লাখ, আসলে খরচ করেন ৩ কোটি। ওই টাকা কোথা থেকে এলো তা জানা যায় না, জানতে কেউ চায়ও না। তবে এটা সর্বসাধারণের জানা থাকে অবশ্যই যে ৩ কোটি অচিরেই ৩০ কোটিতে পরিণত হবে। শ্রমের কারণে এই স্ফীতি ঘটবে না, ঘটবে লুণ্ঠনের কারণে। টাকা পাওয়া ও বৃদ্ধি করা সবটাই অলৌকিক, ঐন্দ্রজালিক। কেউ ধনী হয় চোরাচালান করে, কেউ ব্যাংক দখল করে, কেউ ঘুষ খেয়ে, কেউ বা রাজনীতি করে। কিন্তু রাজনীতিকদের কাজটাই সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক। কেননা তাঁরা হচ্ছেন নেতা, তাঁরাই আদর্শ, তাঁরা যে আদর্শ স্থাপন করেন, তারই অনুসরণ চলে, সর্বস্তরে। তাঁদের আশ্রয় ও সমর্থ না-পেলে অন্যরা অচল হতো, সাহসই করত না দুর্নীতির পথে পা বাড়াতে।

একটা নতুন নির্বাচিত সরকার দুই মাস হলো রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে। তারা দীর্ঘ তিক্ত অভিজ্ঞতার পথ পাড়ি দিয়ে এসেছে। ফলে তাদের কাছ থেকে অতীতের সরকারগুলোর বিচ্যুতি, ব্যর্থতা, দুর্নীতি-দুঃশাসনের পুনরাবৃত্তি কেউ প্রত্যাশা করে না। আশা করে-দুর্নীতিমুক্ত সমাজ, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, মানবিক মর্যাদা এবং প্রকৃত গণতন্ত্রের ভিত্তি সুদৃঢ় করার মহান ব্রত গ্রহণ করবে নতুন সরকার। জনগণ সেটাই বিশ্বাসও করে। কারণ বিশ্বাস ছাড়া বাঁচে না মানুষ।

♦ লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সূএ: বাংলাদেশ  প্রতিদিন

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



সর্বাধিক পঠিত



 

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ,

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন,

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

 

ইমেল: [email protected]

ফোন নাম্বার : ০১৫৩৫১৩০৩৫০,

Design & Developed BY ThemesBazar.Com