ছবি সংগৃহীত
ইমন হোসেন : সন্তানেরা সবাই প্রতিষ্ঠিত। একজন সরকারের যুগ্ম সচিব, একজন দেশের স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। আরেকজন থাকেন কানাডায়। তবে ৭৫ বছর বয়সী বৃদ্ধা মা নুরজাহান বেগমের দিকে ন্যূনতম মনোযোগ দেওয়ার সময় নেই তাদের! তাকে রাখা হয়েছিল মিরপুর-৬ নম্বরে বোনের বাসায়। পাঁচতলা ভবনের যে ফ্ল্যাটটিতে এই বয়োবৃদ্ধা নারী থাকতেন, সেখানে ঢুকলে মনে হয়, এ যেন কোনো এক বস্তির পরিত্যক্ত ঘর। একটি ছোট্ট শোবার ঘর। বিছানার পাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে নানা জিনিসপত্র। এই ঘরেই মরে পড়েছিলেন নুরজাহান বেগম।
মায়ের প্রতি সন্তানেরা এতোই উদাসীন ছিলেন যে, কবে তিনি মারা গেছেন তাও জানে না কেউ। প্রত্যক্ষদর্শীদের ধারণা, মৃত্যুর পর কয়েকদিন ধরে মরদেহটি ঘরের ভেতরেই পড়ে ছিল। রবিবার (১ জুন) ৯৯৯-এ ফোন করে থানায় খবর দেওয়া হলে পুলিশ সদস্যরা গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করেন।
মরদেহ উদ্ধারের সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত একজন প্রতিবেশী জানান, মরদেহটি দেখে মনে হয়েছে, উনি অন্তত সাত থেকে আট দিন আগে মারা গেছেন। যেই রুমে উনাকে রাখা হয়েছিল, সেই রুমের খুবই বিশ্রী অবস্থা। চারদিকে পোকামাকড়। মনে হয় যেন ১০-১৫ বছর কোনো লোক সেখানে ঢুকে নাই। উনার চোখের ভেতর দিয়ে পোকা ঢুকেছে, পুড়ো অঙ্গ পচে গেছে এবং মাংস ক্ষয়ে ক্ষয়ে পড়তেছে।
তিনি বলেন, ‘খবর পেয়ে যখন পুলিশসহ বাসায় গেলাম, তখনও ফ্যান চলতেছিল। উনার পুরা শরীরটাই পচে গেছে। মরদেহ নামানো যাচ্ছিল না।’
যে ফ্ল্যাটটিতে নুরজাহান বেগম থাকতেন তার প্রতিটি কক্ষই নোংরা ও অপরিচ্ছন্ন। দেখে মনে হয়, দীর্ঘদিন পরিস্কার করা হয়নি। রান্নাঘরের অবস্থাও অস্বাস্থ্যকর। আরেকটি কক্ষ ব্যবহার করা হচ্ছিল স্টোররুম হিসেবে। সব মিলিয়ে একজন বয়স্ক মানুষের বসবাসের জন্য পরিবেশটি ছিল অত্যন্ত নাজুক। মায়ের প্রতি সমাজে প্রতিষ্ঠিত সন্তানদের অবহেলার এই চিত্র দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এলাকার মানুষ।
একজন প্রতিবেশী জানান, তার এক ছেলে যুগ্ম সচিব, আরেক জন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। একজন কানাডায় থাকেন। তারা ভালো একটি পরিবার। তাহলে এমন পরিবারে বাবা-মায়ের এমন অনাদর থাকবে কেন?
নুরজাহান বেগমের মৃত্যুসহ পুরো বিষয়টি নিয়ে ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি হননি পরিবারের কেউ। এরইমধ্যে নুরজাহান বেগমের মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। প্রতিবেদন হাতে পেলেই বয়োবৃদ্ধ এই নারীর মৃত্যুর কারণ জানা যাবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পল্লবী থানার অফিসার ইনচার্জ মো. হাসান বাসির বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ৯৯৯-এ কল পেয়ে আমরা ওই নারীর মরদেহ উদ্ধার করি। বিধি মোতাবেক তার মেয়েকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তিনি কবে মারা গেছেন জানতে চাইলে মেয়ে যে জবাব দিয়েছেন, তা সন্তোষজনক মনে হয়নি। তার মৃতদেহে পোকা ছিল। মৃত্যুর সঠিক সময় উনার মেয়ে বলতে পারেননি। এ কারণে আমরা মরদেহের সুরতহাল করার পর পোস্টমর্টেমে দিয়েছি। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট আসার পর মৃত্যুর সঠিক কারণ ও সঠিক সময় আমরা জানতে পারবো।
সচেতন মানুষের ভাষ্য, একজন মা। যিনি হয়তো একদিন এই সন্তানদের হাত ধরে স্কুলে নিয়ে গেছেন। অসুস্থ হলে নির্ঘুম রাত কাটিয়েছেন। নিজের সুখ বিসর্জন দিয়ে তাদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। কিন্তু জীবনের শেষ অধ্যায়ে তার ঠিকানা ছিল নোংরা-অপরিচ্ছন্ন একটি ঘর। সঙ্গী ছিল শুধুই একাকীত্ব। নুরজাহান বেগমের এমন মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের গল্প নয়। এটি আমাদের সমাজের জন্যও একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন। ব্যস্ততার এই সময়ে আমরা কি আমাদের বয়স্ক বাবা-মায়ের জন্য যথেষ্ট সময় বের করতে পারছি? সূএ : বাংলাদেশ প্রতিদিন








