গত সপ্তাহান্তে সেশেলসে পৌঁছানোর পর দেশটির প্রেসিডেন্ট প্যাট্রিক হারমিনির হাত থেকে ‘গার্ডিয়ান অব দ্য ব্লু হরাইজন’ নামে একটি সম্মাননা গ্রহণ করেন মোদি। ট্রফি ও সনদসহ ওই পুরস্কার গ্রহণের সময় মোদিকে হাস্যোজ্জ্বল দেখা যায়।
তবে পুরস্কারটি ঘোষণার পরপরই এর সত্যতা ও প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। পর্যবেক্ষকদের দাবি, সম্মাননার সনদে একাধিক বানান ভুল ছিল। সেখানে রিপাবলিক (Republic) শব্দটি লেখা হয়েছিল ‘Repubblic’ এবং খোদ দেশের নাম সেশেলস (Seychelles) এর বানানও ভুলভাবে Seycheeles লেখা হয়।
এছাড়া জানা যায়, মোদির সফরের মাত্র তিন দিন আগে এই সম্মাননা চালু করা হয়েছিল এবং রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তিনিই এর প্রথম ও একমাত্র প্রাপক।
বিতর্ক আরও বাড়ে যখন বিভিন্ন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) শনাক্তকরণ সফটওয়্যারে সনদটি পরীক্ষা করে অনেকেই দাবি করেন, এটি এআই ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে।
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস তীব্র সমালোচনা করে। দলের মুখপাত্র সুপ্রিয়া শ্রীনাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, “মোদিকে যেকোনও পুরস্কার দিলেই তিনি তা নিতে ছুটে যাবেন।”
তিনি আরও বলেন, “এত তাড়াহুড়া করে পুরস্কার তৈরি করা হয়েছে যে, সেশেলস প্রজাতন্ত্রের সরকারি নামটিও ঠিকভাবে লেখা হয়নি।”
অন্যদিকে মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) বিরোধীদের সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করেছে। দলটির দাবি, পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়নে মোদির নেতৃত্বের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবেই এই সম্মাননা দেওয়া হয়েছে এবং এটি ভারতের জন্য গর্বের বিষয়।
বিতর্কের মুখে বৃহস্পতিবার সেশেলসের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, ভুলবশত সম্মাননার একটি ‘কার্যকরী খসড়া’ প্রকাশিত হয়েছিল। পরে যথাযথভাবে অনুমোদিত আসল সনদ জারি করা হয়েছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘গার্ডিয়ান অব দ্য ব্লু হরাইজন’ সম্মাননা সম্পূর্ণ বৈধ এবং এটি নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তা ভিত্তিহীন।
বিদেশ সফরে পুরস্কার গ্রহণে মোদির আগ্রহ
সমালোচকদের মতে, গত ১২ বছরে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় দেশে-বিদেশে বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননা গ্রহণে নরেন্দ্র মোদির বিশেষ আগ্রহ লক্ষ্য করা গেছে।
গত মাসে ইসরায়েল সফরের আগেও দেশটির পার্লামেন্ট কনেসেট দ্রুত ‘মেডেল অব দ্য কনেসেট’ নামে একটি নতুন রাষ্ট্রীয় সম্মাননা চালু করে। মোদি দেশটিতে পৌঁছানোর পর তাকে সেই পদক দেওয়া হয়। রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তিনিই এই পদকের একমাত্র প্রাপক।
এর আগে ২০১৯ সালে মোদি ‘ফিলিপ কটলার প্রেসিডেন্সিয়াল অ্যাওয়ার্ড’-এর প্রথম প্রাপক হন। তাকে ‘দেশ পরিচালনায় অসাধারণ নেতৃত্বের’ জন্য এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল। সে সময় জানানো হয়েছিল, প্রতিবছর বিশ্বের কোনও না কোনও রাষ্ট্রনেতাকে এই পুরস্কার দেওয়া হবে। কিন্তু এরপর আর কাউকে এই সম্মাননা দেওয়া হয়নি এবং সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটও দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর অবস্থায় রয়েছে।
ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতির অংশ
নরেন্দ্র মোদির জীবনীকার নিলাঞ্জন মুখোপাধ্যায় মনে করেন, বিদেশে বিভিন্ন সম্মাননা সংগ্রহের প্রবণতা তার ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনৈতিক কৌশলেরই অংশ।
তার ভাষায়, “অনেক সময় প্রশ্নবিদ্ধ পরিস্থিতিতে দেওয়া এসব পুরস্কারের উদ্দেশ্য হলো সমর্থকদের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দেওয়া যে, মোদির ব্যক্তিগত নেতৃত্বের কারণেই বিশ্বজুড়ে তাকে সম্মান জানানো হচ্ছে এবং ভারতের আন্তর্জাতিক প্রভাবও তার ব্যক্তিত্বের ফল।”
গত এক বছরে মোদি ইথিওপিয়ার ‘গ্রেট অনার নিশান’ এবং ত্রিনিদাদ ও টোবাগো প্রজাতন্ত্রের অর্ডার অব দ্য রিপাবলিক-সহ একাধিক আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রীয় সম্মাননা লাভ করেছেন। এসব ক্ষেত্রেও তিনি প্রথম বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ওই সম্মান গ্রহণ করেন।
তবে বিজেপির দাবি, এসব পুরস্কার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা, কূটনৈতিক সাফল্য এবং বিশ্বমঞ্চে ভারতের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বেরই স্বীকৃতি। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান








