ছবি সংগৃহীত
মোস্তফা কামাল : জ্বালানিই এখন বিশ্বজুড়ে উৎপাদনের মূল চালিকাশক্তি। কেবল দেশে নয়, বিশ্বেও পাল্টে গেছে জ্বালানি ব্যবহারের প্রথাগত ধারা ও প্রবণতা। জরুরি হয়ে পড়েছে এ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি চিন্তাভাবনা, প্রাক্কলন ও পরিকল্পনা। অগ্রসর চিন্তার দেশগুলো আরও আগ থেকেই যার যার সাধ্যমতো এর ব্যবস্থা ও ব্যবস্থাপনা টেকসই করেছে। জ্বালানি শোধনাগার বা অয়েল রিফাইনারি একটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং শিল্প উন্নয়নের সক্ষমতা নির্দেশ করে। বিদেশ থেকে আমদানিকৃত অপরিশোধিত তেল শোধন করে ব্যবহারের উপযোগী ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনে রূপান্তর করে দেশের সামগ্রিক উৎপাদন সক্ষমতা ও জ্বালানি নিরাপত্তার নিশানা দেখায়। এ আক্ষেপই সেদিন প্রকাশ পেয়েছে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের ভাষায়। স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও বাংলাদেশ কাঙ্ক্ষিত জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি বলে আফসোস করেছেন তিনি।
রাজধানীর মিরপুর সেনানিবাসে ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজ পরিচালিত ক্যাপস্টোন কোর্সের সমাপনী অনুষ্ঠানে সেনাপ্রধান বলেন, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে নতুন নতুন সমস্যা দেখা দিয়েছে, তার অন্যতম হলো জ্বালানি। এটির নিরাপত্তার গুরুত্ব এখন অনেক বেশি। দেশে জ্বালানি তেল পরিশোধনে চট্টগ্রামে একটি মাত্র ইস্টার্ন রিফাইনারি আছে। যা চাহিদার মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশ মেটাতে পারে।
পাকিস্তান আমলে ১৯৬৩ সালে স্থাপিত ১৫ লাখ টন উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন ইস্টার্ন রিফাইনারিই এখন পর্যন্ত দেশের একমাত্র তেল পরিশোধনাগার। দীর্ঘ এ সময়ে দেশে জ্বালানি তেলের চাহিদা বেড়েছে, কিন্তু ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদন ক্ষমতা এক ফোঁটাও বাড়ানো হয়নি। দ্বিতীয় কোনো জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার স্থাপনও হয়নি। তা কেবলই আর্থিক সম্পদের ঘাটতির কারণে? অর্থ ঘাটতি বা কমতির মাঝেই দেশে এর চেয়েও ব্যয়বহুল প্রকল্প নেওয়া হলো কীভাবে? মৌলিক সক্ষমতা বাড়ানোর জায়গাগুলোতে নজর না দিয়ে কত শতশত অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প ঠিকই নেওয়া হয়। ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট জ্বালানিসংকট না হলে হয়তো বিষয়টি আলোচনায়ও আসতো না। ভাবতে কারোই কষ্ট হচ্ছে না, সামনে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। হরমুজ প্রণালি বন্ধের আগে যেসব তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের শেষ চালান এশিয়ার পথে রওনা হয়েছিল, সেগুলোর কিছু অংশ পৌঁছেছে। ইউরোপগামী শেষ ট্যাংকার চালানগুলোও এপ্রিলের মাঝামাঝি পৌঁছে যাবে। এরপর অনেক দেশের পেট্রোল, ডিজেল, তরল পেট্রোলিয়াম গ্যাস ও প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত কমে যাবে। তখন তেলের দাম আরো চড়তে পারে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) প্রধান ফাতিহ বিরলের ভাষ্য, এবারের সংকট ইতিহাসের সবচেয়ে বড়; জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকি এর আগে কখনোই এতটা প্রকট হয়নি। এমনকি সত্তর দশকের তেল-সংকটের চেয়েও এবারের পরিস্থিতি খারাপ। কোভিড মহামারির চেয়েও। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের চেয়েও এবারের পরিস্থিতি খারাপ।
এবারের সংঘাতের পরিসরও অনেক বড়। তেল ও গ্যাস বাণিজ্যের বৃহৎ পরিসর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দ্রুত এই ঘাটতি পূরণের মতো নয়। গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনামের মতো দেশ আরও বেশি কয়লা পোড়াচ্ছে। তা পরিবেশ নষ্ট করছে। তাই শোধনাগারের সক্ষমতা বাড়ানো এবং নতুন শোধনাগার তৈরির বিকল্প নেই। বাংলাদেশকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করে তা পরিশোধনের সক্ষমতা বাড়াতেই হবে। আমদানিকৃত অপরিশোধিত তেল থেকে নিজস্ব শোধনাগারে তেল পরিশোধনের মাধ্যমে দেশের জ্বালানি চাহিদা মেটানো গেলে যুদ্ধের মতো বৈশ্বিক সংকটের সময়ও জোগান নিশ্চিত করতে পারে। এতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে। জ্বালানি তেলনির্ভর শিল্প, কৃষি ও অন্যান্য খাতে উৎপাদন ব্যয় কমবে। বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার শক্তি যোগাবে। সড়ক, নৌ, রেল, বিমান পরিবহন ব্যয় কমাবে। জ্বালানি তেলনির্ভর বিভিন্ন খাতে ব্যয় কমাবে। নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি করবে। বাংলাদেশে বর্তমান সময়ের একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় ও বিকাশমান ক্ষেত্র হচ্ছে আন্তর্জাতিক সমুদ্র পরিবহন ব্যবস্থায় যুক্ত হওয়া। নিজস্ব তেল পরিশোধনাগার স্থাপনের মাধ্যমে জ্বালানি তেলের ব্যয় কমাতে পারলে বাংলাদেশের জন্য এ খাতের সম্ভাবনা আরও বাড়বে। নিজস্ব পরিশোধন প্লান্ট স্থাপনের মাধ্যমে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের মূল্য কমিয়ে আনতে পারলে তা বিদেশি সমুদ্রগামী জাহাজ ও বিদেশি এয়ারলাইন্সের উড়োজাহাজে সরবরাহ করার মাধ্যমেও ব্যাপকভাবে লাভবান হওয়া সম্ভব।
বিদ্যুতের অতি উচ্চমূল্য থেকে রেহাই পেতেও সাশ্রয়ী মূল্যের এ জ্বালানি তেল ব্যাপকভাবে সহায়ক হবে। জ্বালানি তেল শোধনাগার ও সংরক্ষণ সক্ষমতায় ঘাটতির এ সময়ে বিদ্যুৎ সংকটও পেয়ে বসেছে বাংলাদেশকে। তীব্র তাপদাহের সাথে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে ভোগান্তিতে ঢাকার বাইরের সাধারণ মানুষ। সরকারি তথ্য অনুযায়ী লোডশেডিংয়ের কারণ গ্যাস ও জ্বালানি সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়া। জ্বালানি সঙ্কট, রক্ষণাবেক্ষণসহ বেশ কিছুদিন বন্ধ ২০টির মতো বিদ্যুৎ কেন্দ্র। শিগগিরই এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের সম্ভাবনা দেখছেন না বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।
বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য বলছে, শনিবার দেশে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৮৯০ মেগাওয়াট। সরবরাহ করা গেছে ১৪ হাজার ৭১২ মেগাওয়াট। অর্থাৎ ঘাটতি ছিল ২ হাজার ১৭৮ মেগাওয়াট। জ্বালানি সঙ্কটে বিদ্যুতের উৎপাদন কমে যাওয়ায় এপ্রিলের শুরু থেকেই গ্রামে লোডশেডিং দেওয়া শুরু করে সরকার। এরই মধ্যে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের চারটি ইউনিট বন্ধ, কয়লা সঙ্কটে উৎপাদন কমে যাওয়া এবং আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহ অর্ধেকে নেমে আসায় সরবরাহে সঙ্কট শুরু হয়। পরিস্থিতি মোকাবেলায় রাজধানীতেও লোডশেডিংয়ের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এরপরও পরিস্থিতির উন্নতি আসেনি। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্যাস ও তেলের জটিলতা না কাটলে অবস্থার উন্নতি হবে না। ভবিষ্যৎ সঙ্কটের বিষয়টি চিন্তা করে সরকারকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর পরামর্শ তাদের। বিদ্যুৎ উৎপাদন তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে গ্যাস দিয়ে পাঁচ হাজার ২৩৫ মেগাওয়াট, তেল দিয়ে এক হাজার ৫৩ মেগাওয়াট, কয়লা দিয়ে চার হাজার ৪৩৭ মেগাওয়াট এবং নবায়নযোগ্য খাত থেকে ৩৬০ মেগাওয়াট পাওয়া যায়। এছাড়া ভারত থেকে আমদানি করা হয় প্রায় দুই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। এতেও কুলাচ্ছে না।
বাংলাদেশকে একসময় নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়োজনেই আমদানির পথ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। একটার পর একটা সমস্যা তাদের সঙ্গে লেগেই থাকবে। অবশ্যম্ভাবী পরিস্থিতির কথা চিন্তা করে আগে থেকেই এ ব্যাপারে সতর্কতার সঙ্গে প্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। যার মধ্যে একটি প্রস্তুতি হতে পারে নিজেরাই সাশ্রয়ী মূল্যে পরিশোধিত জ্বালানি তেল উৎপাদন করা। এর আগ পর্যন্ত শোধনাগারের সক্ষমতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। এ কাজে বেসরকারি উদ্যোক্তাদেরও শামিল করা যায়। এ ধরনের বিনিয়োগ লাভজনক বিবেচনা করেই যথেষ্ট যাচাই-বাছাইপূর্বক বেসরকারি খাতের একাধিক উদ্যোক্তা জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার স্থাপনে সরকারের অনুমতি চেয়ে দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষায় দিন গুনছেন। বাংলাদেশে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণভিত্তিক একটি নির্ভরযোগ্য ও টেকসই জ্বালানি শিল্প খাত গড়ে তোলার উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। দূরদৃষ্টি দিয়ে ভাবতে হবে বিষয়টি। কাছেই সেই উদাহরণ রয়েছে। এক ফোঁটা জ্বালানি তেল উৎপাদন না করেও সিঙ্গাপুর এখন পৃথিবীর বৃহত্তম জ্বালানি তেল রপ্তানিকারক দেশ। আর তাদের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন-জিডিপির ৫ শতাংশই আসে এই জ্বালানি তেল রপ্তানি থেকে। গভীর সমুদ্রবন্দর থাকার সুযোগ নিয়েই এ কাজটি তারা করতে পেরেছে। বাংলাদেশের সেই সুযোগ আরও বেশি বিদ্যমান। একটি টেকসই রপ্তানি বাণিজ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে বাংলাদেশ যখন প্রতি মুহূর্তে তৈরি পোশাক শিল্পের পাশাপাশি অন্য একটি বড় বিকল্প রপ্তানি খাত খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করছে, তখন এর একটি উৎকৃষ্ট সমাধান হতে পারে দেশে যত দ্রুত সম্ভব উল্লেখযোগ্য সংখ্যক জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার স্থাপন।
আগামী দিনগুলোতে তেলের বাজার অস্থির থাকবে, সেই বার্তা পরিষ্কার। ১৭ এপ্রিল ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হরমুজ প্রণালি ‘সম্পূর্ণ উন্মুক্ত’ ঘোষণা করার পর অপরিশোধিত ব্রেন্ট তেলের দাম ১০ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলারে নেমে আসে। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই অবস্থান বদলে ফেলে ইরান। তারা তেলবাহী এক ভারতীয় জাহাজে হামলা চালায়। পরের দিন ব্রেন্টক্রুডের দাম বাড়ে ৫ শতাংশ। এরপর তা আবার ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে। তবে মার্চের শেষ দিকে তেলের যে সর্বোচ্চ দাম ছিল, এখন দাম তার চেয়ে প্রায় ১৫ ডলার কম, যদিও যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধে উপসাগরে বিপুল পরিমাণ তেল আটকা পড়েছে। হরমুজ প্রণালি যত দিন বন্ধ থাকবে, প্রতি মাসে বিশ্ব ৭০ লাখ টন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস-এলএনজি থেকে বঞ্চিত হবে, বার্ষিক সরবরাহের যা প্রায় ২ শতাংশের সমান। তবু পশ্চিমা দেশগুলোয় চাপ এখনো সীমিত। পেট্রোলের দাম কিছুটা বেড়েছে, কিন্তু বেশির ভাগ পরিবারের পক্ষে এখনো গাড়ি চালানো সম্ভব হচ্ছে। ট্রাক চলাচল থামেনি, উড়োজাহাজ উড়ছে আগের মতোই। জ্বালানির মজুতও যুদ্ধের আগের সময়ের কাছাকাছি। যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজ অতিক্রম করা শেষ কয়েকটি তেলবাহী জাহাজ ২০ এপ্রিলের মধ্যে মালয়েশিয়া ও ক্যালিফোর্নিয়ায় পৌঁছে যায়। ফলে সরবরাহের ধাক্কা থেকে বিশ্বকে রক্ষা করার মতো কোনো বাড়তি মজুত আর অবশিষ্ট নেই। বিষয়টি এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রে গ্রীষ্মকালীন ছুটির মৌসুম শুরু হচ্ছে, এই মৌসুমে জ্বালানির চাহিদা বেড়ে যায়। এমন অস্থির সময়েই এতো বছরেও দেশে দ্বিতীয় জ্বালানি তেল শোধনাগার প্রতিষ্ঠা না হওয়ায় আফসোস করেছেন। এ আফসোস দেশের সচেতন অনেকের। সবারই উপলব্ধি ও জরুরি জিজ্ঞাসা, বিশ্ববাজারে দাম বাড়লেই দেশে জ্বালানির জ্বালা আর কতো? এ প্রশ্নের জবাব নেই বলেই স্বাধীনতার ৫৪-৫৫ বছরেও জ্বালানি তেলের দ্বিতীয় পরিশোধনাগার গড়ে না ওঠা নিয়ে আফসোস করা নিয়তির মতো।
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন
সূএ: বাংলাদেশ প্রতিদিন








