ছবি সংগৃহীত
অনলাইন ডেস্ক : মার্কিন সেনাবাহিনী তাদের অস্ত্রাগারে থাকা প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইলের (পিআরএসএম) একটি নতুন সংস্করণ তৈরির কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে নিচ্ছে যা মূলত সমুদ্রের চলন্ত জাহাজ ধ্বংস করতে সক্ষম। ইনক্রিমেন্ট-৪ নামের এই বিশেষ ক্ষেপণাস্ত্রটি প্রায় এক হাজার কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারবে এবং এটি বিশেষভাবে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান নৌ-শক্তিকে মোকাবিলা করার জন্য নকশা করা হয়েছে। পেন্টাগনের এই উদ্যোগকে দেখা হচ্ছে এশীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে দীর্ঘদিনের সামরিক সক্ষমতার ঘাটতি পূরণের একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এই ক্ষেপণাস্ত্রটি হাইমার্স (এইচআইএমএআরএস) লঞ্চার থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য হবে যা দুর্গম দ্বীপগুলোতে মোতায়েন করা সম্ভব। বিশেষ করে জিপিএস সুবিধা নেই এমন পরিবেশেও এটি নিখুঁতভাবে লক্ষ্যভেদে সক্ষম হবে যা ভবিষ্যতে কোনো বড় সংঘাতের সময় অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করবে। এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো চীনের নৌবাহিনীর চলাচলের পথগুলোতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা এবং প্রয়োজনে সমুদ্রের বুক থেকে শত্রুপক্ষকে হটিয়ে দেওয়া। বর্তমানে ফিলিপাইনের মতো মিত্র দেশগুলোতে চলমান বিভিন্ন সামরিক মহড়ায় এই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের কৌশলগত দিকগুলো পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে।
কৌশলগতভাবে পিআরএসএম সাধারণ ক্রুজ মিসাইলের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী কারণ এটি হাইপারসনিক গতিতে বা শব্দের চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি বেগে লক্ষ্যবস্তুর ওপর আছড়ে পড়তে পারে। চীনের শক্তিশালী বিমানবাহী রণতরীগুলোর চারপাশে যে ত্রিমাত্রিক সুরক্ষা বলয় থাকে তা ভেদ করার জন্য এই প্রচণ্ড গতি ও শক্তি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সাধারণ মিসাইলগুলো যেখানে নিচু দিয়ে উড়ে যায় সেখানে এই ব্যালিস্টিক মিসাইলটি বায়ুমণ্ডলের ওপর দিয়ে গিয়ে সরাসরি উপর থেকে আঘাত করে যা ঠেকানো সাধারণ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য প্রায় অসম্ভব।
তবে এই নতুন সমরাস্ত্রের উচ্চমূল্য এবং উৎপাদন সীমাবদ্ধতা নিয়ে খোদ যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই সংশয় দেখা দিয়েছে। প্রতিটি পিআরএসএম রাউন্ড তৈরি করতে প্রায় ১.৬ মিলিয়ন ডলার খরচ হয় এবং একটি ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে অন্তত ১৫ মাস সময় লাগে। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে বর্তমানে আমেরিকার হাতে এই মিসাইলের মজুত খুব একটা বেশি নেই। মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক উত্তজনা বা ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র মতো অভিযানে বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ ব্যয়ের ফলে এই মজুত আরও সংকুচিত হয়ে পড়েছে যা পূরণে দীর্ঘ সময় লেগে যেতে পারে।
ভৌগোলিক দিক থেকে বিচার করলে পিআরএসএম মিসাইলটি আমেরিকার বর্তমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি বিশাল শূন্যস্থান পূরণ করবে। বর্তমানে তাদের হাতে থাকা টাইফুন মিসাইল সিস্টেম অনেক দূর পাল্লার এবং এনএমএসআইএস সিস্টেম খুব কম দূরত্বের। এক হাজার কিলোমিটার পাল্লার এই নতুন মিসাইলটি দক্ষিণ জাপান বা উত্তর ফিলিপাইনে মোতায়েন করা হলে তা দক্ষিণ চীন সাগরের একটি বড় অংশকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে। এর ফলে তাইওয়ান বা তার আশপাশের সমুদ্রসীমায় চীনের একাধিপত্য খর্ব করা আমেরিকার জন্য অনেক সহজ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কিন্তু দুর্গম দ্বীপগুলোতে এই মিসাইল লাঞ্চারগুলোর টিকে থাকা নিয়ে সামরিক বিশেষজ্ঞরা বেশ উদ্বিগ্ন। ছোট ছোট দ্বীপে যাতায়াতের সুব্যবস্থা না থাকায় এই বিশাল আকারের লঞ্চারগুলো শত্রু পক্ষের নজরদারি এড়ানো কঠিন হয়ে পড়বে। স্যাটেলাইট প্রযুক্তির মাধ্যমে চীন খুব সহজেই এসব লঞ্চারের অবস্থান শনাক্ত করে ধ্বংস করে দিতে পারে। এছাড়া জাপান বা ফিলিপাইনের মতো দেশগুলোর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এতটাই সীমিত যে তারা নিজেদের বিদ্যুৎ কেন্দ্র বা জনপদ রক্ষা করবে নাকি আমেরিকার এই মিসাইল লাঞ্চার রক্ষা করবে তা নিয়ে দ্বিধায় পড়তে পারে।
ইরানের সাম্প্রতিক হামলার সময় দেখা গেছে যে ড্রোনের ঝাঁক পাঠিয়ে অনেক শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ব্যস্ত রেখে মূল লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করা সম্ভব। চীনের মতো শক্তিশালী দেশের বিরুদ্ধে আমেরিকার এই ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে এখন বড় প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে চীনের বিপুল পরিমাণ ড্রোন এবং মিসাইল শক্তির সামনে পিআরএসএম লঞ্চারগুলোকে সুরক্ষিত রাখা হবে এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে উৎপাদনের ধীরগতি এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করতে পারে বলে হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের মতো গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো সতর্ক করেছে।
এশিয়া টাইমসের বিশেষ প্রতিবেদন








