দূষিত রক্তের কলুষিত রাজনীতি

ছবি সংগৃহীত

 

গোলাম মাওলা রনি : কোথা থেকে শুরু করব ভেবে পাচ্ছি না। মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীর নাকি আওরঙ্গজেব! অথবা বাংলার ইলিয়াস শাহি বংশের প্রতিষ্ঠাতা সামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ নাকি দিল্লির সুলতান ফিরোজ শাহ তুগলক। মোগলদের ন্যায়বিচার ও সুশাসন সম্পর্কে নতুন করে কিছু বলার নেই। তবে দিল্লির সুলতানি আমলের ভারতবর্ষ এবং সুবে বাংলার ইতিহাস জানতে হলে মিনহাজ উস সিরাজের ‘তাবাকাত ই নাসিরি’ এবং জিয়াউদ্দিন বারনীর ‘তারিখ-ই ফিরোজ শাহি’ অধ্যয়ন ছাড়া উপায় নেই।

চলমান সময়ের তাল চাল—অস্থিরতা-বিচারহীনতা, কুশাসন, ক্ষমতাধরদের দাম্ভিকতা, মোনাফেকি এবং অসহায় মানুষের আহাজারি যত বাড়ছে ততই মানুষ অতীতমুখী হচ্ছে। সভ্যতার চাকা উল্টোপথে ঘুরে আমাদের ফ্যাসিবাদের জামানা, ব্রিটিশ আমল, মধ্যযুগ থেকে প্রাচীন যুগে নিয়ে যাচ্ছে। যাঁরা ইতিহাস জানেন তাঁরা আফসোস করেন—আর যাঁরা ইতিহাস দেখেছেন তাঁরা বলেন, আগেই ভালো ছিল। কেউ কেউ অবশ্য যেই লাউ সেই কদুও বলার চেষ্টা করেন।

দেশ-কাল—রাজত্ব বা রাজ্য-রাজার ইতিহাস কম করে হলেও দশ হাজার বছরের পুরনো। ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে যাঁরা বিখ্যাত হয়েছেন তাঁদের প্রথম এবং প্রধান পরিচয় ছিল ন্যায়বিচারক ও সুশাসক হিসেবে। বহিঃশত্রুর হাত থেকে দেশ রক্ষা এবং রাজ্যের অভ্যন্তরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে যাঁরা যত সফল হয়েছেন তাঁরাই মহাকালের ইতিহাসে মানুষের দোয়া ও ভালোবাসায় অমরত্ব লাভ করেছেন। ঘুষ-দুর্নীতি-অনিয়ম এবং অন্যের হক বিনষ্টকারী রাজা, বাদশাহ, আমির, ওমরাহ কেউই শান্তিতে মরতে পারেননি।
অপমান-লাঞ্ছনা-গঞ্জনা, রোগ, শোক, বালা-মুসিবত এবং মানুষের ঘৃণার বোঝা মাথায় নিয়ে সবাইকেই ধরাধাম ত্যাগ করতে হয়েছে।

দূষিত রক্তের কলুষিত রাজনীতিআপনি যদি প্রশ্ন করেন যে আজ থেকে ৪৩৫৬ বছর আগে কিভাবে সম্রাট সারগন মেসোপটেমিয়া সাম্রাজ্যে আধুনিক কালের চেয়েও উত্তম ন্যায়বিচার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন? অথবা চীনের প্রথম সম্রাট শি হুয়ান টি, পারস্যের সাইরাস দ্য গ্রেট অথবা দারায়ুস দ্য গ্রেটের জামানার শাসন প্রণালী কেন আজও কিংবদন্তি হয়ে আছে। পাক ভারতে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য, অশোক, শেরশাহের জামানাকে কেন বিশ্বরাজনীতির বিশ্ববিদ্যালয় মনে করা হয়? তা যদি জানতে চান, তবে সবার আগে রাজনীতি সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হতে হবে।

রাজার ইচ্ছায়ই রাজনীতি হয়ে থাকে। রাজা যদি বদমাশ-চরিত্রহীন, অবাধ্য, উড়নচণ্ডী, মদ্যপ, নারী লোভী, জুয়ায় আসক্ত, অপব্যয়কারী হন, তবে কোনো অবস্থায়ই তাঁর দ্বারা রাজ্য শাসন, ন্যায়বিচার সম্ভব নয়।

রাজনীতির চিরায়ত বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী প্রাচীন যুগে রাজা হওয়ার প্রথম শর্ত ছিল ভালো মানুষ হওয়া। জ্ঞান-বুদ্ধি, বিদ্যা, শক্তি, সাহস, দৃঢ়তা, আনুগত্য, কৃতজ্ঞতা, পরিশ্রম, মিতব্যয়িতার মতো মানবিক গুণাবলি ছাড়া কেউই রাজনীতিতে ইতিহাস সৃষ্টি করতে পারে না। এ জন্য ইতিহাসে আমজনতা যখন সুযোগ পেয়েছে রাজা নির্বাচনের এবং যখন জনগণ বাংলার পাল বংশের গোপাল, জেরুজালেমের হজরত তালুত, রোমের জুলিয়াস সিজার, ফ্রান্সের নেপোলিয়ন বোনাপার্টের মতো মানুষকে নেতা নির্বাচন করতে পেরেছে, ঠিক তখনই রচিত হয়েছে রাজনীতির নতুন ইতিহাস।

অন্যদিকে রাজতন্ত্রের অধীনে পরিচালিত রাষ্ট্রসমূহে রাজপরিবারগুলো যখন রাজরক্তের পবিত্রতা রক্ষা করেছে—রাজরক্তের আভিজাত্যের ঐতিহাসিক কানুন মেনে চলেছে এবং নবজাতকের ভূমিষ্ঠ হওয়া থেকে সিংহাসনে আরোহণ পর্যন্ত সম্ভাব্য সব পার্থিব ও পারলৌকিক শিক্ষা, আচার-আচরণ রপ্ত করানোর পাশাপাশি জীবনযুদ্ধের কঠিন প্রশিক্ষণ দিতে পেরেছে, ঠিক তখনই একেকটা ঐতিহ্যবাহী রাজবংশের সৃষ্টি হয়েছে, যাঁরা শত শত বছর ধরে পৃথিবী শাসন করেছেন।

আমজনতা যখন ভালো মানুষ নির্বাচন করতে পারে অথবা রাজরক্ত যখন যোগ্য উত্তরাধিকারী তৈরি করতে পারে ঠিক তখনই ইতিহাসে সম্রাট সারগন অথবা সম্রাট অশোকের অভ্যুদয় হয়। প্রকৃতির লীলাখেলা—গ্রহ-নক্ষত্রের আকর্ষণ, মানুষের চিন্তা-চেতনা ও কর্মের সমন্বয়ে এক জটিল আবহাওয়ার মধ্যে একটি দেশ ও জাতির ভাগ্য নির্ধারিত হয়। সুশাসক পাওয়া যেকোনো জাতির জন্য প্রকৃতির পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ উপহার। অন্যদিকে সুশাসক হওয়া এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা যেকোনো শাসকের জন্য মানবজীবনের সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি ও সাফল্যের প্রামাণ্য দলিল। শাসকরা কেন সুশাসক হন এবং সিংহাসনে আসীন হয়ে কেন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য জীবনপণ করেন, তা নিয়ে মহাকালে বিস্তর গবেষণা হয়েছে। আমি যতটুকু জানি তার কিয়দংশ আপনাদের কাছে পেশ করছি—

প্রথমত, জন্মে ত্রুটি থাকলে কেউ ন্যায়বিচারক ও সুশাসক হতে পারবে না। হারাম খাবার এবং নিষিদ্ধ পরিবেশে বেড়ে ওঠা মানুষ কোনো দিন ভালো চিন্তা করতে পারে না। অধিকন্তু এই শ্রেণির মানুষগুলো কোনো দুর্ঘটনাবশত কোনো জাতির ঘাড়ে নেতা হিসেবে চেপে বসলে তাদের মধ্যে লুকায়িত মন্দ কর্মের ইচ্ছাশক্তিসমূহ (নফসে আমমারা) প্রবল থেকে প্রবলতর হয় এবং তারা যাবতীয় মন্দ কর্মের চৌম্বকশক্তিতে পরিণত হয়। এ অবস্থায় রাজ্যের সব পাপী-দুর্বৃত্ত এবং শয়তান প্রকৃতির প্রাণীদের মধ্যে উল্লাসনৃত্য শুরু হয় এবং তারা মিছিল করে দলে দলে রাজার মন্দ কর্মের চৌম্বকশক্তির শরিক হওয়ার জন্য পরস্পরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা শুরু করে।

উল্লিখিত অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা যদি অতীত রাজা-বাদশাহদের ন্যায়বিচার ও সুশাসনের কাহিনিগুলো লিপিবদ্ধ করি, তবে একেকটি কাহিনি আরব্য রজনীর গল্পকেও হার মানাবে। আপনারা যদি সম্রাট জাহাঙ্গীরের ‘বিচারের ঘণ্টার’ ইতিহাস পড়েন, তবে দেখবেন যে পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম সাম্রাজ্যের মালিক প্রজাদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য কিভাবে বিনিদ্র রজনী কাটাতেন। আজকের ভারতের প্রায় দেড় গুণ ভূখণ্ডের অর্থাৎ প্রায় ৫০ লাখ বর্গকিলোমিটার এলাকার অধীশ্বর, তামাম দুনিয়ার ২৫ ভাগ জিপিপির অর্থভাণ্ডারের মালিক এবং ১৫ লাখ সৈন্যের শাহেনশাহ সম্রাট নুর উদ্দিন মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর তাঁর শোবারঘরে একটি ঘণ্টার ব্যবস্থা করেছিলেন। ঘণ্টার অপর প্রান্ত প্রাসাদের মূল ফটকের বাইরে ছিল। যেকোনো বিচারপ্রার্থী দিনরাতের যেকোনো সময়ে সেই রাজ ঘণ্টা বাজিয়ে সম্রাটের কাছে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করতে পারতেন।

ইতিহাস সাক্ষী—কোনো বিচারপ্রার্থী নাখোশ হয়ে প্রাসাদের সিংহদ্বার থেকে ফিরে যাননি। অথবা কোনো বিচারপ্রার্থীকে ঘণ্টা বাজানোর জন্য কোনোকালে ভর্ত্সনা করা হয়নি। আজকের দিনের কোনো বিচারক-রাজা অথবা জনপ্রতিনিধির কি এমন মনমানসিকতা, চিন্তা-চেতনা, সৎসাহস এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য সম্রাট জাহাঙ্গীরের মতো আকুতি দেখাতে পারবেন।

রাষ্ট্রক্ষমতায় বসে কতটা বিনয়ী এবং কতটা কৃতজ্ঞ থাকা যায় তার উত্কৃষ্ট নজির স্থাপন করে গেছেন সম্রাট শাহজাহান এবং সম্রাট আওরঙ্গজেব। দুনিয়ার সর্বকালের সেরা এবং দামি ময়ূর সিংহাসনে বসে এবং লালকেল্লার মতো রাজপ্রাসাদের অধিবাসী হয়েও তাঁরা ফকির-মিসকিনের মতো সাধারণভাবে মসজিদে উপস্থিত হয়ে নীরবে-নিভৃতে আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করতেন, যেখানে ফকির-মিসকিন-ভিক্ষুকরা গিয়েও সম্রাটদের সঙ্গে কথা বলতে পারতেন।

আমরা আজকের আলোচনার একদম শেষ পর্যায়ে চলে এসেছি। ইরান-তুরান-দিল্লি-পিণ্ডি বাদ দিয়ে এবার সুবে বাংলা নিয়ে কিছু আলোচনা রাখব। ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দিন বারনীর বর্ণনা মতে, বিশৃঙ্খল বাংলাকে ঐক্যবদ্ধ করেন সুলতান সামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ। তাঁর শাসনামলেই গাঙ্গেয় বদ্বীপ বাংলা বা সুবে বাংলা নামে পরিচিত হয় এবং তিনি শাহে বঙ্গালারূপে প্রথম দিল্লির অধীনতা অমান্য করে বাংলাকে স্বাধীন করেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ইলিয়াস শাহি বংশ প্রায় এক শ বছর বাংলা শাসন করে সুশাসন ও ন্যায়বিচারের যে নজির স্থাপন করেছেন তা গত সাড়ে ছয় শ বছরে অন্য কেউ পারেননি।

ইতিহাস সাক্ষী—সুলতান সামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহের হাত ধরে ১৩৪ খ্রিস্টাব্দে বাংলায় যে স্বর্ণযুগ শুরু হয়েছিল—যেখানে রাজা রাতের আঁধারে ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়াতেন প্রজাদের ন্যায়বিচার, নিরাপত্তা ও সুশাসন উপহার দেওয়ার জন্য। রাজ্যের সব ধর্মমতের লোকজন মধ্যযুগে যেভাবে রাষ্ট্রকে বিশ্বাস করত এবং রাজাকে ভালোবাসত, তা ২০২৬ সালের বাংলায় কেন দেখা যাচ্ছে না? সেই কাহিনি বলার স্পর্ধা আপনার, আমার কজনের আছে বলতে পারব না—তবে মধ্যযুগের আমজনতার যে ছিল তা হলফ করে বলতে পারব।

লেখক : রাজনীতিবিদ ও কলাম লেখক।  সূএ : বাংলাদেশ  প্রতিদিন

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



» নতুন মন্ত্রীদের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে গাড়ি

» রোজায় ট্রাকসেলের মাধ্যমে যেসব পণ্য বিক্রি করবে টিসিবি

» যুবদল নেতার দোকান ভাঙচুরের অভিযোগ, জামায়াতের দুই নেতা গ্রেফতার

» গাইবান্ধায় কারাবন্দি আওয়ামী লীগের সভাপতি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু

» রামপুরায় গুলি ও হত্যা: হাবিবসহ ৫ আসামির রায় ৪ মার্চ

» রমজান উপলক্ষে দেশবাসীকে প্রধান উপদেষ্টার শুভেচ্ছা বার্তা

» তারেক রহমান পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ইতিবাচক রাজনীতির সূচনা করেছেন: সারজিস

» কিশোর গ্যাং ‘টেনশন’ গ্রুপের প্রধান সীমান্তে গ্রেফতার

» ৫০তম বিসিএস লিখিত পরীক্ষা ৯ এপ্রিল

» ট্রুকলার থেকে নাম ও নম্বর চিরতরে ডিলিট করবেন যেভাবে

 

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ,

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন,

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন: ই-মেইল : [email protected],

মোবাইল :০১৫৩৫১৩০৩৫০

Desing & Developed BY PopularITLtd.Com
পরীক্ষামূলক প্রচার...

দূষিত রক্তের কলুষিত রাজনীতি

ছবি সংগৃহীত

 

গোলাম মাওলা রনি : কোথা থেকে শুরু করব ভেবে পাচ্ছি না। মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীর নাকি আওরঙ্গজেব! অথবা বাংলার ইলিয়াস শাহি বংশের প্রতিষ্ঠাতা সামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ নাকি দিল্লির সুলতান ফিরোজ শাহ তুগলক। মোগলদের ন্যায়বিচার ও সুশাসন সম্পর্কে নতুন করে কিছু বলার নেই। তবে দিল্লির সুলতানি আমলের ভারতবর্ষ এবং সুবে বাংলার ইতিহাস জানতে হলে মিনহাজ উস সিরাজের ‘তাবাকাত ই নাসিরি’ এবং জিয়াউদ্দিন বারনীর ‘তারিখ-ই ফিরোজ শাহি’ অধ্যয়ন ছাড়া উপায় নেই।

চলমান সময়ের তাল চাল—অস্থিরতা-বিচারহীনতা, কুশাসন, ক্ষমতাধরদের দাম্ভিকতা, মোনাফেকি এবং অসহায় মানুষের আহাজারি যত বাড়ছে ততই মানুষ অতীতমুখী হচ্ছে। সভ্যতার চাকা উল্টোপথে ঘুরে আমাদের ফ্যাসিবাদের জামানা, ব্রিটিশ আমল, মধ্যযুগ থেকে প্রাচীন যুগে নিয়ে যাচ্ছে। যাঁরা ইতিহাস জানেন তাঁরা আফসোস করেন—আর যাঁরা ইতিহাস দেখেছেন তাঁরা বলেন, আগেই ভালো ছিল। কেউ কেউ অবশ্য যেই লাউ সেই কদুও বলার চেষ্টা করেন।

দেশ-কাল—রাজত্ব বা রাজ্য-রাজার ইতিহাস কম করে হলেও দশ হাজার বছরের পুরনো। ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে যাঁরা বিখ্যাত হয়েছেন তাঁদের প্রথম এবং প্রধান পরিচয় ছিল ন্যায়বিচারক ও সুশাসক হিসেবে। বহিঃশত্রুর হাত থেকে দেশ রক্ষা এবং রাজ্যের অভ্যন্তরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে যাঁরা যত সফল হয়েছেন তাঁরাই মহাকালের ইতিহাসে মানুষের দোয়া ও ভালোবাসায় অমরত্ব লাভ করেছেন। ঘুষ-দুর্নীতি-অনিয়ম এবং অন্যের হক বিনষ্টকারী রাজা, বাদশাহ, আমির, ওমরাহ কেউই শান্তিতে মরতে পারেননি।
অপমান-লাঞ্ছনা-গঞ্জনা, রোগ, শোক, বালা-মুসিবত এবং মানুষের ঘৃণার বোঝা মাথায় নিয়ে সবাইকেই ধরাধাম ত্যাগ করতে হয়েছে।

দূষিত রক্তের কলুষিত রাজনীতিআপনি যদি প্রশ্ন করেন যে আজ থেকে ৪৩৫৬ বছর আগে কিভাবে সম্রাট সারগন মেসোপটেমিয়া সাম্রাজ্যে আধুনিক কালের চেয়েও উত্তম ন্যায়বিচার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন? অথবা চীনের প্রথম সম্রাট শি হুয়ান টি, পারস্যের সাইরাস দ্য গ্রেট অথবা দারায়ুস দ্য গ্রেটের জামানার শাসন প্রণালী কেন আজও কিংবদন্তি হয়ে আছে। পাক ভারতে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য, অশোক, শেরশাহের জামানাকে কেন বিশ্বরাজনীতির বিশ্ববিদ্যালয় মনে করা হয়? তা যদি জানতে চান, তবে সবার আগে রাজনীতি সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হতে হবে।

রাজার ইচ্ছায়ই রাজনীতি হয়ে থাকে। রাজা যদি বদমাশ-চরিত্রহীন, অবাধ্য, উড়নচণ্ডী, মদ্যপ, নারী লোভী, জুয়ায় আসক্ত, অপব্যয়কারী হন, তবে কোনো অবস্থায়ই তাঁর দ্বারা রাজ্য শাসন, ন্যায়বিচার সম্ভব নয়।

রাজনীতির চিরায়ত বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী প্রাচীন যুগে রাজা হওয়ার প্রথম শর্ত ছিল ভালো মানুষ হওয়া। জ্ঞান-বুদ্ধি, বিদ্যা, শক্তি, সাহস, দৃঢ়তা, আনুগত্য, কৃতজ্ঞতা, পরিশ্রম, মিতব্যয়িতার মতো মানবিক গুণাবলি ছাড়া কেউই রাজনীতিতে ইতিহাস সৃষ্টি করতে পারে না। এ জন্য ইতিহাসে আমজনতা যখন সুযোগ পেয়েছে রাজা নির্বাচনের এবং যখন জনগণ বাংলার পাল বংশের গোপাল, জেরুজালেমের হজরত তালুত, রোমের জুলিয়াস সিজার, ফ্রান্সের নেপোলিয়ন বোনাপার্টের মতো মানুষকে নেতা নির্বাচন করতে পেরেছে, ঠিক তখনই রচিত হয়েছে রাজনীতির নতুন ইতিহাস।

অন্যদিকে রাজতন্ত্রের অধীনে পরিচালিত রাষ্ট্রসমূহে রাজপরিবারগুলো যখন রাজরক্তের পবিত্রতা রক্ষা করেছে—রাজরক্তের আভিজাত্যের ঐতিহাসিক কানুন মেনে চলেছে এবং নবজাতকের ভূমিষ্ঠ হওয়া থেকে সিংহাসনে আরোহণ পর্যন্ত সম্ভাব্য সব পার্থিব ও পারলৌকিক শিক্ষা, আচার-আচরণ রপ্ত করানোর পাশাপাশি জীবনযুদ্ধের কঠিন প্রশিক্ষণ দিতে পেরেছে, ঠিক তখনই একেকটা ঐতিহ্যবাহী রাজবংশের সৃষ্টি হয়েছে, যাঁরা শত শত বছর ধরে পৃথিবী শাসন করেছেন।

আমজনতা যখন ভালো মানুষ নির্বাচন করতে পারে অথবা রাজরক্ত যখন যোগ্য উত্তরাধিকারী তৈরি করতে পারে ঠিক তখনই ইতিহাসে সম্রাট সারগন অথবা সম্রাট অশোকের অভ্যুদয় হয়। প্রকৃতির লীলাখেলা—গ্রহ-নক্ষত্রের আকর্ষণ, মানুষের চিন্তা-চেতনা ও কর্মের সমন্বয়ে এক জটিল আবহাওয়ার মধ্যে একটি দেশ ও জাতির ভাগ্য নির্ধারিত হয়। সুশাসক পাওয়া যেকোনো জাতির জন্য প্রকৃতির পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ উপহার। অন্যদিকে সুশাসক হওয়া এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা যেকোনো শাসকের জন্য মানবজীবনের সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি ও সাফল্যের প্রামাণ্য দলিল। শাসকরা কেন সুশাসক হন এবং সিংহাসনে আসীন হয়ে কেন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য জীবনপণ করেন, তা নিয়ে মহাকালে বিস্তর গবেষণা হয়েছে। আমি যতটুকু জানি তার কিয়দংশ আপনাদের কাছে পেশ করছি—

প্রথমত, জন্মে ত্রুটি থাকলে কেউ ন্যায়বিচারক ও সুশাসক হতে পারবে না। হারাম খাবার এবং নিষিদ্ধ পরিবেশে বেড়ে ওঠা মানুষ কোনো দিন ভালো চিন্তা করতে পারে না। অধিকন্তু এই শ্রেণির মানুষগুলো কোনো দুর্ঘটনাবশত কোনো জাতির ঘাড়ে নেতা হিসেবে চেপে বসলে তাদের মধ্যে লুকায়িত মন্দ কর্মের ইচ্ছাশক্তিসমূহ (নফসে আমমারা) প্রবল থেকে প্রবলতর হয় এবং তারা যাবতীয় মন্দ কর্মের চৌম্বকশক্তিতে পরিণত হয়। এ অবস্থায় রাজ্যের সব পাপী-দুর্বৃত্ত এবং শয়তান প্রকৃতির প্রাণীদের মধ্যে উল্লাসনৃত্য শুরু হয় এবং তারা মিছিল করে দলে দলে রাজার মন্দ কর্মের চৌম্বকশক্তির শরিক হওয়ার জন্য পরস্পরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা শুরু করে।

উল্লিখিত অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা যদি অতীত রাজা-বাদশাহদের ন্যায়বিচার ও সুশাসনের কাহিনিগুলো লিপিবদ্ধ করি, তবে একেকটি কাহিনি আরব্য রজনীর গল্পকেও হার মানাবে। আপনারা যদি সম্রাট জাহাঙ্গীরের ‘বিচারের ঘণ্টার’ ইতিহাস পড়েন, তবে দেখবেন যে পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম সাম্রাজ্যের মালিক প্রজাদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য কিভাবে বিনিদ্র রজনী কাটাতেন। আজকের ভারতের প্রায় দেড় গুণ ভূখণ্ডের অর্থাৎ প্রায় ৫০ লাখ বর্গকিলোমিটার এলাকার অধীশ্বর, তামাম দুনিয়ার ২৫ ভাগ জিপিপির অর্থভাণ্ডারের মালিক এবং ১৫ লাখ সৈন্যের শাহেনশাহ সম্রাট নুর উদ্দিন মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর তাঁর শোবারঘরে একটি ঘণ্টার ব্যবস্থা করেছিলেন। ঘণ্টার অপর প্রান্ত প্রাসাদের মূল ফটকের বাইরে ছিল। যেকোনো বিচারপ্রার্থী দিনরাতের যেকোনো সময়ে সেই রাজ ঘণ্টা বাজিয়ে সম্রাটের কাছে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করতে পারতেন।

ইতিহাস সাক্ষী—কোনো বিচারপ্রার্থী নাখোশ হয়ে প্রাসাদের সিংহদ্বার থেকে ফিরে যাননি। অথবা কোনো বিচারপ্রার্থীকে ঘণ্টা বাজানোর জন্য কোনোকালে ভর্ত্সনা করা হয়নি। আজকের দিনের কোনো বিচারক-রাজা অথবা জনপ্রতিনিধির কি এমন মনমানসিকতা, চিন্তা-চেতনা, সৎসাহস এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য সম্রাট জাহাঙ্গীরের মতো আকুতি দেখাতে পারবেন।

রাষ্ট্রক্ষমতায় বসে কতটা বিনয়ী এবং কতটা কৃতজ্ঞ থাকা যায় তার উত্কৃষ্ট নজির স্থাপন করে গেছেন সম্রাট শাহজাহান এবং সম্রাট আওরঙ্গজেব। দুনিয়ার সর্বকালের সেরা এবং দামি ময়ূর সিংহাসনে বসে এবং লালকেল্লার মতো রাজপ্রাসাদের অধিবাসী হয়েও তাঁরা ফকির-মিসকিনের মতো সাধারণভাবে মসজিদে উপস্থিত হয়ে নীরবে-নিভৃতে আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করতেন, যেখানে ফকির-মিসকিন-ভিক্ষুকরা গিয়েও সম্রাটদের সঙ্গে কথা বলতে পারতেন।

আমরা আজকের আলোচনার একদম শেষ পর্যায়ে চলে এসেছি। ইরান-তুরান-দিল্লি-পিণ্ডি বাদ দিয়ে এবার সুবে বাংলা নিয়ে কিছু আলোচনা রাখব। ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দিন বারনীর বর্ণনা মতে, বিশৃঙ্খল বাংলাকে ঐক্যবদ্ধ করেন সুলতান সামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ। তাঁর শাসনামলেই গাঙ্গেয় বদ্বীপ বাংলা বা সুবে বাংলা নামে পরিচিত হয় এবং তিনি শাহে বঙ্গালারূপে প্রথম দিল্লির অধীনতা অমান্য করে বাংলাকে স্বাধীন করেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ইলিয়াস শাহি বংশ প্রায় এক শ বছর বাংলা শাসন করে সুশাসন ও ন্যায়বিচারের যে নজির স্থাপন করেছেন তা গত সাড়ে ছয় শ বছরে অন্য কেউ পারেননি।

ইতিহাস সাক্ষী—সুলতান সামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহের হাত ধরে ১৩৪ খ্রিস্টাব্দে বাংলায় যে স্বর্ণযুগ শুরু হয়েছিল—যেখানে রাজা রাতের আঁধারে ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়াতেন প্রজাদের ন্যায়বিচার, নিরাপত্তা ও সুশাসন উপহার দেওয়ার জন্য। রাজ্যের সব ধর্মমতের লোকজন মধ্যযুগে যেভাবে রাষ্ট্রকে বিশ্বাস করত এবং রাজাকে ভালোবাসত, তা ২০২৬ সালের বাংলায় কেন দেখা যাচ্ছে না? সেই কাহিনি বলার স্পর্ধা আপনার, আমার কজনের আছে বলতে পারব না—তবে মধ্যযুগের আমজনতার যে ছিল তা হলফ করে বলতে পারব।

লেখক : রাজনীতিবিদ ও কলাম লেখক।  সূএ : বাংলাদেশ  প্রতিদিন

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



সর্বাধিক পঠিত



 

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ,

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন,

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন: ই-মেইল : [email protected],

মোবাইল :০১৫৩৫১৩০৩৫০

Design & Developed BY ThemesBazar.Com