ছবি সংগৃহীত
আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু :প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার ছয় মাস দেশ পরিচালনা করেছে। সময়ের বিচারে সরকারকে এখনো শিক্ষানবিশ সরকার বলা যেতে পারে। রাজনৈতিক সরকার হলেও প্রকৃতপক্ষে দেশ পরিচালনা করছেন আমলারাই। প্রধানমন্ত্রীসহ তাঁর মন্ত্রিসভার অধিকাংশ মন্ত্রী নতুন এবং অতীতে যাঁরা বেগম খালেদা জিয়ার সরকারে মন্ত্রিত্ব করেছেন, তাঁরা বয়সের ভারে অনেকটাই ন্যুব্জ। প্রায় দুই দশক রাজনীতির বাইরে থাকায় নতুন সময় সামলাতে তাদেরও যে পদে পদে সমস্যার মধ্যে পড়তে হচ্ছে, তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। একটি রাজনৈতিক সরকারের পক্ষে তাদের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথে প্রথম পা ফেলার জন্যও সম্ভবত ছয় মাস যথেষ্ট সময় নয়। সবকিছু বুঝে উঠতেই অনেক সময় পেরিয়ে যায়। তবে সামনে এগোনোর জন্য যা প্রয়োজন, দেশে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে এনে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যমূল্যের লাগামহীন বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ ও জরুরি সার্ভিসগুলোর মান ও সরবরাহ নিশ্চিত করা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে দেশজুড়ে যে ভীতির সংস্কৃতি গড়ে তোলা হয়েছিল এবং ড. ইউনূসের নেতৃত্বে দেড় বছরের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের আইনহীন উচ্ছৃঙ্খল অবস্থা বিরাজ করছিল, সেখান থেকে বিএনপি সরকার এখনো দেশকে বের করে আনতে পারেনি। আইনহীনতার কারণে জনগণ ক্রমশ হতাশ হয়ে পড়ছে এবং পণ্যমূল্য ও গ্যাস-বিদ্যুৎ-জ্বালানির যুগপৎ মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ ঘাটতির কারণে জনগণের মাঝে ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হতে শুরু করেছে।
এমন পরিস্থিতিতে সুযোগসন্ধানীরা বলার চেষ্টা করছে যে ‘আগেই ভালো ছিলাম’! এ প্রবণতা মানুষের মাঝে সম্ভবত অনাদিকাল থেকেই রয়েছে। ব্রিটিশরাজ ভারত ছেড়ে যাওয়ার পর কংগ্রেসের অধীনে ভারত ভালোভাবে পরিচালিত হচ্ছিল না, কারণ স্বাধীনভাবে গণতান্ত্রিক সরকার পরিচালনার অভিজ্ঞতা ভারতের রাজনীতিবিদদের ছিল না। অতএব একটি শ্রেণি বলতে শুরু করেছিল, ‘ইংরেজ আমলেই ভালো ছিলাম।’ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনে ভারতীয় জনগণ কি সুখের সাগরে সাঁতার কেটেছে? জনগণের বিপুল অংশই লুটেরা ব্রিটিশরাজের অবসান কামনা করেছে, সংগ্রাম করেছে, অনেকে ফাঁসির মঞ্চে জীবন দিয়েছে এবং রাজনৈতিক নেতারা বছরের পর বছর দেশের অভ্যন্তরে কারাগারে কাটিয়েছেন, এমনকি বহু নেতা চিরদিনের মতো দ্বীপান্তরিত হয়েছিলেন। তবু কিছু মানুষের কাছে অতীত যত মন্দ অভিজ্ঞতায় ভরা থাকুক, তাদের কাছে বর্তমানের চেয়ে অতীত ভালো। নীরদ সি চৌধুরীর মতো উপমহাদেশের খ্যাতিমান পণ্ডিত পর্যন্ত মনে করতেন যে ব্রিটিশের ভারত থেকে চলে যাওয়া উচিত হয়নি। তিনি তাঁর ‘অটোবায়োগ্রাফি অব অ্যান আননোন ইন্ডিয়ান’ গ্রন্থে এই মর্মে তাঁর বিশ্বাস ব্যক্ত করেছেন, ‘ব্রিটিশ শাসন ভারতের আইনশৃঙ্খলা, আধুনিক শিক্ষা এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিল। তাদের হঠাৎ চলে যাওয়ার ফলে ভারতীয় উপমহাদেশে বিশৃঙ্খলা ও দেশভাগজনিত হিংসার সৃষ্টি হয়েছে। ব্রিটিশরা ভারতে শক্ত আইন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করেছিল। ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার ফলে দেশভাগ ও দাঙ্গা সহজে প্রতিহত করা সম্ভব হয়নি।’
১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করার পর কয়েক বছর পর্যন্ত শোনা গিয়েছিল, ‘পাকিস্তান আমলেই ভালো ছিলাম’। আসলে কি ভালো ছিল? ভালোই যদি থাকত, তাহলে ১৯৪৭ সালে একটি দেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র এক বছর পর নতুন দেশের বিরুদ্ধে ক্ষোভ সৃষ্টি হতো না এবং ২৩ বছরের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ সশস্ত্র স্বাধীনতাযুদ্ধে গড়াত না। মানুষ তার অবচেতন মনেই কোনো পরিবর্তন থেকে তাৎক্ষণিকভাবে সীমাহীন প্রাপ্তির আশা করে এবং এর ব্যতিক্রম হলেই অতীতের জাবর কাটে। শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে তাঁর কোনো কোনো মন্ত্রী বাংলাদেশকে সিঙ্গাপুরের সঙ্গে তুলনা করেছেন, এক মন্ত্রী বলেছিলেন ‘আমেরিকায় উঁচু উঁচু কিছু বিল্ডিং ছাড়া আর কী আছে?’ এমনকি শেখ হাসিনা পর্যন্ত বলেছিলেন, ‘২০ ঘণ্টা প্লেনে যাত্রা করে আটলান্টিক পার হয়ে আমেরিকায় না গেলে কিচ্ছু আসে-যায় না।’ অর্থাৎ তাঁর শাসনামলে বাংলাদেশকে তিনি উন্নতির শিখরে পৌঁছানোর দৌড়ে সিঙ্গাপুর, আমেরিকার পর্যায় ছাড়িয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁর তাঁবেদার পররাষ্ট্রমন্ত্রী এম এ মোমেন আরও একধাপ এগিয়ে নিয়েছিলেন বাংলাদেশকে। ২০২২ সালে বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশে সবাই বেহেশতে আছে।’ ওই সময় আওয়ামী লীগে সদ্য যোগদানকারী মোহাম্মদ এ আরাফাত (২০২৪-এর আওয়ামী লীগ সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী) যমুনা টিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘কথাটি সর্বৈব মিথ্যা। বর্তমান বাস্তবতায় বিশ্বের কোনো দেশই বেহেশতে নেই। এমনকি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও এক দিন পরেই সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ফলে নিত্যপণ্যের দামও বেড়েছে, মানুষের কষ্ট হচ্ছে।’ (যমুনা টিভি অনলাইন সংস্করণ, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২২)। অতএব বিএনপি সরকার তার প্রাথমিক সময়ে যে সমস্যাগুলো মোকাবিলা করছে, তা বহুলাংশে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া।
এটা তো মাত্র একটি দিক। আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় অপকর্ম ছিল রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানের দলীয়করণ, ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার অভিলাষ, স্বাধীনতার অবদান ও কৃতিত্বে অন্য কোনো দল বা ব্যক্তিকে শরিক করতে অস্বীকৃতি এবং ঢালাওভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন। এমনকি জুলাই-আগস্টের হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে অনুশোচনা ব্যক্ত করতেও তাদের টপ টু বটম অস্বীকৃতির মাঝে মানসিক দৈন্য স্পষ্ট হয়ে উঠে এবং তারা ভবিষ্যতে যদি আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে আসতে পারে, অতীতে যা করেছে, তার চেয়েও দানবীয় রূপে ফিরে আসবে, তাদের আস্ফালন, দম্ভোক্তি থেকে তা স্পষ্ট। অতএব, যাঁরা বলতে চান, ‘আগেই ভালো ছিলাম,’ তাঁরা আসলে তাঁদের মনের কথা বলেন না। আওয়ামী লীগ ও অন্তর্বর্তী আমলে সহ্য করা যন্ত্রণার খেদ থেকে বলেন। এ কথাও মনে রাখতে হবে যে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে বাংলাদেশের প্রথম সরকারের আমলে আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ তকমা দিয়েছিলেন, আওয়ামী লীগ পরবর্তীকালেও তা মুছে ফেলতে পারেনি। বারবার তাদের বলতে হয়েছে, ‘আসুন, দেখে যান, বাংলাদেশ এখন আর তলাবিহীন ঝুড়ি নয়।’ কিন্তু টানা সাড়ে ১৫ বছর ক্ষমতায় থেকে ব্যাংকের অর্থ ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুট করে আওয়ামী লীগ ভিন্নভাবে দেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি হিসেবেই রেখে গেছে। তবে স্বীকার করতেই হবে, আওয়ামী লীগ একটি বড় দল ছিল, প্রশাসন ও সমাজের সব স্তরে এখনো তাদের গুণগ্রাহী ও সুবিধাভোগীরা রয়েছেন। অতএব প্রচারকৌশল হিসেবেও তারা ‘আগেই ভালো ছিলাম’ তত্ত্ব ছুড়ে দিয়ে থাকতে পারে। এসব অপপ্রচার কাটিয়ে ওঠার ব্যাপারে সরকারকে কৌশলী হতে হবে।
গত ছয় মাসে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চোখে পড়ার মতো উন্নতি ঘটেনি, তা দৃশ্যমান। সরকার নতুন হলেও যে অপ্রয়োজনীয় কোনো সত্তা নয়, তা প্রমাণ করতে ‘প্রথম রাতেই বিড়াল মারা’ সরকারের কর্তব্য। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে হাঁটবাজার ও পরিবহনে চাঁদাবাজি এবং দখলদারত্বে হাতবদলের ফলে নতুন করে এসব কাজে যারা জড়িত হয়েছে, তাদের দমন করতে বর্তমান সরকারের ব্যর্থতা জনগণকে ব্যথিত ও চরম হতাশ করেছে। এসব অবাঞ্ছিতদের দমন করতে না পারায় ক্ষমতাসীন দলের নিম্নস্তরে খুনাখুনি লেগেই আছে। যদিও অবাঞ্ছিতদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় ও আনুগত্য নেই, কিন্তু বাস্তবে তারা ক্ষমতাসীন দলের আশ্রয়প্রশ্রয়েই টিকে থাকে। এ কারণে তাদের সব অন্যায়-অপকর্মের দায়ভার পড়ে সরকারের ওপর। এর ফলে সরকারের ওপর জন-আস্থা হ্রাসের কারণ সৃষ্টি হয় এবং প্রকারান্তরে সরকারের সুনামহানি হয়। অতএব নিজ স্বার্থেই সরকারের উচিত তাদের জনপ্রিয়তা ও ভাবমূর্তি উজ্জ্বল রাখার জন্য এই শ্রেণি থেকে নিজেদের জরুরি ভিত্তিতে মুক্ত করা।
নতুন সরকার যত নতুনই হোক, তাদের ভাবতে হবে যে জনগণ ভোট দিয়ে একটি সরকার গঠন করে কেন? জনগণ কেন এমন একজন নেতা বা এমন কাউকে চায়, যিনি তাদের পরিচালনা করবেন উচ্চতর একটি অবস্থান থেকে? গণতন্ত্রের নিয়মই এমন যে জনগণ সরকার গঠন করে বা অন্যদের দ্বারা নিজেদের শাসিত হতে দেয়? তারা স্বীকার করে নেয় বা চায় যে যোগ্যতর কেউ তাদের ওপর ক্ষমতা বজায় রাখুক এবং দেশকে উন্নতির পথে নিয়ে যাক। তারা সরকার চায় শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার প্রয়োজনে এবং আরও ভালোভাবে বাঁচার তাগিদে। তারা চায় সরকার জাতিকে একসঙ্গে নিয়ে কাজ করবে। সরকার কোনো দল নয়, দলেরও নয়, সরকার দেশের ও সবার। এ সত্য বিস্মৃত হলে এবং সরকারকে কেবল একটিমাত্র দলের সেবায় নিয়োজিত করলে পরিণাম কী হতে পারে গত সাড়ে পাঁচ দশকে বাংলাদেশ বারবার তা প্রত্যক্ষ করেছে। এসব দৃষ্টান্ত বিএনপি সরকারের জন্য শিক্ষণীয় হতে পারে। দেশে বিরাজমান পরিস্থিতির লাগাম এখনই টেনে ধরতে না পারলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে বেশি সময় লাগবে না। অতএব সময়ক্ষেপণ না করে সরকারকে প্রমাণ করতে হবে যে যেকোনো বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগে তারা দ্বিধা করবে না এবং সীমিত সংখ্যক অপরাধপ্রবণ মন্দ লোকের দ্বারা সৃষ্ট ভীতির সংস্কৃতি থেকে দেশকে ও সমাজের বৃহত্তর অংশকে সুরক্ষিত রাখবে।
♦ লেখক : যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সিনিয়র সাংবাদিক । সূএ: বাংলাদেশ প্রতিদিন








