লিয়াকত হোসাইন লায়ন, জামালপুর প্রতিনিধি ॥ ভোরের সূর্য ওঠার আগেই ফুটেছে জলজ ফুলের রানী শাপলা ফুল। ভাদ্রের মাঝামাঝি সময়ে কলি থেকে ফুল ফোটা শুরু হয়ে এখন তা চলমান রয়েছে। ঝিরিঝিরি বাতাশে দুলছে ফুলগুলো। মাছরাঙ্গা,সাদা বকের আনাগোনা, পাখির কিচির মিচির শব্দ, স্বচ্ছ টলমল পানিতে ভাসছে অসংখ্য লাল শাপলা। প্রকৃতির মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্য জামালপুরের ইসলামপুর বৈলডাঙ্গা বিলে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়,ইসলামপুর পৌর এলাকার টংগের আগলা ও পাথর্শী ইউনিয়নের পূর্ব হাড়িয়াবাড়ী গ্রামের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া একসময়ের খরস্রোতা বৈলডাঙ্গা বিল । যদিও কয়েক দশক আগে থেকেই বিলের মাঝ দিয়ে সড়ক নির্মান করে বিলের প্রবাহ বর্তমানে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। হাড়িয়া বাড়ী উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে দিয়ে বয়ে যাওয়া বিলেই ফুটেছে লাল শাপলা ফুল। সকালে জলাশয়ের দিকে তাকালেই শাপলার বাহারি রূপ দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। বিলে ফুটে থাকা শাপলা ফুল দেখতে যেমন বৈচিত্রময়, তেমনি ধরণীর বুকে লাল সবুজের সমারোহে যেন মনোমুগ্ধকর দৃশ্যাবলীর একটি। শাপলা শুধু শাপলা ফুলই নয় এটি জাতীয় ফুল।
বিলের প্রতিদিন শাপলা ফুল দেখতে দর্শনার্থীরা ভিড় করছেন। নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোরসহ নানা বয়সী মানুষ ঘুরে ঘুরে উপভোগ করছেন এই অপরূপ সৌন্দর্য। কেউ কেউ শাপলা ফুল সংগ্রহ করছেন, কেউ বা সেলফি তুলে স্মৃতি ধরে রাখছেন।
সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসা শিক্ষিকা রোকেয়া আক্তার বলেন, বিলের শাপলা ফুল দেখলে মন জুড়িয়ে যায়। বিলের অপরুপ দৃশ্যটি মানুষের মনে দাগ কাটার মতো। শাপলা ফুল ও তার পাতা স্পর্শ করলে মনে হয় যেন সৌন্দর্যের লীলাভূমিতে প্রবেশ করেছি। বিলের শাপলা ফুল গুলো আশপাশের পরিবেশটাকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
দর্শনার্থী শামিম মিয়া বলেন, আমাদের বিনোদনের জায়গা নেই। তাই বিনোদনের জন্য এখানে ছুটে আসা। শাপলা ফুলের সৌন্দর্য অন্য রকম এক ভালো লাগা কাজ করছে।
স্থানীয়রা জানান, এই বৈলডাঙ্গা বিলটিতে বর্ষাকালে অসংখ্য শাপলা ফুল ফোটে। শাপলা ফুল দেখার জন্য অনেক মানুষের সমাগম হয়। অনেক দর্শনার্থী মনের আনন্দে কিংবা ছবি তোলার জন্য ফুল ছিঁড়ছেন। অনেকে আবার ফুল ছিঁড়ে বাসায় নিয়ে প্রিয়জনকে উপহার দিচ্ছেন।
এতে বিলটিতে শাপলা ফুলের সংখ্যা দিনদিন কমে আসছে এবং বিলের সৌন্দর্যও বিনষ্ট হতে চলেছে।
অবঃ শিক্ষক সিরাজ উদ্দিন বলেন, উপজেলার বোয়ালমারি সহ বিভিন্ন স্থানেই ফুটেছে শাপলা। বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই গ্রামাঞ্চলের খাল-বিল, জলাশয় এবং নিচু জমিতে বিপুল পরিমানে শাপলা জন্মাত। এক দশক আগেও বিভিন্ন অঞ্চলে গোলাপি, সাদা, বেগুনি, নীল ও বিরল প্রজাতির হলুদ শাপলা ফোঁটার কারণে চারিদিকে নয়নাভিরাম সৌন্দর্যে প্রাকৃতিক দৃশ্যে দেখা যেত। গ্রাম ও শহুরে মানুষের কাছে এটি সবজি হিসেবে খুবই জনপ্রিয়। শাপলার ড্যাপ শিশুদের প্রিয় খাবার এবং গ্রামের লোকেরা ড্যাপ দিয়ে খই ভেজে মোয়াসহ বিভিন্ন প্রকার সু-স্বাদু খাবার তৈরি করে। অনেকে আবার শাপলা তুলে বাজারে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতো। লাল শাপলার ঔষধি গুণও রয়েছে। লাল ও সাদা রঙের শাপলা বেশ পুষ্টি সমৃদ্ধ সবজি। এতে প্রচুর পরিমানে ক্যালসিয়াম রয়েছে। শাপলার ভেষজ গুণও কম নয়। তবে লাল রঙের শাপলা ঔষধি কাজে ব্যবহৃত হয়। তাই শাপলা চুলকানি ও আমাশয় রোগের জন্য বেশ উপকারী।
বর্তমানে লাল ও সাদা প্রজাতির শাপলাগুলি বিভিন্ন জায়গায় দেখা গেলেও দেখা যাচ্ছে না গোলাপি, বেগুনি, নীল ও হলুদ শাপলা। এসব শাপলা কালের পরিক্রমায় হারিয়ে গেছে। নাব্যতা হ্রাস, খাল বিল ও জলাশয় ভরাট,ঘরবাড়ি তৈরি, ফসলি জমিতে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার এবং জলবায়ূ পরিবর্তনের কারণে হারিয়ে যেতে বসেছে আমাদের জাতীয় ফুল শাপলা ।








