ছবি সংগৃহীত
অনলাইন ডেস্ক : ইরানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে ব্যাপক পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলাবারুদ ব্যবহারের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডারে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে দূরপাল্লার নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্র, প্যাট্রিয়ট ও থাডের মতো ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ব্যবস্থার মজুত নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। মার্কিন সামরিক বাহিনী বলছে, প্রয়োজনীয় অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে; তবে একাধিক মার্কিন ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণে সতর্ক করা হয়েছে, বর্তমান মজুত পুনরায় যুদ্ধ-পূর্ব পর্যায়ে নিতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।
রয়টার্সের সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তিন ব্যক্তির বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে পাঁচ মাসের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র তার এটিএসিএমএস ও প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল বা পিআরএসএমের প্রায় পুরো বৈশ্বিক মজুত ব্যবহার করেছে। এসব ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিটির দাম ১০ লাখ ডলারেরও বেশি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে ঠিক কতটি অবশিষ্ট আছে, তা প্রকাশ করা হয়নি। শুধু এসব ক্ষেপণাস্ত্র নয়, যুক্তরাষ্ট্রের টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতেও বড় ধাক্কা লেগেছে। রয়টার্সের এক সূত্রের হিসাবে, যুদ্ধ শুরুর পর দেশটির বৈশ্বিক টমাহক মজুতের অর্ধেকের সামান্য কম ব্যবহার করা হয়েছে। তবে এই হিসাব স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি রয়টার্স।
প্যাট্রিয়ট-থাডেও বড় চাপ
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অস্ত্র নিয়ে। প্যাট্রিয়ট ও থাড ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলায় ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে।
ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের প্যাট্রিয়ট ও থাড ইন্টারসেপ্টরের যুদ্ধ-পূর্ব মজুতের বড় অংশ শেষ হয়ে গেছে। জুলাইয়ের শেষ দিকে সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ- সিএসআইএসের হিসাব অনুযায়ী, দুই ব্যবস্থার মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে প্রায় ১ হাজার ইন্টারসেপ্টর অবশিষ্ট ছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘাটতি সাধারণ আক্রমণাত্মক অস্ত্রের তুলনায় বেশি উদ্বেগের। কারণ প্যাট্রিয়ট বা থাডের মতো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে বিকল্প তুলনামূলক কম। কোনো দেশ বিপুলসংখ্যক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করলে সেগুলো ঠেকাতে পর্যাপ্ত ইন্টারসেপ্টর না থাকলে সামরিক ঘাঁটি, জাহাজ ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
অস্ত্র তৈরি হচ্ছে, কিন্তু ফিরতে সময় লাগবে
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শিল্প অস্ত্র উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও বলেছেন, মার্কিন প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলো ইতিহাসের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি অস্ত্র তৈরি করছে এবং কারখানাগুলোর সক্ষমতা দ্রুত বাড়ানো হচ্ছে। পেন্টাগনের মুখপাত্রও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী প্রয়োজনীয় সক্ষমতা ধরে রেখেছে এবং বিভিন্ন অঞ্চলে অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি অস্ত্রের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করছে।
কিন্তু সমস্যাটি শুধু অর্থের নয়- সময়ও বড় বিষয়। এপি জানিয়েছে, সিএসআইএসের একটি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত টমাহক, প্যাট্রিয়ট ও থাডের মজুত যুদ্ধ-পূর্ব পর্যায়ে ফিরিয়ে নিতে মার্কিন সামরিক ঠিকাদারদের অন্তত তিন বছর সময় লাগতে পারে। এসব জটিল অস্ত্রের উৎপাদন বাড়াতে নতুন কারখানা, যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল এবং সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান প্রস্তুত করতে সময় প্রয়োজন।
সিএসআইএসের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ইরান যুদ্ধের সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলার মতো পর্যাপ্ত অস্ত্র রয়েছে। কিন্তু মজুত কমে যাওয়ায় পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সম্ভাব্য বড় সংঘাতের ক্ষেত্রে একটি ‘ঝুঁকিপূর্ণ সময়সীমা’ তৈরি হয়েছে।
চীনের সঙ্গে যুদ্ধের আশঙ্কায় বাড়ছে উদ্বেগ
মার্কিন অস্ত্রভাণ্ডারের এই চাপ শুধু ইরান যুদ্ধের জন্যই সমস্যা নয়; এর প্রভাব পড়তে পারে এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতিতেও। ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের মতো মার্কিন মিত্রদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। এসব দেশ নিজেদের প্রতিরক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। কিন্তু ইরান যুদ্ধে মার্কিন মজুত কমে যাওয়ায় তাদের অস্ত্র সরবরাহেও বিলম্বের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তাইওয়ানের কর্মকর্তারা বিশেষ করে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহে উল্লেখযোগ্য বিলম্বের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। জাপানের ক্ষেত্রেও টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ বিলম্বিত হওয়ার সম্ভাবনার কথা সামনে এসেছে।
এশিয়ার জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ কারণ চীন তাইওয়ান ঘিরে সামরিক সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। সিএসআইএসের যুদ্ধ-অনুশীলনগুলোতে দেখা গেছে, চীনের সঙ্গে বড় ধরনের পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রকে অল্প সময়ের মধ্যেই বিপুলসংখ্যক দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হতে পারে। একটি সম্ভাব্য সংঘাতে মাত্র চার সপ্তাহেই প্রায় ৫ হাজার দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের প্রয়োজন হতে পারে বলে ওই যুদ্ধ-অনুশীলনগুলোর বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
টমাহকের মজুতেও বড় ধাক্কা
ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের টমাহক ব্যবহারের পরিমাণও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ওয়াশিংটন পোস্টের হিসাবে, যুদ্ধের প্রথম চার সপ্তাহেই ৮৫০টির বেশি টমাহক নিক্ষেপ করা হয়েছিল। পরে সিএসআইএসের হিসাব অনুযায়ী, ব্যবহৃত টমাহকের সংখ্যা ১ হাজার ছাড়িয়েছে। যুদ্ধের আগে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আনুমানিক ৩ হাজার ১০০ থেকে ৪ হাজার ৫০০ টমাহক ছিল বলে সিএসআইএসের তথ্য উল্লেখ করেছে ওয়াশিংটন পোস্ট। একই সময়ে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ দূরপাল্লার অস্ত্রের মজুতও কমেছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের দূরপাল্লার অস্ত্রের মজুত দ্রুত কমে যাওয়ায় ভবিষ্যতে বড় আকারের ইরানবিরোধী অভিযান চালাতে হলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ মানবচালিত বোমারু বিমান ব্যবহারের ওপর নির্ভর করতে হতে পারে।
সরকারি রিপোর্টেও উঠে এসেছে ঘাটতির কথা
অস্ত্রভাণ্ডারের ঘাটতি নিয়ে এতদিন মার্কিন প্রশাসন বেশির ভাগ প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে এলেও সম্প্রতি প্রকাশিত মার্কিন সরকারের একটি নজরদারি প্রতিবেদনে উন্নত অস্ত্রের মজুত ঘাটতির বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন সরকারের ইন্সপেক্টর জেনারেলের একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধের কারণে কৌশলগত অস্ত্রের মজুতে ঘাটতি তৈরি হয়েছে এবং নতুন করে গোলাবারুদ উৎপাদন ও সরবরাহে শিল্পভিত্তিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা প্রকাশ পেয়েছে।
প্রতিবেদনটি আরও বলছে, ইরানের হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটির শত শত ভবন ও স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। একই সময়ে ৩০টি পর্যন্ত এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন এবং সাতটি কেসি-১৩৫ জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পেন্টাগনের দাবি, ‘সংকট’ নেই
তবে পুরো পরিস্থিতিকে ‘মার্কিন অস্ত্রভাণ্ডার শেষ হয়ে যাচ্ছে’ হিসেবে দেখছে না ট্রাম্প প্রশাসন। রয়টার্সকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পারনেল বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং প্রেসিডেন্টের নির্দেশে প্রয়োজনীয় সময় ও স্থানে অভিযান পরিচালনার জন্য তাদের হাতে পর্যাপ্ত সামরিক সক্ষমতা রয়েছে।
ট্রাম্পও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে বেশি অস্ত্র রয়েছে এবং প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলো রেকর্ড মাত্রায় অস্ত্র উৎপাদন করছে। তবে বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ অন্য জায়গায়। তাদের মতে, অস্ত্র একেবারে শেষ হয়ে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়নি; বরং দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ চালিয়ে গেলে বর্তমান মজুত দ্রুত পুনর্গঠন করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
ইরান যুদ্ধ তাই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য শুধু সামরিক অভিযানের পরীক্ষা নয়, বরং বিশ্বের সবচেয়ে বড় সামরিক শক্তির অস্ত্র উৎপাদন ও মজুত ব্যবস্থার সক্ষমতারও বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর মজুত যুদ্ধ-পূর্ব অবস্থায় ফিরতে কয়েক বছর লেগে গেলে সেই সময়টুকুতে চীন, রাশিয়া কিংবা অন্য কোনো প্রতিপক্ষের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাত মোকাবিলায় ওয়াশিংটনের কৌশলগত ঝুঁকি বাড়তে পারে।
তথ্য সূত্র- রয়টার্স, এপি নিউজ, দ্যা ওয়াশিংটন পোস্ট।








