এই উত্তর পাওয়া যাবে আইসিসির আয়ের উৎস ও বিভিন্ন বোর্ডের মধ্যে তার ভাগ-বাটোয়ারা পর্যবেক্ষণ করলে। মনে হতে পারে, আইসিসির আয় শুধুমাত্র টিকিট বিক্রি কিংবা দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সিরিজের ওপর নির্ভরশীল। না, সেখান থেকে আয় খুব নগণ্য। মূলত, আইসিসি ক্রিকেটের বৈশ্বিক টুর্নামেন্টগুলো বাণিজ্যিক স্বত্ব বিক্রি করে। আইসিসির আয়ের খাত মূলত চারটি।
সম্প্রচার ও ডিজিটাল স্বত্ব: আইসিসি তাদের ইভেন্টগুলোর জন্য কয়েক বছরের নির্দিষ্ট চক্রে বিশ্বব্যাপী টেলিভিশন ও ডিজিটাল স্বত্ব বিক্রি করে। বর্তমান চক্রে যার মূল্য প্রায় ৩০০ কোটি ডলার। এখানে ভারত বড় ভূমিকা রাখে। ভারতীয় সম্প্রচারকারীরা অনেক উচ্চমূল্য দেয়, কারণ আইসিসি ইভেন্টগুলো জাতীয় পর্যায়ে বিশাল দর্শক সমাগম নিশ্চিত করে।
স্পনসরশিপ ও অংশীদারিত্ব: বৈশ্বিক স্পনসররা টুর্নামেন্টের স্বত্ব কেনে, কোনো দলের নয়। তারা খেলা চলাকালে সর্বোচ্চ দর্শক উপস্থিতির সময়গুলোতে নিজেদের প্রচারের জন্য অর্থ প্রদান করে। আর ভারত বনাম পাকিস্তানের ম্যাচ যে এই বিবেচনায় এগিয়ে থাকে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
আয়োজক ফি এবং স্থানীয় আয়: আয়োজক ক্রিকেট বোর্ডগুলো ফি প্রদান করে এবং টিকিটের লভ্যাংশ ভাগ করে নেয়। এটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও সম্প্রচার থেকে আসা অর্থের তুলনায় নগণ্য।
লাইসেন্সিং এবং আনুষঙ্গিক আয়: পণ্যদ্রব্য বিক্রয়, ডেটা বা তথ্য সরবরাহ এবং বাণিজ্যিক লাইসেন্সিং থেকে অতিরিক্ত আয় আসে।
সব মিলিয়ে ২০২৪-২০২৭ সালের জন্য আইসিসির বার্ষিক নিট আয় বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় ৬০ কোটি ডলার। আর আইসিসি তাদের আয়ের অংশ চারটি উপাদানের ওপর ভিত্তি করে ভাগ-বাটোয়ারা করে— বাণিজ্যিক অবদান, ক্রিকেটের ইতিহাস, গত ১৬ বছরের মাঠের পারফরম্যান্স, পূর্ণ সদস্য পদের মর্যাদা। এখানে বাণিজ্যিক অবদানকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই একটি কারণই ভারত ও বাকি দেশগুলোর মধ্যে আয়ের বিশাল ব্যবধান তৈরি করে।
আর বৈশ্বিক ক্রিকেট থেকে আসা রাজস্ব আয়ের ৭০-৮০ শতাংশ এনে দেয় ভারত। বর্তমান চক্রে ভারতের ঘরোয়া ক্রিকেটের মিডিয়া স্বত্বই ৩০০ কোটি ডলারের বেশি। মূলত এই কারণে ভারতের প্রতি আইসিসির ঝোঁক বেশি। গাণিতিকভাবে আয় যেখানে বেশি, স্বাভাবিকভাবে সেদিকেই থাকবে আইসিসি।
তাছাড়া আয়ের উৎস হিসেবে ভারতের বাজার বড় হওয়ায় ভাগও তারা বেশি পায়। আইসিসির আয়ের ৩৮.৫ শতাংশ পায় ভারতের ক্রিকেট বোর্ড, বছরে তাদের আয় ২৩ কোটি ১০ লাখ ডলার। ৬.৮৯ শতাংশ শেয়ারে দুই নম্বরে ইসিবি। বছরে ইংলিশ বোর্ড পায় ৪ কোটি ১৩ লাখ ৩০ হাজার ডলার। আইসিসির আয়ের ৬.২৫ শতাংশ পায় ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া। তাদের বার্ষিক আয় ৩ কোটি ৭৫ লাখ ৩০ হাজার ডলার। সেরা চারে আছে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড, তারা পায় ৫,৭৬৫ শতাংশ— বার্ষিক ইনকাম ৩ কোটি ৪৫ লাখ ১০ হাজার ডলার। অন্য পূর্ণ সদস্যরা প্রত্যেকে পাঁচ শতাংশের কম করে ভাগ পায়। তাদের বার্ষিক আয় ১ কোটি ৬০ লাখ থেকে ২ কোটি ৮০ লাখ ডলার। ৯৬টি সহযোগী দেশ সব মিলিয়ে পায় ১১.২ শতাংশ। বার্ষিক আয় ৬ কোটি ৭২ লাখ ডলার। ১২টি পূর্ণ সদস্যরা আইসিসির মোট আয়ের ৮৮.৮ শতাংশ ভাগ পায়। ভারতের একার আয় ছয় বোর্ডের মিলিত আয়ের চেয়ে বেশি।
শেয়ার পাওয়ায় ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া ভারতের ধারেকাছে না থাকলেও তাদের গায়ে সেভাবে ধাক্কা লাগে না। শুধুমাত্র আইসিসির ভাগের টাকার ওপর নির্ভরশীল নয় তারা। ঘরের মাঠে ঘরোয়া লিগ, টিকিট ও দ্বিপাক্ষিক সিরিজ থেকে বড় অঙ্কের অর্থ পায় তারা। আইসিসির দেওয়া টাকা তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু বড় কোনো ভূমিকা রাখে না। তবে পাকিস্তান, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও মাঝের স্তরে থাকা অন্য দেশগুলো এই ভাগের ওপর নির্ভরশীল। এই টাকা না পেলে তাদের ঘরোয়া অবকাঠামোতেই বড় ধাক্কা লাগবে। সেক্ষেত্রে পাকিস্তান ভারত ম্যাচ বয়কট না করলে বিশ্ব ক্রিকেটের ইকোসিস্টেমে যে আঘাত আসবে, তা প্রভাব ফেলতে পারে এই দেশগুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়নেও।








