ছবি সংগৃহীত
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : উপনিবেশবাদীরা আসলেই ডাকাত। লুণ্ঠনই আদর্শ তাদের। লুটপাটের লোভেই জাহাজ ভাসায় এবং স্থানীয়দের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। কোনো প্রাণীই তাদের পাশে দাঁড়াতে পারবে না নিষ্ঠুরতায়। কিন্তু তারা ভাবটা করে সেবকের। এটাই হচ্ছে নির্মমতার চূড়ান্ত নিদর্শন। ভান করছে সেবার এবং বিশ্বাসও হয়েছে হয়তো মনে মনে যে, সেবা করার জন্যই এসেছে, ঈশ্বরের প্রেরিত একেকজন। কাজেই সাধারণ ডাকাতের মধ্যে যে অপরাধবোধটুকু থাকে সেটুকুও থাকে না। নির্দ্বিধায় এবং বিবেকবানের নৈতিক প্রফুল্লতায় ডাকাতি চালিয়ে যায়। তাদের নিষ্ঠুরতার তুলনা নেই।
যারা ভোট সংগ্রহে বের হন স্থানীয় কিংবা জাতীয় নির্বাচনে, তাঁরা অবশ্যই ডাকাত নন। সেবক বটে। তাঁরা বলেন তাঁরা মানুষের সেবা করতে চান। তা গ্রামে তো হাজারো সুযোগ রয়েছে মানুষের সেবা করার, যেকোনো একটা গ্রহণ করুন না কেন, এমন মাতম না করে। পুলটা ভাঙা, মেরামত করে দিন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বাঁশের খুঁটিতে চাল নেই, সরবরাহ করুন। রাস্তা নেই, তৈরি করুন। বিদ্যুৎ আসেনি, নিয়ে আসুন। গ্রন্থাগার, টিউবওয়েল, চিকিৎসালয়, যেদিকে তাকান জনসেবার অপরিমেয় সুযোগ আপনাকে নীরবে ডাকাডাকি করছে, সাড়া দিন। না, তা দেবেন না। কেবল নির্বাচন এলে লাফিয়ে পড়বেন। বলবেন, যত লাগে দেব। দয়া করে আমাকে একটু সুযোগ দিন, আপনাদের সেবা করার। মেহেরবানি করুন, মুখ তুলে তাকান। ওই যে প্রার্থী আমার প্রতিদ্বন্দ্বী; ও আবার কী সেবা করবে, সেবা যা করার করব আমি।
বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এ সেবকদের কেউই বিশ্বাস করে না। মতলব জানা আছে। কিছুদিন আগে আরেক দল সেবক এসেছিলেন। সেবা করবেন, সুযোগ দিন। তাদের কেউ জিতেছেন, অন্যরা হেরেছেন। জেতা-হারা নির্বিশেষে সবাই এখন চলে গেছেন। গ্রামে নেই, শহরে গেছেন চলে। অনেকে আরও বড় শহর থেকে এসেছিলেন। আমেরিকার। তাঁদের কেউ কেউ জিতেছেন, যারা হেরেছেন তাঁরা দেশে নেই, ফিরে গেছেন প্রবাসে। যাঁরা নির্বাচিত হলেন তাঁরা কোথায়? গ্রামে যাননি। গ্রামে যাবেন কী, সংসদেই যান না অনেকে। সেজন্য সংসদে কোরাম হতে চায় না। অপেক্ষা করতে হয়। তাই বলে বিরোধী দলও সংসদে তেমন আসেন না, বিশেষ বিশেষ উপলক্ষ ছাড়া।
তাহলে? সেবার কী হলো? না, সেবাতে কেউ বিশ্বাস করে না। ভোটপ্রার্থী তো নয়ই, ভোটারও নয়। ভোটপ্রার্থী খুব পরিষ্কারভাবে জানেন কষ্টার্জিত টাকা তিনি কী জন্য অকাতরে দান করছেন। অকাতরে মোটেই নয়, খুবই কাতরভাবে, কিন্তু ভান করতে হচ্ছে কাতর না হওয়ার। জানমাল বলে একটা কথা আছে। জানই আগে আসে, মালের চেয়ে। কিন্তু মাল চলে গেলে জানের দামটা কী? প্রার্থীরা মাল ঢালছেন, জানকে আরও জীবন্ত করবেন বলে। যা খরচ করছেন তার বহুগুণ তুলে নেবেন। নানাভাবে! জায়গা-জমি হাতিয়ে নেবেন। থানাপুলিশের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ নিয়ে কারও বাড়ি দখল করবেন, কারও গাছ কাটবেন। গম থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় অনুদান যা আসে সবই করতলগত করবেন। চাকরি দেওয়ার নাম করে টাকা নেবেন। কৃষিঋণ, পাওয়ার পাম্প, বিদ্যুৎ-যত যা আসে তাঁর প্রশস্ত হাতেই যাবে। রাজা হবেন। দাপট দেখাবেন। ভোটাররা এসব বিলক্ষণ জানেন। সেবকদের তারা খুবই চেনেন। উদ্দেশ্য কী, কেন এত টাকা ঢালা-সবই জানা আছে। সেজন্য তারা সাড়া দেন না, সহজে মুখ খোলেন না। সেবক হতে আগ্রহীরা যে যা দেয়, নিয়ে নেয়। এটাই সময়। পরে আর দেখা পাওয়া যাবে না। সমস্তটা অভিজ্ঞতার মধ্যেই রয়েছে। কোনো মোহ নেই, আস্থার তো প্রশ্নই ওঠে না। মানুষ জানে যে, আমাদের সমাজে সেবা সাধারণত দুই প্রকারের। পদসেবা ও আত্মসেবা। ওপরওয়ালার পা এবং নিজের পকেট-এ দুটোরই সেবা করা হয়ে থাকে। পদসেবাও আত্মসেবাই, নিজের আখেরই গোছাচ্ছেন আসলে, অন্যেরা পা টিপে টিপে।
ইংরেজ উপনিবেশবাদীরা এক দিন আমাদের দেশ দখল করে নিয়েছিল। প্রত্যেকটি ইংরেজ তখন ভাবত যে দখল করে তারা আমাদের উপকার করেছে, আমাদের সেবা করেছে। দেখছ না রাস্তাঘাট, দালানকোঠা, রেললাইন। এসব কারা করল? শিক্ষাদীক্ষা কারা দিল? পাকিস্তানিরা যে নতুন উপনিবেশ গড়েছিল বাংলাদেশে, সেও ওই একই আদর্শবাদিতায়। আমাদের ‘উপকার’ করতে চেয়েছিল। যখন আমরা বলেছি, না তোমাদের উপকার নেব না, তখন ভারী ক্ষেপে গেছে। বন্দুক নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। মূর্খরা বোঝে না কীসে তাদের ভালো, কীসে মন্দ। বুঝিয়ে ছাড়বে।
অনেক কিছু বদলেছে। কিন্তু মূল কাঠামোটি বদলায়নি। এখনো ওই ‘সেবাই’ চলছে। কেউ সেবা করে অবৈধ উপায়ে, সামরিক শাসন জারি করে; কেউ করে বৈধ উপায়ে, ভোট নিয়ে। সেবা মোটামুটি একই রকমের। বারবার স্বাধীন হচ্ছি, বিপ্লব ঘটাচ্ছি, কিন্তু জনগণ তাদের সেবকদের হাত থেকে অব্যাহতি পাচ্ছে না। জাতীয় নির্বাচনে অস্থানীয়রা ছুটে যায়, গ্রামবাসীর কাছে গিয়ে ভোট চায়। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তুলনামূলকভাবে যারা অধিক স্থানীয়, তাদেরই ভিড় বেশি। কিন্তু স্থানীয়ই হোক, কি অস্থানীয়ই হোক, চরিত্র ওই একই নির্ভেজাল সেবকের।
গ্রামে একসময়ে ইউনিয়ন বোর্ড ছিল। সেই ব্রিটিশ আমলে। তখনো নির্বাচন হতো। সেবকরাই নির্বাচিত হতেন। তবে সেই সময়ে ব্যবস্থাটা ছিল অনেকটা সামন্তবাদী। মিয়া ও মাতব্বর বাড়ির লোকেরাই নির্বাচিত হতেন।
বছরের পর বছর ধরে একজনই আসতেন নির্বাচিত হয়ে। ইনি গ্রামের উন্নতিতে সচেষ্ট হতেন হয়তো, কিন্তু কাজ খুব বেশি হতো না এবং শোষণ ঠিকই ছিল। শ্রমজীবী উৎপাদন করত, অবকাশভোগী ভোগ করত এবং জনগণের সেবা করত। তারপর অনেক রদবদল হয়েছে। অতীতের আইয়ুব খানের বুনিয়াদি গণতন্ত্র, জিয়াউর রহমানের গ্রাম সরকার, এরশাদের উপজেলা সিস্টেম-সবই দেখলাম আমরা। কিন্তু জনগণের ভাগ্যে কোনো পরিবর্তন এলো না। নাম বদলাল, জিনিস ঠিকই রইল। সেবকরা সেবা করে চললেন। এরশাদ ও তাঁর চেলারা বলেছিলেন, উপজেলা সিস্টেম করে বিপ্লব সাধন করেছেন, প্রশাসনকে গ্রামবাসীর দোরগোড়ায় নিয়ে গেছেন। তা নিয়ে গেছেন বৈকি। টাউট ও দুর্নীতিকে অসহায় গ্রামবাসীর দরজা পর্যন্ত পৌঁছার রাস্তা করে দিয়েছিলেন। টাকাও বিস্তর খরচ করেছেন। এরশাদ সরকার অপচয়ের যে রেকর্ড রেখে গেছেন তার মধ্যে উপজেলা খাতেরও একটা অবদান ছিল।
সবই তো বুঝলাম, কিন্তু জনগণ কি এভাবে পড়ে থাকবে হিংস্র ও নিষ্ঠুর সেবকদের মুখের কাছে, থাবার নিচে? কিছুই কি করার নেই? জনগণ এই সেবকদের খুবই চেনে। কিন্তু এদের বাইরে কোনো প্রার্থী পায় না। যেদিকে তাকায়, কেবলই সেবক দেখে, সহকর্মী দেখে না। একাত্তরের যুদ্ধের কথা স্মরণ করা যাক। দেশে তখন সেবক ছিল না, শত্রু ছিল এবং মিত্র ছিল। হানাদার ছিল, আর ছিল সহযোদ্ধা। স্বাধীনতার পর দেখা গেল সেবকরা নেমে পড়েছে। কেবলই সেবা করতে চাচ্ছে। বিদেশি সাহায্য এলো, ঋণ এলো, সবই এলো যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে সেবা করার উদ্দেশ্যে। স্থানীয় সেবকরা আন্তর্জাতিক সেবকদের সঙ্গে মৈত্রী গড়ে তুলে আবারও সেই ব্যবস্থাটাকেই শক্তিশালী তরে তুলল যেটি আমরা ভাঙতে চেয়েছিলাম এবং ভেঙে গেছে বলে আশা করেছিলাম। হায় আশা, তোমার মতো প্রতারক কে আছে আর এই বিশ্বসংসারে!
গ্রাম-পাড়া-মহল্লায় এখন আমরা সেবক চাই না। সেবক অনেক দেখেছি, তাদের হাত থেকে এখন মুক্তি চাই। সব সেবকই যে আসলে একেকজন মস্তান তা জানা আছে আমাদের। যা দরকার, সে হলো সহকর্মী ও সহযোদ্ধা। বিকল্প নেতৃত্বের কথা বলা হয়ে থাকে। সেই নেতৃত্ব যে কেবল ওপরে থাকবে তা তো নয়। একেবারে তৃণমূলেও তাকে থাকতে হবে। জনগণের পাশে দাঁড়াতে হবে। সেবক হিসেবে নয়, সহকর্মী হিসেবে, বন্ধু হিসেবে। রাস্তাঘাট তৈরি থেকে শুরু করে অন্যায়, অবিচার, জবরদখল-বিরোধিতা পর্যন্ত সব কাজেই সমস্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হওয়া দরকার। বিচ্ছিন্নভাবে নয়। আঞ্চলিক ভিত্তিতে নয়, সারা দেশজুড়ে। রাষ্ট্রক্ষমতা যে কতবেশি নিয়ামক সেটা কেবল রাজধানীতে বোঝা যায় না, সবচেয়ে দুর্গম পাড়াগাঁয়েও বোঝা যায়। গ্রামও রাষ্ট্রেরই অংশ এবং সেবকরা যে সেবক হতে চান, সে-ও নিজস্ব সেবাকার্যে রাষ্ট্রক্ষমতার অংশ পাবে এই আশাতেই। নইলে কে যেত শীতের রাতে টাকার থলে নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করতে, মানুষের দরজায় দরজায়? নির্বাচিত হলে রাষ্ট্রক্ষমতার অংশভাগী হওয়া যাবে এবং সেবা করা যাবে স্বাধীনভাবে; আশা তো এটাই। এর বিরুদ্ধে আক্ষেপে কাজ হবে না। বিকল্প পদক্ষেপের কোনো বিকল্প নেই। এটা যে আমরা বুঝি না, তা নয়; বুঝি ঠিকই, কিন্তু পদক্ষেপ নিতে পারি না। তাতে আরও বোঝা যায় পদক্ষেপ নেওয়াটা কত বেশি জরুরি।
♦ লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা
সূএ : বাংলাদেশ প্রতিদিন








