এলপিজি ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি খাবারের দাম না বাড়িয়ে যেভাবে ব্যয় সংকোচন করছেন রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীরা

ছবি সংগৃহীত

 

অনলাইন ডেস্ক : রাজধানী ঢাকায় প্রায় ২০ হাজার হোটেল-রেস্তোরাঁর অধিকাংশই রান্নার কাজে এলপিজির ওপর নির্ভরশীল। তবে গত তিন মাসে এলপিজির দাম প্রায় ৪৩ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ায় রেস্তোরাঁ খাতের উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর সঙ্গে সম্প্রতি গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম প্রায় ১৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোতে খাতটির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।

ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ফলে খাবার প্রস্তুতের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে বাজারে প্রতিযোগিতা এবং ক্রেতাদের সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার কথা বিবেচনায় নিয়ে তারা সরাসরি খাবারের দাম বাড়ানোর পথে হাঁটতে চাইছেন না। এ কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ মোকাবিলায় বিকল্প কৌশল গ্রহণ করছে।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার হোটেল ও রেস্তোরাঁর বর্তমান চিত্র বলছে, অনেক প্রতিষ্ঠান খাবারের মূল্য আগের মতোই রাখলেও পরিবেশনের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছে। কোথাও ভাত, কোথাও মাংস, আবার কোথাও অন্যান্য খাবারের পরিমাণ আগের তুলনায় হ্রাস করা হয়েছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, মূল্য বৃদ্ধি না করে ব্যয় সমন্বয়ের জন্য আপাতত এটিই তাদের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

এদিকে উৎপাদন খরচ কমাতে কিছু রেস্তোরাঁ এলপিজির পরিবর্তে বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার শুরু করেছে। আবার কোথাও কোথাও কয়লা ও লাকড়ির মতো তুলনামূলক কম খরচের বিকল্প জ্বালানির ব্যবহারও দেখা গেছে। যদিও এসব বিকল্প ব্যবস্থার কার্যকারিতা ও পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন। সম্প্রতি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার একাধিক হোটেল ও রেস্তোরাঁ ঘুরে এমন চিত্র পাওয়া গেছে, যা নগরীর খাদ্যসেবা খাতের বর্তমান সংকটকেই স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) নির্ধারিত ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম গত ফেব্রুয়ারিতে ছিল ১ হাজার ৩৫৬ টাকা। বর্তমানে সেই দাম বেড়ে ১ হাজার ৯৪০ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। কয়েক মাসের ব্যবধানে উল্লেখযোগ্য এ মূল্যবৃদ্ধি রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীদের ব্যয় কাঠামোয় বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে।

ব্যবসায়ীরা জানান, অতীতে পুরান ঢাকা, কারওয়ান বাজারসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার অনেক রেস্তোরাঁয় গ্রাহকদের জন্য বিনামূল্যে আনলিমিটেড ভাত, ডাল, বাড়তি ঝোল কিংবা অতিরিক্ত আলু সরবরাহের প্রচলন ছিল। তবে বাড়তি ব্যয়ের কারণে এখন সে সংস্কৃতি প্রায় বিলুপ্তির পথে। অনেক প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত এসব খাবারের জন্য আলাদা মূল্য নির্ধারণ করতে বাধ্য হচ্ছে।

খরচ বৃদ্ধির এ চাপ শুধু বাণিজ্যিক রেস্তোরাঁতেই সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব পড়েছে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্যান্টিনেও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ (এফবিএস) ও ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের (আইবিএ) মতো ক্যান্টিনগুলোয়ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণে নানা সুযোগ-সুবিধা সংকুচিত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। ক্যান্টিন চালানো প্রসঙ্গে বাবুর্চি রেস্টুরেন্ট ও প্রিমিয়াম ক্যাটারিং সার্ভিসের মালিক সৈয়দ মোহাম্মদ আন্দালিব বলেন, ‘আগের সেই আপ্যায়নের কালচারটা এখন আর নেই। যে ফ্লেক্সিবিলিটি আমরা আগে প্রোভাইড করতাম, সে সুযোগ এখন আমাদের কাছে নেই। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে আমরা আসলে এখন শুধু বাঁচার জন্য বাঁচি, যেখানে লাভের অংশ পুরোটাই চলে যাচ্ছে।’

রেস্তোরাঁ মালিকরা বলছেন, জ্বালানি ও বিদ্যুতের ব্যয় বৃদ্ধির এ ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে খাবারের মূল্যবৃদ্ধি কিংবা সেবার মান আরো সীমিত করার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। তাতে ক্রেতা ও ব্যবসায়ী উভয় পক্ষই এ মূল্যস্ফীতির প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

তারা বলছেন, কাস্টমার থাকুক বা না থাকুক, রেস্টুরেন্টে আলো-এসি সচল রাখতেই হয়। সেক্ষেত্রে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের গড়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি রেস্টুরেন্ট মালিকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। ফ্রিজ, ডিপ ফ্রিজ, এয়ারকন্ডিশনিং, আলোকসজ্জা—সবই বিদ্যুৎনির্ভর হওয়ায় তাদের খরচ বেড়ে গেছে বলেও জানান।

রেস্টুরেন্ট পরিচালনার ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে ‘লবঙ্গ’ ও ‘লাইলাতি’ রেস্টুরেন্টের স্বত্বাধিকারী তৌফিকুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘পাইপলাইনের গ্যাস সংযোগ থাকলেও চাপ না থাকায় ঢাকার ৮০ শতাংশ হোটেল-রেস্তোরাঁ এলপিজির ওপর নির্ভরশীল। আগে যে গ্যাস ১ হাজার ৪০০ টাকায় পাওয়া যেত এখন তা ২ হাজার ২০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। এতে শুধু জ্বালানি খাতেই এক-তৃতীয়াংশ খরচ চলে যাচ্ছে। অনেক হোটেল-রেস্তোরাঁ তাই বৈদ্যুতিক চুলা, কয়লা, লাকড়ির মতো বিকল্প জ্বালানিতে ঝুঁকছে।’

তবে ঢাকার অনেক রেস্তোরাঁয় এমন বিকল্প জ্বালানির জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নেই উল্লেখ করে এ ব্যবসায়ী বলেন, ‘সব রেস্টুরেন্টে লাকড়ি, কয়লা বা বৈদ্যুতিক চুলায় রান্নার ব্যবস্থা নেই। আবার সনাতন এ পদ্ধতিতে ফেরার কথা কেউ কেউ ভাবলেও এর জন্য দক্ষ বাবুর্চির অভাব এবং উচ্চ মজুরির কারণে খরচ উল্টো বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। সব মিলিয়ে বাড়তি খরচের ফলে ব্যবসার মুনাফার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে। আগে যেখানে গ্রস প্রফিট ১৮-২০ শতাংশ হতো, তা কমে ১৫ শতাংশে এবং নিট প্রফিট ১০-১২ শতাংশে নেমে আসতে পারে। এমন প্রেক্ষাপটে গ্রাহকদের খাবারের পরিমাণ কিছুটা কমিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে, এমনকি অনেক হোটেল-রেস্তোরাঁ খাবারের মেন্যু ও পরিবেশনের ধরনেও পরিবর্তন এনেছে।’

এলপিজি ও বিদ্যুতের দাম বেড়ে যাওয়ায় অভিজাত ক্যাফেগুলোও খরচের চাপে পড়েছে। গুলশানের প্রিমিয়াম ক্যাফে বিস্ট্রো ‘কিভা হান’ রেস্টুরেন্টে ১০-১৫ শতাংশ খরচ বেড়ে যাওয়ার কথা জানান প্রতিষ্ঠানটির মালিক সামিত বিন সালাম। তিনি বলেন, ‘উৎপাদন খরচ বাড়লেও আমরা এখনো খাবারের দাম বাড়াইনি। দাম বাড়লে আমরা হয়তো প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ব।’

সেবা খাতের এ ব্যবসায়ী জানান, গুলশানের মতো অভিজাত এলাকায় গ্রাহকের অভাব না থাকলেও লাভের হার বাড়াতে ব্যবসায়ীরা গ্যাসের ব্যবহার কমাচ্ছেন। এর বিকল্প হিসেবে তারা রান্নায় বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের ওপর জোর দিচ্ছেন এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য শুরু করেছেন নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের কাজ।

রেস্তোরাঁ মালিকদের দাবি, কাঁচামাল, জ্বালানি ও বিদ্যুতের ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে ব্যবসা পরিচালনা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জ্বালানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। সেই সঙ্গে রেস্টুরেন্ট খাতের সংকট উত্তরণে ভ্যাট কাঠামো সহজ করা এবং বাণিজ্যিক গ্যাস সংযোগ পুনরায় চালুর দাবি জানানো হয়।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান বলেন, ‘এলপিজি এবং নিত্যপণ্যের আকাশচুম্বী দামের কারণে আগেই ব্যবসা পরিচালনা কঠিন ছিল। নতুন করে বিদ্যুতের দাম বাড়ায় এ খাতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ীদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। বর্তমানে পরিস্থিতির চাপে বহু রেস্টুরেন্ট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সরকার যদি এ খাতকে শিল্প খাত বিবেচনা করে এসবের আওতামুক্ত না রাখে তাহলে রেস্টুরেন্ট শিল্পে ধস নামবে।’ এমনকি লোকসান সামলাতে না পেরে নিজের দুটি রেস্টুরেন্ট বন্ধ করে দেয়ার কথাও জানান ইমরান হাসান।

সূত্র : বণিক বার্তা।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



» রাশিয়ার শ্রমবাজারে ১ লাখ কর্মী পাঠাতে চায় বাংলাদেশ, সম্মত রুশ কর্তৃপক্ষ

» সরকারকে ব্যর্থ প্রমাণে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে বিরোধী দল: ইশরাক

» নির্বাচনের আগে জামায়াতের গাড়ি-বাড়ি লাগত না, কিন্তু পরে সব লাগে : রাশেদ খান

» বিদ্যুতের প্রিপেইড মিটারের ফাঁদে অসহায় গ্রাহক

» গরমে শিশুর ডায়রিয়ার ঝুঁকি, যা জানা জরুরি

» মোসাদ্দেক–হৃদয়ে ভর করে লড়ছে বাংলাদেশ

» থ্রি-হুইলার আটক করায় হাইওয়ে পুলিশের গাড়িতে হামলা

» সুপ্রিমকোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা নিয়ে হাইকোর্টের রায় আপিল বিভাগে স্থগিত

» যেসব উপকার মিলবে জাম খেলে

» কাঁঠালের বিচির হালুয়ার তৈরির রেসিপি

 

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ,

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন,

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

 

ইমেল: [email protected]

ফোন নাম্বার : ০১৫৩৫১৩০৩৫০,

Desing & Developed BY PopularITLtd.Com
পরীক্ষামূলক প্রচার...

এলপিজি ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি খাবারের দাম না বাড়িয়ে যেভাবে ব্যয় সংকোচন করছেন রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীরা

ছবি সংগৃহীত

 

অনলাইন ডেস্ক : রাজধানী ঢাকায় প্রায় ২০ হাজার হোটেল-রেস্তোরাঁর অধিকাংশই রান্নার কাজে এলপিজির ওপর নির্ভরশীল। তবে গত তিন মাসে এলপিজির দাম প্রায় ৪৩ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ায় রেস্তোরাঁ খাতের উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর সঙ্গে সম্প্রতি গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম প্রায় ১৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোতে খাতটির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।

ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ফলে খাবার প্রস্তুতের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে বাজারে প্রতিযোগিতা এবং ক্রেতাদের সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার কথা বিবেচনায় নিয়ে তারা সরাসরি খাবারের দাম বাড়ানোর পথে হাঁটতে চাইছেন না। এ কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ মোকাবিলায় বিকল্প কৌশল গ্রহণ করছে।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার হোটেল ও রেস্তোরাঁর বর্তমান চিত্র বলছে, অনেক প্রতিষ্ঠান খাবারের মূল্য আগের মতোই রাখলেও পরিবেশনের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছে। কোথাও ভাত, কোথাও মাংস, আবার কোথাও অন্যান্য খাবারের পরিমাণ আগের তুলনায় হ্রাস করা হয়েছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, মূল্য বৃদ্ধি না করে ব্যয় সমন্বয়ের জন্য আপাতত এটিই তাদের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

এদিকে উৎপাদন খরচ কমাতে কিছু রেস্তোরাঁ এলপিজির পরিবর্তে বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার শুরু করেছে। আবার কোথাও কোথাও কয়লা ও লাকড়ির মতো তুলনামূলক কম খরচের বিকল্প জ্বালানির ব্যবহারও দেখা গেছে। যদিও এসব বিকল্প ব্যবস্থার কার্যকারিতা ও পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন। সম্প্রতি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার একাধিক হোটেল ও রেস্তোরাঁ ঘুরে এমন চিত্র পাওয়া গেছে, যা নগরীর খাদ্যসেবা খাতের বর্তমান সংকটকেই স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) নির্ধারিত ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম গত ফেব্রুয়ারিতে ছিল ১ হাজার ৩৫৬ টাকা। বর্তমানে সেই দাম বেড়ে ১ হাজার ৯৪০ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। কয়েক মাসের ব্যবধানে উল্লেখযোগ্য এ মূল্যবৃদ্ধি রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীদের ব্যয় কাঠামোয় বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে।

ব্যবসায়ীরা জানান, অতীতে পুরান ঢাকা, কারওয়ান বাজারসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার অনেক রেস্তোরাঁয় গ্রাহকদের জন্য বিনামূল্যে আনলিমিটেড ভাত, ডাল, বাড়তি ঝোল কিংবা অতিরিক্ত আলু সরবরাহের প্রচলন ছিল। তবে বাড়তি ব্যয়ের কারণে এখন সে সংস্কৃতি প্রায় বিলুপ্তির পথে। অনেক প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত এসব খাবারের জন্য আলাদা মূল্য নির্ধারণ করতে বাধ্য হচ্ছে।

খরচ বৃদ্ধির এ চাপ শুধু বাণিজ্যিক রেস্তোরাঁতেই সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব পড়েছে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্যান্টিনেও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ (এফবিএস) ও ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের (আইবিএ) মতো ক্যান্টিনগুলোয়ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণে নানা সুযোগ-সুবিধা সংকুচিত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। ক্যান্টিন চালানো প্রসঙ্গে বাবুর্চি রেস্টুরেন্ট ও প্রিমিয়াম ক্যাটারিং সার্ভিসের মালিক সৈয়দ মোহাম্মদ আন্দালিব বলেন, ‘আগের সেই আপ্যায়নের কালচারটা এখন আর নেই। যে ফ্লেক্সিবিলিটি আমরা আগে প্রোভাইড করতাম, সে সুযোগ এখন আমাদের কাছে নেই। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে আমরা আসলে এখন শুধু বাঁচার জন্য বাঁচি, যেখানে লাভের অংশ পুরোটাই চলে যাচ্ছে।’

রেস্তোরাঁ মালিকরা বলছেন, জ্বালানি ও বিদ্যুতের ব্যয় বৃদ্ধির এ ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে খাবারের মূল্যবৃদ্ধি কিংবা সেবার মান আরো সীমিত করার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। তাতে ক্রেতা ও ব্যবসায়ী উভয় পক্ষই এ মূল্যস্ফীতির প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

তারা বলছেন, কাস্টমার থাকুক বা না থাকুক, রেস্টুরেন্টে আলো-এসি সচল রাখতেই হয়। সেক্ষেত্রে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের গড়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি রেস্টুরেন্ট মালিকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। ফ্রিজ, ডিপ ফ্রিজ, এয়ারকন্ডিশনিং, আলোকসজ্জা—সবই বিদ্যুৎনির্ভর হওয়ায় তাদের খরচ বেড়ে গেছে বলেও জানান।

রেস্টুরেন্ট পরিচালনার ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে ‘লবঙ্গ’ ও ‘লাইলাতি’ রেস্টুরেন্টের স্বত্বাধিকারী তৌফিকুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘পাইপলাইনের গ্যাস সংযোগ থাকলেও চাপ না থাকায় ঢাকার ৮০ শতাংশ হোটেল-রেস্তোরাঁ এলপিজির ওপর নির্ভরশীল। আগে যে গ্যাস ১ হাজার ৪০০ টাকায় পাওয়া যেত এখন তা ২ হাজার ২০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। এতে শুধু জ্বালানি খাতেই এক-তৃতীয়াংশ খরচ চলে যাচ্ছে। অনেক হোটেল-রেস্তোরাঁ তাই বৈদ্যুতিক চুলা, কয়লা, লাকড়ির মতো বিকল্প জ্বালানিতে ঝুঁকছে।’

তবে ঢাকার অনেক রেস্তোরাঁয় এমন বিকল্প জ্বালানির জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নেই উল্লেখ করে এ ব্যবসায়ী বলেন, ‘সব রেস্টুরেন্টে লাকড়ি, কয়লা বা বৈদ্যুতিক চুলায় রান্নার ব্যবস্থা নেই। আবার সনাতন এ পদ্ধতিতে ফেরার কথা কেউ কেউ ভাবলেও এর জন্য দক্ষ বাবুর্চির অভাব এবং উচ্চ মজুরির কারণে খরচ উল্টো বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। সব মিলিয়ে বাড়তি খরচের ফলে ব্যবসার মুনাফার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে। আগে যেখানে গ্রস প্রফিট ১৮-২০ শতাংশ হতো, তা কমে ১৫ শতাংশে এবং নিট প্রফিট ১০-১২ শতাংশে নেমে আসতে পারে। এমন প্রেক্ষাপটে গ্রাহকদের খাবারের পরিমাণ কিছুটা কমিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে, এমনকি অনেক হোটেল-রেস্তোরাঁ খাবারের মেন্যু ও পরিবেশনের ধরনেও পরিবর্তন এনেছে।’

এলপিজি ও বিদ্যুতের দাম বেড়ে যাওয়ায় অভিজাত ক্যাফেগুলোও খরচের চাপে পড়েছে। গুলশানের প্রিমিয়াম ক্যাফে বিস্ট্রো ‘কিভা হান’ রেস্টুরেন্টে ১০-১৫ শতাংশ খরচ বেড়ে যাওয়ার কথা জানান প্রতিষ্ঠানটির মালিক সামিত বিন সালাম। তিনি বলেন, ‘উৎপাদন খরচ বাড়লেও আমরা এখনো খাবারের দাম বাড়াইনি। দাম বাড়লে আমরা হয়তো প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ব।’

সেবা খাতের এ ব্যবসায়ী জানান, গুলশানের মতো অভিজাত এলাকায় গ্রাহকের অভাব না থাকলেও লাভের হার বাড়াতে ব্যবসায়ীরা গ্যাসের ব্যবহার কমাচ্ছেন। এর বিকল্প হিসেবে তারা রান্নায় বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের ওপর জোর দিচ্ছেন এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য শুরু করেছেন নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের কাজ।

রেস্তোরাঁ মালিকদের দাবি, কাঁচামাল, জ্বালানি ও বিদ্যুতের ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে ব্যবসা পরিচালনা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জ্বালানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। সেই সঙ্গে রেস্টুরেন্ট খাতের সংকট উত্তরণে ভ্যাট কাঠামো সহজ করা এবং বাণিজ্যিক গ্যাস সংযোগ পুনরায় চালুর দাবি জানানো হয়।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান বলেন, ‘এলপিজি এবং নিত্যপণ্যের আকাশচুম্বী দামের কারণে আগেই ব্যবসা পরিচালনা কঠিন ছিল। নতুন করে বিদ্যুতের দাম বাড়ায় এ খাতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ীদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। বর্তমানে পরিস্থিতির চাপে বহু রেস্টুরেন্ট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সরকার যদি এ খাতকে শিল্প খাত বিবেচনা করে এসবের আওতামুক্ত না রাখে তাহলে রেস্টুরেন্ট শিল্পে ধস নামবে।’ এমনকি লোকসান সামলাতে না পেরে নিজের দুটি রেস্টুরেন্ট বন্ধ করে দেয়ার কথাও জানান ইমরান হাসান।

সূত্র : বণিক বার্তা।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



সর্বাধিক পঠিত



 

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ,

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন,

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

 

ইমেল: [email protected]

ফোন নাম্বার : ০১৫৩৫১৩০৩৫০,

Design & Developed BY ThemesBazar.Com