ছবি সংগৃহীত
অনলাইন ডেস্ক : ম্যানিলা থেকে পর্যটন দ্বীপ করনের উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসা ‘এমভি জুন অ্যাস্টার’ নামক একটি যাত্রীবাহী ফেরিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ৪০ ঘণ্টারও বেশি সময় পর অবশেষে সেটিতে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছেন ফিলিপাইনের উদ্ধারকর্মীরা। বিষাক্ত ধোঁয়া এবং প্রচণ্ড তাপের কারণে দীর্ঘ সময় আটকে থাকার পর শুক্রবার স্থানীয় সময় বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ফিলিপাইন কোস্ট গার্ডের একটি বিশেষ দল ফেরিটির পোড়া অবশিষ্টাংশে তল্লাশি অভিযান শুরু করে। ভেতরে এখনো নিখোঁজ বহু মানুষের সন্ধানে উদ্ধার তৎপরতা চালানো হচ্ছে।
হৃদয়বিদারক এই দুর্ঘটনায় এ পর্যন্ত অন্তত পাঁচজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। এছাড়া ঘটনার পর থেকে ৪৩ জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে, যাদের মধ্যে অনেকেই মারাত্মক আহত অবস্থায় বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। কর্তৃপক্ষের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, এখনো ৮৪ জন যাত্রী নিখোঁজ রয়েছেন। শুরুতে নিখোঁজের সংখ্যা ৮৬ বলা হলেও শুক্রবার সকালে কোস্ট গার্ড নিশ্চিত করে যে তালিকায় নাম থাকা দুজন যাত্রী শেষ মুহূর্তে ফেরিতে ওঠেননি।
বুধবার রাতে ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলা থেকে ছেড়ে আসা যাত্রীবাহী ও পণ্যবাহী এই ফেরিটি পালওয়ান প্রদেশের বিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্র করন দ্বীপের কাছাকাছি পৌঁছালে হঠাৎই আগুনের সূত্রপাত হয়। প্রাথমিক ইন্টারভিউতে বেঁচে যাওয়া যাত্রীরা জানিয়েছেন, ফেরির কার্গো হোল্ড অর্থাৎ যেখানে কনটেইনার ও মালামাল রাখা ছিল, সেখান থেকেই আগুনের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তে পুরো ফেরি ঘন ও বিষাক্ত কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায়, যার ফলে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে যাত্রীদের মধ্যে। অনেকেই জীবন বাঁচাতে কোনো ধরনের লাইফ জ্যাকেট ছাড়াই অন্ধকারের মধ্যে সমুদ্রে লাফিয়ে পড়েন।
দুর্ঘটনার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে ৩০ বছর বয়সী এক যাত্রী জানান, আগুন লাগার পর ফেরিজুড়ে চিৎকার আর হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে যায়। তিনি নিচে পড়ে গেলে অন্য যাত্রীরা তাকে মাড়িয়ে চলে যান। কোনোমতে হামাগুড়ি দিয়ে উঠে তিনি সমুদ্রে ঝাঁপ দেন এবং দেখতে পান ছোট ছোট শিশুদেরও সাগরে লাফিয়ে পড়তে। উদ্ধারকারী নৌকার দ্রুত উপস্থিতি না থাকলে সমুদ্রের হিমশীতল পানিতেই তার মৃত্যু হতো বলে তিনি জানান।
উদ্ধার অভিযানের শুরু থেকেই সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল কার্গো হোল্ডের উচ্চ তাপমাত্রা এবং অসম্পূর্ণ দহনের ফলে সৃষ্ট প্রাণঘাতী কার্বন মনোক্সাইডের ঘন ধোঁয়া। কোস্ট গার্ডের মুখপাত্র নোয়েমি কায়াবিয়াব জানান, ক্রু ও উদ্ধারকারীদের নিরাপত্তার স্বার্থে তারা চাইলেও তৎক্ষণাৎ জাহাজের ভেতরে প্রবেশ করতে পারছিলেন না। পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসার পর তারা প্রবেশ করেন এবং জাহাজের কার্গো হোল্ড থেকেই নতুন করে অগ্নিনির্বাপণ ও তল্লাশি জোরদার করার সিদ্ধান্ত নেন।
বর্তমানে সমুদ্রে বিশাল এলাকা জুড়ে তল্লাশি কার্যক্রম বিস্তৃত করা হয়েছে। কোস্ট গার্ড তাদের সবচেয়ে বড় একটি জাহাজ মোতায়েনের পাশাপাশি আশপাশের এলাকায় চলাচলকারী অন্যান্য জলযানগুলোকে রেডিও বার্তার মাধ্যমে নজর রাখার নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে নিখোঁজদের উদ্ধারে ডুবুরি দল ও চিকিৎসাকর্মী বহনকারী বিশেষ হেলিকপ্টারের মাধ্যমে আকাশপথেও পর্যবেক্ষণ চালানো হচ্ছে। স্থানীয় ডুবুরি দলগুলো কোস্ট গার্ডের সংকেতের অপেক্ষায় প্রস্তুত রয়েছে।
২০০২ সালে নির্মিত এই ফেরিটির নিয়মিত নিরাপত্তা সনদ ছিল এবং চলতি বছরের মার্চ মাসেই এটি পরিদর্শন সম্পন্ন করেছিল। তবে দুর্ঘটনার আসল কারণ উদঘাটনে ফিলিপাইনের সামুদ্রিক কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে তদন্ত শুরু করেছে। অতিরিক্ত যাত্রী বা মালামাল পরিবহন করা হয়েছিল কি না, কার্গো লোডিং সঠিক ছিল কি না এবং আপৎকালীন সময়ে ক্রুদের ভূমিকা কেমন ছিল; এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সূত্র: বিবিসি








