মা-বাবা আদেশ করলে স্ত্রীকে তালাক দেওয়া যায়?

সংগৃহীত ছবি

 

ধর্ম ডেস্ক : বর্তমান সমাজে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মতবিরোধ, শ্বশুরবাড়ির অশান্তি বা পারিবারিক দ্বন্দ্বের কারণে অনেক সময় তালাক পর্যন্ত গড়ায়। অনেক ক্ষেত্রে মা-বাবা ছেলেকে বলেন- ‘তোর বউ আমাদের কথা শোনে না, তাকে তালাক দে।’ প্রশ্ন হলো, একজন স্বামী কি শুধুমাত্র মা-বাবার আদেশে স্ত্রীকে তালাক দিতে পারে?

ইসলামে তালাকের অবস্থান

তালাক ইসলামি শরিয়তে বৈধ হলেও এটি আল্লাহর কাছে অত্যন্ত অপছন্দনীয় কাজ। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে হালাল বিষয়ের মধ্যে তালাকের চেয়ে অধিকতর ঘৃণিত আর কিছু নেই।’ (আবু দাউদ: ২১৭৭) অতএব, তালাক বৈধ হলেও যথাযথ কারণ ছাড়া তা দেওয়া মারাত্মক অন্যায় এবং গুনাহের কাজ।

হালকা কারণে তালাক ইসলাম সমর্থন করে না

শুধু পারিবারিক অশান্তি, শ্বশুর-শাশুড়ির সঙ্গে মতবিরোধ বা অভিমানের কারণে তালাক দেওয়া কোনোভাবেই সমীচীন নয়। বরং স্বামীর উচিত পারিবারিক শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা। বিখ্যাত ফতোয়াগ্রন্থগুলোতে বলা হয়েছে, মা-বাবা আদেশ করলেও যথাযথ কারণ ছাড়া স্ত্রীকে তালাক দেওয়া যাবে না। বর্তমান সময়ে এ ধরনের তালাক অনেক ক্ষেত্রে স্ত্রীর প্রতি জুলুম এবং উভয় পরিবারের জন্য ফিতনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই সামান্য ঝগড়া-ঝাঁটির কারণে তালাক দেওয়া ইসলামে অনুমোদিত নয়। (ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া: ১/৩৮৪; তানকিহুল ফতোয়াল হামিদিয়া: ১/৩৮)

পিতা-মাতার আনুগত্যের সীমা

ইসলামে পিতা-মাতার আনুগত্য ও সেবা মহান ইবাদত। তবে তাদের আদেশ যদি অন্যায় হয়, তাহলে তা মানা বৈধ নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যদি তারা তোমাকে আমার সাথে শিরক করতে জোর চেষ্টা করে, যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তখন তাদের আনুগত্য করবে না এবং দুনিয়ায় তাদের সাথে বসবাস করবে সদ্ভাবে।’ (সূরা লুকমান: ১৫)

হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে, ‘আনুগত্য কেবল বৈধ কাজেই হয়ে থাকে।’ (সহিহ বুখারি: ৭১৪৫)

অতএব, যদি মা-বাবার আদেশ অন্যায় হয়- যেমন, কেবল রাগ বা ঈর্ষা থেকে স্ত্রীকে তালাক দিতে বলা হয়, তাহলে তা পালন করা হারাম।

যৌক্তিক কারণে তালাক দিতে বললে

তবে যদি পিতা-মাতা যুক্তিসংগত ও শরিয়তসম্মত কারণে স্ত্রীকে তালাক দিতে বলেন- যেমন, স্ত্রী দ্বীনের পরিপন্থী কাজে লিপ্ত, চরিত্রহীন বা সংসার ভাঙনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে তাদের পরামর্শ মানা উচিত।

হজরত আবদুল্লাহ ইবনু ওমর (রা.) বলেন, ‘আমার এমন এক স্ত্রী ছিল যাকে আমি ভালোবাসতাম, কিন্তু আমার পিতা ওমর (রা.) তাকে অপছন্দ করতেন। তিনি আমাকে তালাক দিতে বললেন, আমি অস্বীকার করলাম। পরে রাসুল (স.)-এর কাছে বিষয়টি উপস্থাপন করলে তিনি বললেন, তাকে তালাক দাও। ফলে আমি তাকে তালাক দিলাম।’ (মুসনাদে আবু দাউদ তায়ালিসি: ১৯৩১; মুসনাদে আহমাদ: ৪৭১২; সুনানে আবু দাউদ: ৫১৩৮)

এই ঘটনার মাধ্যমে বোঝা যায়, হজরত ওমর (রা.)-এর আপত্তি যুক্তিনির্ভর ও ধর্মীয় বিবেচনার ভিত্তিতে ছিল, ব্যক্তিগত আবেগের কারণে নয়।

পারিবারিক দ্বন্দ্বে স্বামীর করণীয়

মা-বউয়ের মধ্যে দ্বন্দ্বে স্বামীর ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আবেগ বা পক্ষপাত নয়, বরং ন্যায়বিচার ও প্রজ্ঞা অবলম্বনের মাধ্যমে নিম্নের কাজগুলো করা উচিত।

  • ধৈর্য ধারণ করা ও উভয় পক্ষকে বোঝানো
  • স্ত্রীকে পিতামাতার সম্মান করতে শেখানো
  • পিতামাতাকে বোঝানো যেন তারা বউয়ের ভুলত্রুটি ক্ষমা করেন
  • পরিবারের সবার জন্য দোয়া করা, যাতে মমতা ও বোঝাপড়া সৃষ্টি হয়

শ্বশুর-শাশুড়ির দায়িত্ব হলো- পুত্রবধূর ভুলত্রুটি ক্ষমা করা এবং নিজের মেয়ের মতো স্নেহ-ভালোবাসা প্রদর্শন করা।

তালাক ইসলামে বৈধ হলেও তা শেষ বিকল্প। মা-বাবার আদেশ হলেও যদি তা অন্যায় হয়, তবে তালাক দেওয়া জায়েজ নয়। হালকা কারণে বিচ্ছেদ ইসলামি দৃষ্টিতে অনুচিত ও ক্ষতিকর। তাই পারিবারিক কলহ বা সামান্য ভুল বোঝাবুঝির কারণে তালাক নয়;  বরং ধৈর্য, সহমর্মিতা ও আল্লাহভীতির মাধ্যমে সমাধান করাই উত্তম পন্থা।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে ন্যায়বিচার, ধৈর্য ও প্রজ্ঞার সঙ্গে পারিবারিক জীবন পরিচালনার তাওফিক দিন। আমিন।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



» বর্তমান বাংলাদেশে আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে: প্রতিমন্ত্রী নুর

» জীবিতের চেয়ে প্রয়াত খালেদা জিয়া আরও বেশি শক্তিশালী : পার্থ

» বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গঠনই জুলাই শহীদদের রক্তের ঋণ শোধের উপায়: জোনায়েদ সাকি

» গণতন্ত্রের মা বেঁচে থাকবেন মানুষের অনুপ্রেরণা হয়ে: খালেদা জিয়ার স্মরণে সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

» অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন জেনারেলের পরামর্শ ট্রাম্পের জন্য ইরান যুদ্ধে ‌‘জয় ঘোষণা’ করে ফিরে আসাই হবে ‘বুদ্ধিমানের’ কাজ

» ঈদযাত্রার নিরাপত্তা নিয়ে পুলিশের পরামর্শ

» ১৩৩ অধ্যাদেশ পর্যালোচনায় সংসদে বিশেষ কমিটি গঠন

» ফ্যাসিবাদী আমলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে দলীয় বাহিনী করে ফেলা হয় : রাষ্ট্রপতি

» ফ্যাসিস্ট ও তাদের দোসররা যেন সংসদকে কলুষিত করতে না পারে : নাহিদ

» বাগেরহাটের রামপালে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা: বাস–মাইক্রোবাস সংঘর্ষে নিহত ১৩, একই পরিবারের ১১ জন

 

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ,

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন,

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

 

ইমেল: [email protected]

ফোন নাম্বার : ০১৫৩৫১৩০৩৫০,

Desing & Developed BY PopularITLtd.Com
পরীক্ষামূলক প্রচার...

মা-বাবা আদেশ করলে স্ত্রীকে তালাক দেওয়া যায়?

সংগৃহীত ছবি

 

ধর্ম ডেস্ক : বর্তমান সমাজে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মতবিরোধ, শ্বশুরবাড়ির অশান্তি বা পারিবারিক দ্বন্দ্বের কারণে অনেক সময় তালাক পর্যন্ত গড়ায়। অনেক ক্ষেত্রে মা-বাবা ছেলেকে বলেন- ‘তোর বউ আমাদের কথা শোনে না, তাকে তালাক দে।’ প্রশ্ন হলো, একজন স্বামী কি শুধুমাত্র মা-বাবার আদেশে স্ত্রীকে তালাক দিতে পারে?

ইসলামে তালাকের অবস্থান

তালাক ইসলামি শরিয়তে বৈধ হলেও এটি আল্লাহর কাছে অত্যন্ত অপছন্দনীয় কাজ। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে হালাল বিষয়ের মধ্যে তালাকের চেয়ে অধিকতর ঘৃণিত আর কিছু নেই।’ (আবু দাউদ: ২১৭৭) অতএব, তালাক বৈধ হলেও যথাযথ কারণ ছাড়া তা দেওয়া মারাত্মক অন্যায় এবং গুনাহের কাজ।

হালকা কারণে তালাক ইসলাম সমর্থন করে না

শুধু পারিবারিক অশান্তি, শ্বশুর-শাশুড়ির সঙ্গে মতবিরোধ বা অভিমানের কারণে তালাক দেওয়া কোনোভাবেই সমীচীন নয়। বরং স্বামীর উচিত পারিবারিক শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা। বিখ্যাত ফতোয়াগ্রন্থগুলোতে বলা হয়েছে, মা-বাবা আদেশ করলেও যথাযথ কারণ ছাড়া স্ত্রীকে তালাক দেওয়া যাবে না। বর্তমান সময়ে এ ধরনের তালাক অনেক ক্ষেত্রে স্ত্রীর প্রতি জুলুম এবং উভয় পরিবারের জন্য ফিতনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই সামান্য ঝগড়া-ঝাঁটির কারণে তালাক দেওয়া ইসলামে অনুমোদিত নয়। (ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া: ১/৩৮৪; তানকিহুল ফতোয়াল হামিদিয়া: ১/৩৮)

পিতা-মাতার আনুগত্যের সীমা

ইসলামে পিতা-মাতার আনুগত্য ও সেবা মহান ইবাদত। তবে তাদের আদেশ যদি অন্যায় হয়, তাহলে তা মানা বৈধ নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যদি তারা তোমাকে আমার সাথে শিরক করতে জোর চেষ্টা করে, যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তখন তাদের আনুগত্য করবে না এবং দুনিয়ায় তাদের সাথে বসবাস করবে সদ্ভাবে।’ (সূরা লুকমান: ১৫)

হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে, ‘আনুগত্য কেবল বৈধ কাজেই হয়ে থাকে।’ (সহিহ বুখারি: ৭১৪৫)

অতএব, যদি মা-বাবার আদেশ অন্যায় হয়- যেমন, কেবল রাগ বা ঈর্ষা থেকে স্ত্রীকে তালাক দিতে বলা হয়, তাহলে তা পালন করা হারাম।

যৌক্তিক কারণে তালাক দিতে বললে

তবে যদি পিতা-মাতা যুক্তিসংগত ও শরিয়তসম্মত কারণে স্ত্রীকে তালাক দিতে বলেন- যেমন, স্ত্রী দ্বীনের পরিপন্থী কাজে লিপ্ত, চরিত্রহীন বা সংসার ভাঙনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে তাদের পরামর্শ মানা উচিত।

হজরত আবদুল্লাহ ইবনু ওমর (রা.) বলেন, ‘আমার এমন এক স্ত্রী ছিল যাকে আমি ভালোবাসতাম, কিন্তু আমার পিতা ওমর (রা.) তাকে অপছন্দ করতেন। তিনি আমাকে তালাক দিতে বললেন, আমি অস্বীকার করলাম। পরে রাসুল (স.)-এর কাছে বিষয়টি উপস্থাপন করলে তিনি বললেন, তাকে তালাক দাও। ফলে আমি তাকে তালাক দিলাম।’ (মুসনাদে আবু দাউদ তায়ালিসি: ১৯৩১; মুসনাদে আহমাদ: ৪৭১২; সুনানে আবু দাউদ: ৫১৩৮)

এই ঘটনার মাধ্যমে বোঝা যায়, হজরত ওমর (রা.)-এর আপত্তি যুক্তিনির্ভর ও ধর্মীয় বিবেচনার ভিত্তিতে ছিল, ব্যক্তিগত আবেগের কারণে নয়।

পারিবারিক দ্বন্দ্বে স্বামীর করণীয়

মা-বউয়ের মধ্যে দ্বন্দ্বে স্বামীর ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আবেগ বা পক্ষপাত নয়, বরং ন্যায়বিচার ও প্রজ্ঞা অবলম্বনের মাধ্যমে নিম্নের কাজগুলো করা উচিত।

  • ধৈর্য ধারণ করা ও উভয় পক্ষকে বোঝানো
  • স্ত্রীকে পিতামাতার সম্মান করতে শেখানো
  • পিতামাতাকে বোঝানো যেন তারা বউয়ের ভুলত্রুটি ক্ষমা করেন
  • পরিবারের সবার জন্য দোয়া করা, যাতে মমতা ও বোঝাপড়া সৃষ্টি হয়

শ্বশুর-শাশুড়ির দায়িত্ব হলো- পুত্রবধূর ভুলত্রুটি ক্ষমা করা এবং নিজের মেয়ের মতো স্নেহ-ভালোবাসা প্রদর্শন করা।

তালাক ইসলামে বৈধ হলেও তা শেষ বিকল্প। মা-বাবার আদেশ হলেও যদি তা অন্যায় হয়, তবে তালাক দেওয়া জায়েজ নয়। হালকা কারণে বিচ্ছেদ ইসলামি দৃষ্টিতে অনুচিত ও ক্ষতিকর। তাই পারিবারিক কলহ বা সামান্য ভুল বোঝাবুঝির কারণে তালাক নয়;  বরং ধৈর্য, সহমর্মিতা ও আল্লাহভীতির মাধ্যমে সমাধান করাই উত্তম পন্থা।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে ন্যায়বিচার, ধৈর্য ও প্রজ্ঞার সঙ্গে পারিবারিক জীবন পরিচালনার তাওফিক দিন। আমিন।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



সর্বাধিক পঠিত



 

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ,

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন,

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

 

ইমেল: [email protected]

ফোন নাম্বার : ০১৫৩৫১৩০৩৫০,

Design & Developed BY ThemesBazar.Com