ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি টিকবে কতোদিন?

ছবি সংগৃহীত

 

অনলাইন ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। ওয়াশিংটন একে বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দাবি করলেও তেহরানের ভাষ্য ভিন্ন। এই অসামঞ্জস্যপূর্ণ বর্ণনার কারণে অনেকের কাছেই মনে হচ্ছে যে চুক্তিটি সম্ভবত অকার্যকর হয়ে পড়ছে। তবে আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, আলোচনার টেবিলে এই ধরনের পরস্পরবিরোধী অবস্থান থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয় বরং এটি প্রমাণ করে যে উভয় পক্ষই নিজ নিজ দেশের জনগণের কাছে পরিস্থিতিটি নিজেদের অনুকূলে তুলে ধরার চেষ্টা করছে।

মূল সংকটটি তৈরি হয়েছে চুক্তির বাইরের বিষয়গুলোকে নিয়ে। বিশেষজ্ঞ মনিকা ডাফি টফটের মতে, এটি কোনো সাধারণ দ্বিপাক্ষিক আলোচনা নয় বরং একটি জটিল ‘ফাইভ-লেভেল গেম’। ওয়াশিংটনকে যেমন একদিকে তেহরানকে সামলাতে হচ্ছে, তেমনি অন্যদিকে ইসরায়েল, কংগ্রেস, আরব মিত্র এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর স্বার্থের কথা ভাবতে হচ্ছে। একইভাবে তেহরানকেও তাদের সুপ্রিম লিডার, রেভল্যুশনারি গার্ড এবং নিষেধাজ্ঞার চাপে থাকা জনগণের কথা মাথায় রাখতে হচ্ছে। ফলে প্রতিটি পক্ষ এমন সব প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে যা চুক্তির মূল কাঠামোর সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট দেখলে বোঝা যায়, শান্তিচুক্তিগুলো টিকে থাকে তখনই যখন পক্ষগুলো তাদের নিজ নিজ জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দিতে পারে। কিন্তু বর্তমান মার্কিন-ইরান চুক্তিতে একটি বড় দুর্বলতা রয়ে গেছে। এই চুক্তিটি উভয় পক্ষকে প্রচুর আর্থিক সুবিধা এবং ছাড় দেওয়ার ক্ষেত্রে অত্যন্ত উদার হলেও, নিয়ম ভাঙলে কী ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে সে সম্পর্কে প্রায় নীরব। এটিই চুক্তির দীর্ঘস্থায়ী সাফল্যের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো বড় যুদ্ধ অবসানের পর যেসব শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, সেগুলোর কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা না গেলে তা গৃহযুদ্ধের মতো সংঘাতের চেয়েও দ্রুত ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে। বর্তমান চুক্তিতে ইরানকে তেল বিক্রির সুবিধা, অবরুদ্ধ তহবিল ছাড় এবং পুনর্গঠনের জন্য বিশাল অংকের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। বিপরীতে তেহরান হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কমানোর মতো পদক্ষেপ নিতে রাজি হয়েছে। কিন্তু এসব শর্ত লঙ্ঘিত হলে কার্যকর কোনো শাস্তির বিধান সেখানে নেই।

এই চুক্তির আরেকটি বড় ঝুঁকির জায়গা হলো এর আওতার বাইরে থাকা পক্ষগুলো। ইসরায়েল, হেজবুল্লাহ বা ইরানের মদদপুষ্ট বিভিন্ন আঞ্চলিক মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলো এই চুক্তির অংশ নয়। যেহেতু তারা চুক্তির কোনো শর্তে স্বাক্ষর করেনি, তাই তারা কোনো বাধ্যবাধকতার ভেতরও নেই। ফলে তারা যখন খুশি এই শান্তি প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করতে পারে, কারণ এমন কাজ করার জন্য তাদের কোনো বাড়তি মাশুল গুনতে হবে না। এটি মূলত একটি অসম্পূর্ণ নিরাপত্তা কাঠামো।

শান্তি বজায় রাখার জন্য প্রয়োজনীয় দীর্ঘমেয়াদী প্রাতিষ্ঠানিক বাধ্যবাধকতা এখানে অনুপস্থিত। মিশর ও ইসরায়েলের ১৯৭৯ সালের শান্তি চুক্তির দীর্ঘস্থায়িত্বের মূলে ছিল একটি সুনির্দিষ্ট তদারকি ব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক বাহিনীর উপস্থিতি। কিন্তু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এমন কোনো সুনির্দিষ্ট নজরদারি বলবৎ করার প্রক্রিয়া এখনো তৈরি হয়নি। সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় ‘ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ’ নিয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে না পৌঁছে তা ভবিষ্যতের জন্য ফেলে রাখা হয়েছে।

পরবর্তী সংঘাত যে আসবে না, তা হলফ করে বলা যায় না। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, শান্তি প্রক্রিয়ার শুরুতে নাটকীয় বাগবিতণ্ডা বা টানাপোড়েন থাকা স্বাভাবিক। তবে বড় সংকট হলো, পুরস্কারগুলো শেষ হয়ে গেলে বা প্রণোদনাগুলো শুকিয়ে গেলে তখন কী হবে। চুক্তিটি ততক্ষণ পর্যন্তই টিকবে যতক্ষণ সব পক্ষ বাড়তি সুবিধাগুলো পাচ্ছে। কিন্তু একবার এসব সুবিধা ফুরিয়ে গেলে চুক্তির পেছনে যদি কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থার ভয় না থাকে, তবে তা ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা প্রবল।

এই চুক্তি টিকিয়ে রাখার প্রধান দায়িত্ব শুধু চুক্তিতে স্বাক্ষরকারীদের নয়। এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেখানে সহিংসতায় ফিরে আসার মতো যেকোনো পদক্ষেপের জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে বড় অংকের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মূল্য দিতে হয়। চুক্তিতে স্বাক্ষর না করা তৃতীয় পক্ষগুলোকেও এই শাস্তির আওতাভুক্ত করতে না পারলে, বর্তমানের এই যুদ্ধবিরতি কেবল একটি সাময়িক বিরতি হিসেবেই গণ্য হবে। সূত্র: এশিয়া টাইমস 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



» ফ্যামিলি কার্ড গ্রামীণ অর্থনীতিকে গতিশীল করছে: সংসদে তথ্য প্রতিমন্ত্রী

» স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ‘হাল জামানার মুফতি’ বললেন জামায়াতের এমপি শাহজাহান চৌধুরী

» ক্ষমতাসীন দল তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নের চোরাই পথ আবিষ্কার করেছে: মামুনুল হক

» গণভোটের রায় বিএনপি কেন মানছে না, জানালেন গোলাম পরওয়ার

» বিএনপি কখনোই কোনো দেশের দালালি করে না: রাশেদ খান

» পারিবারিক বিরোধের জেরে একজনকে পিটিয়ে হত্যা

» পাগলা মসজিদের দানবাক্সে মিলল রেকর্ড ১৫ কোটি ৯০ লাখ টাকা

» ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি টিকবে কতোদিন?

» ঢাকা-কুয়ালালামপুর কৌশলগত অংশীদারিত্ব নতুন উচ্চতায়

» এইচএসসি পরীক্ষায় প্রতিটি কক্ষে সিকিউরিটি ক্যামেরা স্থাপনের নির্দেশ শিক্ষামন্ত্রীর

 

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ,

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন,

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

 

ইমেল: [email protected]

ফোন নাম্বার : ০১৫৩৫১৩০৩৫০,

Desing & Developed BY PopularITLtd.Com
পরীক্ষামূলক প্রচার...

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি টিকবে কতোদিন?

ছবি সংগৃহীত

 

অনলাইন ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। ওয়াশিংটন একে বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দাবি করলেও তেহরানের ভাষ্য ভিন্ন। এই অসামঞ্জস্যপূর্ণ বর্ণনার কারণে অনেকের কাছেই মনে হচ্ছে যে চুক্তিটি সম্ভবত অকার্যকর হয়ে পড়ছে। তবে আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, আলোচনার টেবিলে এই ধরনের পরস্পরবিরোধী অবস্থান থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয় বরং এটি প্রমাণ করে যে উভয় পক্ষই নিজ নিজ দেশের জনগণের কাছে পরিস্থিতিটি নিজেদের অনুকূলে তুলে ধরার চেষ্টা করছে।

মূল সংকটটি তৈরি হয়েছে চুক্তির বাইরের বিষয়গুলোকে নিয়ে। বিশেষজ্ঞ মনিকা ডাফি টফটের মতে, এটি কোনো সাধারণ দ্বিপাক্ষিক আলোচনা নয় বরং একটি জটিল ‘ফাইভ-লেভেল গেম’। ওয়াশিংটনকে যেমন একদিকে তেহরানকে সামলাতে হচ্ছে, তেমনি অন্যদিকে ইসরায়েল, কংগ্রেস, আরব মিত্র এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর স্বার্থের কথা ভাবতে হচ্ছে। একইভাবে তেহরানকেও তাদের সুপ্রিম লিডার, রেভল্যুশনারি গার্ড এবং নিষেধাজ্ঞার চাপে থাকা জনগণের কথা মাথায় রাখতে হচ্ছে। ফলে প্রতিটি পক্ষ এমন সব প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে যা চুক্তির মূল কাঠামোর সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট দেখলে বোঝা যায়, শান্তিচুক্তিগুলো টিকে থাকে তখনই যখন পক্ষগুলো তাদের নিজ নিজ জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দিতে পারে। কিন্তু বর্তমান মার্কিন-ইরান চুক্তিতে একটি বড় দুর্বলতা রয়ে গেছে। এই চুক্তিটি উভয় পক্ষকে প্রচুর আর্থিক সুবিধা এবং ছাড় দেওয়ার ক্ষেত্রে অত্যন্ত উদার হলেও, নিয়ম ভাঙলে কী ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে সে সম্পর্কে প্রায় নীরব। এটিই চুক্তির দীর্ঘস্থায়ী সাফল্যের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো বড় যুদ্ধ অবসানের পর যেসব শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, সেগুলোর কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা না গেলে তা গৃহযুদ্ধের মতো সংঘাতের চেয়েও দ্রুত ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে। বর্তমান চুক্তিতে ইরানকে তেল বিক্রির সুবিধা, অবরুদ্ধ তহবিল ছাড় এবং পুনর্গঠনের জন্য বিশাল অংকের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। বিপরীতে তেহরান হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কমানোর মতো পদক্ষেপ নিতে রাজি হয়েছে। কিন্তু এসব শর্ত লঙ্ঘিত হলে কার্যকর কোনো শাস্তির বিধান সেখানে নেই।

এই চুক্তির আরেকটি বড় ঝুঁকির জায়গা হলো এর আওতার বাইরে থাকা পক্ষগুলো। ইসরায়েল, হেজবুল্লাহ বা ইরানের মদদপুষ্ট বিভিন্ন আঞ্চলিক মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলো এই চুক্তির অংশ নয়। যেহেতু তারা চুক্তির কোনো শর্তে স্বাক্ষর করেনি, তাই তারা কোনো বাধ্যবাধকতার ভেতরও নেই। ফলে তারা যখন খুশি এই শান্তি প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করতে পারে, কারণ এমন কাজ করার জন্য তাদের কোনো বাড়তি মাশুল গুনতে হবে না। এটি মূলত একটি অসম্পূর্ণ নিরাপত্তা কাঠামো।

শান্তি বজায় রাখার জন্য প্রয়োজনীয় দীর্ঘমেয়াদী প্রাতিষ্ঠানিক বাধ্যবাধকতা এখানে অনুপস্থিত। মিশর ও ইসরায়েলের ১৯৭৯ সালের শান্তি চুক্তির দীর্ঘস্থায়িত্বের মূলে ছিল একটি সুনির্দিষ্ট তদারকি ব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক বাহিনীর উপস্থিতি। কিন্তু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এমন কোনো সুনির্দিষ্ট নজরদারি বলবৎ করার প্রক্রিয়া এখনো তৈরি হয়নি। সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় ‘ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ’ নিয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে না পৌঁছে তা ভবিষ্যতের জন্য ফেলে রাখা হয়েছে।

পরবর্তী সংঘাত যে আসবে না, তা হলফ করে বলা যায় না। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, শান্তি প্রক্রিয়ার শুরুতে নাটকীয় বাগবিতণ্ডা বা টানাপোড়েন থাকা স্বাভাবিক। তবে বড় সংকট হলো, পুরস্কারগুলো শেষ হয়ে গেলে বা প্রণোদনাগুলো শুকিয়ে গেলে তখন কী হবে। চুক্তিটি ততক্ষণ পর্যন্তই টিকবে যতক্ষণ সব পক্ষ বাড়তি সুবিধাগুলো পাচ্ছে। কিন্তু একবার এসব সুবিধা ফুরিয়ে গেলে চুক্তির পেছনে যদি কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থার ভয় না থাকে, তবে তা ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা প্রবল।

এই চুক্তি টিকিয়ে রাখার প্রধান দায়িত্ব শুধু চুক্তিতে স্বাক্ষরকারীদের নয়। এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেখানে সহিংসতায় ফিরে আসার মতো যেকোনো পদক্ষেপের জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে বড় অংকের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মূল্য দিতে হয়। চুক্তিতে স্বাক্ষর না করা তৃতীয় পক্ষগুলোকেও এই শাস্তির আওতাভুক্ত করতে না পারলে, বর্তমানের এই যুদ্ধবিরতি কেবল একটি সাময়িক বিরতি হিসেবেই গণ্য হবে। সূত্র: এশিয়া টাইমস 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



সর্বাধিক পঠিত



 

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ,

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন,

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

 

ইমেল: [email protected]

ফোন নাম্বার : ০১৫৩৫১৩০৩৫০,

Design & Developed BY ThemesBazar.Com