সর্বত্রই আস্থাহীনতা

ছবি সংগৃহীত

 

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : আশাবাদী হওয়াটা খুবই দরকার, আশাবাদী হতে যারা আগ্রহী, তারা উন্নতির বিষয়ে নিশ্চিন্ত বোধ করতে পারেন এটা লক্ষ্য করে যে দেশে বড় একটা ভোক্তা শ্রেণির উত্থান ঘটেছে। তাতে বাংলাদেশে পণ্যের চাহিদা বেশ বেড়েছে। আর পণ্যের চাহিদা বাড়া মানেই তো উৎপাদন বাড়া। কিন্তু তাই কী? দুইয়ে দুইয়ে চার? নির্ভুল অঙ্ক? যদি তেমনটাই ঘটত তবে আমাদের জন্য আনন্দের অবধি থাকত না। কারণ উৎপাদন বাড়া মানেই তো কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাওয়া। কিন্তু সেটা কি ঘটছে? বিদেশি পণ্যে কি বাজার ছেয়ে যায়নি? যেসব পণ্য দেশে উৎপাদিত হচ্ছে সেগুলোর উৎপাদক কোম্পানির অনেকটির মালিকানা ইতোমধ্যে কি বিদেশিদের হাতে চলে যায়নি? অন্যরাও কি যাওয়ার পথে উন্মুখ হয়ে নেই? সর্বোপরি উৎপাদন এবং ক্রয়বিক্রয়ের মুনাফাটা যাচ্ছে কোথায়? বড় একটা অংশই তো বছরের পর বছর পাচার হয়ে চলে যায় বিদেশে।

শিল্পোদ্যোক্তাদের একজনকে জানি ব্যক্তিগতভাবে যিনি অত্যন্ত সজ্জন, পাচারে বিশ্বাসী নন; তিনি একটি বই লিখেছেন, যাতে দেশের যে উন্নতি হচ্ছে তার প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন বাংলাদেশে উচ্চ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রবৃদ্ধির। একটি আন্তর্জাতিক ব্যাংকের প্রদত্ত তথ্য উদ্ধৃত করে তিনি এমন আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন-আমাদের দেশে মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থানের হার শিগগিরই ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া এবং ভারতকেও পেছনে ফেলে এগিয়ে যাবে। কিন্তু এই উত্থানে উৎফুল্ল হব বুকের এমন পাটা কিন্তু আমাদের মতো সাধারণ মানুষের নেই। কারণ এই উন্নতির অর্থ দাঁড়াবে একদিকে দেশের সম্পদ পাচার হওয়া, অন্যদিকে বেকার ও দরিদ্রের সংখ্যা বৃদ্ধি। উচ্চবিত্তরা তাদের সম্পদ তো বটেই, এমনকি সন্তানদেরও দেশে রাখবে না। ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে, শিক্ষার জন্য বিদেশ গমনার্থীর সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। একটি পত্রিকা জানাচ্ছে, গত দশ বছরে ওই স্রোত দ্বিগুণ সংখ্যায় স্ফীত ও বেগবান হয়েছে। পাশাপাশি এটাও আমাদের জানা আছে, বাংলাদেশে বিদেশি শিক্ষার্থীদের আসা ক্রমাগত কমছে।

নির্মম সত্যটা হলো, যতই উন্নতি ঘটছে ততই কমছে দেশপ্রেম। তাই বলে দেশপ্রেম কি একেবারেই নিঃশেষ হয়ে গেছে? না, মোটেই নয়। দেশপ্রেম অবশ্যই আছে। বিশেষভাবে আছে সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের মধ্যে। তারা অন্য দেশে গিয়ে বসবাস করবে-এমনটা ভাবতেই পারে না। বেশির ভাগই দেশে থাকে। পরিশ্রম করে। এবং তাদের শ্রমের কারণেই দেশের যেটুকু উন্নতি, তা সম্ভব হয়েছে। ভোক্তারা নয়, মেহনতিরাই হচ্ছে উন্নতির চাবিকাঠি। ঋণ করে, জায়গাজমি বেচে দিয়ে সুবিধাবঞ্চিতদের কেউ কেউ বিদেশে যায়; থাকবার জন্য নয়, উপার্জন করে টাকা দেশে পাঠাবে বলে। বিদেশে গিয়ে অনেকেই অমানবিক জীবনযাপন করে, ‘অবৈধ’ পথে গিয়ে এবং প্রতারকদের কবলে পড়ে কেউ কেউ জেল পর্যন্ত খাটে। কিন্তু তারা বুক বাঁধে এই আশায়, দেশে তাদের আপনজনরা খেয়েপরে বাঁচতে পারবে। বিত্তবানরা যা ছড়ায় তা হলো হতাশা। এ দেশের কোনো ভবিষ্যৎ নেই, এটাই তাদের স্থির বিশ্বাস। হতাশা কিন্তু তারাই সৃষ্টি করে। বিশেষভাবে সম্পদ পাচার করার মধ্য দিয়ে। এই যে দেশে এখন ডলারের সংকট চলছে, এবং যার ফলে সবকিছুর দাম বেড়েছে, তার প্রধান কারণ টাকা ডলারে রূপান্তরিত হয়ে বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে এটা বিত্তবানদের কাজ। তারাই হতাশা সৃষ্টি করে এবং দেশের ভবিষ্যৎহীনতার বিশ্বাস ক্রমাগত বলীয়ান হতে থাকে। এবং নিজেদের ওই হতাশা তারা যে কেবল নিজেদের মধ্যেই আটকে রাখে, তা নয়, অন্যদের মধ্যেও সংক্রমিত করে দেয়। সেটাই স্বাভাবিক। কারণ হতাশা হচ্ছে একটি রোগ, শুধু রোগ নয়, সংক্রামক রোগ বটে। একাত্তরে যখন আমরা চরমতম বিপদের মধ্যে ছিলাম, মৃত্যুর শঙ্কায় দিনরাত সন্ত্রস্ত থাকতাম, তখন এমন চরম বিপদ ও সীমাহীন অত্যাচারের মুখেও আমরা কিন্তু হতাশ হইনি; কারণ আমরা জানতাম আমরা কেউ একা নই, আমরা সবাই আছি একসঙ্গে এবং লড়ছি একত্র হয়ে। ১৬ ডিসেম্বরেই কিন্তু সেই ঐক্যটা ভাঙার লক্ষণ দেখা দিয়েছে; এবং কিছুদিনের মধ্যেই ভেঙে একেবারে খানখান হয়ে গেছে। সমষ্টি হারিয়ে গেছে, সত্য হয়েছে ব্যক্তিগতভাবে উন্নতি করা, না-পারলে কোনোমতে বেঁচে থাকা।

এমনটা কেন ঘটল? ঘটল এ কারণে যে উত্থান ঘটল লুণ্ঠনের, জবরদখলের, ব্যক্তিগত সুবিধা বৃদ্ধির। এবং এসবই প্রধান সত্য হয়ে দাঁড়াল। একাত্তরে আমরা সমাজতন্ত্রী হয়েছিলাম, বাহাত্তরে দেখা গেল সমাজতন্ত্র বিদায় নিচ্ছে, পুঁজিবাদ এসে গেছে। এবং পুঁজিবাদেরই অব্যাহত বিকাশ ঘটেছে এই বাংলাদেশে। দেখা গেছে, পরের সরকার আগেরটির তুলনায় অধিক মাত্রায় পুঁজিবাদী, এবং একই সরকার যদি টিকে থাকে তবে আগেরবারের তুলনায় পরেরবার পুঁজিবাদের জন্য অধিকতর ছাড় দিচ্ছে। পুঁজিবাদের বিকাশের প্রয়োজনে রাস্তাঘাট পরিষ্কার করার জন্য তো আমরা যুদ্ধ করিনি; পুঁজিবাদের বিকাশ তো পাকিস্তান আমলে বেশ গোছগাছ করেই এগোচ্ছিল। আমরা চেয়েছিলাম সবার মুক্তি; চেয়েছিলাম প্রত্যেকেই যাতে মুক্তি পায়।

দেশের মানুষ বিদেশে শিক্ষার জন্য যেমন যায় তেমনি যায় চিকিৎসার জন্যও। বাংলাদেশে ভালো চিকিৎসকের কি অভাব আছে? আধুনিক যন্ত্রপাতি কি নেই? আকাল পড়েছে কি চিকিৎসা বিষয়ে জ্ঞানের? না, অভাব এসবের কোনো কিছুরই নয়। অভাব ঘটেছে একটা জিনিসেরই, সেটা হলো আস্থা। রোগী আস্থা রাখতে অসমর্থ হয়, দেশি চিকিৎসকের চিকিৎসায়। তাই যাদের সামর্থ্য আছে তারা পারলে সিঙ্গাপুর বা ব্যাংককে যায়, অত খরচে যারা অপারগ তারা চেষ্টা করে ভারতে যাওয়ার। হতাশা যেমন, অনাস্থাও তেমনি ভীষণ রকমের সংক্রামক।

আস্থার এই অভাবের কারণটা কী? কারণ হচ্ছে দেশি চিকিৎসকদের অধিকাংশই রোগীকে সময় দিতে পারেন না, পর্যাপ্ত মনোযোগ দানেও ব্যর্থ হন। না দিতে পারার কারণ তাঁদের তাড়া করার জন্য ঘাড়ের ওপর বসে থাকে অর্থোপাজনের নিষ্ঠুর তাগিদ। যত বেশি রোগী দেখবেন, তত বেশি আয় হবে। রোগ সারানোর জন্য খ্যাত হওয়ার চেয়ে আগ্রহটা থাকে অপরের তুলনায় অধিক আয় করার দিকে। আমাদের নতুন স্বাস্থ্যমন্ত্রী দেখলাম আস্থার এই অভাবের কথাটা স্বীকার করেছেন। কিন্তু আস্থা কীভাবে ফেরত আনা যাবে, তা যে তিনি জানেন এমনটা ভরসা করা কঠিন। আর জানলেও তা কার্যকর করার উপায় তাঁর হাতে না থাকারই কথা। কারণ ব্যাপারটা এক-দুজন চিকিৎসকের নয়, ব্যাপারটা এমনকি চিকিৎসাব্যবস্থাতেও সীমাবদ্ধ নয়, এটি ছড়িয়ে রয়েছে গোটা রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ব্যবস্থাজুড়ে। সর্বত্রই আস্থাহীনতা বিরাজমান।

শুরুটা কিন্তু দেশের ভবিষ্যতের প্রতি আস্থার অভাব দিয়েই। সুবিধাপ্রাপ্ত লোকেরা মনে করে, এ দেশের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। তাই অন্যত্র বসতি গড়তে পারলে ভালো। সেই চেষ্টাই তারা করতে থাকে। এবং চেষ্টার অংশ হিসেবে বৈধ-অবৈধ যে পথেই সম্ভব টাকাপয়সা যা সংগ্রহ করতে পারে তা পাচার করার পথ খোঁজে। তাদের এই আস্থাহীনতা অন্যদের মধ্যেও অতি সহজে সংক্রমিত হয়ে যায়। এবং সংক্রমিত হয়ে যাচ্ছেও।

রাষ্ট্র আছে। কিন্তু রাষ্ট্র যে মানুষকে নিরাপত্তা দেবে এমন কোনো ভরসা নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়। অন্য সবকিছু বাদ থাক, রাস্তার ট্রাফিক বাতিগুলোকে যে ঠিকমতো কাজ করাবে তা-ও তো পারছে না। সারা বিশ্বে এমন কোনো বড় শহর আছে বলে আমাদের জানা নেই, যেখানে ট্রাফিক সিগন্যাল যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে অসমর্থ। ঢাকা শহরে ট্রাফিক বাতি আছে, কিন্তু সেগুলোর কোনো কার্যকারিতা নেই। নির্ভরতা ট্রাফিক পুলিশের ওপর। ওদিকে খোদ পুলিশ বাহিনীর ভিতর দুর্নীতি আগেও ছিল, স্বাধীন বাংলাদেশে সেটা কমছে না, ক্রমাগত বাড়ছেই। নিয়ন্ত্রণ আছে বলে মনে হয় না। বিপন্ন হয়ে আদালতে গেলে ন্যায়বিচার পাওয়া যাবে এমন নিশ্চয়তা নেই। আদালতে গিয়ে মামলা করাটাই মস্ত বড় বিড়ম্বনা। টাকা লাগে। সময় খরচ হয়। একবার ঢুকলে সহজে বের হয়ে আসা যায় না, মামলা চলতেই থাকে; এর মধ্যে টাকার আদানপ্রদানে বিরাম ঘটে না। নিম্ন আদালতে বিচার কেনাবেচা সম্ভব এমন গুঞ্জন আদালতপাড়াতেই শোনা যায়। রাষ্ট্রের চলমানতার আসল চাবিকাঠি আমলাদের হাতে। ব্যবসায়ীরাই যে রাজনীতিকে কবজায় রাখে এটা ঠিক, কিন্তু তাদেরও দ্বারস্থ হতে হয় চাবিকাঠি যাদের হাতে তাদের কাছে (অর্থাৎ আমলাদের)। রাষ্ট্রের চরিত্রটা তাই দাঁড়িয়েছে পুঁজিবাদী-আমলাতান্ত্রিক। আমলারা নিজেদের সুযোগসুবিধা বাড়ানোর ব্যাপারেই মনোযোগী, পাবলিকের উপকারের ব্যাপারে নয়। পাবলিক সার্ভেন্টদের কেউ পাবলিকের সেবা করার জন্য রওনা দিয়েছে এমন খবর পেলে পাবলিকের মনে স্বস্তি আসবে কী, আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। এসপিরা বিনা সুদে ঋণের দাবি জানিয়েছিলেন বিগত সরকারের আমলে; আর নিচের দিকে যাঁরা তাঁদের দাবি ছিল ভাতা বৃদ্ধির। সিভিল সার্ভিস অত সুবিধা পেলে পুলিশ সার্ভিস কেন পিছিয়ে থাকবে? সামরিক বাহিনীর সুযোগসুবিধার বিষয়টা অবশ্য জানাজানি হয় না, তবে সরকারের অন্যান্য শাখার লোকেরা নিশ্চয়ই খোঁজখবর কিছু রাখে, এবং নিজেদের বঞ্চিত ভেবে ক্ষুব্ধ হয়।

♦ লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ।  সূএ : বাংলাদেশ প্রতিদিন

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



» আজানের সময় কানে আঙুল দেওয়া হয় কেন?

» জীবনের শ্রেষ্ঠ অধ্যায়ের সমাপ্তি—মধ্যরাতে রাকিবের ফেসবুক পোস্ট

» কোন ডালে সবচেয়ে বেশি প্রোটিন থাকে?

» ‘ককটেল টু’সহ ওটিটিতে আরও যা দেখবেন

» হঠাৎ ব্যাটিং ধসের মুখে বাংলাদেশ

» সিলেটে হামের উপসর্গে আরও দুই শিশুর মৃত্যু, নতুন শনাক্ত ২৮

» রবিবার কিশোরগঞ্জে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী, জেলাজুড়ে উৎসবের আমেজ

» সংগ্রাম, ত্যাগ ও নেতৃত্বে এগিয়ে চলা—ছাত্রদল নেতা আবু আফসান মোহাম্মদ ইয়াহইয়া

» তারেক রহমানের সঙ্গে বিদায়ী সাক্ষাতের পর এবার ছাত্রদল সেক্রেটারির বার্তা

» যে কোনো সময় ছাত্রদলের নতুন কমিটি ঘোষণা

 

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ,

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন,

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

 

ইমেল: [email protected]

ফোন নাম্বার : ০১৫৩৫১৩০৩৫০,

Desing & Developed BY PopularITLtd.Com
পরীক্ষামূলক প্রচার...

সর্বত্রই আস্থাহীনতা

ছবি সংগৃহীত

 

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : আশাবাদী হওয়াটা খুবই দরকার, আশাবাদী হতে যারা আগ্রহী, তারা উন্নতির বিষয়ে নিশ্চিন্ত বোধ করতে পারেন এটা লক্ষ্য করে যে দেশে বড় একটা ভোক্তা শ্রেণির উত্থান ঘটেছে। তাতে বাংলাদেশে পণ্যের চাহিদা বেশ বেড়েছে। আর পণ্যের চাহিদা বাড়া মানেই তো উৎপাদন বাড়া। কিন্তু তাই কী? দুইয়ে দুইয়ে চার? নির্ভুল অঙ্ক? যদি তেমনটাই ঘটত তবে আমাদের জন্য আনন্দের অবধি থাকত না। কারণ উৎপাদন বাড়া মানেই তো কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাওয়া। কিন্তু সেটা কি ঘটছে? বিদেশি পণ্যে কি বাজার ছেয়ে যায়নি? যেসব পণ্য দেশে উৎপাদিত হচ্ছে সেগুলোর উৎপাদক কোম্পানির অনেকটির মালিকানা ইতোমধ্যে কি বিদেশিদের হাতে চলে যায়নি? অন্যরাও কি যাওয়ার পথে উন্মুখ হয়ে নেই? সর্বোপরি উৎপাদন এবং ক্রয়বিক্রয়ের মুনাফাটা যাচ্ছে কোথায়? বড় একটা অংশই তো বছরের পর বছর পাচার হয়ে চলে যায় বিদেশে।

শিল্পোদ্যোক্তাদের একজনকে জানি ব্যক্তিগতভাবে যিনি অত্যন্ত সজ্জন, পাচারে বিশ্বাসী নন; তিনি একটি বই লিখেছেন, যাতে দেশের যে উন্নতি হচ্ছে তার প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন বাংলাদেশে উচ্চ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রবৃদ্ধির। একটি আন্তর্জাতিক ব্যাংকের প্রদত্ত তথ্য উদ্ধৃত করে তিনি এমন আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন-আমাদের দেশে মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থানের হার শিগগিরই ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া এবং ভারতকেও পেছনে ফেলে এগিয়ে যাবে। কিন্তু এই উত্থানে উৎফুল্ল হব বুকের এমন পাটা কিন্তু আমাদের মতো সাধারণ মানুষের নেই। কারণ এই উন্নতির অর্থ দাঁড়াবে একদিকে দেশের সম্পদ পাচার হওয়া, অন্যদিকে বেকার ও দরিদ্রের সংখ্যা বৃদ্ধি। উচ্চবিত্তরা তাদের সম্পদ তো বটেই, এমনকি সন্তানদেরও দেশে রাখবে না। ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে, শিক্ষার জন্য বিদেশ গমনার্থীর সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। একটি পত্রিকা জানাচ্ছে, গত দশ বছরে ওই স্রোত দ্বিগুণ সংখ্যায় স্ফীত ও বেগবান হয়েছে। পাশাপাশি এটাও আমাদের জানা আছে, বাংলাদেশে বিদেশি শিক্ষার্থীদের আসা ক্রমাগত কমছে।

নির্মম সত্যটা হলো, যতই উন্নতি ঘটছে ততই কমছে দেশপ্রেম। তাই বলে দেশপ্রেম কি একেবারেই নিঃশেষ হয়ে গেছে? না, মোটেই নয়। দেশপ্রেম অবশ্যই আছে। বিশেষভাবে আছে সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের মধ্যে। তারা অন্য দেশে গিয়ে বসবাস করবে-এমনটা ভাবতেই পারে না। বেশির ভাগই দেশে থাকে। পরিশ্রম করে। এবং তাদের শ্রমের কারণেই দেশের যেটুকু উন্নতি, তা সম্ভব হয়েছে। ভোক্তারা নয়, মেহনতিরাই হচ্ছে উন্নতির চাবিকাঠি। ঋণ করে, জায়গাজমি বেচে দিয়ে সুবিধাবঞ্চিতদের কেউ কেউ বিদেশে যায়; থাকবার জন্য নয়, উপার্জন করে টাকা দেশে পাঠাবে বলে। বিদেশে গিয়ে অনেকেই অমানবিক জীবনযাপন করে, ‘অবৈধ’ পথে গিয়ে এবং প্রতারকদের কবলে পড়ে কেউ কেউ জেল পর্যন্ত খাটে। কিন্তু তারা বুক বাঁধে এই আশায়, দেশে তাদের আপনজনরা খেয়েপরে বাঁচতে পারবে। বিত্তবানরা যা ছড়ায় তা হলো হতাশা। এ দেশের কোনো ভবিষ্যৎ নেই, এটাই তাদের স্থির বিশ্বাস। হতাশা কিন্তু তারাই সৃষ্টি করে। বিশেষভাবে সম্পদ পাচার করার মধ্য দিয়ে। এই যে দেশে এখন ডলারের সংকট চলছে, এবং যার ফলে সবকিছুর দাম বেড়েছে, তার প্রধান কারণ টাকা ডলারে রূপান্তরিত হয়ে বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে এটা বিত্তবানদের কাজ। তারাই হতাশা সৃষ্টি করে এবং দেশের ভবিষ্যৎহীনতার বিশ্বাস ক্রমাগত বলীয়ান হতে থাকে। এবং নিজেদের ওই হতাশা তারা যে কেবল নিজেদের মধ্যেই আটকে রাখে, তা নয়, অন্যদের মধ্যেও সংক্রমিত করে দেয়। সেটাই স্বাভাবিক। কারণ হতাশা হচ্ছে একটি রোগ, শুধু রোগ নয়, সংক্রামক রোগ বটে। একাত্তরে যখন আমরা চরমতম বিপদের মধ্যে ছিলাম, মৃত্যুর শঙ্কায় দিনরাত সন্ত্রস্ত থাকতাম, তখন এমন চরম বিপদ ও সীমাহীন অত্যাচারের মুখেও আমরা কিন্তু হতাশ হইনি; কারণ আমরা জানতাম আমরা কেউ একা নই, আমরা সবাই আছি একসঙ্গে এবং লড়ছি একত্র হয়ে। ১৬ ডিসেম্বরেই কিন্তু সেই ঐক্যটা ভাঙার লক্ষণ দেখা দিয়েছে; এবং কিছুদিনের মধ্যেই ভেঙে একেবারে খানখান হয়ে গেছে। সমষ্টি হারিয়ে গেছে, সত্য হয়েছে ব্যক্তিগতভাবে উন্নতি করা, না-পারলে কোনোমতে বেঁচে থাকা।

এমনটা কেন ঘটল? ঘটল এ কারণে যে উত্থান ঘটল লুণ্ঠনের, জবরদখলের, ব্যক্তিগত সুবিধা বৃদ্ধির। এবং এসবই প্রধান সত্য হয়ে দাঁড়াল। একাত্তরে আমরা সমাজতন্ত্রী হয়েছিলাম, বাহাত্তরে দেখা গেল সমাজতন্ত্র বিদায় নিচ্ছে, পুঁজিবাদ এসে গেছে। এবং পুঁজিবাদেরই অব্যাহত বিকাশ ঘটেছে এই বাংলাদেশে। দেখা গেছে, পরের সরকার আগেরটির তুলনায় অধিক মাত্রায় পুঁজিবাদী, এবং একই সরকার যদি টিকে থাকে তবে আগেরবারের তুলনায় পরেরবার পুঁজিবাদের জন্য অধিকতর ছাড় দিচ্ছে। পুঁজিবাদের বিকাশের প্রয়োজনে রাস্তাঘাট পরিষ্কার করার জন্য তো আমরা যুদ্ধ করিনি; পুঁজিবাদের বিকাশ তো পাকিস্তান আমলে বেশ গোছগাছ করেই এগোচ্ছিল। আমরা চেয়েছিলাম সবার মুক্তি; চেয়েছিলাম প্রত্যেকেই যাতে মুক্তি পায়।

দেশের মানুষ বিদেশে শিক্ষার জন্য যেমন যায় তেমনি যায় চিকিৎসার জন্যও। বাংলাদেশে ভালো চিকিৎসকের কি অভাব আছে? আধুনিক যন্ত্রপাতি কি নেই? আকাল পড়েছে কি চিকিৎসা বিষয়ে জ্ঞানের? না, অভাব এসবের কোনো কিছুরই নয়। অভাব ঘটেছে একটা জিনিসেরই, সেটা হলো আস্থা। রোগী আস্থা রাখতে অসমর্থ হয়, দেশি চিকিৎসকের চিকিৎসায়। তাই যাদের সামর্থ্য আছে তারা পারলে সিঙ্গাপুর বা ব্যাংককে যায়, অত খরচে যারা অপারগ তারা চেষ্টা করে ভারতে যাওয়ার। হতাশা যেমন, অনাস্থাও তেমনি ভীষণ রকমের সংক্রামক।

আস্থার এই অভাবের কারণটা কী? কারণ হচ্ছে দেশি চিকিৎসকদের অধিকাংশই রোগীকে সময় দিতে পারেন না, পর্যাপ্ত মনোযোগ দানেও ব্যর্থ হন। না দিতে পারার কারণ তাঁদের তাড়া করার জন্য ঘাড়ের ওপর বসে থাকে অর্থোপাজনের নিষ্ঠুর তাগিদ। যত বেশি রোগী দেখবেন, তত বেশি আয় হবে। রোগ সারানোর জন্য খ্যাত হওয়ার চেয়ে আগ্রহটা থাকে অপরের তুলনায় অধিক আয় করার দিকে। আমাদের নতুন স্বাস্থ্যমন্ত্রী দেখলাম আস্থার এই অভাবের কথাটা স্বীকার করেছেন। কিন্তু আস্থা কীভাবে ফেরত আনা যাবে, তা যে তিনি জানেন এমনটা ভরসা করা কঠিন। আর জানলেও তা কার্যকর করার উপায় তাঁর হাতে না থাকারই কথা। কারণ ব্যাপারটা এক-দুজন চিকিৎসকের নয়, ব্যাপারটা এমনকি চিকিৎসাব্যবস্থাতেও সীমাবদ্ধ নয়, এটি ছড়িয়ে রয়েছে গোটা রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ব্যবস্থাজুড়ে। সর্বত্রই আস্থাহীনতা বিরাজমান।

শুরুটা কিন্তু দেশের ভবিষ্যতের প্রতি আস্থার অভাব দিয়েই। সুবিধাপ্রাপ্ত লোকেরা মনে করে, এ দেশের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। তাই অন্যত্র বসতি গড়তে পারলে ভালো। সেই চেষ্টাই তারা করতে থাকে। এবং চেষ্টার অংশ হিসেবে বৈধ-অবৈধ যে পথেই সম্ভব টাকাপয়সা যা সংগ্রহ করতে পারে তা পাচার করার পথ খোঁজে। তাদের এই আস্থাহীনতা অন্যদের মধ্যেও অতি সহজে সংক্রমিত হয়ে যায়। এবং সংক্রমিত হয়ে যাচ্ছেও।

রাষ্ট্র আছে। কিন্তু রাষ্ট্র যে মানুষকে নিরাপত্তা দেবে এমন কোনো ভরসা নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়। অন্য সবকিছু বাদ থাক, রাস্তার ট্রাফিক বাতিগুলোকে যে ঠিকমতো কাজ করাবে তা-ও তো পারছে না। সারা বিশ্বে এমন কোনো বড় শহর আছে বলে আমাদের জানা নেই, যেখানে ট্রাফিক সিগন্যাল যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে অসমর্থ। ঢাকা শহরে ট্রাফিক বাতি আছে, কিন্তু সেগুলোর কোনো কার্যকারিতা নেই। নির্ভরতা ট্রাফিক পুলিশের ওপর। ওদিকে খোদ পুলিশ বাহিনীর ভিতর দুর্নীতি আগেও ছিল, স্বাধীন বাংলাদেশে সেটা কমছে না, ক্রমাগত বাড়ছেই। নিয়ন্ত্রণ আছে বলে মনে হয় না। বিপন্ন হয়ে আদালতে গেলে ন্যায়বিচার পাওয়া যাবে এমন নিশ্চয়তা নেই। আদালতে গিয়ে মামলা করাটাই মস্ত বড় বিড়ম্বনা। টাকা লাগে। সময় খরচ হয়। একবার ঢুকলে সহজে বের হয়ে আসা যায় না, মামলা চলতেই থাকে; এর মধ্যে টাকার আদানপ্রদানে বিরাম ঘটে না। নিম্ন আদালতে বিচার কেনাবেচা সম্ভব এমন গুঞ্জন আদালতপাড়াতেই শোনা যায়। রাষ্ট্রের চলমানতার আসল চাবিকাঠি আমলাদের হাতে। ব্যবসায়ীরাই যে রাজনীতিকে কবজায় রাখে এটা ঠিক, কিন্তু তাদেরও দ্বারস্থ হতে হয় চাবিকাঠি যাদের হাতে তাদের কাছে (অর্থাৎ আমলাদের)। রাষ্ট্রের চরিত্রটা তাই দাঁড়িয়েছে পুঁজিবাদী-আমলাতান্ত্রিক। আমলারা নিজেদের সুযোগসুবিধা বাড়ানোর ব্যাপারেই মনোযোগী, পাবলিকের উপকারের ব্যাপারে নয়। পাবলিক সার্ভেন্টদের কেউ পাবলিকের সেবা করার জন্য রওনা দিয়েছে এমন খবর পেলে পাবলিকের মনে স্বস্তি আসবে কী, আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। এসপিরা বিনা সুদে ঋণের দাবি জানিয়েছিলেন বিগত সরকারের আমলে; আর নিচের দিকে যাঁরা তাঁদের দাবি ছিল ভাতা বৃদ্ধির। সিভিল সার্ভিস অত সুবিধা পেলে পুলিশ সার্ভিস কেন পিছিয়ে থাকবে? সামরিক বাহিনীর সুযোগসুবিধার বিষয়টা অবশ্য জানাজানি হয় না, তবে সরকারের অন্যান্য শাখার লোকেরা নিশ্চয়ই খোঁজখবর কিছু রাখে, এবং নিজেদের বঞ্চিত ভেবে ক্ষুব্ধ হয়।

♦ লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ।  সূএ : বাংলাদেশ প্রতিদিন

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



সর্বাধিক পঠিত



 

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ,

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন,

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

 

ইমেল: [email protected]

ফোন নাম্বার : ০১৫৩৫১৩০৩৫০,

Design & Developed BY ThemesBazar.Com