ছবি সংগৃহীত
অনলাইন ডেস্ক : আন্তর্জাতিক গুম দিবস উপলক্ষে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস থেকে গুমের মতো ভয়াবহ সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশকে পূর্ণাঙ্গ আইনের শাসনে ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানিয়েছেন মামুনুল হক।
রোববার (৩০ আগস্ট) বাংলাদেশ খেলাফতে মজলিসের আমির আল্লামা মামুনুল হক এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে এ কথা লেখেন।
তিনি লেখেন, ‘৩০ আগস্ট জাতীয় গুম দিবস। গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণ, তাদের পরিবারগুলোর দীর্ঘদিনের অপেক্ষা ও দুর্ভোগের প্রতি সংহতি প্রকাশ এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘন প্রতিরোধের অঙ্গীকারের জন্য দিনটি গুরুত্বপূর্ণ।’
মামুনুল হক লেখেন, ‘বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে গুম একটি গুরুতর ও বেদনাদায়ক অধ্যায়। বিশেষ করে বিগত দীর্ঘ সময়ের শাসনামলে রাজনৈতিক বিরোধী, ভিন্নমতাবলম্বী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নাগরিকদের আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেওয়া এবং পরবর্তীতে তাদের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য না পাওয়ার অভিযোগ বারবার সামনে এসেছে। অনেক নিখোঁজ ব্যক্তি দীর্ঘ সময় পর পরিবারের কাছে ফিরে এসেছেন। আবার অনেকে এখনো নিখোঁজ। তাদের পরিবারগুলো দীর্ঘদিন ধরে প্রিয়জনের সন্ধান, ঘটনার সত্য উদঘাটন এবং ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় রয়েছে।
‘একজন নাগরিককে গোপনে আটক বা নিখোঁজ করে দেওয়া শুধু তার ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার অধিকারকে ক্ষুণ্ন করে না; এর সঙ্গে তার পরিবারের মৌলিক অধিকার ও মানবিক মর্যাদাও গভীরভাবে জড়িত। কোনো পরিবারের কাছে বছরের পর বছর ধরে একজন স্বজনের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য না থাকা একটি গুরুতর মানবিক সংকট। একই সঙ্গে এ ধরনের ঘটনা সমাজে ভয় ও অনাস্থার পরিবেশ তৈরি করে এবং রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।’
খেলাফত মজলিসের আমির লেখেন, ‘ফলে গুমের সংস্কৃতির অবসান শুধু অতীতের ঘটনার বিচার নিশ্চিত করার বিষয় নয়; এটি ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থায় নাগরিকের নিরাপত্তা ও আইনের শাসন নিশ্চিত করারও বিষয়। অতীতে সংঘটিত প্রতিটি গুমের ঘটনা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা, প্রকৃত ঘটনা ও দায়ীদের শনাক্ত করা এবং আইনের আওতায় বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে যাতে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে কাউকে গুম বা গোপনে আটক করতে না পারে, সেই প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষাও নিশ্চিত করতে হবে।’
‘এই প্রেক্ষাপটে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার সংক্রান্ত আইন প্রণয়নের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে প্রস্তাবিত আইনের কয়েকটি বিষয় নিয়ে ইতোমধ্যে প্রশ্ন ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে গুমের অভিযোগের তদন্তের দায়িত্ব কোন প্রতিষ্ঠানের ওপর থাকবে এবং সেই প্রতিষ্ঠান কতটা স্বাধীনভাবে তদন্ত পরিচালনা করতে পারবে, এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।’
তিনি আরও লেখেন, ‘অতীতে যেসব আইনশৃঙ্খলা বা নিরাপত্তা সংস্থার সদস্যদের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ উঠেছে, তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত যদি একই ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অধীন কোনো সংস্থার ওপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে তদন্তের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে।’
মামুনুল হক পোস্টে লেখেন, ‘ন্যায়বিচারের স্বার্থে তদন্তকারী প্রতিষ্ঠানকে প্রশাসনিক, রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব থেকে যথাসম্ভব মুক্ত রাখা প্রয়োজন। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় সংস্থার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগের ক্ষেত্রে তদন্তব্যবস্থার স্বাধীনতা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে গুমের অভিযোগ তদন্তে একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য কাঠামো নিশ্চিত করা প্রয়োজন।’

‘আইনের সংজ্ঞা ও প্রয়োগের ক্ষেত্রেও স্পষ্টতা থাকা জরুরি। কাউকে গোপনে আটক করা, তার অবস্থান সম্পর্কে পরিবারকে অবহিত না করা কিংবা রাষ্ট্রীয় হেফাজতে রেখে তার অবস্থান গোপন করার মতো ঘটনাগুলো যেন আইনের কোনো অস্পষ্টতা বা ফাঁকফোকরের কারণে জবাবদিহির বাইরে চলে যেতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের সত্য জানার অধিকার, তথ্য পাওয়ার অধিকার, প্রতিকার, ক্ষতিপূরণ ও নিরাপত্তার বিষয়গুলোও আইনে কার্যকরভাবে সুরক্ষিত হওয়া প্রয়োজন।’
তিনি লেখেন, ‘আমরা মনে করি, গুম প্রতিরোধের আইন কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, রাজনৈতিক দল বা সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিশোধের হাতিয়ার হওয়া উচিত নয়। এটি হতে হবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার প্রতিরোধ এবং নাগরিকের মৌলিক অধিকার সুরক্ষার জন্য একটি স্থায়ী ও সর্বজনীন আইন। যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক, যে রাজনৈতিক দলই রাষ্ট্র পরিচালনা করুক, আইনটি যেন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হয়।’
তিনি আরও লেখেন, ‘ফ্যাসিবাদী শাসনামলে গড়ে ওঠা গুমের সংস্কৃতির অবসান ঘটাতে হলে শুধু অতীতের ঘটনাগুলোর বিচার করলেই হবে না; সেই সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তির সুযোগও বন্ধ করতে হবে। রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি যেন রাজনৈতিক পরিচয়, ক্ষমতা কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থানের কারণে আইনের ঊর্ধ্বে থাকতে না পারে, এ নিশ্চয়তা প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।’
‘জাতীয় গুম দিবসে আমরা গুমের শিকার সকল ব্যক্তি এবং তাদের পরিবারের প্রতি গভীর সহমর্মিতা প্রকাশ করছি। একই সঙ্গে প্রত্যাশা করছি, অতীতের গুমের ঘটনাগুলোর সত্য উদঘাটন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর আইন ও শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।’
তিনি লেখেন, ‘গুমের অন্ধকার থেকে আইনের শাসনের বাংলাদেশে ফিরে আসতে হবে। এমন একটি বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যেখানে কোনো নাগরিককে তার রাজনৈতিক মত, বিশ্বাস, পরিচয় বা কর্মকাণ্ডের কারণে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের শিকার হতে হবে না; যেখানে কোনো ব্যক্তি আইনের বাইরে নয় এবং রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠানও জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে নয়। গুমের সংস্কৃতির অবসান হোক। প্রতিষ্ঠিত হোক আইনের শাসন, নাগরিকের নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতা।’








