সেনাবাহিনীর পদোন্নতিতে মেধা-যোগ্যতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান

ছবি: প্রেস উইং

অনলাইন ডেস্ক : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, মেধা, যোগ্যতা, দক্ষতা ও সততার মূল্যায়নের মাধ্যমে যোগ্যতমদের বাছাই করে স্বীকৃতি দেওয়ার লক্ষ্যেই সেনাসদর সিলেকশন বোর্ড গঠন করা হয়েছে। এই বোর্ডের মাধ্যমে পদায়ন ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে এবং সেনাবাহিনীতে আগামী দিনের দূরদর্শী ও পেশাদার নেতৃত্বের সুদৃঢ় ভিত্তি গড়ে উঠবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

রোববার (২৬ জুলাই) আর্মড ফোর্সেস ডিভিশনে ‘সেনাসদর সিলেকশন বোর্ডের’ সভায় উপস্থিত জেনারেলদের উদ্দেশ্য করে দেওয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেনাবাহিনীর যেকোনো সাফল্যে তিনি গৌরববোধ করেন, আবার বাহিনী সম্পর্কে কোনো নেতিবাচক খবর তাকে অস্বস্তিতে ফেলে। ক্যান্টনমেন্ট তার গভীর আবেগ ও স্মৃতিময় স্থান উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেনা পরিবেশেই তার কিশোর ও তারুণ্যের দিনগুলো কেটেছে। সে কারণে সেনাবাহিনীর নিয়ম-শৃঙ্খলা ও বিধিবিধান সম্পর্কে তিনি ওয়াকিবহাল এবং সেনাবাহিনীকে তিনি নিজের বৃহত্তর পরিবারের অংশ বলে মনে করেন।

বক্তব্যের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী স্বাধীনতার ঘোষক, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। তিনি বলেন, স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে তৎকালীন মেজর জিয়া সেনাবাহিনীকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করেছেন। স্বাধীনতার পর সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন ও বাহিনীতে অস্থিরতা সৃষ্টির অপচেষ্টা হলেও শহীদ লেফটেন্যান্ট জেনারেল জিয়াউর রহমানের দৃঢ় ও দূরদর্শী নেতৃত্বে সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ও পেশাদারত্বের নতুন যুগের সূচনা হয়েছিল।

সরকারপ্রধান ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মূল শক্তি কেবল সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা নয়, বরং সমগ্র জাতির ঐক্য, প্রস্তুতি ও সহনশীলতায় নিহিত। এ লক্ষ্য সামনে রেখে শহীদ প্রেসিডেন্ট লেফটেন্যান্ট জেনারেল জিয়াউর রহমানের ধারণার আলোকে একটি আধুনিক প্রতিরক্ষা নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে। এতে সশস্ত্র বাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বেসামরিক প্রশাসন, শিল্প, প্রযুক্তি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সাধারণ জনগণ সমন্বিত জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ হিসেবে কাজ করবে। এর উদ্দেশ্য যুদ্ধকে উৎসাহিত করা নয় বরং সম্ভাব্য সংকট, আগ্রাসন ও দুর্যোগ মোকাবিলায় আত্মনির্ভরশীল ও প্রস্তুত সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলা।

তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে যুদ্ধের ধরন বদলে গেছে। ভৌগোলিক সীমান্তের পাশাপাশি সাইবার স্পেস, তথ্যযুদ্ধ, ড্রোন প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং আঞ্চলিক ভূ-কৌশলগত প্রতিযোগিতা নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠেছে। এ কারণে ড্রোন প্রযুক্তি, স্যাটেলাইট নজরদারি, সাইবার ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে সরকার কাজ করছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সময়ের চাহিদা অনুযায়ী আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর সেনাবাহিনী গড়ে তুলতে সরকার বদ্ধপরিকর। সামুদ্রিক নিরাপত্তা, সীমান্ত নিরাপত্তা, আন্তঃরাষ্ট্রীয় ও আন্তঃসীমান্ত হুমকি, সাইবার ও তথ্যভিত্তিক নিরাপত্তা, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং মানবিক সহায়তাসহ বহুমাত্রিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশের ভৌগোলিক অবস্থান, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, জাতীয় নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা এবং জনগণের প্রত্যাশা বিবেচনায় বাস্তবসম্মত ও টেকসই প্রতিরক্ষা আধুনিকায়ন মডেল অনুসরণের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন তিনি।

তিনি জানান, সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়ন ও উন্নয়নের জন্য একটি রূপরেখা প্রণয়ন করা হচ্ছে। সেখানে সংখ্যার পরিবর্তে সক্ষমতা, সম্প্রসারণের পাশাপাশি কার্যকারিতা, প্ল্যাটফর্ম বৃদ্ধির পরিবর্তে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং একক বাহিনীকেন্দ্রিক উন্নয়নের পরিবর্তে যৌথ সক্ষমতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। একই সঙ্গে সুশৃঙ্খল, আধুনিক ও শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী গঠন, সমন্বিত প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা, যুগোপযোগী প্রতিরক্ষা নীতি, দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশ এবং গণতান্ত্রিক সামরিক-বেসামরিক সম্পর্ক জোরদারের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর ভূমিকার প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতার পর থেকেই বাহিনীর সদস্যরা সেখানে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় কাজ করছেন। তিনি বলেন, প্রায় ১ হাজার ৩৬ কিলোমিটার দীর্ঘ বর্ডার রোড প্রকল্প সীমান্ত নিরাপত্তার পাশাপাশি দুর্গম এলাকার মানুষের জীবনযাত্রা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। পার্বত্য এলাকায় সেনাবাহিনী ১ হাজার ২০০ বর্গমিটার এলাকা মাইন ও বিস্ফোরকমুক্ত করার কাজও চালিয়ে যাচ্ছে। এ সময় পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তিরক্ষা ও সন্ত্রাস দমনে দায়িত্ব পালনকালে শাহাদাতবরণকারী ২১৭ জন সেনাসদস্যের পরিবারের প্রতি সমবেদনা ও কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবদানের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দক্ষতা, পেশাদারত্ব ও নিষ্ঠার কারণে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে সর্বোচ্চ শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষ মর্যাদা অর্জন করেছে। সম্প্রতি সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক, দক্ষিণ সুদান ও মালিতে দায়িত্ব পালনকারী সেনাসদস্যদের প্রশংসা করেন তিনি। একই সঙ্গে ২০২৫ সালের ১৩ ডিসেম্বর দক্ষিণ সুদানে ড্রোন হামলায় নিহত ছয়জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীর আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং তাদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান, ৫ আগস্ট-পরবর্তী সংকটময় সময়, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পুরো সময়জুড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, স্থবির অর্থনীতি সচল রাখা, গত ১২ ফেব্রুয়ারির অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্পন্ন করা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের সময় তেল সংরক্ষণাগারগুলোতে দায়িত্ব পালনে সেনাবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

তিনি বলেন, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, পার্বত্য চট্টগ্রামে সন্ত্রাস দমন, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, দুর্যোগ-পরবর্তী উদ্ধার অভিযান, জুলাই গণজাগরণ এবং বন্যা পরিস্থিতিসহ যেকোনো জাতীয় সংকটে সেনাবাহিনী অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।

ফ্যাসিস্ট শাসনের সময় দেশের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো সেনাবাহিনীকেও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গণতান্ত্রিক পরিবেশে বাহিনীকে আবারও যোগ্যতা, দক্ষতা ও পেশাদারত্ব দিয়ে জনগণের আস্থা অর্জন করতে হবে।

পদোন্নতি ও পদায়নের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাজনৈতিক মতাদর্শ কিংবা ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ঊর্ধ্বে উঠে সততা, ন্যায়পরায়ণতা, পেশাগত যোগ্যতা, চারিত্রিক দৃঢ়তা, দূরদর্শিতা ও নেতৃত্বের গুণাবলিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। মেধা ও যোগ্যতাই একজন সেনা কর্মকর্তার পদোন্নতির প্রধান মাপকাঠি হওয়া উচিত বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, পদোন্নতির ক্ষেত্রে একজন কর্মকর্তার শারীরিক সক্ষমতা ও শারীরিক উপস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হওয়া উচিত। এ প্রসঙ্গে প্রয়াত মার্কিন জেনারেল নরম্যান সোয়ার্জকফের উক্তি, ‘The more you sweat in peace, the less you bleed in war’ উদ্ধৃত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেনাবাহিনীতে নিয়মানুবর্তিতা ও ফিটনেসের ক্ষেত্রে কোনো আপসের সুযোগ নেই।

প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, সিলেকশন বোর্ডের মাধ্যমে নির্বাচিত কর্মকর্তারা ভবিষ্যতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাফল্য, গৌরব ও পেশাদারত্বের ধারাবাহিকতা আরও সুদৃঢ় করবেন। তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের দর্শন হচ্ছে, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ এবং জনগণের স্বার্থ রক্ষায় ‘সবার জন্য বাংলাদেশ’।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



» কোনো একসময় বাংলাদেশ বিশ্বকাপ ফুটবল খেলবে : ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী

» মোবাইল ব্যাংকিংয়ে অতিরিক্ত চার্জ নেওয়া কেন অবৈধ নয়

» রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল : স্পিকারের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় চাইবে ইসি

» টঙ্গীতে তিতাস গ্যাস অফিস ঘেরাও কর্মসূচি

» জিয়াউর রহমান সমাধিতে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির শ্রদ্ধা

» সাগরে লঘুচাপ, ঝড়ের শঙ্কায় বন্দরে ৩ নম্বর সতর্কসংকেত

» সেনাবাহিনীর পদোন্নতিতে মেধা-যোগ্যতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান

» ‘সাবেক রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনকে গ্রেফতারের দাবি আমলে নেওয়ার মতো নয়’

» গত ২৪ ঘণ্টায় বিভিন্ন অপরাধে জড়িত অভিযোগে ৪৬৩ জন গ্রেপ্তার

» সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগে সংশয়মুক্ত বিএনপি

 

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ,

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন,

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

 

ইমেল: [email protected]

ফোন নাম্বার : ০১৫৩৫১৩০৩৫০,

Desing & Developed BY PopularITLtd.Com
পরীক্ষামূলক প্রচার...

সেনাবাহিনীর পদোন্নতিতে মেধা-যোগ্যতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান

ছবি: প্রেস উইং

অনলাইন ডেস্ক : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, মেধা, যোগ্যতা, দক্ষতা ও সততার মূল্যায়নের মাধ্যমে যোগ্যতমদের বাছাই করে স্বীকৃতি দেওয়ার লক্ষ্যেই সেনাসদর সিলেকশন বোর্ড গঠন করা হয়েছে। এই বোর্ডের মাধ্যমে পদায়ন ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে এবং সেনাবাহিনীতে আগামী দিনের দূরদর্শী ও পেশাদার নেতৃত্বের সুদৃঢ় ভিত্তি গড়ে উঠবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

রোববার (২৬ জুলাই) আর্মড ফোর্সেস ডিভিশনে ‘সেনাসদর সিলেকশন বোর্ডের’ সভায় উপস্থিত জেনারেলদের উদ্দেশ্য করে দেওয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেনাবাহিনীর যেকোনো সাফল্যে তিনি গৌরববোধ করেন, আবার বাহিনী সম্পর্কে কোনো নেতিবাচক খবর তাকে অস্বস্তিতে ফেলে। ক্যান্টনমেন্ট তার গভীর আবেগ ও স্মৃতিময় স্থান উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেনা পরিবেশেই তার কিশোর ও তারুণ্যের দিনগুলো কেটেছে। সে কারণে সেনাবাহিনীর নিয়ম-শৃঙ্খলা ও বিধিবিধান সম্পর্কে তিনি ওয়াকিবহাল এবং সেনাবাহিনীকে তিনি নিজের বৃহত্তর পরিবারের অংশ বলে মনে করেন।

বক্তব্যের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী স্বাধীনতার ঘোষক, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। তিনি বলেন, স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে তৎকালীন মেজর জিয়া সেনাবাহিনীকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করেছেন। স্বাধীনতার পর সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন ও বাহিনীতে অস্থিরতা সৃষ্টির অপচেষ্টা হলেও শহীদ লেফটেন্যান্ট জেনারেল জিয়াউর রহমানের দৃঢ় ও দূরদর্শী নেতৃত্বে সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ও পেশাদারত্বের নতুন যুগের সূচনা হয়েছিল।

সরকারপ্রধান ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মূল শক্তি কেবল সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা নয়, বরং সমগ্র জাতির ঐক্য, প্রস্তুতি ও সহনশীলতায় নিহিত। এ লক্ষ্য সামনে রেখে শহীদ প্রেসিডেন্ট লেফটেন্যান্ট জেনারেল জিয়াউর রহমানের ধারণার আলোকে একটি আধুনিক প্রতিরক্ষা নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে। এতে সশস্ত্র বাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বেসামরিক প্রশাসন, শিল্প, প্রযুক্তি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সাধারণ জনগণ সমন্বিত জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ হিসেবে কাজ করবে। এর উদ্দেশ্য যুদ্ধকে উৎসাহিত করা নয় বরং সম্ভাব্য সংকট, আগ্রাসন ও দুর্যোগ মোকাবিলায় আত্মনির্ভরশীল ও প্রস্তুত সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলা।

তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে যুদ্ধের ধরন বদলে গেছে। ভৌগোলিক সীমান্তের পাশাপাশি সাইবার স্পেস, তথ্যযুদ্ধ, ড্রোন প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং আঞ্চলিক ভূ-কৌশলগত প্রতিযোগিতা নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠেছে। এ কারণে ড্রোন প্রযুক্তি, স্যাটেলাইট নজরদারি, সাইবার ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে সরকার কাজ করছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সময়ের চাহিদা অনুযায়ী আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর সেনাবাহিনী গড়ে তুলতে সরকার বদ্ধপরিকর। সামুদ্রিক নিরাপত্তা, সীমান্ত নিরাপত্তা, আন্তঃরাষ্ট্রীয় ও আন্তঃসীমান্ত হুমকি, সাইবার ও তথ্যভিত্তিক নিরাপত্তা, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং মানবিক সহায়তাসহ বহুমাত্রিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশের ভৌগোলিক অবস্থান, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, জাতীয় নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা এবং জনগণের প্রত্যাশা বিবেচনায় বাস্তবসম্মত ও টেকসই প্রতিরক্ষা আধুনিকায়ন মডেল অনুসরণের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন তিনি।

তিনি জানান, সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়ন ও উন্নয়নের জন্য একটি রূপরেখা প্রণয়ন করা হচ্ছে। সেখানে সংখ্যার পরিবর্তে সক্ষমতা, সম্প্রসারণের পাশাপাশি কার্যকারিতা, প্ল্যাটফর্ম বৃদ্ধির পরিবর্তে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং একক বাহিনীকেন্দ্রিক উন্নয়নের পরিবর্তে যৌথ সক্ষমতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। একই সঙ্গে সুশৃঙ্খল, আধুনিক ও শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী গঠন, সমন্বিত প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা, যুগোপযোগী প্রতিরক্ষা নীতি, দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশ এবং গণতান্ত্রিক সামরিক-বেসামরিক সম্পর্ক জোরদারের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর ভূমিকার প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতার পর থেকেই বাহিনীর সদস্যরা সেখানে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় কাজ করছেন। তিনি বলেন, প্রায় ১ হাজার ৩৬ কিলোমিটার দীর্ঘ বর্ডার রোড প্রকল্প সীমান্ত নিরাপত্তার পাশাপাশি দুর্গম এলাকার মানুষের জীবনযাত্রা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। পার্বত্য এলাকায় সেনাবাহিনী ১ হাজার ২০০ বর্গমিটার এলাকা মাইন ও বিস্ফোরকমুক্ত করার কাজও চালিয়ে যাচ্ছে। এ সময় পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তিরক্ষা ও সন্ত্রাস দমনে দায়িত্ব পালনকালে শাহাদাতবরণকারী ২১৭ জন সেনাসদস্যের পরিবারের প্রতি সমবেদনা ও কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবদানের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দক্ষতা, পেশাদারত্ব ও নিষ্ঠার কারণে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে সর্বোচ্চ শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষ মর্যাদা অর্জন করেছে। সম্প্রতি সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক, দক্ষিণ সুদান ও মালিতে দায়িত্ব পালনকারী সেনাসদস্যদের প্রশংসা করেন তিনি। একই সঙ্গে ২০২৫ সালের ১৩ ডিসেম্বর দক্ষিণ সুদানে ড্রোন হামলায় নিহত ছয়জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীর আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং তাদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান, ৫ আগস্ট-পরবর্তী সংকটময় সময়, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পুরো সময়জুড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, স্থবির অর্থনীতি সচল রাখা, গত ১২ ফেব্রুয়ারির অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্পন্ন করা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের সময় তেল সংরক্ষণাগারগুলোতে দায়িত্ব পালনে সেনাবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

তিনি বলেন, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, পার্বত্য চট্টগ্রামে সন্ত্রাস দমন, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, দুর্যোগ-পরবর্তী উদ্ধার অভিযান, জুলাই গণজাগরণ এবং বন্যা পরিস্থিতিসহ যেকোনো জাতীয় সংকটে সেনাবাহিনী অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।

ফ্যাসিস্ট শাসনের সময় দেশের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো সেনাবাহিনীকেও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গণতান্ত্রিক পরিবেশে বাহিনীকে আবারও যোগ্যতা, দক্ষতা ও পেশাদারত্ব দিয়ে জনগণের আস্থা অর্জন করতে হবে।

পদোন্নতি ও পদায়নের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাজনৈতিক মতাদর্শ কিংবা ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ঊর্ধ্বে উঠে সততা, ন্যায়পরায়ণতা, পেশাগত যোগ্যতা, চারিত্রিক দৃঢ়তা, দূরদর্শিতা ও নেতৃত্বের গুণাবলিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। মেধা ও যোগ্যতাই একজন সেনা কর্মকর্তার পদোন্নতির প্রধান মাপকাঠি হওয়া উচিত বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, পদোন্নতির ক্ষেত্রে একজন কর্মকর্তার শারীরিক সক্ষমতা ও শারীরিক উপস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হওয়া উচিত। এ প্রসঙ্গে প্রয়াত মার্কিন জেনারেল নরম্যান সোয়ার্জকফের উক্তি, ‘The more you sweat in peace, the less you bleed in war’ উদ্ধৃত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেনাবাহিনীতে নিয়মানুবর্তিতা ও ফিটনেসের ক্ষেত্রে কোনো আপসের সুযোগ নেই।

প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, সিলেকশন বোর্ডের মাধ্যমে নির্বাচিত কর্মকর্তারা ভবিষ্যতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাফল্য, গৌরব ও পেশাদারত্বের ধারাবাহিকতা আরও সুদৃঢ় করবেন। তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের দর্শন হচ্ছে, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ এবং জনগণের স্বার্থ রক্ষায় ‘সবার জন্য বাংলাদেশ’।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



সর্বাধিক পঠিত



 

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ,

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন,

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

 

ইমেল: [email protected]

ফোন নাম্বার : ০১৫৩৫১৩০৩৫০,

Design & Developed BY ThemesBazar.Com