ছবি সংগৃহীত
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : অনেক মাদ্রাসায় অতিরিক্ত নিপীড়ন ঘটে বলে গুঞ্জন রয়েছে। কিছু তার অমানবিক, কিছু অনৈতিক। মাঝে মাঝে তার উন্মোচনও ঘটে। কিছুদিন আগে এরকম এক ঘটনার খবর প্রকাশ পায়। সেটা এই রাজধানীর বনশ্রী এলাকার এক মাদ্রাসায়। ছুটির পরে ভবনের তৃতীয় তলায় এক শিক্ষার্থীর ঝুলন্ত লাশ পাওয়া যায়। তার শরীরে অনৈতিক নির্যাতনের ক্ষত ছিল। লেখাপড়া করতে সে ঢাকায় এসেছিল সুদূর চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে।
নেত্রকোনা থেকে খবর, মাদ্রাসার ছাত্রীকে ধর্ষণের দায়ে শিক্ষক কারাগারে। আমানুল্লাহ মাহমুদী নামের ওই শিক্ষক তার ওই ছাত্রীটিকে ছুটির পরে মাদ্রাসাসংলগ্ন মসজিদ ঝাড়ু দিতে বলেন। তারপর নিজের ঘরে নিয়ে তাকে ধর্ষণ করেন। মেয়েটি চিৎকার করে উঠলে প্রহারের ভয় দেখান। এরকম একাধিকবার ঘটেছে। ভয়ে শিশুটি কাউকে কিছু বলেনি। কিন্তু মা যখন টের পান যে তার কন্যা অন্তঃসত্ত্বা, তখন ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে যায়। থানায় গিয়ে মা নালিশ করেন। মাদ্রাসাশিক্ষককে আটক করা হয়।
শিশু নির্যাতনের ঘটনাগুলো ছাড়া-ছাড়া, তবে সবগুলো মিলে উপাদান বিষণ্নতার এক মহাকাব্যের। ঘরের ভিতরেও শিশুরা এখন নিপীড়িত হচ্ছে। পিতা-মাতার মধ্যে বিরোধ, বিভিন্ন ধরনের পারিবারিক অশান্তি তো আছেই; রয়েছে প্রযুক্তির সংক্রমণও। যেমন একটি জরিপ জানাচ্ছে যে ঢাকার শিশুরা দিনে পাঁচ ঘণ্টা ডিজিটাল স্ক্রিনে আটক থাকে।
তাৎক্ষণিক বিচারের আরেকটি খবর: বাড়ির মালিককে গণপিটুনি; ফাঁসির দাবিতে থানা ঘেরাও। ঘটনাটি শেরপুরের। সেখানকার পৌর এলাকায় ধর্ষণের দায়ে ধৃত হয়ে গণপিটুনির প্রাথমিক শাস্তি পেয়েছেন এনামুল হক (৩৮) নামের এক ব্যক্তি। তিনি একটি বাড়ির মালিক, যে বাড়িতে পাঁচ মাস আগে এক দম্পতি ঘর ভাড়া নেন। স্বামী কাজ করেন ফার্নিচারের দোকানে। সকালে যান ফিরতে রাত হয়। স্ত্রী ঘরে থাকেন, একা। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বাড়ির মালিক মহিলাকে প্রায়ই উত্ত্যক্ত করতেন। বিপদ ঘটতে পারে এই শঙ্কায় ওই দম্পতি অন্যত্র বাসা খুঁজছিলেন। শিকার হাতছাড়া হচ্ছে টের পেয়ে বাড়ির মালিক আর অপেক্ষা করেননি; এক ভরদুপুরে অসহায় মহিলাকে ধর্ষণ করেন। খবর জানাজানি হয়ে গেলে, ওই দিন রাতেই তিন-চার শ লোক জড়ো হয়। পুলিশ এসে এনামুল হককে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। জনতা তাতে সন্তুষ্ট না হয়ে তার ফাঁসির দাবিতে থানা ঘেরাও করে।
প্রতিবেশীরা উদ্ধার করলে অবশ্য দুর্বৃত্ত ধর্ষকের হাত থেকে বাঁচার সুযোগ থাকে। যেমনটা ঘটেছে ঢাকার কলাবাগানে। সেখানেও বাড়ির এক মালিক জড়িত। বয়স তার ৬৩। আলমগীর হুদা রুবেল নামের ওই লোকটির নিজের কোনো পরিবার নেই। থাকেন ভাইয়ের পরিবারের সঙ্গে। একই বাড়িতে। তার বাড়ির ভাড়াটের শিশুকন্যাটির বয়স রামিসার মতোই ৮ বছর। পড়েও সে রামিসার মতোই ক্লাস টুতেই। চকলেট দেওয়ার কথা বলে তাকে নিজের ঘরে এনে বাবার বয়সি লোকটি শিশুটিকে ধর্ষণের চেষ্টা করেন। রামিসার তুলনায় শিশুটির কপাল ভালো। চিৎকার করলে প্রতিবেশীরা ছুটে আসেন। দরজায় ধাক্কা দেন। আলমগীর হুদা রুবেল দরজা খুলতে বাধ্য হন। শিশুটি রক্ষা পায়। পুলিশ এসে রুবেলকে থানায় নিয়ে যায়। শিশুদের তো এই অবস্থা, বয়স্কদের ভিতরে নিঃসঙ্গতা ও হতাশা কীভাবে কাজ করছে তার দুটি দৃষ্টান্তের উল্লেখ করেছি। আরেকটি ঘটনারও খবর পাওয়া গেল।
সেটি এই মর্মে: ঢাকার মিরপুরে নিজের ফ্ল্যাটে সেলিনা আফরোজের মৃত্যু। তিনিও একাই থাকতেন। তাঁর স্বামী ও দুই কন্যা থাকেন কানাডায়। তিনি নিজেও সেখানে কিছুকাল ছিলেন। কিন্তু স্বামীর সঙ্গে বিরোধের তাড়নায় ১০-১২ বছর হলো ঢাকায় ফিরে একাকীই থাকতেন। কারও সঙ্গে মিশতেন না। কেনাকাটা করতেন সন্ধ্যার পর। রান্নাবান্না করতেন নিজেই। খবরের শিরোনামে বলা হয়, ‘মিরপুরে আরেক নিঃসঙ্গ নারীর অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার।’ তাঁর বয়স বলা হচ্ছে ৫৫। তাঁকে তো বৃদ্ধা বলা যাবে না; আরও অনেক বছর তাঁর বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চয়ই ছিল।
শিশু নির্যাতন ও কটি বিষণ্নতার মহাকাব্যধর্ষণ এবং হতাশায় আত্মহনন তো বাড়ছেই, ছিনতাইও বসে নেই। বাড়ছেই। পেশাদার সন্ত্রাসীরা বহুদিন ধরেই ছিল। তারা নিঃশেষ হয়ে যায়নি, বরং রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ে প্রকাশ্যে যেমন, গুপ্তভাবেও তেমনি আগের চেয়েও বেশি তৎপর রয়েছে। ছিনতাই নতুন কোনো ব্যাপার নয়, তবে ওই কাজ এখন যে শুধু পরিমাণে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়েছে তা নয়, গুণগতভাবেও উন্নত হয়েছে। কাজটিতে রীতিমতো পেশাদারত্বই দেখা দিয়েছে। পেশাদার একটি দল শুনলাম ধরা পড়েছে।
সন্ধ্যার পরে মাইক্রোবাসে দলটি নারায়ণগঞ্জ থেকে রওনা হয়ে ঢাকায় আসত এবং বিশেষভাবে মোহাম্মদপুর এলাকার রাস্তাঘাটে রাতভর তৎপরতা চালাত। একটি দল ধরা পড়েছে, আরও দল নিশ্চয়ই আছে। শঙ্কা হয়, ছিনতাই না নতুন একটি পেশা হিসেবেই গড়ে ওঠে! বেকারের সংখ্যা তো বাড়ছেই।
গত ১৩ জুন রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের সামনের সড়কে সোহেলি ইসলামের ওপর হামলা করেছিল মোটরসাইকেল আরোহী, হেলমেট-পরা যে দুই ছিনতাইকারী, তারাও তো মনে হয় পেশাদারই। সোহেলি ইসলাম তাঁর মেয়েকে নিয়ে পারিবারিক এক অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন দিনাজপুরে। সেখান থেকে রাতের বাসে গাবতলীতে পৌঁছেন ভোর ৫টায়। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে মা ও মেয়ে অটোরিকশায় রওনা দেন ধানমন্ডিতে, নিজেদের বাসার দিকে। পথিমধ্যে ওই আক্রমণ। ছিনতাইকারীরা তাঁর হাতের ব্যাগ ধরে টান দেয়; ব্যাগের ফিতা জড়ানো ছিল হাতে; আচমকা টানে তিনি ছিটকে পড়েন সড়কে। মাথায় আঘাত পান। আর্তনাদ করেছেন। সড়কে লোকজন ছিল, কেউ সাড়া দেয়নি। মহিলার মেয়ে এবং অটোরিবশার ড্রাইভার মিলে তাঁকে পাশের হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখান থেকে পরপর অন্য দুটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু বাঁচানো যায়নি।
ওই যে কেউ সাড়া দিল না, তার ব্যাখ্যা কী? ব্যাখ্যা এই যে, একাকী মানুষ এগোতে ভয় পায়। কারণ ভয়ের একটি আবহ দেশব্যাপী এখন দাপটের সঙ্গে বিরাজমান। সমবেত হতে পারলে সেই ভয় কেটে যায়। সড়কের ওই মানুষগুলোই ছিনতাইকারীদের পাকড়াও করত, আটক করে গণপিটুনি দিত, যদি তারা একত্র হতে পারত। একত্র হলে মানুষ সাহসী হয়, যার অবিস্মরণীয় নিদর্শন আমরা একাত্তরে দেখেছি। দেখেছি নব্বই এবং চব্বিশেও।
বাংলাদেশের অর্থনীতির নির্ভরতা তো এখনো কৃষির ওপরেই। কৃষক কীভাবে বাঁচে সে খবর সচরাচর অজ্ঞাতই থাকে। মাঝেমধ্যে খবর যা পাওয়া যায় তা উৎফুল্ল করে না, দুশ্চিন্তাগ্রস্তই করে। যেমন এই সংবাদ-শিরোনামটি : ‘ধানের হাটে আরও অসহায় কৃষক।’ ভিতরের খবর : ১. এক মণ ধানেও মিলছে না একজন শ্রমিকের মজুরি। ২. কষ্টের ধানে দুঃখ বাড়ছে কৃষকের সংসারে। ৩. বৃষ্টিতে ভেজা ধান সংরক্ষণ করতে পারছেন না কৃষক। ৪. উৎপাদনের খরচই উঠছে না। ৫. খরচের ভারে নুইয়ে পড়ছেন প্রান্তিক কৃষক। হাওড় এলাকায় বর্ষা এলে প্রতি বছরই চাষির মুখ শুকায়, উৎকণ্ঠায় প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়। ভালো খবর কখনই পাওয়া যায় না। এবারের খবর আরও খারাপ। দুটি খবর বিপন্ন কৃষকের দুর্দশার ভয়াবহতার কিছুটা আভাস দেয়। ১. তলিয়ে যাওয়া ধান দেখে ঢলে পড়লেন কৃষক, জমিতেই মৃত্যু। ২. স্ট্রোকে হাসপাতালে আরও দুজন।
হাওড়ে বন্যার সময় ফসল উদ্ধারে পুরুষদের পাশাপাশি মেয়েরাও কাজ করেছেন, সমান মাত্রায়। কিন্তু মজুরি পাওয়ার ক্ষেত্রে দেখা গেছে সেই পুরোনো বৈষম্য। লিচুর মৌসুমে ঈশ্বরদীতে শ্রমিকের প্রয়োজন হয়, পুরুষদের পাশাপাশি মেয়েরাও কাজ করেছেন। কিন্তু মেয়েরা পেয়েছেন পুরুষদের অর্ধেক। পুরুষদের ৭০০-৮০০ টাকার জায়গায় মেয়েদের প্রাপ্তি ৩০০-৪০০ টাকা। ভালো কথা, ওই কর্মক্ষেত্রে কিন্তু মেয়েদের বোরখা-হিজাব পরে যেতে হয়নি। বিশেষ পর্দার কোনো বালাই ছিল না। অথচ নিরাপত্তার প্রশ্ন ওঠেনি। হিজাব-বোরখা পরে গেলেও কেউ তাকে বাধা দিত না।
হাওড়ে বন্যার ব্যাপারে স্মরণীয় এটাও যে সবটাই যে প্রাকৃতিক তা নয়, পেছনে মানুষের হাতও রয়েছে। অপরিকল্পিত বাঁধ ও সড়ক নির্মাণ এবং দুর্নীতির দায়িত্ব কম নয়।
স্থানীয় সরকারের অকার্যকারিতাও দায়ী। সর্বোপরি ওপর থেকে যে পানি প্লাবনের মতো নেমে আসে, তার বিষয়ে প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের রাজনৈতিক সমঝোতার দিকটাও রয়েছে। তাৎপর্যপূর্ণ খবর অবশ্য এটি যে কোথাও কোথাও স্থানীয় লোকেরা ভাঙা বাঁধ নিজেরাই মেরামত করে পানির প্রবাহ ঠেকিয়েছেন, সরকারি উদ্যোগের জন্য অপেক্ষা করেনি।
♦ লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় । সূএ: বাংলাদেশ প্রতিদিন








