জাপানের কালো ডিম, যা আয়ু বাড়ায় সাত বছর

ছবি সংগৃহীত

 

ফিচার ডেস্ক : পর্যটকদের আকর্ষণ করতে জাপান বেশ পারদর্শী। টোকিও তার চকচকে শহুরে দর্শন দিয়ে মুগ্ধ করে, আর কিয়োটো শান্তি ও ঐতিহ্য অনুভব করায়। কিন্তু সম্প্রতি পর্যটকরা প্রচলিত জনপ্রিয় স্থানগুলো ছাড়িয়ে নতুন অভিজ্ঞতা খুঁজছেন।

এ ধরনের নতুন আকর্ষণের একটি হলো ওয়াকুদানি। এটি হাকোন অঞ্চলের একটি বাষ্পীয় আগ্নেয়গিরি উপত্যকা। এখানে সাদা ডিমগুলোকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় রান্না করা হয়, যার ফলে খোসা কালো হয়ে যায়। সেই ডিম খেলে আপনার আয়ু সাত বছর বেড়ে যায়!

শুনলে যেন মনে হবে রূপকথার গল্প শুনছেন। কিন্তু অবাক করার বিষয় হলো, এই বিশ্বাস নতুন নয়। সোশ্যাল মিডিয়ার যুগের অনেক আগেই, শত শত বছর ধরে মানুষ ওয়াকুদানিতে ভিড় করছে এই কালো ডিমের টানে।

টোকিও থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার দূরে হাকোনে অঞ্চলে অবস্থিত ওওয়াকুদানি। টোকিও থেকে প্রথমে ট্রেনে করে যেতে হয় ওদাওয়ারা, তারপর পাহাড়ি ট্রেন, কেবল কার পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত হাকোনে রোপওয়েতে চড়ে পৌঁছাতে হয় এই আগ্নেয় উপত্যকায়।

dftgt

ওয়াকুদানি বাংলা শব্দের অর্থ ‘বৃহৎ ফুটন্ত উপত্যকা’। প্রায় ৩ হাজার বছর আগে মাউন্ট হাকোনে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলে এই উপত্যকার জন্ম। আজও জায়গাটি সক্রিয় আগ্নেয় অঞ্চল। মাটির ফাঁক দিয়ে বের হয় গরম গ্যাস, চারপাশে সারাক্ষণ ধোঁয়ার আস্তরণ।

এই ভয়ংকর পরিবেশের কারণেই একে অনেকে ‘হেল ভ্যালি’ বা ‘ডেথ ভ্যালি’ বলেও ডাকে। কিন্তু ঠিক এই আগ্নেয় শক্তির মাঝেই জন্ম নেয় ওয়াকুদানির সবচেয়ে বিখ্যাত খাবার-কুরো তামাগো অর্থাৎ কালো ডিম।

এই ডিমগুলো আসলে সাধারণ মুরগির ডিমই। সেগুলোকে প্রায় এক ঘণ্টা ধরে সেদ্ধ করা হয় ওওয়াকুদানির সালফারসমৃদ্ধ গরম পানিতে। পানির খনিজ উপাদান ডিমের খোসার সঙ্গে রাসায়নিক বিক্রিয়া করে, ফলে খোসা কালো হয়ে যায়। কখনো কখনো খোসার গায়ে খানিকটা খসখসে ভাবও দেখা যায়। তবে ভেতরের অংশ একেবারেই স্বাভাবিক। ডিম ভাঙলে দেখা যাবে, সাদা রঙের সাধারণ সেদ্ধ ডিম,স্বাদেও তেমন পার্থক্য নেই, শুধু হালকা সালফারের স্বাদ পাওয়া যায়।

ert

এই কালো ডিম সাধারণত ওওয়াকুদানি স্টেশনের কাছেই বিক্রি হয়, বিশেষ করে কুরোতামাগো হাউস এ। চারটি করে প্যাকেটে ডিম বিক্রি হয় এবং সাধারণত সেখানেই দাঁড়িয়ে খাওয়ার নিয়ম।

এই ডিম ঘিরে সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো-একটি ডিম খেলেই নাকি আয়ু বাড়ে সাত বছর। এই বিশ্বাস প্রায় হাজার বছরের পুরোনো। জাপানের হেইয়ান যুগের বিখ্যাত বৌদ্ধ ভিক্ষু ও পণ্ডিত কোবো দাইশি, যিনি কুকাই নামেও পরিচিত। লোককথা অনুযায়ী বিষাক্ত ধোঁয়া এবং অস্থিতিশীল ভূমির কাছে বসবাসকারী স্থানীয়দের দুর্দশায় ব্যথিত হয়ে তিনি এনমেই জিজো-র মূর্তি খোদাই করেছিলেন। যিনি দীর্ঘায়ু ও সুরক্ষার প্রতীক।

কোবো স্থানীয় বাসিন্দাদের উষ্ণ প্রস্রবণে সেদ্ধ ডিম খেতে উৎসাহিত করতেন। তাদের বিশ্বাস ছিল এর ফলে স্বাস্থ্য ও জীবনীশক্তি বৃদ্ধি হবে। সময়ে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি বিশ্বাসে পরিণত হয়েছে যে, একটি কালো ডিম খেলে আয়ু সাত বছর বেড়ে যায়।

জাপানি সংস্কৃতিতে সাত সংখ্যাটির একটি প্রতীকী তাৎপর্য রয়েছে। এই সংখ্যাটি প্রায়শই সৌভাগ্য এবং আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে জড়িত। যদিও এই দাবির কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, দুইটির বেশি ডিম খাওয়া উচিত নয়। যেন দীর্ঘায়ু তাড়াহুড়া করে বাড়ানো যায় না-এই বার্তাই এতে লুকিয়ে আছে।

ওয়াকুদানিতে কালো ডিম খাওয়ার অভিজ্ঞতা অনেকের কাছেই শুধু খাবারের চেয়ে বেশি কিছু। চারপাশের ধোঁয়া ওঠা ভূমি, জিজো মূর্তি, মন্দির আর শতাব্দীপ্রাচীন গল্প-সব মিলিয়ে বিষয়টি এক ধরনের আচার-অনুষ্ঠানের মতো অনুভূতি তৈরি করে।

ওয়াকুদানির কালো ডিম আসলে শুধু আয়ু বাড়ানোর গল্প নয়-এটি জাপানের সংস্কৃতি, বিশ্বাস আর প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের এক অনন্য প্রতীক।  সূত্র: এনডিটিভি

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



» আদালত প্রাঙ্গণ থেকে পালিয়ে যাওয়া আসামি র‌্যাব হাতে গ্রেফতার

» যুদ্ধের মাঝেই আবুধাবির গ্যাস প্রকল্পে ৬.২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে ইউএই

» প্রবাসী কার্ডধারীদের ভূমি সেবা সহজ করতে ভূমিমন্ত্রীর নির্দেশ

» যেকোনো দুর্যোগে দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করতে হবে: জুবাইদা রহমান

» নেতাকর্মীকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান রিজভীর

» মানবতাবিরোধী অপরাধে মোজাফফরকে ট্রাইব্যুনালে হাজিরের নির্দেশ

» তিন জেলায় চার নদীর পানি বিপৎসীমার ওপরে, সতর্কসীমায় আরও ১২টি

» গুম ও বিচারবহির্ভূত খুনকে প্রশ্রয় দেবে না সরকার : ডা. জাহেদ

» এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে ভুয়া বিজ্ঞপ্তি, বোর্ডের জরুরি বার্তা

» হজ প্যাকেজ ঘোষণা : সর্বনিম্ন ৫ লাখ সাড়ে ৫ হাজার টাকা

 

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ,

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন,

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

 

ইমেল: [email protected]

ফোন নাম্বার : ০১৫৩৫১৩০৩৫০,

Desing & Developed BY PopularITLtd.Com
পরীক্ষামূলক প্রচার...

জাপানের কালো ডিম, যা আয়ু বাড়ায় সাত বছর

ছবি সংগৃহীত

 

ফিচার ডেস্ক : পর্যটকদের আকর্ষণ করতে জাপান বেশ পারদর্শী। টোকিও তার চকচকে শহুরে দর্শন দিয়ে মুগ্ধ করে, আর কিয়োটো শান্তি ও ঐতিহ্য অনুভব করায়। কিন্তু সম্প্রতি পর্যটকরা প্রচলিত জনপ্রিয় স্থানগুলো ছাড়িয়ে নতুন অভিজ্ঞতা খুঁজছেন।

এ ধরনের নতুন আকর্ষণের একটি হলো ওয়াকুদানি। এটি হাকোন অঞ্চলের একটি বাষ্পীয় আগ্নেয়গিরি উপত্যকা। এখানে সাদা ডিমগুলোকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় রান্না করা হয়, যার ফলে খোসা কালো হয়ে যায়। সেই ডিম খেলে আপনার আয়ু সাত বছর বেড়ে যায়!

শুনলে যেন মনে হবে রূপকথার গল্প শুনছেন। কিন্তু অবাক করার বিষয় হলো, এই বিশ্বাস নতুন নয়। সোশ্যাল মিডিয়ার যুগের অনেক আগেই, শত শত বছর ধরে মানুষ ওয়াকুদানিতে ভিড় করছে এই কালো ডিমের টানে।

টোকিও থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার দূরে হাকোনে অঞ্চলে অবস্থিত ওওয়াকুদানি। টোকিও থেকে প্রথমে ট্রেনে করে যেতে হয় ওদাওয়ারা, তারপর পাহাড়ি ট্রেন, কেবল কার পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত হাকোনে রোপওয়েতে চড়ে পৌঁছাতে হয় এই আগ্নেয় উপত্যকায়।

dftgt

ওয়াকুদানি বাংলা শব্দের অর্থ ‘বৃহৎ ফুটন্ত উপত্যকা’। প্রায় ৩ হাজার বছর আগে মাউন্ট হাকোনে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলে এই উপত্যকার জন্ম। আজও জায়গাটি সক্রিয় আগ্নেয় অঞ্চল। মাটির ফাঁক দিয়ে বের হয় গরম গ্যাস, চারপাশে সারাক্ষণ ধোঁয়ার আস্তরণ।

এই ভয়ংকর পরিবেশের কারণেই একে অনেকে ‘হেল ভ্যালি’ বা ‘ডেথ ভ্যালি’ বলেও ডাকে। কিন্তু ঠিক এই আগ্নেয় শক্তির মাঝেই জন্ম নেয় ওয়াকুদানির সবচেয়ে বিখ্যাত খাবার-কুরো তামাগো অর্থাৎ কালো ডিম।

এই ডিমগুলো আসলে সাধারণ মুরগির ডিমই। সেগুলোকে প্রায় এক ঘণ্টা ধরে সেদ্ধ করা হয় ওওয়াকুদানির সালফারসমৃদ্ধ গরম পানিতে। পানির খনিজ উপাদান ডিমের খোসার সঙ্গে রাসায়নিক বিক্রিয়া করে, ফলে খোসা কালো হয়ে যায়। কখনো কখনো খোসার গায়ে খানিকটা খসখসে ভাবও দেখা যায়। তবে ভেতরের অংশ একেবারেই স্বাভাবিক। ডিম ভাঙলে দেখা যাবে, সাদা রঙের সাধারণ সেদ্ধ ডিম,স্বাদেও তেমন পার্থক্য নেই, শুধু হালকা সালফারের স্বাদ পাওয়া যায়।

ert

এই কালো ডিম সাধারণত ওওয়াকুদানি স্টেশনের কাছেই বিক্রি হয়, বিশেষ করে কুরোতামাগো হাউস এ। চারটি করে প্যাকেটে ডিম বিক্রি হয় এবং সাধারণত সেখানেই দাঁড়িয়ে খাওয়ার নিয়ম।

এই ডিম ঘিরে সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো-একটি ডিম খেলেই নাকি আয়ু বাড়ে সাত বছর। এই বিশ্বাস প্রায় হাজার বছরের পুরোনো। জাপানের হেইয়ান যুগের বিখ্যাত বৌদ্ধ ভিক্ষু ও পণ্ডিত কোবো দাইশি, যিনি কুকাই নামেও পরিচিত। লোককথা অনুযায়ী বিষাক্ত ধোঁয়া এবং অস্থিতিশীল ভূমির কাছে বসবাসকারী স্থানীয়দের দুর্দশায় ব্যথিত হয়ে তিনি এনমেই জিজো-র মূর্তি খোদাই করেছিলেন। যিনি দীর্ঘায়ু ও সুরক্ষার প্রতীক।

কোবো স্থানীয় বাসিন্দাদের উষ্ণ প্রস্রবণে সেদ্ধ ডিম খেতে উৎসাহিত করতেন। তাদের বিশ্বাস ছিল এর ফলে স্বাস্থ্য ও জীবনীশক্তি বৃদ্ধি হবে। সময়ে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি বিশ্বাসে পরিণত হয়েছে যে, একটি কালো ডিম খেলে আয়ু সাত বছর বেড়ে যায়।

জাপানি সংস্কৃতিতে সাত সংখ্যাটির একটি প্রতীকী তাৎপর্য রয়েছে। এই সংখ্যাটি প্রায়শই সৌভাগ্য এবং আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে জড়িত। যদিও এই দাবির কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, দুইটির বেশি ডিম খাওয়া উচিত নয়। যেন দীর্ঘায়ু তাড়াহুড়া করে বাড়ানো যায় না-এই বার্তাই এতে লুকিয়ে আছে।

ওয়াকুদানিতে কালো ডিম খাওয়ার অভিজ্ঞতা অনেকের কাছেই শুধু খাবারের চেয়ে বেশি কিছু। চারপাশের ধোঁয়া ওঠা ভূমি, জিজো মূর্তি, মন্দির আর শতাব্দীপ্রাচীন গল্প-সব মিলিয়ে বিষয়টি এক ধরনের আচার-অনুষ্ঠানের মতো অনুভূতি তৈরি করে।

ওয়াকুদানির কালো ডিম আসলে শুধু আয়ু বাড়ানোর গল্প নয়-এটি জাপানের সংস্কৃতি, বিশ্বাস আর প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের এক অনন্য প্রতীক।  সূত্র: এনডিটিভি

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



সর্বাধিক পঠিত



 

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ,

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন,

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

 

ইমেল: [email protected]

ফোন নাম্বার : ০১৫৩৫১৩০৩৫০,

Design & Developed BY ThemesBazar.Com