ছবি সংগৃহীত
অনলাইন ডেস্ক : ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে প্রাণঘাতী নিপাহ ভাইরাসে নতুন করে আক্রান্তের ঘটনা নিশ্চিত হওয়ার পর এশিয়ার বিভিন্ন দেশের বিমানবন্দরগুলোতে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। গত এক মাসে রাজ্যটিতে দুটি নিপাহ সংক্রমণের ঘটনা শনাক্ত হওয়ায় সম্ভাব্য বিস্তার ঠেকাতে থাইল্যান্ড, নেপাল ও ভিয়েতনামসহ কয়েকটি দেশ বিমানবন্দরে যাত্রী স্ক্রিনিং জোরদার করেছে।
ভারতের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ডিসেম্বরের পর পশ্চিমবঙ্গে নিপাহ ভাইরাসে দুটি আক্রান্তের ঘটনা ধরা পড়লেও দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ায় সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে। আক্রান্ত রোগীদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ না করা হলেও প্রায় ২০০ জন ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিকে পরীক্ষা করা হয়েছে এবং নতুন কোনো সংক্রমণ পাওয়া যায়নি।
কী এই নিপাহ ভাইরাস?
নিপাহ ভাইরাস মূলত প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে ছড়ায়। বিশেষ করে শূকর ও ফলখেকো বাদুড়ের সংস্পর্শে এ ভাইরাস মানুষের দেহে প্রবেশ করতে পারে। আক্রান্ত প্রাণীর শরীরের নিঃসরণ বা সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমেও সংক্রমণ ঘটে।
মানুষের শরীরে ভাইরাসটি চার থেকে ১৪ দিন পর্যন্ত সুপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে। প্রাথমিক উপসর্গ হিসেবে দেখা যায় উচ্চ জ্বর, বমি, বমিভাব ও শ্বাসকষ্ট। পরবর্তী সময়ে নিউমোনিয়া দেখা দিতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে মস্তিষ্কে প্রদাহ সৃষ্টি হয়ে খিঁচুনি, অচেতনতা ও স্নায়বিক জটিলতা তৈরি হতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) নিপাহ ভাইরাসকে উচ্চ ঝুঁকির মহামারি-সৃষ্টিকারী ভাইরাস হিসেবে চিহ্নিত করেছে। কারণ এটি অত্যন্ত সংক্রামক এবং এখনো এর কোনো কার্যকর টিকা নেই। নিপাহ ভাইরাসে মৃত্যুহার ৪০ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত, যা কোভিড-১৯-এর তুলনায় অনেক বেশি।
আগের প্রাদুর্ভাব
নিপাহ ভাইরাস প্রথম শনাক্ত হয় ১৯৯৮ সালে মালয়েশিয়ায়, যেখানে শূকর খামারিদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে এবং শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়। যে গ্রামে ভাইরাসটি প্রথম শনাক্ত হয়েছিল, সেখান থেকেই এর নামকরণ করা হয়।
এরপর থেকে ভারত, বাংলাদেশ, ফিলিপাইনস, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়াসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে প্রায় প্রতিবছরই নিপাহ ভাইরাসের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। বাংলাদেশে নিপাহ ভাইরাস প্রায় নিয়মিতভাবেই শনাক্ত হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, কাঁচা খেজুরের রস সংগ্রহ ও পান করার সঙ্গে এ সংক্রমণের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে, কারণ ফলখেকো বাদুড় সাধারণত খেজুর গাছে বাস করে এবং তাদের নিঃসরণের মাধ্যমেই ভাইরাসটি রসে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
ভারতে প্রথম নিপাহ সংক্রমণ ধরা পড়ে ২০০১ সালে পশ্চিমবঙ্গে, যা বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকা। পরে ২০১৮ সালে কেরালায় নিপাহ ভাইরাসে অন্তত ১৭ জনের মৃত্যু হয়। ২০২৩ সালেও রাজ্যটিতে আরও দুটি মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।
সর্বশেষ পরিস্থিতি
সর্বশেষ এই সংক্রমণটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ২০০৭ সালের পর এই প্রথম ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নিপাহ ভাইরাস শনাক্ত হলো। ভারতীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, উন্নত নজরদারি, ল্যাব পরীক্ষার সক্ষমতা এবং মাঠপর্যায়ের তদন্তের মাধ্যমে দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে।
ভারত সরকার জানিয়েছে, সংক্রমণ বৃদ্ধির বিষয়ে যে গুজব ছড়ানো হচ্ছে তা ভিত্তিহীন। তবে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়া ভারত থেকে আসা যাত্রীদের জন্য অতিরিক্ত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, তাপমাত্রা পরিমাপ ও স্বাস্থ্য ঘোষণা বাধ্যতামূলক করেছে। মিয়ানমার পশ্চিমবঙ্গে অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে। চীনও সীমান্ত এলাকায় রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার করেছে।
ভারতীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সব প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান








