এস.এম. সাইফুল ইসলাম কবির, বাগেরহাট জেলা প্রতিনিধি : হিমেল হাওয়া, শৈত্যপ্রবাহ আর কনকনে শীত উপেক্ষা করে বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলায় শেষ মুহূর্তে আমন ধান কাটা ও মাড়াইয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা। মাঠে মাঠে সোনালি ফসলের সমারোহে যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে গ্রামবাংলা। চলতি মৌসুমে বিঘাপ্রতি ৩ থেকে ৫ মণ ধান বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃষকদের ঘরে ঘরে বইছে আনন্দের জোয়ার।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, উপকূলীয় এই উপজেলার ১৬টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভার প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে শেষ মুহূর্তের আমন ধান কাটার ধুম। গত দুই সপ্তাহ ধরে তীব্র শৈত্যপ্রবাহে সাধারণ মানুষ ঘর থেকে বের হতে কষ্ট পেলেও কৃষকরা মাঠে নেমেছেন নতুন উদ্যমে। ইতোমধ্যে অনেক কৃষক ৮০ শতাংশ ধান কেটে ঘরে তুলে মাড়াইয়ের কাজ শেষ করেছেন।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এ বছর স্থানীয় জাতের মোটা আমন ধানে বিঘাপ্রতি ১০ থেকে ১৪ মণ ফলন মিলেছে। যেখানে গত বছর একই জমিতে সর্বোচ্চ ৭ থেকে ৮ মণ ধান পাওয়া গিয়েছিল। কোনো কোনো জমিতে বিঘাপ্রতি ১৬ থেকে ১৭ মণ পর্যন্ত ফলন হয়েছে, যা গত ৪-৫ বছরের মধ্যে বিরল বলে জানিয়েছেন কৃষকরা।
বাজারে প্রতি মণ ধান কৃষকরা বিক্রি করছেন গড়ে ১ হাজার ২০ টাকা দরে। যদিও গত বছর এই সময়ে ধানের দাম ছিল প্রায় ১ হাজার ৩০০ টাকা, তবুও ফলন বৃদ্ধির কারণে দামের ঘাটতি পুষিয়ে উঠতে পেরেছেন কৃষকরা।
খাউলিয়া ইউনিয়নের পূর্ব চিপা বারইখালী গ্রামের কৃষক মিজান আকন জানান, তিনি ৭ বিঘা জমির মধ্যে ৫ বিঘার ধান কেটে ইতোমধ্যে ১১০ মণ ধান ঘরে তুলেছেন। আরও প্রায় ৪০ মণ ধান পাওয়ার আশা করছেন। অথচ গত বছর একই জমিতে তার উৎপাদন ছিল মাত্র ৬০ থেকে ৬৫ মণ।
একই গ্রামের কৃষক খলিল হাওলাদার, ওমর ফারুক, জাকির আকন এবং চালিতাবুনিয়া গ্রামের আব্দুল্লাহ মল্লিক বলেন,
“এ বছর মাঠে আমন ধান সত্যিই ভালো হয়েছে। গড়ে বিঘায় ৪-৫ মণ ধান বেশি পেয়েছি। এমন ফলন আমরা অনেক বছরেও দেখিনি।”
গ্রামগুলোর প্রতিটি বাড়ির উঠানেই এখন ধান মাড়াইয়ের দৃশ্য—যা গ্রামীণ অর্থনীতির চাঙ্গা হওয়ার স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরছে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে মোরেলগঞ্জ উপজেলায় দেশি ও উচ্চ ফলনশীল (উফসি) আমন ধান আবাদ হয়েছে ২৫ হাজার ৩৭০ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে স্থানীয় জাতের ধান ১৮ হাজার ৭২০ হেক্টর এবং উফসি ধান ৬ হাজার ৬৫০ হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে। মোট উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৫৩ হাজার ৭২০ মেট্রিক টন ধান।
গত বছর উপজেলায় ২৬ হাজার ৪১৪ হেক্টর জমিতে আমন আবাদ করে উৎপাদন হয়েছিল ৫৩ হাজার ৯২৯ মেট্রিক টন। এ বছর প্রায় ১০০ হেক্টর জমিতে আমন আবাদ কম হয়েছে। এর পেছনে মৎস্য ঘের বৃদ্ধি, ফসলি জমি ভরাট করে বসতবাড়ি নির্মাণ এবং অতিবৃষ্টির কারণে জলাবদ্ধতাকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন কৃষি কর্মকর্তারা। তবে জমি কমলেও ফলন বৃদ্ধির ফলে উৎপাদনের ঘাটতি পুষিয়ে গেছে।
এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. সাইফুল ইসলাম বলেন,
“ইতোমধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ আমন ধান কর্তন সম্পন্ন হয়েছে। বাকি ২০ শতাংশ আগামী ১-২ সপ্তাহের মধ্যেই কাটা শেষ হবে। এ বছর আবহাওয়া আমনের জন্য অনুকূলে ছিল। অতিবৃষ্টির কারণে লবণাক্ততা কমেছে, কৃষকেরা সুষম সার ব্যবহার করেছে এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি অনুসরণ করায় ফলন ভালো হয়েছে। গড়ে বিঘাপ্রতি ২-৩ মণ ধান বৃদ্ধি পেয়েছে।”
সব মিলিয়ে শীতের কনকনে বাতাস আর কুয়াশার চাদর ভেদ করে মোরেলগঞ্জের মাঠে মাঠে এখন পরিশ্রমের ঘামে সাফল্যের হাসি—যা কৃষক পরিবারের দীর্ঘদিনের অপেক্ষার ফল।








