সিঙাড়ার উৎপত্তি কোথায়, কীভাবে বাংলায় হয়ে উঠলো জনপ্রিয়

ছবি সংগৃহীত

 

ফিচার ডেস্ক :সকালের নাস্তা, অফিসের কাজের ফাঁকে কিংবা বিকেলের আড্ডায় গরম গরম সিঙাড়া যেন বাঙালির রসনা মেটায়। বৃষ্টি হোক কিংবা কাঠফাটা রোদ্দুর সিঙাড়ার স্বাদ কখনোই কমে না। মচমচে খাস্তা ময়দার খোলসের ভেতরে আলু-বাদাম,অল্প মসলাদার পুর, সঙ্গে টক-মিষ্টি চাটনি, এই স্বাদের তুলনা হয় না নামিদামি রেস্তোরাঁর দেশ-বিদেশের বড় বড় শেফের রান্নার সঙ্গেও।

খুব সাধারণ ৫-১০টাকার সিঙাড়া আজ বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু এই সিঙাড়ার শিকড় যে বহু দূরের এক ইতিহাসে গাঁথা, তা অনেকেই জানেন না। কীভাবে সিঙাড়া বাংলায় এলো, আর কীভাবেই বা এত জনপ্রিয় হয়ে উঠলো সেই গল্পই আজ জানাবো। চলুন শুরু করি-

সিঙাড়ার মূল উৎস খুঁজতে গেলে আমাদের যেতে হয় মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়ার দিকে। ইতিহাসবিদদের মতে, সিঙাড়ার প্রাচীন রূপ ছিল ‘সাম্বোসা’ বা ‘সাম্বুসাক’ যা পারস্য অঞ্চলে বেশ জনপ্রিয় ছিল। প্রায় ১০ম থেকে ১৩শ শতাব্দীর মধ্যে এই খাবারের উল্লেখ পাওয়া যায় বিভিন্ন পারস্য ও আরবি সাহিত্যে। সে সময় এটি ছিল মাংস, বাদাম ও মসলা দিয়ে তৈরি এক ধরনের ভাজা পিঠা, যা রাজদরবার ও ধনী সমাজে পরিবেশন করা হতো।

পরবর্তীতে মুসলিম শাসকদের হাত ধরে ভারতীয় উপমহাদেশে সিঙাড়ার আগমন ঘটে। দিল্লি সালতানাতের সময় (১৩শ শতাব্দী) মধ্য এশিয়া থেকে আগত ব্যবসায়ী ও শাসকরাই এই খাবার নিয়ে আসেন। বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা তার ভ্রমণকাহিনিতেও ‘সাম্বুসাক’-এর উল্লেখ করেছেন, যা সে সময়ের রাজকীয় ভোজে পরিবেশন করা হতো।

তবে উপমহাদেশে আসার পর সিঙাড়ার রূপ ও স্বাদে আসে বড় পরিবর্তন। বিশেষ করে বাংলায় এসে এটি সম্পূর্ণ নতুন এক পরিচয় পায়। এখানে মাংসের পরিবর্তে আলু, মটরশুঁটি, পেঁয়াজ,বাদাম ও বিভিন্ন মসলা দিয়ে তৈরি পুর ব্যবহার শুরু হয়। মূলত বাংলার মানুষের খাদ্যাভ্যাস, জলবায়ু এবং সহজলভ্য উপকরণ এই পরিবর্তনের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ব্রিটিশ শাসনামলে সিঙাড়া আরও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। শহরের রাস্তার ধারের দোকান, চায়ের স্টল এবং হোটেলগুলোতে ত্রিকোণ বা পিরামিড আকৃতির খোলসের মধ্যে নানা রকম পুর ভরা খাবারটি সহজলভ্য হয়ে যায়। কম খরচে পেট ভরানোর উপযোগী হওয়ায় এটি দ্রুতই সাধারণ মানুষের প্রিয় খাবারে পরিণত হয়। বিশেষ করে কলকাতা ও ঢাকার মতো শহরে সিঙাড়া হয়ে ওঠে বিকেলের নাস্তার প্রধান আকর্ষণ।

বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে সিঙাড়ার কিছু আঞ্চলিক বৈচিত্র্যও দেখা যায়। ঢাকার সিঙাড়া সাধারণত ছোট আকারের এবং ভেতরে থাকে আলু, মটরশুঁটি ও কখনো ডিম বা কিমা। অন্যদিকে কলকাতার সিঙাড়া তুলনামূলক বড় এবং এতে কাজুবাদাম, কিশমিশ বা ফুলকপিও ব্যবহার করা হয়। আবার কোনো কোনো জায়গায় সিঙাড়ার সঙ্গে পরিবেশন করা হয় টক-ঝাল তেঁতুল চাটনি, সরিষা-তেঁতুলের তৈরি টক বা টমেটো সস দিয়ে, যা এর স্বাদকে আরও বাড়িয়ে তোলে।

সিঙাড়ার জনপ্রিয়তার পেছনে আরেকটি বড় কারণ হলো এর সহজলভ্যতা ও বহুমুখিতা। এটি যেমন ঘরে সহজে তৈরি করা যায়, তেমনি রাস্তার পাশের দোকানেও সহজে পাওয়া যায়। উৎসব, পারিবারিক অনুষ্ঠান কিংবা অফিসের নাস্তা সব জায়গাতেই সিঙাড়ার উপস্থিতি চোখে পড়ে। এমনকি বর্তমানে বিভিন্ন ফিউশন ভার্সনও দেখা যাচ্ছে, যেখানে চিজ, চিকেন বা নুডলস দিয়েও সিঙাড়া তৈরি করা হচ্ছে। এছাড়া কলিজা সিঙাড়ার জনপ্রিয়তাও আরও অনেক বেশি।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সিঙাড়া শুধু একটি খাবার নয়, বরং বাঙালির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। চায়ের কাপের সঙ্গে এক প্লেট সিঙাড়া মানেই আড্ডার শুরু, গল্পের ঝাঁপি খোলা। সঙ্গে যদি থাকে এক কাপ চা তাহলে ষোল আনা পূর্ণ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই খাবারটি আমাদের জীবনের সঙ্গে মিশে গেছে।  সূএ : জাগোনিউজ২৪.কম,

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



» আমার দেশ পত্রিকার প্রেসে বোমা হামলা: ডিআরইউয়ের তীব্র নিন্দা

» ক্র্যাবের বিবৃতি , আইজিপির বক্তব্য ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রত্যাহার না করলে কঠোর কর্মসূচি

» ‘১০০ বার কেন, বিজয়কে হাজারবার বিয়ে করতে রাজি’

» মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা আধুনিক করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছি: শিক্ষামন্ত্রী

» মানব পাচার ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

» বাংলাদেশে কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণে উইনরক ইন্টারন্যাশনালকে আহ্বান রাষ্ট্রপতির

» লিবিয়া থেকে কাল দেশে ফিরছেন ১৭৪ বাংলাদেশি

» সরকারি বাসায় এবার এডিসের লার্ভা মিললে ফ্ল্যাটের বরাদ্দ বাতিলের নির্দেশ প্রতিমন্ত্রীর

» ইউনিয়নের প্রতি তিনটি ওয়ার্ডে একটি করে ফ্যামিলি ওয়েলবিং সেন্টার করা হবে : স্বাস্থ্যমন্ত্রী

» চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেটের কারণে কৃষকদের সংকট বাড়ছে: আখতার হোসেন

 

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ,

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন,

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

 

ইমেল: dhakacrimenewsbd@gmail.com

ফোন নাম্বার : ০১৫৩৫১৩০৩৫০,

Desing & Developed BY PopularITLtd.Com
পরীক্ষামূলক প্রচার...

সিঙাড়ার উৎপত্তি কোথায়, কীভাবে বাংলায় হয়ে উঠলো জনপ্রিয়

ছবি সংগৃহীত

 

ফিচার ডেস্ক :সকালের নাস্তা, অফিসের কাজের ফাঁকে কিংবা বিকেলের আড্ডায় গরম গরম সিঙাড়া যেন বাঙালির রসনা মেটায়। বৃষ্টি হোক কিংবা কাঠফাটা রোদ্দুর সিঙাড়ার স্বাদ কখনোই কমে না। মচমচে খাস্তা ময়দার খোলসের ভেতরে আলু-বাদাম,অল্প মসলাদার পুর, সঙ্গে টক-মিষ্টি চাটনি, এই স্বাদের তুলনা হয় না নামিদামি রেস্তোরাঁর দেশ-বিদেশের বড় বড় শেফের রান্নার সঙ্গেও।

খুব সাধারণ ৫-১০টাকার সিঙাড়া আজ বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু এই সিঙাড়ার শিকড় যে বহু দূরের এক ইতিহাসে গাঁথা, তা অনেকেই জানেন না। কীভাবে সিঙাড়া বাংলায় এলো, আর কীভাবেই বা এত জনপ্রিয় হয়ে উঠলো সেই গল্পই আজ জানাবো। চলুন শুরু করি-

সিঙাড়ার মূল উৎস খুঁজতে গেলে আমাদের যেতে হয় মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়ার দিকে। ইতিহাসবিদদের মতে, সিঙাড়ার প্রাচীন রূপ ছিল ‘সাম্বোসা’ বা ‘সাম্বুসাক’ যা পারস্য অঞ্চলে বেশ জনপ্রিয় ছিল। প্রায় ১০ম থেকে ১৩শ শতাব্দীর মধ্যে এই খাবারের উল্লেখ পাওয়া যায় বিভিন্ন পারস্য ও আরবি সাহিত্যে। সে সময় এটি ছিল মাংস, বাদাম ও মসলা দিয়ে তৈরি এক ধরনের ভাজা পিঠা, যা রাজদরবার ও ধনী সমাজে পরিবেশন করা হতো।

পরবর্তীতে মুসলিম শাসকদের হাত ধরে ভারতীয় উপমহাদেশে সিঙাড়ার আগমন ঘটে। দিল্লি সালতানাতের সময় (১৩শ শতাব্দী) মধ্য এশিয়া থেকে আগত ব্যবসায়ী ও শাসকরাই এই খাবার নিয়ে আসেন। বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা তার ভ্রমণকাহিনিতেও ‘সাম্বুসাক’-এর উল্লেখ করেছেন, যা সে সময়ের রাজকীয় ভোজে পরিবেশন করা হতো।

তবে উপমহাদেশে আসার পর সিঙাড়ার রূপ ও স্বাদে আসে বড় পরিবর্তন। বিশেষ করে বাংলায় এসে এটি সম্পূর্ণ নতুন এক পরিচয় পায়। এখানে মাংসের পরিবর্তে আলু, মটরশুঁটি, পেঁয়াজ,বাদাম ও বিভিন্ন মসলা দিয়ে তৈরি পুর ব্যবহার শুরু হয়। মূলত বাংলার মানুষের খাদ্যাভ্যাস, জলবায়ু এবং সহজলভ্য উপকরণ এই পরিবর্তনের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ব্রিটিশ শাসনামলে সিঙাড়া আরও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। শহরের রাস্তার ধারের দোকান, চায়ের স্টল এবং হোটেলগুলোতে ত্রিকোণ বা পিরামিড আকৃতির খোলসের মধ্যে নানা রকম পুর ভরা খাবারটি সহজলভ্য হয়ে যায়। কম খরচে পেট ভরানোর উপযোগী হওয়ায় এটি দ্রুতই সাধারণ মানুষের প্রিয় খাবারে পরিণত হয়। বিশেষ করে কলকাতা ও ঢাকার মতো শহরে সিঙাড়া হয়ে ওঠে বিকেলের নাস্তার প্রধান আকর্ষণ।

বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে সিঙাড়ার কিছু আঞ্চলিক বৈচিত্র্যও দেখা যায়। ঢাকার সিঙাড়া সাধারণত ছোট আকারের এবং ভেতরে থাকে আলু, মটরশুঁটি ও কখনো ডিম বা কিমা। অন্যদিকে কলকাতার সিঙাড়া তুলনামূলক বড় এবং এতে কাজুবাদাম, কিশমিশ বা ফুলকপিও ব্যবহার করা হয়। আবার কোনো কোনো জায়গায় সিঙাড়ার সঙ্গে পরিবেশন করা হয় টক-ঝাল তেঁতুল চাটনি, সরিষা-তেঁতুলের তৈরি টক বা টমেটো সস দিয়ে, যা এর স্বাদকে আরও বাড়িয়ে তোলে।

সিঙাড়ার জনপ্রিয়তার পেছনে আরেকটি বড় কারণ হলো এর সহজলভ্যতা ও বহুমুখিতা। এটি যেমন ঘরে সহজে তৈরি করা যায়, তেমনি রাস্তার পাশের দোকানেও সহজে পাওয়া যায়। উৎসব, পারিবারিক অনুষ্ঠান কিংবা অফিসের নাস্তা সব জায়গাতেই সিঙাড়ার উপস্থিতি চোখে পড়ে। এমনকি বর্তমানে বিভিন্ন ফিউশন ভার্সনও দেখা যাচ্ছে, যেখানে চিজ, চিকেন বা নুডলস দিয়েও সিঙাড়া তৈরি করা হচ্ছে। এছাড়া কলিজা সিঙাড়ার জনপ্রিয়তাও আরও অনেক বেশি।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সিঙাড়া শুধু একটি খাবার নয়, বরং বাঙালির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। চায়ের কাপের সঙ্গে এক প্লেট সিঙাড়া মানেই আড্ডার শুরু, গল্পের ঝাঁপি খোলা। সঙ্গে যদি থাকে এক কাপ চা তাহলে ষোল আনা পূর্ণ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই খাবারটি আমাদের জীবনের সঙ্গে মিশে গেছে।  সূএ : জাগোনিউজ২৪.কম,

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



সর্বাধিক পঠিত



 

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ,

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন,

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

 

ইমেল: dhakacrimenewsbd@gmail.com

ফোন নাম্বার : ০১৫৩৫১৩০৩৫০,

Design & Developed BY ThemesBazar.Com