ছবি সংগৃহীত
অনলাইন ডেস্ক : দেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সড়কপথ ঢাকা-চট্টগ্রাম রুট। গত এক দশকে সড়কপথ চার লেন ও রেলপথকে ডাবল লাইনে উন্নীত করতে প্রায় সাড়ে ১৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। এই রুটে বিপুল এই বিনিয়োগের ফলে যাতায়াতের সময় কমে ৪ ঘণ্টায় নেমে এসেছিল। তবে অদূরদর্শী পরিকল্পনা, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, তীব্র যানজট ও জনবল সংকটের কারণে সেই সুফল আর পাচ্ছে না এই রুটে চলাচলকারী পরিবহন ও যাত্রীরা। এই রুটে চলাচল করতে এখন আগের মতোই দীর্ঘ ৭-৮ ঘণ্টার দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
ঢাকা-চট্টগ্রামের রেলপথের দৈর্ঘ্য ৩২১ কিলোমিটার। এক সময় সিঙ্গেল লাইনে ট্রেন চলাচল করত ৫-৬ ঘণ্টায়। তবে ট্রেনের সংখ্যা বৃদ্ধি, স্টেশন বন্ধ হয়ে যাওয়া, দুর্বল রেললাইন ও পুরনো কোচ-ইঞ্জিনের কারণে ভ্রমণ সময় বেড়ে যায়। ২০১৫ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ডাবল লাইন প্রকল্প বাস্তবায়নের পর ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়। এরপর সময় নেমে আসে ৫ ঘণ্টার নিচে। কিন্তু প্রকল্প-পরবর্তী রক্ষণাবেক্ষণ ব্যর্থতা, জনবল সংকট ও অব্যবস্থাপনায় সেই অর্জন বেশিদিন টেকেনি। বর্তমানে বিলাসবহুল বিরতিহীন ট্রেনও ৬ ঘণ্টার নিচে গন্তব্যে পৌঁছতে পারছে না। আর বিরতিযুক্ত আন্তঃনগর ট্রেনগুলোর নির্ধারিত সময় ৬ ঘণ্টা ১০ মিনিট হলেও বাস্তবে যাত্রা সময় বেড়ে ৭-৮ ঘণ্টায় দাঁড়াচ্ছে।
এ বিষয়ে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আবদুল হালিম বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কটি যখন সম্প্রসারণ করা হয়েছিল, তখন সার্ভিস লেনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। বিভিন্ন ছোট-বড় বাজার, ফিডার রোডের সংযোগস্থলের যানজট এ পথের যানবাহনের গতি হ্রাস করে দিচ্ছে। এ রুটে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু করলেও সেটি বাতিল হওয়ায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পরবর্তী অবকাঠামো নির্মাণে পিছিয়ে পড়েছে সওজ।
তিনি বলেন, দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ধারাবাহিক উন্নয়ন ধারা অব্যাহত রাখতে উদ্যোগ যে নেওয়া হয়নি, তা নয়। বর্তমানে সরকার মহাসড়কটি ১০ লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা নিয়েছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মধ্যে দ্রুত, নিরাপদ ও আরামদায়ক যাতায়াত নিশ্চিত হবে।
সওজ বিভাগের তথ্য বলছে, ২০০৬ সালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। দাউদকান্দি টোল প্লাজা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত ১৯২.৩ কিলোমিটার চার লেনে উন্নীত করতে ২০১০ সালে চীনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি হয়। এই প্রকল্পে প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকা। তবে ২০১৬ সালে উদ্বোধনের সময় ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৮১৭ কোটি টাকায়। এরপর চাপ যানবাহনের দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় সড়কটি আবারো অপ্রতুল হয়ে পড়ে। মহাসড়কটিতে ২০১৬ সালে দৈনিক যানবাহনের সংখ্যা ১৬ হাজার ৪৮৫টি প্রাক্কলন করে প্রকল্পটির ডিজাইন করা হয়। কিন্তু ২০১৯ সালের দিকে তা দৈনিক ৩২ হাজার ছাড়িয়ে যায়। বর্তমানে সেটি আরও বেড়ে ৫০ হাজার ছাড়িয়েছে। বিকল্প হিসেবে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের প্রস্তাব এলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চারলেন করার সময় সার্ভিস লেন না রাখাই ছিল বড় ভুল। পরিকল্পনার এ ঘাটতি ও পরবর্তী সম্প্রসারণে ধীরগতির কারণে এখন যাত্রীদের ৭-৮ ঘণ্টা এবং পণ্যবাহী যানের ৮-১০ ঘণ্টা সময় লাগছে।
অন্যদিকে, গত এক দশকে রেলপথ উন্নয়নে একাধিক মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। একসময় এক লেনের ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে ট্রেন চলাচলে বিলম্ব ও দুর্ঘটনা ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। ২০১৫ সালে লাকসাম-চিনকি আস্তানা ডাবল লাইন চালু হয়। টঙ্গী-ভৈরববাজার ডাবল লাইন উদ্বোধন হয় ২০১৬ সালে। সর্বশেষ ২০২৩ সালে আখাউড়া-লাকসাম ডাবল লাইন চালুর মাধ্যমে পুরো রেলপথ ডাবল লাইনে উন্নীত হয়। এছাড়া, দ্বিতীয় ভৈরব ও তিতাস রেলসেতু নির্মাণে ট্রেন চলাচল আরো সহজ হয়। এতে একসময় ভ্রমণ সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। তবে বর্তমানে রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, পুরনো কোচ-ইঞ্জিন ও ব্যবস্থাপনা দুর্বলতায় রেলপথেও ভ্রমণ সময় আবার বেড়ে আগের অবস্থায় ফিরে গেছে।
এ বিষয়ে রেলওয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রেলের সেতু এক্সট্রা ডিসট্যান্স অব পন্টেজ দূরত্বসহ ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের প্রকৃত দূরত্ব ৩২১ কিলোমিটার। নতুন নির্মিত রেলপথে ট্রেনের মাঝারি গতিবেগ ঘণ্টায় ৭৫ কিলোমিটার হিসাবে বিরতিহীন ট্রেন ৪ ঘণ্টা ৩০ মিনিটের মধ্যেই গন্তব্যে পৌঁছানোর কথা। কিন্তু রেলপথের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ সত্ত্বেও এখনো এ রুটের ট্র্যাকগুলোর দ্রুতগতির মিটার গেজ ট্রেন চলাচল করতে পারে না। রেলপথে পর্যাপ্ত পাথর না থাকায় বাড়তি গতিবেগে ট্রেন লাইনচ্যুত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। আবার পূর্বাঞ্চল রেলের অধিকাংশ লোকোমোটিভই চারটির পরিবর্তে দুটি মোটরে চলাচল করায় অনেক সময় নতুন ও উঁচু সেতুতে উঠতে বেগ পেতে হয়। ফলে সিঙ্গেল লাইনকে ডাবল করা, এক ট্র্যাকের সেতুকে ডাবল লাইনের সেতু নির্মাণের পরও যাত্রী ও পণ্যবাহী ট্রেনগুলোকে এক দশক আগের গতিতে গন্তব্যে পৌঁছতে হচ্ছে।
রেলপথে ভ্রমণ সময় বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের বাধাহীন ট্রেন চলাচলের সুযোগ তৈরি হলেও সেটি বাস্তবায়নে রয়েছে ব্যর্থতা। বিশেষ করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোচ-ইঞ্জিন আমদানি না করায় ট্র্যাক অবকাঠামো খাতে উন্নয়ন হলেও ধীরে ধীরে রানিং টাইম আগের অবস্থানে ফেরত যাচ্ছে।
তবে দ্রুত ইঞ্জিন আমদানির মাধ্যমে রেলওয়ের এ মহাসংকট দূর করতে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে নিয়মিত ভ্রমণকারী যাত্রী ও যোগাযোগ সংশ্লিষ্টরা জানান, সড়ক ও রেলপথে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম কিংবা চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় যেতে নির্ধারিত কোনো ভ্রমণ সময় আর নেই। আগে বিভিন্ন পরিবহন সংস্থাগুলো যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছার নির্ধারিত সময় বলে দিত। বর্তমানে প্রায় প্রতিটি পরিবহন সংস্থা এ রুটের যাত্রীদের যানজটসহ পথিমধ্যের বাধা-বিপত্তির অজুহাত তুলে নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর নিশ্চয়তা দিচ্ছে না।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে সার্ভিস লেন না থাকায় সড়কের উভয় পাশে উল্টোমুখী যানবাহনের চাপ, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার অভাবে যত্রতত্র পার্কিং, হাটবাজারের কারণে দীর্ঘ সময় ব্যয় করতে হচ্ছে যাত্রীদের। অব্যবস্থাপনার কারণে কাঙ্ক্ষিত সুফলের পরিবর্তে রেলপথেও ভোগান্তি বাড়ছে দিন দিন। রেলপথকে ডাবল লাইন করার পরও সিঙ্গেল লাইনের মতো ৬-৭ ঘণ্টার ভ্রমণ সময় কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’
বিপুল উন্নয়ন ব্যয়ের পরও সেবার মানে পিছিয়ে পড়ার বিষয়গুলো নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কৈফিয়ত তলব করা উচিত বলে মনে করেন তিনি। সৌজন্যে : বণিক বার্তা








