ছবি সংগৃহীত
অনলাইন ডেস্ক : দীর্ঘদিনের যুদ্ধ আর রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের সামনে এখন নতুন কোনো পথ খোলা নেই। যুদ্ধের ভয়াবহতা আর পাল্টাপাল্টি হামলার পর দুই পক্ষই এখন একটি শান্তিচুক্তির প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভব করছে। পাকিস্তানের ইসলামাবাদে ম্যারাথন আলোচনার পর হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে ইরানি বন্দরগুলোতে যে অবরোধ আরোপ করা হয়েছে, তা তেহরানের অর্থনীতিকে চূড়ান্ত বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে। ওয়াশিংটন এই অর্থনৈতিক চাপকে দর কষাকষির প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। তবে এই অবরোধ কেবল ইরান নয় বরং দেশটির তেলনির্ভর মিত্র চীনের ওপরও বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে একটি চুক্তির জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন। দেশীয় রাজনীতিতে ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতি, জ্বালানি তেলের আকাশচুম্বী দাম এবং নিজের কট্টর সমর্থক গোষ্ঠীর মধ্যে অসন্তোষের কারণে ট্রাম্পকে এখন একটি বড় ধরনের কূটনৈতিক সাফল্যের মুখ দেখতেই হবে। ট্রাম্পের অস্থির সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং অদ্ভুত আলোচনা পদ্ধতি অনেক সময় বিভ্রান্তি তৈরি করলেও বর্তমান পরিস্থিতি প্রমাণ করছে যে মধ্যপ্রাচ্যে একটি স্থিতিশীল সমাধান ছাড়া তার সামনে আর কোনো সহজ বিকল্প নেই। যুদ্ধের ময়দান থেকে ফিরে এসে আলোচনার টেবিলে জয়ী হওয়া এখন ট্রাম্পের রাজনৈতিক অস্তিত্বের জন্য অনিবার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে, ইরান এই মুহূর্তে তাদের ইতিহাসের অন্যতম কঠিন সময় পার করছে। টানা ৩৯ দিনের বোমা হামলায় দেশটির অবকাঠামো এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। যদিও তেহরান প্রচারণার লড়াইয়ে নিজেদের বিজয়ী দাবি করছে, কিন্তু বাস্তবতা হলো তাদের মন্ত্রিসভা এবং সামরিক কমান্ডের শীর্ষ নেতৃত্ব প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) এখন তাদের তৃতীয় স্তরের নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে। যুদ্ধের ময়দানে নিজেদের উচ্চতা বাড়িয়ে কথা বললেও ১৩ হাজার লক্ষ্যবস্তুতে মার্কিন হামলার ক্ষত ইরানকে আলোচনার টেবিলে নমনীয় হতে বাধ্য করছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
ইরানের বর্তমান অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে দেশটির সর্বোচ্চ নেতার অসুস্থতা এবং প্রকাশ্যে নেতৃত্বের অনুপস্থিতির কারণে। নতুন নেতৃত্ব হার্ডলাইনার বা কট্টরপন্থী হলেও তারা বুঝতে পারছেন, ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতি নিয়ে দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব। ইরানের আঞ্চলিক শক্তি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি স্তিমিত। প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর ওপর একের পর এক হামলা চালিয়ে তেহরান নিজেকে কার্যত বন্ধুহীন করে তুলেছে। উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের এই ধ্বংসাত্মক আচরণে ক্ষুব্ধ, আর মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তান থাকলেও তাদের প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে সৌদি আরবের সঙ্গে। ফলে ইরান এখন আঞ্চলিকভাবে একঘরে হয়ে পড়ার শঙ্কায় ভুগছে।
এতসব তিক্ততার মাঝেও ইসলামাবাদের আলোচনায় একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে, হোয়াইট হাউস এবং তেহরান অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে একমত হতে পেরেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার ব্যাপারে দুই পক্ষই ইতিবাচক। মার্কিন অবরোধের কারণে ইরানের নৌ-চলাচলের ক্ষমতা কমে গেলেও চীনের স্বার্থ রক্ষায় তারা এই জলপথ উন্মুক্ত রাখতে আগ্রহী। এখন মূল লড়াই চলছে চুক্তির খুঁটিনাটি এবং মেয়াদের ওপর। পরমাণু কর্মসূচি স্থগিত রাখার সময়সীমা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মতভেদ থাকলেও কূটনৈতিকভাবে এর একটি মাঝামাঝি সমাধান বের করা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
ইরানের পরমাণু সক্ষমতা বর্তমান যুদ্ধে উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। তাদের মজুতকৃত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম এখন ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নজরদারিতে রয়েছে। সার্বভৌমত্বের দোহাই দিয়ে ইরান এই মজুত ধরে রাখতে চাইলেও আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মাধ্যমে এটি রাশিয়ায় স্থানান্তর বা অন্য কোনো উপায়ে ধ্বংস করার প্রস্তাব টেবিলে রয়েছে। এই ইস্যুটি সমাধান করা গেলে চুক্তির পথে প্রধান বাধা দূর হবে। তবে দুই পক্ষকেই এমনভাবে শর্তগুলো সাজাতে হচ্ছে যাতে নিজ দেশে তারা একে একটি বড় ধরনের বিজয় হিসেবে প্রচার করতে পারে।
ইসরায়েল এবং হিজবুল্লাহর মধ্যকার সংঘাত এই শান্তি প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে একটি বড় অনিশ্চয়তা হিসেবে কাজ করছে। ইরান চায় না তাদের আঞ্চলিক প্রক্সি বা মিত্র গোষ্ঠীগুলোকে পুরোপুরি ত্যাগ করতে। বিশেষ করে লেবাননে হিজবুল্লাহর রকেট হামলা এবং ইসরায়েলের পাল্টা আক্রমণ পরিস্থিতিকে প্রতিনিয়ত অস্থিতিশীল করে তুলছে। লেবানন সরকার ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি কথা বললেও হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্রীকরণ করার ক্ষমতা তাদের নেই। ফলে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের চূড়ান্ত চুক্তিতে এই আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলোর ভবিষ্যৎ এবং ইসরায়েলের নিরাপত্তা উদ্বেগকে কীভাবে সমন্বয় করা হয়, সেটিই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হবে এই নতুন চুক্তিটি ওবামা আমলের পরমাণু চুক্তির চেয়ে কতটা শ্রেয়। ইরানকে পরমাণু বোমা থেকে দূরে রাখা এবং তাদের আঞ্চলিক প্রভাব কমিয়ে আনার দাবি করে ট্রাম্প একটি জয় নিশ্চিত করতে চান। তবে মুদ্রার উল্টো পিঠ হলো, এই বিধ্বংসী যুদ্ধ ইরানের কট্টরপন্থীদের মনে এই বিশ্বাস গেঁথে দিয়েছে যে, আত্মরক্ষার জন্য পারমাণবিক অস্ত্র এখন তাদের জন্য আগের চেয়েও বেশি প্রয়োজন। ট্রাম্প হয়তো একটি সাময়িক চুক্তি করতে সফল হবেন, কিন্তু যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট দীর্ঘমেয়াদী ক্ষত এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎকে এক অজানা গন্তব্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
সূএ : সিএনএনের বিশ্লেষণ








