এফ-৩৫ কিংবা বোয়িং ৭৩৭, পাখির সামনে সবাই অসহায়

অনলাইন ডেস্ক : আধুনিক সামরিক ও সামরিক-বেসামরিক বিমান চলাচল ব্যবস্থা প্রযুক্তির দিক থেকে চরম উন্নতির চূড়ায় পৌঁছেছে। শক্তিশালী ইঞ্জিন, ধারালো সেন্সর কিংবা অতি-উন্নত প্রতিরোধক উপকরণের ব্যবহারের মাধ্যমে আকাশপথকে আজ অনেক বেশি নিরাপদ ও গতিশীল করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু এতসব অভাবনীয় বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির পরও বৈমানিক জগতের জন্য এক চিরন্তন ও অদম্য আতঙ্ক হিসেবে থেকে গেছে ডানা মেলে উড়ে চলা একদল ক্ষুদে প্রাণী; পাখি। আকাশের এই পালকযুক্ত শত্রু বা পাখির সংঘাতের (বার্ড স্ট্রাইক) কারণে প্রতিনিয়ত যেমন শত শত কোটি টাকার উড়োজাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি মাঝে মাঝেই সৃষ্টি হচ্ছে ভয়াবহ ও প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ক্যারোলাইনার মার্টেল বিচ থেকে উড্ডয়নের পরপরই আমেরিকান এয়ারলাইন্সের একটি বোয়িং ৭৩৭ উড়োজাহাজ পাখির ঝাঁকের মুখোমুখি হয়ে মারাত্মক দুর্ঘটনার শিকার হয়। শার্লটের উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়া ১৭৬০ নম্বর ফ্লাইটটিতে পরিভ্রমণ করছিলেন ১৮১ জন যাত্রী ও ক্রু। রানওয়ে ছেড়ে ওঠার কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই বিমানটির বাঁ পাশের ইঞ্জিনে একটি বা একাধিক পাখি ঢুকে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে ইঞ্জিনে কম্প্রেসর স্টল বা বিস্ফোরণের শব্দ হয় এবং সেখান থেকে আগুনের শিখা ও ধোঁয়া নির্গত হতে দেখা যায়। পরিস্থিতি বেসামাল হয়ে উঠলে ককপিট থেকে বিমানচালক এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলকে জরুরি বার্তা পাঠান—মেডে, মেডে, মেডে! আমরা ইঞ্জিনের সমস্যায় পড়েছি।

একই সময়ে আকাশে থাকা অন্য এক বিমানের পাইলটও রেডিওতে নিশ্চিত করেন যে আমেরিকান এয়ারলাইন্সের ওই বিমানের ইঞ্জিনে পাখির আঘাত লেগেছে। উড়োজাহাজটি অবতরণের জন্য আকাশে চক্কর দেওয়ার সময় বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ রানওয়েতে প্রচুর পরিমাণে পাখির ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পায়। বৈমানিক পরিভাষায় এসব অবশিষ্টাংশকে বলা হয় ‘স্নার্জ’, যা সাধারণত প্রজাতির সঠিক ধরণ শনাক্ত করতে ওয়াশিংটন ডিসির বিখ্যাত স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউশনের ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়, যাতে ভবিষ্যতে একই প্রজাতির পাখির দ্বারা ঘটিত ঝুঁকি এড়াতে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

পাখির সঙ্গে বিমানের এই সংঘর্ষ কেবল কোনো একক ঘটনা নয় বরং বৈশ্বিক বিমান চলাচলের জন্য এক মারাত্মক ও দীর্ঘস্থায়ী হুমকি। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এফএএ) উপাত্ত অনুযায়ী, কেবল ২০২৫ সালেই যুক্তরাষ্ট্রে চব্বিশ হাজারেরও বেশি বন্যপ্রাণী ও পাখিসংঘাতের ঘটনা নথিবদ্ধ হয়েছে। এসব দুর্ঘটনার অধিকাংশই ঘটে বিমান চলাচলের অত্যন্ত সংবেদনশীল মুহূর্তে—যেমন রানওয়ে থেকে উড্ডয়ন, উচ্চতা বৃদ্ধি, অবতরণ কিংবা অবতরণের পূর্ব মুহূর্তে যখন বিমান তুলনামূলকভাবে নিচু উচ্চতায় অবস্থান করে। সংঘর্ষের ক্ষেত্রে বিমানের প্রধান ইঞ্জিন, ডানা, উইন্ডশিল্ড, নাকের অংশ (রেডোম) ও ফিউসেলেজ সবচেয়ে বেশি আঘাতপ্রাপ্ত হয়। যদিও বেশিরভাগ সংঘাতের ঘটনায় বিমান সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে রক্ষা পায় এবং শুধুমাত্র পাখির মৃত্যু ঘটে, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কোনো মুহূর্তে বা সংবেদনশীল যন্ত্রাংশে এই আঘাত লাগলে তা মুহূর্তে রূপ নেয় এক ভয়াবহ বিপর্যয়ে।

টার্বোফ্যান ইঞ্জিনগুলোতে পাখি ঢুকে পড়া অত্যন্ত বিপজ্জনক। আধুনিক ইঞ্জিনগুলো নির্দিষ্ট আকারের পাখি শোষণ করতে পারলেও এবং একাধিক ইঞ্জিনবিশিষ্ট বিমান একটি ইঞ্জিনের শক্তিতেও নিরাপদ অবতরণে সক্ষম হলেও একসাথে একাধিক ইঞ্জিন বিকল হলে বা অভ্যন্তরীণ যন্ত্রাংশ ধ্বংস হলে পুরো বিমানটিই নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়তে পারে। ইতিহাস ঘাটলে এমন বহু মর্মান্তিক ও অলৌকিক ঘটনার উদাহরণ মিলে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ব্যাংকক থেকে দক্ষিণ কোরিয়াগামী জেজু এয়ারের একটি বোয়িং ৭৩৭ বিমান অবতরণের সময় বৈকাল হাঁসের একটি ঝাঁকের মুখোমুখি হয়। বিমানের দুটি ইঞ্জিনেই পাখি ঢুকে পড়ার কারণে পাইলট জরুরি অবতরণের চেষ্টা করেন কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। বিমানটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি অবকাঠামোর সঙ্গে ধাক্কা খেলে ১৮১ জন আরোহীর মধ্যে ১৭৯ জনই প্রাণ হারান। আবার ২০২২ সালের নভেম্বরে ডেল্টা এয়ারলাইন্সের একটি এয়ারবাস এ৩২০ বিমান ১৩ হাজার ফুট উচ্চতায় থাকাকালে সরাসরি ককপিটে পাখির আঘাত খায়। পাইলটের বর্ণনামতে, সেই আঘাতের বিকট শব্দ যেন কোনো বোমার মতো ছিল; ধাক্কায় ককপিটের দরজা খুলে যায় এবং বিমানের ভেতরে দ্রুত বায়ুর চাপ কমতে শুরু করে। ঠিক তেমনিভাবে ২০১৯ সালের আগস্টে রাশিয়ার উরাল এয়ারলাইন্সের একটি বিমান উড্ডয়নের পরপরই গাংচিলের ঝাঁকের মুখে পড়ে শক্তি হারিয়ে ফেললে সাহসিকতার সঙ্গে চালক পার্শ্ববর্তী একটি ভুট্টা ক্ষেতে জরুরি অবতরণ করান, ফলে সেদিন ২৩৩ জন আরোহীর অলৌকিক প্রাণরক্ষা ঘটে।

বেসামরিক এয়ারলাইন্সের পাশাপাশি সামরিক বিমান চলাচলেও এই সংঘাতের মাত্রা কোনো অংশে কম নয়। বিশেষ করে নিচু উচ্চতায় দ্রুতগতিতে উড়ে চলা একক ইঞ্জিনের যুদ্ধবিমান কিংবা প্রশিক্ষণ বিমানগুলোর জন্য পাখি এক মূর্তিমান আতঙ্ক। হালকা ও অত্যন্ত দ্রুতগতির কারণে যুদ্ধবিমানের উইন্ডশিল্ড ভেঙে পাইলট আহত হওয়া বা বিমানের দৃষ্টিসীমা নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এমনকি পাখির আঘাতে অবতরণ যন্ত্রাংশের ব্রেক বা স্টিয়ারিং সিস্টেম বিকল হয়েও রানওয়েতে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। প্রযুক্তিগতভাবে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় পঞ্চম প্রজন্মের স্টিলথ যুদ্ধবিমানগুলোও এই ছোট প্রাণীর কাছে হার মানতে বাধ্য হচ্ছে।

সামরিক যুদ্ধবিমানের ক্ষেত্রেও সম্প্রতি একের পর এক ঘটনা দেখা গেছে। মিয়ানমার বিমান বাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান ইঞ্জিনে পাখি ঢুকে আগুন ধরে যাওয়ার কারণে বিধ্বস্ত হয়। মালয়েশিয়ার এফ/এ-১৮ হর্নেট যুদ্ধবিমান উড্ডয়নের সময় ইঞ্জিনে অগ্নিকাণ্ডের ফলে রানওয়েতে আছড়ে পড়ে, তদন্তে যার পেছনে পাখির সংঘাতকেই দায়ী করা হয়। যুক্তরাজ্যের রয়্যাল এয়ার ফোর্সের একটি সর্বাধুনিক এফ-৩৫ লাইটনিং-টু যুদ্ধবিমান ২০২৫ সালের শুরুতে পাখির আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে জরুরি অবতরণে বাধ্য হয়। এর আগে দক্ষিণ কোরিয়ার বিমান বাহিনীর একটি উন্নত এফ-৩৫এ যুদ্ধবিমানের এয়ার ইনটেকের ভেতরে একটি ঈগল ঢুকে পড়লে বিমানটির হাইড্রোলিক, বিদ্যুৎ ও অস্ত্রাগারের গুরুত্বপূর্ণ বাল্কহেড মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চালক অলৌকিকভাবে নিরাপদে বেলি-ল্যান্ডিং করাতে সক্ষম হলেও বিমানটির মেরামতের খরচ এতটাই আকাশচুম্বী ছিল যে পরবর্তীতে দক্ষিণ কোরীয় কর্তৃপক্ষ ওই এফ-৩৫এ বিমানটিকে স্থায়ীভাবে অবসরে পাঠাতে বাধ্য হয়। সূত্র: ইউরোএশিয়ান টাইমস

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



» বিভিন্ন থানা ও ডিবি পুলিশের অভিযানে ২০ জন গ্রেপ্তার

» শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘দাতাল বাবু’ সহযোগীসহ গ্রেপ্তার

» পাচারের সময় ৭৬০ বস্তা সারসহ পাঁচজন আটক

» লঘুচাপে উত্তাল মেঘনা, হাতিয়ার সঙ্গে সারাদেশের নৌ যোগাযোগ বন্ধ

» সিএনজি চালককে গুলি করে টাকা-মোবাইল ছিনতাই

» চুরির অপবাদে গাছের সঙ্গে বেঁধে কিশোরকে নির্যাতন

» আগ্নেয়াস্ত্র, চাপাতি ও ১০ ককটেল উদ্ধার

» ‘প্রতিশোধ’ নিয়ে ফিরলো জোভান-তিশা জুটি

» টেস্টে দ্বিতীয়বার যে রেকর্ড গড়ল টাইগার পেসাররা

» এফ-৩৫ কিংবা বোয়িং ৭৩৭, পাখির সামনে সবাই অসহায়

 

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ,

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন,

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

 

ইমেল: [email protected]

ফোন নাম্বার : ০১৫৩৫১৩০৩৫০,

Desing & Developed BY PopularITLtd.Com
পরীক্ষামূলক প্রচার...

এফ-৩৫ কিংবা বোয়িং ৭৩৭, পাখির সামনে সবাই অসহায়

অনলাইন ডেস্ক : আধুনিক সামরিক ও সামরিক-বেসামরিক বিমান চলাচল ব্যবস্থা প্রযুক্তির দিক থেকে চরম উন্নতির চূড়ায় পৌঁছেছে। শক্তিশালী ইঞ্জিন, ধারালো সেন্সর কিংবা অতি-উন্নত প্রতিরোধক উপকরণের ব্যবহারের মাধ্যমে আকাশপথকে আজ অনেক বেশি নিরাপদ ও গতিশীল করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু এতসব অভাবনীয় বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির পরও বৈমানিক জগতের জন্য এক চিরন্তন ও অদম্য আতঙ্ক হিসেবে থেকে গেছে ডানা মেলে উড়ে চলা একদল ক্ষুদে প্রাণী; পাখি। আকাশের এই পালকযুক্ত শত্রু বা পাখির সংঘাতের (বার্ড স্ট্রাইক) কারণে প্রতিনিয়ত যেমন শত শত কোটি টাকার উড়োজাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি মাঝে মাঝেই সৃষ্টি হচ্ছে ভয়াবহ ও প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ক্যারোলাইনার মার্টেল বিচ থেকে উড্ডয়নের পরপরই আমেরিকান এয়ারলাইন্সের একটি বোয়িং ৭৩৭ উড়োজাহাজ পাখির ঝাঁকের মুখোমুখি হয়ে মারাত্মক দুর্ঘটনার শিকার হয়। শার্লটের উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়া ১৭৬০ নম্বর ফ্লাইটটিতে পরিভ্রমণ করছিলেন ১৮১ জন যাত্রী ও ক্রু। রানওয়ে ছেড়ে ওঠার কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই বিমানটির বাঁ পাশের ইঞ্জিনে একটি বা একাধিক পাখি ঢুকে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে ইঞ্জিনে কম্প্রেসর স্টল বা বিস্ফোরণের শব্দ হয় এবং সেখান থেকে আগুনের শিখা ও ধোঁয়া নির্গত হতে দেখা যায়। পরিস্থিতি বেসামাল হয়ে উঠলে ককপিট থেকে বিমানচালক এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলকে জরুরি বার্তা পাঠান—মেডে, মেডে, মেডে! আমরা ইঞ্জিনের সমস্যায় পড়েছি।

একই সময়ে আকাশে থাকা অন্য এক বিমানের পাইলটও রেডিওতে নিশ্চিত করেন যে আমেরিকান এয়ারলাইন্সের ওই বিমানের ইঞ্জিনে পাখির আঘাত লেগেছে। উড়োজাহাজটি অবতরণের জন্য আকাশে চক্কর দেওয়ার সময় বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ রানওয়েতে প্রচুর পরিমাণে পাখির ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পায়। বৈমানিক পরিভাষায় এসব অবশিষ্টাংশকে বলা হয় ‘স্নার্জ’, যা সাধারণত প্রজাতির সঠিক ধরণ শনাক্ত করতে ওয়াশিংটন ডিসির বিখ্যাত স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউশনের ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়, যাতে ভবিষ্যতে একই প্রজাতির পাখির দ্বারা ঘটিত ঝুঁকি এড়াতে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

পাখির সঙ্গে বিমানের এই সংঘর্ষ কেবল কোনো একক ঘটনা নয় বরং বৈশ্বিক বিমান চলাচলের জন্য এক মারাত্মক ও দীর্ঘস্থায়ী হুমকি। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এফএএ) উপাত্ত অনুযায়ী, কেবল ২০২৫ সালেই যুক্তরাষ্ট্রে চব্বিশ হাজারেরও বেশি বন্যপ্রাণী ও পাখিসংঘাতের ঘটনা নথিবদ্ধ হয়েছে। এসব দুর্ঘটনার অধিকাংশই ঘটে বিমান চলাচলের অত্যন্ত সংবেদনশীল মুহূর্তে—যেমন রানওয়ে থেকে উড্ডয়ন, উচ্চতা বৃদ্ধি, অবতরণ কিংবা অবতরণের পূর্ব মুহূর্তে যখন বিমান তুলনামূলকভাবে নিচু উচ্চতায় অবস্থান করে। সংঘর্ষের ক্ষেত্রে বিমানের প্রধান ইঞ্জিন, ডানা, উইন্ডশিল্ড, নাকের অংশ (রেডোম) ও ফিউসেলেজ সবচেয়ে বেশি আঘাতপ্রাপ্ত হয়। যদিও বেশিরভাগ সংঘাতের ঘটনায় বিমান সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে রক্ষা পায় এবং শুধুমাত্র পাখির মৃত্যু ঘটে, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কোনো মুহূর্তে বা সংবেদনশীল যন্ত্রাংশে এই আঘাত লাগলে তা মুহূর্তে রূপ নেয় এক ভয়াবহ বিপর্যয়ে।

টার্বোফ্যান ইঞ্জিনগুলোতে পাখি ঢুকে পড়া অত্যন্ত বিপজ্জনক। আধুনিক ইঞ্জিনগুলো নির্দিষ্ট আকারের পাখি শোষণ করতে পারলেও এবং একাধিক ইঞ্জিনবিশিষ্ট বিমান একটি ইঞ্জিনের শক্তিতেও নিরাপদ অবতরণে সক্ষম হলেও একসাথে একাধিক ইঞ্জিন বিকল হলে বা অভ্যন্তরীণ যন্ত্রাংশ ধ্বংস হলে পুরো বিমানটিই নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়তে পারে। ইতিহাস ঘাটলে এমন বহু মর্মান্তিক ও অলৌকিক ঘটনার উদাহরণ মিলে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ব্যাংকক থেকে দক্ষিণ কোরিয়াগামী জেজু এয়ারের একটি বোয়িং ৭৩৭ বিমান অবতরণের সময় বৈকাল হাঁসের একটি ঝাঁকের মুখোমুখি হয়। বিমানের দুটি ইঞ্জিনেই পাখি ঢুকে পড়ার কারণে পাইলট জরুরি অবতরণের চেষ্টা করেন কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। বিমানটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি অবকাঠামোর সঙ্গে ধাক্কা খেলে ১৮১ জন আরোহীর মধ্যে ১৭৯ জনই প্রাণ হারান। আবার ২০২২ সালের নভেম্বরে ডেল্টা এয়ারলাইন্সের একটি এয়ারবাস এ৩২০ বিমান ১৩ হাজার ফুট উচ্চতায় থাকাকালে সরাসরি ককপিটে পাখির আঘাত খায়। পাইলটের বর্ণনামতে, সেই আঘাতের বিকট শব্দ যেন কোনো বোমার মতো ছিল; ধাক্কায় ককপিটের দরজা খুলে যায় এবং বিমানের ভেতরে দ্রুত বায়ুর চাপ কমতে শুরু করে। ঠিক তেমনিভাবে ২০১৯ সালের আগস্টে রাশিয়ার উরাল এয়ারলাইন্সের একটি বিমান উড্ডয়নের পরপরই গাংচিলের ঝাঁকের মুখে পড়ে শক্তি হারিয়ে ফেললে সাহসিকতার সঙ্গে চালক পার্শ্ববর্তী একটি ভুট্টা ক্ষেতে জরুরি অবতরণ করান, ফলে সেদিন ২৩৩ জন আরোহীর অলৌকিক প্রাণরক্ষা ঘটে।

বেসামরিক এয়ারলাইন্সের পাশাপাশি সামরিক বিমান চলাচলেও এই সংঘাতের মাত্রা কোনো অংশে কম নয়। বিশেষ করে নিচু উচ্চতায় দ্রুতগতিতে উড়ে চলা একক ইঞ্জিনের যুদ্ধবিমান কিংবা প্রশিক্ষণ বিমানগুলোর জন্য পাখি এক মূর্তিমান আতঙ্ক। হালকা ও অত্যন্ত দ্রুতগতির কারণে যুদ্ধবিমানের উইন্ডশিল্ড ভেঙে পাইলট আহত হওয়া বা বিমানের দৃষ্টিসীমা নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এমনকি পাখির আঘাতে অবতরণ যন্ত্রাংশের ব্রেক বা স্টিয়ারিং সিস্টেম বিকল হয়েও রানওয়েতে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। প্রযুক্তিগতভাবে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় পঞ্চম প্রজন্মের স্টিলথ যুদ্ধবিমানগুলোও এই ছোট প্রাণীর কাছে হার মানতে বাধ্য হচ্ছে।

সামরিক যুদ্ধবিমানের ক্ষেত্রেও সম্প্রতি একের পর এক ঘটনা দেখা গেছে। মিয়ানমার বিমান বাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান ইঞ্জিনে পাখি ঢুকে আগুন ধরে যাওয়ার কারণে বিধ্বস্ত হয়। মালয়েশিয়ার এফ/এ-১৮ হর্নেট যুদ্ধবিমান উড্ডয়নের সময় ইঞ্জিনে অগ্নিকাণ্ডের ফলে রানওয়েতে আছড়ে পড়ে, তদন্তে যার পেছনে পাখির সংঘাতকেই দায়ী করা হয়। যুক্তরাজ্যের রয়্যাল এয়ার ফোর্সের একটি সর্বাধুনিক এফ-৩৫ লাইটনিং-টু যুদ্ধবিমান ২০২৫ সালের শুরুতে পাখির আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে জরুরি অবতরণে বাধ্য হয়। এর আগে দক্ষিণ কোরিয়ার বিমান বাহিনীর একটি উন্নত এফ-৩৫এ যুদ্ধবিমানের এয়ার ইনটেকের ভেতরে একটি ঈগল ঢুকে পড়লে বিমানটির হাইড্রোলিক, বিদ্যুৎ ও অস্ত্রাগারের গুরুত্বপূর্ণ বাল্কহেড মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চালক অলৌকিকভাবে নিরাপদে বেলি-ল্যান্ডিং করাতে সক্ষম হলেও বিমানটির মেরামতের খরচ এতটাই আকাশচুম্বী ছিল যে পরবর্তীতে দক্ষিণ কোরীয় কর্তৃপক্ষ ওই এফ-৩৫এ বিমানটিকে স্থায়ীভাবে অবসরে পাঠাতে বাধ্য হয়। সূত্র: ইউরোএশিয়ান টাইমস

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



সর্বাধিক পঠিত



 

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ,

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন,

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

 

ইমেল: [email protected]

ফোন নাম্বার : ০১৫৩৫১৩০৩৫০,

Design & Developed BY ThemesBazar.Com