ছবি সংগৃহীত
অনলাইন ডেস্ক : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জয়জয়কার আর প্রয়োগের দৌড়ে টেক দুনিয়ার প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিযোগিতা এখন তুঙ্গে। কিন্তু সেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়েই হাজার হাজার কর্মীকে প্রতিস্থাপন করার এক উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের অভিভাবক প্রতিষ্ঠান মেটা। সম্প্রতি রয়টার্সের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, মেটাকে পুরোদমে ‘এআই নেটিভ’ বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর সংস্থায় রূপান্তর করার গোপন প্রকল্প ‘প্রজেক্ট ওটি’ কীভাবে নিজস্ব কর্মীদের তীব্র প্রতিবাদ এবং প্রযুক্তিগত ব্যর্থতার মুখে ভেস্তে গেছে।
ঘটনার সূত্রপাত চলতি বছরের শুরুতে মেটার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মার্ক জুকারবার্গের হাওয়াই রিসোর্টে আয়োজিত এক বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলনে। সেখানে মেটার উচ্চপদস্থ কর্তারা একটি গোপন রূপরেখা তৈরি করেন, যার মূল লক্ষ্য ছিল প্রতিষ্ঠানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে কর্মী সংখ্যা অস্বাভাবিক হারে কমিয়ে আনা। অভ্যন্তরীণ নথিপত্র অনুযায়ী, মেটার বিভিন্ন বিভাগের অন্তত ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কর্মী ছেঁটে ফেলার পরিকল্পনা ছিল তাদের। রূপরেখা অনুযায়ী, গত মে মাসে প্রথম ধাপে ১০ শতাংশ কর্মী ছাঁটাই করা হয় এবং সিদ্ধান্ত হয় যে আগামী নভেম্বরে দ্বিতীয় ধাপে বাকিদের বিদায় জানানো হবে। পরিকল্পনা ছিল, দৈনন্দিন কাজগুলোর বড় অংশ পরিচালনা করবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত এআই এজেন্ট বা ভার্চুয়াল কর্মীরা, আর তাদের তদারকির জন্য রাখা হবে মেধার ভিত্তিতে বাছাই করা অত্যন্ত সীমিত সংখ্যক মানব কর্মী। মেটা কর্তৃপক্ষের উদ্দেশ্য ছিল ছাঁটাই থেকে বেঁচে যাওয়া অর্থ দিয়ে বিশ্বমানের এআই বিশেষজ্ঞদের চড়া বেতনে ধরে রাখা।
তবে জুকারবার্গের এই বল প্রয়োগের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন শুরু হতেই মেটার অভ্যন্তরে নজিরবিহীন বিদ্রোহ দেখা দেয়। প্রতিষ্ঠানে কর্মরত প্রকৌশলী ও অন্যান্য কর্মীরা বুঝতে পারেন, প্রযুক্তি প্রয়োগের নামে আসলে তাদের কাজ থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার পাঁয়তারা চলছে। পরিবেশ আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যখন মেটা কর্তৃপক্ষ কর্মীদের কম্পিউটারে ট্র্যাকিং সফটওয়্যার ইনস্টল করে তাদের মাউসের ক্লিক ও কি-বোর্ডের টাইপিং নজরদারি করা শুরু করে, যাতে এআই এজেন্টদের মানুষের কাজের ধরন শেখানো যায়। ক্ষুব্ধ কর্মীরা মেটার নিজস্ব যোগাযোগ মাধ্যম ‘ওয়ার্কপ্লেস’-এ জুকারবার্গসহ উচ্চপদস্থ কর্তাদের তীব্র সমালোচনা শুরু করেন। অভ্যন্তরীণ জরিপে কর্মীদের সন্তুষ্টির হার ৭৪ শতাংশ থেকে লাফিয়ে ৫৫ শতাংশে নেমে আসে, এমনকি অফিসে ট্র্যাকিং ও ছাঁটাইয়ের বিরুদ্ধে পোস্টার টাঙিয়ে প্রতিবাদ জানাতে দেখা যায় অনেককে।
কর্মী বিদ্রোহের বাইরেও প্রজেক্ট ওটি ভেস্তে যাওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ ছিল স্বয়ং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যর্থতা। মেটা ভেবেছিল এআই এজেন্টদের মাধ্যমে কোডিং বা প্রোগ্রামিং দ্রুত গতিতে সম্পন্ন হবে। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা। এআই চালিত কোডিং কোডের পরিমাণ বিপুল বাড়ালেও কাজের গুণগত মান ও উৎপাদনশীলতায় চরম ধস নামায়। এআই এজেন্টগুলোর নিয়ন্ত্রণহীন কাজের ফলে সিস্টেমে জটিলতা বেড়ে যায়, ফায়ারওয়াল ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সিকিউরিটি ইনসিডেন্ট বা নিরাপত্তাজনিত বিঘ্ন এক লাফে ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। এমনকি জুন মাসে একটি দুর্বল এআই কাস্টমার সাপোর্ট চ্যাটবটের নিরাপত্তা ত্রুটি কাজে লাগিয়ে সাইবার অপরাধীরা জনপ্রিয় সব ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট হ্যাক করতে সক্ষম হয়। প্রদেয় প্রতিশ্রুতি এবং বাস্তব দক্ষতার এই বিশাল ব্যবধান উন্মোচিত হতেই জুকারবার্গের পরিকল্পনার ভিত্তি নড়ে ওঠে।
অভ্যন্তরীণ এই বিশৃঙ্খলা, এআই প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা এবং কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগের বিপরীতে আশানুরূপ ফল না পাওয়ায় বিনিয়োগকারীদের চাপের মুখে জুকারবার্গ শেষ মুহূর্তে পিছু হটতে বাধ্য হন। গত ১৯ মে প্রথম ধাপের ছাঁটাই কার্যকর হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে মে সিইও নভেম্বরের নির্ধারিত দ্বিতীয় ধাপের ছাঁটাই প্রক্রিয়া বাতিল ঘোষণা করেন। কর্মীদের আশ্বস্ত করতে পরে তিনি এক অভ্যন্তরীণ বার্তা ও টাউন হলে স্বীকার করেন যে, এআই প্রযুক্তির অগ্রগতি যতটা দ্রুত হবে বলে তারা আশা করেছিলেন, বাস্তবে তা হয়নি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে মেটা প্রশাসন পরবর্তীতে কর্মীদের নজরদারি বন্ধ করে এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর আশ্বাস দেয়।
বর্তমানে এই ব্যর্থতার ধাক্কা সামলাতে মেটা তাদের জনসংযোগ কৌশল বদলে ফেলে নিজেদের ‘মানুষকেন্দ্রিক’ প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রচার করতে শুরু করেছে। তবে বিশ্বজুড়ে বিশ্লেষকদের মতে, এআই প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করে রাতারাতি প্রতিষ্ঠানে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনার এ ঘটনা প্রযুক্তি বিশ্বের বাকি পরাশক্তিগুলোর জন্য এক বড় সতর্কবার্তা। এআই কর্মীবাহিনীর পরিপূরক হতে পারে, কিন্তু রাতারাতি মানুষের জায়গা দখল করতে গেলে যে প্রযুক্তি ও সামাজিক; দুই দিক থেকেই চরম বিপর্যয় নেমে আসতে পারে, মেটার এই ছাঁটাই নাটকের ব্যর্থতাই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
রয়টার্সের বিশেষ প্রতিবেদন








