দুর্নীতি প্রতিরোধে লটারি পদ্ধতি হতে পারে কার্যকর উদ্যোগ

ছবি সংগৃহীত

 

অদিতি করিম :বাংলাদেশে দুর্নীতির অন্যতম প্রধান কারণ হলো নিয়োগ এবং বদলি বাণিজ্য। একটি সংঘবদ্ধ দালাল ও মধ‍্যস্বত্বভোগী চক্র সরকারি চাকরির পদোন্নতি এবং বদলিতে তদবির করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। সব সরকারের আমলেই এরা প্রশাসনের অন্দরমহলে ঢুকে তদবির করে। যখন যে দল ক্ষমতায় আসে এই দালালরা সেই দলের লোক হয়ে যায়। এরা সহজেই নিজেদের রঙ বদল করতে পারে। এদের কারণেই প্রশাসনে দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়ে আর বদনাম হয় সরকারের।

যে চাকরিজীবী কোটি টাকা ঘুষ দিয়ে কাঙ্খিত পদে নিয়োগ পান, তার প্রধান কাজ হয় ঘুষের টাকা উদ্ধার। এ কারণে নতুন পদে আসীন হয়েই তিনি জনগণের সেবা না করে দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন। যেহেতু তিনি ঘুষ দিয়ে চেয়ারে বসেছেন তাই ওই সরকারি কর্মচারী থাকেন জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে। এভাবেই সরকারি অফিসে দুর্নীতি বিস্তৃত হয়।

তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই দুর্নীতি দমনে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছেন। দুর্নীতি প্রতিরোধে তারেক রহমান বহুমাত্রিক উদ্যোগ নিয়েছেন। এরমধ্যে নিজে যেমন কৃচছতার নীতি অনুসরণ করছেন তেমনি সরকারের প্রতিটি স্তরে অপচয় বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। তবে দুর্নীতি দমনে প্রধানমন্ত্রীর সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গুলোর একটি হলো সরকারি অফিসে বদলি ও পদায়নে লটারি পদ্ধতি চালু করা। ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে কয়েকটি পদে লটারির মাধ্যমে বদলি পদ্ধতি চালু করা হয়েছে।

সম্প্রতি দেশে প্রথমবারের মতো লটারির মাধ্যমে সাব রেজিস্ট্রার বদলি করা হয়েছে। আইন মন্ত্রণালয় বদলি প্রক্রিয়ায় ‘স্বচ্ছতা নিশ্চিত’ করতে সাব-রেজিস্ট্রারদের লটারির মাধ্যমে বদলি করা হয়। এরফলে দুর্নীতিগ্রস্ত হিসেবে পরিচিত এই পদে দুর্নীতি কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে। এটি যে দুর্নীতি প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ তা প্রমাণিত হয়েছে।

অতীতে ভূমি অফিসের পদায়ন ছিল ঘুষের খনি। এখানে ঘুষ লেনদেন হতো মূলত সাব-রেজিস্ট্রার পদ ঘিরে। এই সাব-রেজিস্ট্রাররাই হলেন এই খাতের কালেক্টর। জনগণের কাছ থেকে তারাই সরাসরি অর্থ আদায় করেন। এই টাকা পদ অনুযায়ী বণ্টন হতো সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত। সাব-রেজিস্ট্রারেরও কিছু নির্দিষ্ট পদ ছিল যেসব বিক্রি হয় রীতিমতো নিলামে। গুলশান, গাজীপুর, রূপগঞ্জ, কেরানীগঞ্জের মতো জায়গায় সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে পদায়নের জন্য লাগতো কয়েক কোটি টাকা। এই বদলি লটারির মাধ্যমে করে সরকার এই খাতে দুর্নীতি বন্ধে একটি কার্যকর ব্যবস্থা নিয়েছে।

কিন্তু সাব রেজিস্ট্রার পদায়নে দুর্নীতি হ্রাস পেলেও অন্যান‍্য সরকারি কর্মচারীদের বদলি ও পদায়ন বাণিজ্য এখনও অব্যাহত আছে। দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগিরা বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে এখনও সক্রিয়। শুধু সাব রেজিস্ট্রার কেন, সরকারি ব‍্যাংকের এমডি থেকে চিকিৎসক-সব সরকারি কর্মচারীদের বদলির ক্ষেত্রে তদবির এবং ঘুষ লেনদেনের প্রবণতা এখনও লক্ষ্য করা যায়। বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে একদম নিম্ন পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের পছন্দের জায়গায় বদলি হতে হলে দালালদের মাধ্যমে লেনদেনের রেওয়াজ অনেক পুরনো। কিছু কিছু লাভজনক পদ বিক্রি হয় কোটি কোটি টাকায়। যে কর্মকর্তা বিপুল অঙ্কের অর্থ দিয়ে বদলি হন, তার প্রথম কাজ হয় বিনিয়োগের টাকা তোলা। এরপর তিনি ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে নিজের আখের গোছাতে ব্যস্ত হন। সচিব থেকে শুরু করে একদম নিম্ন স্তরের কর্মকর্তাদের লাভজনক পদ পেতে ঘুষ দিতে হয়। কর্মচারীদেরও লোভনীয় পদে যেতে উৎকোচ দিতে হয়। সরকারি চাকরিতে কিছু চিহ্নিত পদ আছে যেসব পদে টাকা ছাড়া পদায়ন অসম্ভব। আবার এলাকা ভেদে পদের দাম বাড়ে-কমে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে এরকম অন্তত ২৫টি পদ আছে, যেখানে টাকা ছাড়া বদলি হওয়া সম্ভব নয়। দেশের অন্যতম দুর্নীতিগ্রস্ত খাত হলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এখানে দুর্নীতি হয় প্রধানত থানাকেন্দ্রিক। অতীতে গুলশান, বনানী, ধানমন্ডির মতো অভিজাত এলাকার থানায় ওসি পদে আসতে ১০ থেকে ১৫ কোটি টাকা খরচ করতে হতো। এখনো পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন হয়নি বলেই জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। শুধু ওসি নন, এসব থানার কনস্টেবল পদে আসতেও গুনতে হয় লাখ টাকা।

একজন পুলিশ সদস্য যখন ঘুষ দিয়ে একটি পদে আসেন তখন তিনি সৎ থাকবেন কীভাবে?নিম্ন আদালতের বিচারকদের পদায়নেও হয় ঘুষ লেনদেন। সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বিচারকদের বদলিতে ঘুষ নেওয়ার অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছিলেন। এই সময়ে নিম্ন আদালতের বিচারক বদলিতে কোটি টাকার লেনদেন হয়। সবচেয়ে বেশি ঘুষ লাগে ঢাকা এবং তার আশপাশের এলাকায় পদায়নের জন্য।

ইউনূস আমলে সচিব পর্যায়ে পদায়ন ও পদোন্নতির জন্য ঘুষ লেনদেনের ঘটনা ঘটেছে প্রকাশ‍্যে। ডিসি নিয়োগে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে জনপ্রশাসন সচিব বদলি হন। এই সময় বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর পদায়ন বাণিজ্যের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল।

রাষ্ট্রায়ত্ত্ব ব্যাংক, বীমা কোম্পানির এমডি হবার জন্য কোটি টাকার ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি কয়েকটি ব্যাংকের এমডি নিয়োগ নিয়ে কিছু মধ‍্যস্বত্বভোগি দালালের খবর পাওয়া যাচ্ছে। বন বিভাগ, গণপূর্ত অধিদপ্তর, সড়ক ও জনপদ বিভাগ, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ ইত্যাদি বিভাগে নিম্ন পদের চেয়ে উচ্চ পদ অনেক ব্যয়বহুল। ২০২৩ সালে একটি প্রধান প্রকৌশলীর পদ শতকোটি টাকার বিনিময়ে বিক্রি হয়েছিল। এসব সরকারি দপ্তরে কিছু চিহ্নিত জেলা ও পদ আছে  যেসব পদে বদলি হবার জন্য রীতিমতো নিলাম হয়।

ডাক্তারদের পদায়নেও বাণিজ্য হয়। একজন চিকিৎসককে ঢাকায় বদলি হতে লাখ টাকা গুনতে হয়। ঢাকার বাইরে কোন চিকিৎসক থাকতে চান না। কারণ সবকিছু ঢাকামুখী, ঢাকা কেন্দ্রিক। ইউনূস আমলে ৩ হাজার মেডিকেল অফিসার ও ৫০০ কর্মচারীর চেয়ার রদবদল করা হয়েছে। এত স্বল্প সময়ে অতীতে এমন বদলি হয়নি অধিদপ্তরে। বদলি হওয়া অনেক চিকিৎসক জেলা-উপজেলা পর্যায়ের কর্মস্থলে যোগ দেননি। তদবির করে ঢাকা এবং তার আশপাশে বদলি হয়েছেন। ফলে গ্রামে চিকিৎসক নেই। ফলে বদলি ও পদায়ন বাণিজ্যের কারণে, একদিকে যেমন একটি দুর্নীতিবাজ দালাল গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে, যারা গোটা সরকার পদ্ধতিকে কুলষিত এবং দুর্নীতিগ্রস্ত করছে, অন্যদিকে জনগণ সঠিক সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

আশার কথা, তারেক রহমানের সরকার দুর্নীতির এই উৎসমুখ বন্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছে। এই অবস্থা পরিবর্তনের জন্য সাব রেজিস্ট্রার বদলিতে প্রথমবারের মতো লটারি পদ্ধতি চালু করেছে। এটি একটি  অসাধারণ উদ্যোগ। এরফলে দেশের অন‍্যতম দুর্নীতিগ্রস্ত এই সেক্টরে দুর্নীতি অনেক কমে যেতে শুরু করেছে। যারা ঘুষ ছাড়া লটারির মাধ্যমে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এবং লাভজনক এলাকায় সাব রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন তারা আগের মতো বুভুক্ষের মতো দুর্নীতিতে নিমজ্জিত নন। জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ থাকছেন এবং জনগণের সেবায় মনোযোগী হয়েছেন। লটারির মাধ্যমে সাব রেজিস্ট্রার বদলি মাধ্যমে দুর্নীতি বন্ধে যে প্রশংসনীয় উদ্যোগ সরকার নিয়েছে তা অন্যান্য মন্ত্রণালয়ও অনুসরণ করতে পারে।

ইতিমধ্যে আমরা দেখেছি কয়েকটি মন্ত্রণালয় লটারির মাধ্যমে পদায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। লটারির মাধ্যমে গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলীদের বদলি ও পদায়ন করা হচ্ছে বলে মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে। বদলি বাণিজ্য বন্ধ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত এবং যোগ্য ব্যক্তিকে যোগ্য জায়গায় পদায়নের লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব‍্যাংক, বীমার প্রধান নির্বাহী পদায়নের ক্ষেত্রেও যোগ‍্যদের ফিট লিস্ট করে লটারির ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে কেবল দুর্নীতি কমবে না, ব‍্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা ফিরে আসবে।

সরকারের সেবামূলক সব প্রতিষ্ঠান এ পদ্ধতি অনুসরণ করে বদলি ও পদায়ন করতে পারে। যেমন ধরা যাক, জেলা প্রশাসক পদায়ন নিয়ে প্রায়ই বিতর্ক সৃষ্টি হয়। কিন্তু জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় যদি ফিট লিস্টে থাকা যোগ্য প্রার্থীদের মধ্যে লটারির মাধ্যমে নির্ধারণ করে যে, কোন জেলায় কে ডিসি পদে নিয়োগ পাবেন তাহলে সহজেই বিতর্ক এড়ানো সম্ভব।একইভাবে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কিংবা চিকিৎসক পদে বদলির ক্ষেত্রে এ পদ্ধতি একটি সহজ সমাধান।

একজন সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারী যদি ঘুষ না দিয়ে একটি পদে বসেন, তাহলে একদিকে যেমন তিনি দুর্নীতিগ্রস্ত হবেন না। অন্যদিকে তিনি জবাবদিহির আওতায় আসবেন। ভালো কাজ করে জনগণের আস্থা অর্জন করার চেষ্টা করবেন। এতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী আবহ সৃষ্টি হবে। তাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধে অন্যতম হাতিয়ার হতে পারে লটারির মাধ্যমে পদায়ন ও বদলি। শুধু কয়েকটি সরকারি বিভাগে নয়, সকল সরকারি প্রতিষ্ঠানে বদলি ও পদায়ন বাণিজ্য বন্ধ করতে পর্যায়ক্রমে লটারি পদ্ধতি চালু করা যেতে পারে। এটি বর্তমান সরকারের দুর্নীতি বিরোধী অভিযানকে অনেকখানি সফল করতে পারে।

অদিতি করিম: লেখক ও নাট্যকার
ইমেইল: auditekarim@gmail.com সূএ: বাংলাদেশ  প্রতিদিন

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



» চাঁদাবাজি নির্মূলে শিগগিরই নতুন আইন আসছে: আইজিপি

» আগামীকাল লক্ষ্মীপূজা

» গাজীপুরের সাড়ে তিন ঘণ্টার চেষ্টায় নিয়ন্ত্রণে আগুন

» মেট্রোরেলে যাত্রীদের নিরাপত্তায় বসছে মেটাল ডিটেক্টর ও লাগেজ স্ক্যানার

» কারিনার প্রশংসা পেয়ে নজর লাগার ভয় পেলেন সাইফ!

» সরকারকে বিব্রত করতে অপপ্রচার চালাচ্ছেন গোলাম পরওয়ার : ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব

» দুর্বৃত্তদের গুলিতে যুবদল নেতা আহত

» দুর্নীতি প্রতিরোধে লটারি পদ্ধতি হতে পারে কার্যকর উদ্যোগ

» সংসদ ভবনে সংবিধান সংশোধন কমিটির নবম বৈঠক

» পদ্মা নদীতে মা ইলিশ সংরক্ষণে অভিযান, ৫ জেলে আটক

 

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ,

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন,

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

 

ইমেল: dhakacrimenewsbd@gmail.com

ফোন নাম্বার : ০১৫৩৫১৩০৩৫০,

Desing & Developed BY PopularITLtd.Com
পরীক্ষামূলক প্রচার...

দুর্নীতি প্রতিরোধে লটারি পদ্ধতি হতে পারে কার্যকর উদ্যোগ

ছবি সংগৃহীত

 

অদিতি করিম :বাংলাদেশে দুর্নীতির অন্যতম প্রধান কারণ হলো নিয়োগ এবং বদলি বাণিজ্য। একটি সংঘবদ্ধ দালাল ও মধ‍্যস্বত্বভোগী চক্র সরকারি চাকরির পদোন্নতি এবং বদলিতে তদবির করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। সব সরকারের আমলেই এরা প্রশাসনের অন্দরমহলে ঢুকে তদবির করে। যখন যে দল ক্ষমতায় আসে এই দালালরা সেই দলের লোক হয়ে যায়। এরা সহজেই নিজেদের রঙ বদল করতে পারে। এদের কারণেই প্রশাসনে দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়ে আর বদনাম হয় সরকারের।

যে চাকরিজীবী কোটি টাকা ঘুষ দিয়ে কাঙ্খিত পদে নিয়োগ পান, তার প্রধান কাজ হয় ঘুষের টাকা উদ্ধার। এ কারণে নতুন পদে আসীন হয়েই তিনি জনগণের সেবা না করে দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন। যেহেতু তিনি ঘুষ দিয়ে চেয়ারে বসেছেন তাই ওই সরকারি কর্মচারী থাকেন জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে। এভাবেই সরকারি অফিসে দুর্নীতি বিস্তৃত হয়।

তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই দুর্নীতি দমনে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছেন। দুর্নীতি প্রতিরোধে তারেক রহমান বহুমাত্রিক উদ্যোগ নিয়েছেন। এরমধ্যে নিজে যেমন কৃচছতার নীতি অনুসরণ করছেন তেমনি সরকারের প্রতিটি স্তরে অপচয় বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। তবে দুর্নীতি দমনে প্রধানমন্ত্রীর সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গুলোর একটি হলো সরকারি অফিসে বদলি ও পদায়নে লটারি পদ্ধতি চালু করা। ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে কয়েকটি পদে লটারির মাধ্যমে বদলি পদ্ধতি চালু করা হয়েছে।

সম্প্রতি দেশে প্রথমবারের মতো লটারির মাধ্যমে সাব রেজিস্ট্রার বদলি করা হয়েছে। আইন মন্ত্রণালয় বদলি প্রক্রিয়ায় ‘স্বচ্ছতা নিশ্চিত’ করতে সাব-রেজিস্ট্রারদের লটারির মাধ্যমে বদলি করা হয়। এরফলে দুর্নীতিগ্রস্ত হিসেবে পরিচিত এই পদে দুর্নীতি কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে। এটি যে দুর্নীতি প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ তা প্রমাণিত হয়েছে।

অতীতে ভূমি অফিসের পদায়ন ছিল ঘুষের খনি। এখানে ঘুষ লেনদেন হতো মূলত সাব-রেজিস্ট্রার পদ ঘিরে। এই সাব-রেজিস্ট্রাররাই হলেন এই খাতের কালেক্টর। জনগণের কাছ থেকে তারাই সরাসরি অর্থ আদায় করেন। এই টাকা পদ অনুযায়ী বণ্টন হতো সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত। সাব-রেজিস্ট্রারেরও কিছু নির্দিষ্ট পদ ছিল যেসব বিক্রি হয় রীতিমতো নিলামে। গুলশান, গাজীপুর, রূপগঞ্জ, কেরানীগঞ্জের মতো জায়গায় সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে পদায়নের জন্য লাগতো কয়েক কোটি টাকা। এই বদলি লটারির মাধ্যমে করে সরকার এই খাতে দুর্নীতি বন্ধে একটি কার্যকর ব্যবস্থা নিয়েছে।

কিন্তু সাব রেজিস্ট্রার পদায়নে দুর্নীতি হ্রাস পেলেও অন্যান‍্য সরকারি কর্মচারীদের বদলি ও পদায়ন বাণিজ্য এখনও অব্যাহত আছে। দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগিরা বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে এখনও সক্রিয়। শুধু সাব রেজিস্ট্রার কেন, সরকারি ব‍্যাংকের এমডি থেকে চিকিৎসক-সব সরকারি কর্মচারীদের বদলির ক্ষেত্রে তদবির এবং ঘুষ লেনদেনের প্রবণতা এখনও লক্ষ্য করা যায়। বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে একদম নিম্ন পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের পছন্দের জায়গায় বদলি হতে হলে দালালদের মাধ্যমে লেনদেনের রেওয়াজ অনেক পুরনো। কিছু কিছু লাভজনক পদ বিক্রি হয় কোটি কোটি টাকায়। যে কর্মকর্তা বিপুল অঙ্কের অর্থ দিয়ে বদলি হন, তার প্রথম কাজ হয় বিনিয়োগের টাকা তোলা। এরপর তিনি ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে নিজের আখের গোছাতে ব্যস্ত হন। সচিব থেকে শুরু করে একদম নিম্ন স্তরের কর্মকর্তাদের লাভজনক পদ পেতে ঘুষ দিতে হয়। কর্মচারীদেরও লোভনীয় পদে যেতে উৎকোচ দিতে হয়। সরকারি চাকরিতে কিছু চিহ্নিত পদ আছে যেসব পদে টাকা ছাড়া পদায়ন অসম্ভব। আবার এলাকা ভেদে পদের দাম বাড়ে-কমে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে এরকম অন্তত ২৫টি পদ আছে, যেখানে টাকা ছাড়া বদলি হওয়া সম্ভব নয়। দেশের অন্যতম দুর্নীতিগ্রস্ত খাত হলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এখানে দুর্নীতি হয় প্রধানত থানাকেন্দ্রিক। অতীতে গুলশান, বনানী, ধানমন্ডির মতো অভিজাত এলাকার থানায় ওসি পদে আসতে ১০ থেকে ১৫ কোটি টাকা খরচ করতে হতো। এখনো পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন হয়নি বলেই জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। শুধু ওসি নন, এসব থানার কনস্টেবল পদে আসতেও গুনতে হয় লাখ টাকা।

একজন পুলিশ সদস্য যখন ঘুষ দিয়ে একটি পদে আসেন তখন তিনি সৎ থাকবেন কীভাবে?নিম্ন আদালতের বিচারকদের পদায়নেও হয় ঘুষ লেনদেন। সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বিচারকদের বদলিতে ঘুষ নেওয়ার অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছিলেন। এই সময়ে নিম্ন আদালতের বিচারক বদলিতে কোটি টাকার লেনদেন হয়। সবচেয়ে বেশি ঘুষ লাগে ঢাকা এবং তার আশপাশের এলাকায় পদায়নের জন্য।

ইউনূস আমলে সচিব পর্যায়ে পদায়ন ও পদোন্নতির জন্য ঘুষ লেনদেনের ঘটনা ঘটেছে প্রকাশ‍্যে। ডিসি নিয়োগে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে জনপ্রশাসন সচিব বদলি হন। এই সময় বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর পদায়ন বাণিজ্যের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল।

রাষ্ট্রায়ত্ত্ব ব্যাংক, বীমা কোম্পানির এমডি হবার জন্য কোটি টাকার ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি কয়েকটি ব্যাংকের এমডি নিয়োগ নিয়ে কিছু মধ‍্যস্বত্বভোগি দালালের খবর পাওয়া যাচ্ছে। বন বিভাগ, গণপূর্ত অধিদপ্তর, সড়ক ও জনপদ বিভাগ, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ ইত্যাদি বিভাগে নিম্ন পদের চেয়ে উচ্চ পদ অনেক ব্যয়বহুল। ২০২৩ সালে একটি প্রধান প্রকৌশলীর পদ শতকোটি টাকার বিনিময়ে বিক্রি হয়েছিল। এসব সরকারি দপ্তরে কিছু চিহ্নিত জেলা ও পদ আছে  যেসব পদে বদলি হবার জন্য রীতিমতো নিলাম হয়।

ডাক্তারদের পদায়নেও বাণিজ্য হয়। একজন চিকিৎসককে ঢাকায় বদলি হতে লাখ টাকা গুনতে হয়। ঢাকার বাইরে কোন চিকিৎসক থাকতে চান না। কারণ সবকিছু ঢাকামুখী, ঢাকা কেন্দ্রিক। ইউনূস আমলে ৩ হাজার মেডিকেল অফিসার ও ৫০০ কর্মচারীর চেয়ার রদবদল করা হয়েছে। এত স্বল্প সময়ে অতীতে এমন বদলি হয়নি অধিদপ্তরে। বদলি হওয়া অনেক চিকিৎসক জেলা-উপজেলা পর্যায়ের কর্মস্থলে যোগ দেননি। তদবির করে ঢাকা এবং তার আশপাশে বদলি হয়েছেন। ফলে গ্রামে চিকিৎসক নেই। ফলে বদলি ও পদায়ন বাণিজ্যের কারণে, একদিকে যেমন একটি দুর্নীতিবাজ দালাল গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে, যারা গোটা সরকার পদ্ধতিকে কুলষিত এবং দুর্নীতিগ্রস্ত করছে, অন্যদিকে জনগণ সঠিক সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

আশার কথা, তারেক রহমানের সরকার দুর্নীতির এই উৎসমুখ বন্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছে। এই অবস্থা পরিবর্তনের জন্য সাব রেজিস্ট্রার বদলিতে প্রথমবারের মতো লটারি পদ্ধতি চালু করেছে। এটি একটি  অসাধারণ উদ্যোগ। এরফলে দেশের অন‍্যতম দুর্নীতিগ্রস্ত এই সেক্টরে দুর্নীতি অনেক কমে যেতে শুরু করেছে। যারা ঘুষ ছাড়া লটারির মাধ্যমে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এবং লাভজনক এলাকায় সাব রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন তারা আগের মতো বুভুক্ষের মতো দুর্নীতিতে নিমজ্জিত নন। জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ থাকছেন এবং জনগণের সেবায় মনোযোগী হয়েছেন। লটারির মাধ্যমে সাব রেজিস্ট্রার বদলি মাধ্যমে দুর্নীতি বন্ধে যে প্রশংসনীয় উদ্যোগ সরকার নিয়েছে তা অন্যান্য মন্ত্রণালয়ও অনুসরণ করতে পারে।

ইতিমধ্যে আমরা দেখেছি কয়েকটি মন্ত্রণালয় লটারির মাধ্যমে পদায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। লটারির মাধ্যমে গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলীদের বদলি ও পদায়ন করা হচ্ছে বলে মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে। বদলি বাণিজ্য বন্ধ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত এবং যোগ্য ব্যক্তিকে যোগ্য জায়গায় পদায়নের লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব‍্যাংক, বীমার প্রধান নির্বাহী পদায়নের ক্ষেত্রেও যোগ‍্যদের ফিট লিস্ট করে লটারির ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে কেবল দুর্নীতি কমবে না, ব‍্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা ফিরে আসবে।

সরকারের সেবামূলক সব প্রতিষ্ঠান এ পদ্ধতি অনুসরণ করে বদলি ও পদায়ন করতে পারে। যেমন ধরা যাক, জেলা প্রশাসক পদায়ন নিয়ে প্রায়ই বিতর্ক সৃষ্টি হয়। কিন্তু জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় যদি ফিট লিস্টে থাকা যোগ্য প্রার্থীদের মধ্যে লটারির মাধ্যমে নির্ধারণ করে যে, কোন জেলায় কে ডিসি পদে নিয়োগ পাবেন তাহলে সহজেই বিতর্ক এড়ানো সম্ভব।একইভাবে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কিংবা চিকিৎসক পদে বদলির ক্ষেত্রে এ পদ্ধতি একটি সহজ সমাধান।

একজন সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারী যদি ঘুষ না দিয়ে একটি পদে বসেন, তাহলে একদিকে যেমন তিনি দুর্নীতিগ্রস্ত হবেন না। অন্যদিকে তিনি জবাবদিহির আওতায় আসবেন। ভালো কাজ করে জনগণের আস্থা অর্জন করার চেষ্টা করবেন। এতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী আবহ সৃষ্টি হবে। তাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধে অন্যতম হাতিয়ার হতে পারে লটারির মাধ্যমে পদায়ন ও বদলি। শুধু কয়েকটি সরকারি বিভাগে নয়, সকল সরকারি প্রতিষ্ঠানে বদলি ও পদায়ন বাণিজ্য বন্ধ করতে পর্যায়ক্রমে লটারি পদ্ধতি চালু করা যেতে পারে। এটি বর্তমান সরকারের দুর্নীতি বিরোধী অভিযানকে অনেকখানি সফল করতে পারে।

অদিতি করিম: লেখক ও নাট্যকার
ইমেইল: auditekarim@gmail.com সূএ: বাংলাদেশ  প্রতিদিন

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



সর্বাধিক পঠিত



 

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ,

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন,

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

 

ইমেল: dhakacrimenewsbd@gmail.com

ফোন নাম্বার : ০১৫৩৫১৩০৩৫০,

Design & Developed BY ThemesBazar.Com