ভরদুপুরে ছেলেখেলা

ছবি সংগৃহীত

 

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : ঠিক ওই রকমই মনে হচ্ছে ব্যাপারটা, যেন ভরদুপুরে ছেলেখেলা। যাতে আনন্দ নেই, স্বাস্থ্য নেই, বিড়ম্বনা রয়েছে, আশঙ্কা আছে গ্লানির। এই যে সংসদ নির্বাচনের জন্য সৎ ও যোগ্য প্রার্থী খুঁজে বের করার কাজে অত্যন্ত ব্যস্ত হয়ে পড়েন আমাদের সুশীল সমাজ, এ যেন অনেকটা ছেলেখেলাই। তদুপরি ভরদুপুরেই বটে। দুপুর না বলে উপায় কী? পরিস্থিতি তো খুবই তপ্ত এবং যথেষ্ট পরিমাণে পীড়াদায়ক। ছেলেখেলা অবশ্য ছেলেদেরই মানায়। সে খেলা দুপুরে ভালো, কি বিকালে-এই রকম সময় বিবেচনার দ্বারা তাড়িত না হতেও পারে। কিন্তু বয়স্ক ও সুশীল ব্যক্তিদের ছেলেখেলা, সে তো ভিন্ন ঘটনা। তার তো সময়-অসময় থাকবার কথা।

আমার নিজের জন্য ছেলেখেলার এই তুলনাটা মোটেই কষ্টকল্পনা নয়। একদা নিতান্ত কষ্টের মধ্য দিয়েই তুলনাটির যথার্থতার বিষয়ে অবহিত হতে হয়েছিল আমাকে। স্মরণ করলে হাসি পায়, দুঃখ তো লাগেই।

সময়টা ছিল আইউব খানের সামরিক শাসনের। তিনি একটি নতুন ধরনের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হয়েছিলেন। নাম দিয়েছিলেন বুনিয়াদি গণতন্ত্র। নির্বাচন হবে ধাপে ধাপে। প্রথমে নির্বাচিত হবেন বুনিয়াদি গণতন্ত্রীরা। তাঁরা নির্বাচন করবেন সংসদ সদস্য পদে। এবং পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের ৪০ হাজার করে ৮০ হাজার বুনিয়াদি গণতন্ত্রী নির্বাচিত করবেন প্রেসিডেন্ট।

আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও নিকটাত্মীয়কে এলাকার কয়েকজন বুনিয়াদি গণতন্ত্রী বলেছিলেন সংসদ নির্বাচনের জন্য প্রার্থী হতে। তাঁরা ভোট দেবেন, অন্যদের ভোটও এনে দেবেন। খরচের জন্য চিন্তা নেই। কয়েকজন তো মাত্র ভোটার, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে তেমন টাকাপয়সা লাগবে না। ওই যাতায়াত বাবদ যা কিছু খরচা। বন্ধুটি ছিলেন এলাকার নামকরা স্কুলের হেডমাস্টার। স্থানীয় অভিভাবক এবং বন্ধুর আত্মীয়স্বজন অনেকেই উৎসাহ দিলেন দাঁড়াতে। তাঁর মতো সৎ ও যোগ্য প্রার্থী কাকেই বা পাওয়া যাবে? তা ছাড়া তাঁর রয়েছে অনেক ছাত্র এবং বিপুল জনপ্রিয়তা।

আমি নিজেও যে উৎসাহ দিইনি তেমনও নয়। আজ থেকে অনেক বছর আগের ঘটনা ওটি। নির্বাচন কী জিনিস তখনো তেমন বুঝে উঠিনি। অল্প কিছু ভোটার, প্রার্থী হবেন বেশ কয়েকজন, ভোট ভাগাভাগি হবে, তার ভিতর দিয়ে যোগ্যতা ও জনপ্রিয়তার কারণে আমার বন্ধুটি বিজয়ী হবেন-এমন ভরসা আমাদের খুবই ছিল। বন্ধুর নিজেরও ছিল, নইলে দাঁড়াতে সম্মত হবেন কেন?

কিন্তু মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পরই দেখা গেল চিত্র ভিন্ন রকমের। প্রথমে মনে হয়েছিল পরিস্থিতি আমাদের অনুকূলে বটে, নইলে প্রার্থীদের একজন, বড় গোছের ব্যবসায়ী তিনি, কেন আগ বাড়িয়ে প্রস্তাব পাঠাবেন যে বন্ধুটি যদি তাঁর প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেন, তাহলে ক্ষতিপূরণ হিসেবে বন্ধুটিকে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য বিলেতে পাঠাবার ব্যাপারে অর্থ সাহায্যদানে প্রস্তুত আছেন। প্রস্তাব শুনে আমাদের মনোবল গেল বেড়ে। তবে সেটা বেশি দিন অক্ষুণœ রাখা সহজ হলো না।

ভোটারদের কাছে যাওয়া হলো। কয়েকবার আমিও গেলাম, তাঁর নিকট সঙ্গী হিসেবে, তাঁকে চাঙা রাখতে। দেখি বুনিয়াদি গণতন্ত্রীদের দুরকম আচরণ, দুদলে বিভক্তই বলা চলে।

একদল ভীষণ ভারিক্কি, সহজে মুখ খোলে না, যত খুলতে অসম্মত হয়, তত বৃদ্ধি পায় আমাদের রক্তচাপ। বুঝে উঠতে পারি না তাদের গভীর গহনে কোন মনোভাব লুক্কায়িত; পক্ষে নাকি বিপক্ষে। আরেক দলের আচরণ অত্যন্ত প্রগলভ। এত বেশি প্রশংসা করেন আমাদের প্রার্থীর যে আমরা ভরসা করতে সাহস পাই না। আপনি শিক্ষিত, যোগ্য, সৎ, আদর্শ শিক্ষক; আপনার মতো প্রার্থী আমাদের মতো লোকেরা পাবে কোথায়? আপনি অবশ্যই নির্বাচিত হবেন ইত্যাদি ইত্যাদি। শুনি, কিন্তু আস্থা আসে না।

চরম অভিজ্ঞতা হলো ভোটের দিন। অল্প কয়েকটি ভোটকেন্দ্র। প্রার্থীসহ আমি উপস্থিত ছিলাম একটিতে। দেখি নানা রকমের উত্তেজনা। এমনকি দাঙ্গা বাধাবার কানাঘুষা। বুঝলাম সুবিধা হবে না। ম্রিয়মাণ অবস্থায় অত্যন্ত খাপছাড়াভাবে আমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে স্থানীয় স্কুলের একজন শিক্ষকের কৌতূহল হয়েছিল হয়তো। তিনি এগিয়ে এসে পরিচিত হলেন। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা দিয়ে জীবন শুরু করেছি জানতে পেরে যে মন্তব্যটি করলেন সেটি আমার জন্য স্মরণীয়, ‘তা এই খেলায় আপনি কেন এসেছেন?’

ভোট শেষে দুপুরের পরে নৌকায় করে যখন ফিরছি, তখন বন্ধুর চেহারা দেখেই বুঝেছি আশা করবার কোনো কারণ নেই। কিন্তু তাই বলে এতটা যে খারাপ হবে আমরা ভাবতে পারিনি। সর্বনিম্ন তো বটেই, তার বাক্সে সর্বসাকল্যে ভোট পড়েছে মাত্র দুইটি। আর জয়ী হয়েছেন সেই ব্যবসায়ী ভদ্রলোক, যিনি আমার হেডমাস্টার বন্ধুটিকে বিদেশে পাঠাতে চেয়েছিলেন। ব্যবসায়ীর জন্য ছেলেখেলা, কিন্তু আমাদের জন্য মৃত্যু। বিশেষ করে আমাদের প্রার্থীটির জন্য। লজ্জায় তিনি স্কুল ছেড়েছেন, গ্রাম ছেড়েছেন, শহরে এসে চাকরি নিয়েছেন আমলার। বলেছেন অবশ্য ভালোই হয়েছে। কিন্তু সেই বলাটা সেই সময়ে ছিল কান্নার নামান্তর।

সেই যে স্কুলের শিক্ষকটি বলেছিলেন এ খেলা অন্যরকম, এখানে সবাইকে মানায় না, তাঁর সেই পর্যবেক্ষণের সত্যতা এখন অনেক বেশি উজ্জ্বল। নির্বাচন এখনো খেলা ঠিকই, কিন্তু মোটেই ছেলেখেলা নয়। বলা যায় টাকার খেলাই আসলে। এবং সে খেলা কতটা যে ভয়ংকর হতে পারে তা প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে নানাভাবে নিজেকে জানান দিতে থাকে, নির্বাচনের আগে এবং পরে। কেবল ভোট কেনাবেচা নয়, মনোনয়নও কেনাবেচা চলে এবং ফল প্রকাশের পর নানা ধরনের হিংস্রতা দেখা দেয়; নির্বাচনের দিনেও হিংস্রতা অনিবার্য হয়ে উঠত যদি না সেনাবাহিনীর তৎপরতা থাকত।

এই খেলায় নিরীহ মানুষ নাক গলাবে কোন সাহসে? তাদের দৌড় তো ওই ভোট দেওয়া পর্যন্ত। কিন্তু আমাদের সুশীল সমাজ অর্থাৎ ভদ্রলোক গোষ্ঠী দেখছি দলবেঁধে সাহস করে এগিয়ে এসেছেন। দল বাঁধতে পেরেছেন বলেই যে সাহসী হয়েছেন সেটা বুঝি। তবে তাঁরা যদি আমাদের মতো দলছুট মানুষদের বলবার সাহস দেন, তাহলে ওই কথাটাই বলব, এই লেখার শুরুতে যা উল্লেখ করেছি, অর্থাৎ ভয়ংকর রকমের তপ্ত দ্বিপ্রহরে তাদের কাজটা মনে হচ্ছে নিতান্ত ছেলেমানুষি। ছেলেমানুষিই বলব, কেননা অন্য কথা ভাবাটা আরও অসম্মানজনক হবে। কোনো বিশেষ পরিকল্পনার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে তাদের মতো বিজ্ঞ, বিচক্ষণ ও সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিবর্গ নির্বাচনের জন্য যোগ্য প্রার্থী খুঁজতে দুপুরবেলা লণ্ঠন হাতে রাস্তায় বের হয়েছেন-এমন চিন্তাকে মনের প্রান্ত দেশেও প্রবেশাধিকার দিতে চাই না। যেজন্য ধরে নিচ্ছি কাজটা নিছক ছেলেমানুষিই, গুরুতর কিছু নয়।

হ্যাঁ, তাঁরা যোগ্য প্রার্থী খুঁজে পাবেন ঠিকই, কিন্তু তাঁদের মনোনীত প্রার্থীরা নির্বাচিত হবেন বলে যদি তাঁরা ভরসা করে থাকেন, তা হলে ওটাই হচ্ছে প্রথম জায়গা, যেখানে তাঁদের ছেলেমানুষি প্রকাশ পাবে। নির্বাচিত হতে হলে টাকা লাগবে। অন্য প্রার্থীরা প্রত্যেকে যদি পাঁচ কোটি করে ঢালেন, তাহলে আমাদের প্রার্থী তিন কোটিও খরচ করবেন না; এমন হলে তারা নির্বাচিত হতে পারবেন এমন ভরসা করা নিতান্তই বোকামি। আর যদি তিন কোটি খরচ করেন কোনো প্রার্থী, তাহলে অন্যরা কেন আমরাই তো ভ্রু কুঁচকাব। অত টাকা পেলেন কোথায়? যোগ্য নিশ্চয়ই তাই পেয়েছেন, কিন্তু সৎ পথে কি অত টাকার মালিক হওয়াটা সম্ভব? তা হলে?

আমাদের এই রাষ্ট্র জনগণের, সংবিধান তাই বলে; ইতিহাসও সেই রকমেরই রায় দেয়। বলে যে জনগণই যুদ্ধ করে এই রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা ঘটিয়েছে। কিন্তু ওই মালিকানাটা তো কাগজেপত্রে মাত্র। বাস্তব সত্যটা হলো এই যে রাষ্ট্র জনগণের স্বার্থ দেখে না, স্বার্থ দেখে শাসকশ্রেণির এবং শাসকশ্রেণিকে পুষ্ট করতে গিয়ে রাষ্ট্র নিষ্পেষণ চালায় জনগণের ওপর। সন্দেহ আছে কী যে কখনো কখনো রাষ্ট্রই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী প্রতিষ্ঠান। সংসদে নির্বাচিত হওয়ার জন্য যাঁরা তৎপর হন, তাঁরা ভান করেন যে তারা মালিক হতে চাচ্ছেন না, হতে চাচ্ছেন রাষ্ট্রের ম্যানেজার। কিন্তু নির্বাচিত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা মাত্র, হওয়ার পর পরই ছদ্মবেশটা ফেলে দিয়ে তারা রাষ্ট্রের মালিক হয়ে যান। এবং কে কতটা ভাগ নেবেন তা নিয়ে নিজেদের মধ্যে ঝগড়া-ফ্যাসাদ পাকিয়ে ফেলেন। রাষ্ট্রের চরিত্রে বদল এনে একে জনগণের হাতে তুলে দেবেন এ চিন্তা সংসদ সদস্যদের কল্পনার ধারেকাছেও থাকে না। তাঁরা চান, রাষ্ট্র যেমন আছে তেমনি থাকুক এবং তাঁদের সেবা করুক।

♦লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সূএ: বাংলাদেশ প্রতিদিন

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



» সারাদেশে খাল খননে বড় ধরনের বাজেট বরাদ্দ রাখা হয়েছে : অর্থমন্ত্রী

» পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজ জয় বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে প্রধানমন্ত্রীর অভিনন্দন

» প্রথম স্ত্রীকে পিটিয়ে হত্যা, দ্বিতীয় স্ত্রীসহ স্বামী গ্রেপ্তার

» জাবি শিক্ষার্থী রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় স্বামী গ্রেপ্তার

» লাই হত্যাযজ্ঞ ট্রাইব্যুনালে আনা হলো সাবেক এমপি ফজলে করিমকে

» দেশের রাজনীতিতে আ. লীগের উপস্থিতি অনিবার্য ও অপরিহার্য : রনি

» এনসিপি নেতারা গণভোট নিয়ে অর্ধেক বুঝেছেন: আইনমন্ত্রী

» রাশেদ যদি দলে ফিরতে চায়, আমরা ওয়েলকাম করব: নুর

» সুন্দর ভোট হলে আপত্তি ওঠে ভোট হওয়ার পরে: সিইসি

» কানাডায় ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে পবিত্র লাইলাতুল কদর পালিত

 

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ,

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন,

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

 

ইমেল: [email protected]

ফোন নাম্বার : ০১৫৩৫১৩০৩৫০,

Desing & Developed BY PopularITLtd.Com
পরীক্ষামূলক প্রচার...

ভরদুপুরে ছেলেখেলা

ছবি সংগৃহীত

 

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : ঠিক ওই রকমই মনে হচ্ছে ব্যাপারটা, যেন ভরদুপুরে ছেলেখেলা। যাতে আনন্দ নেই, স্বাস্থ্য নেই, বিড়ম্বনা রয়েছে, আশঙ্কা আছে গ্লানির। এই যে সংসদ নির্বাচনের জন্য সৎ ও যোগ্য প্রার্থী খুঁজে বের করার কাজে অত্যন্ত ব্যস্ত হয়ে পড়েন আমাদের সুশীল সমাজ, এ যেন অনেকটা ছেলেখেলাই। তদুপরি ভরদুপুরেই বটে। দুপুর না বলে উপায় কী? পরিস্থিতি তো খুবই তপ্ত এবং যথেষ্ট পরিমাণে পীড়াদায়ক। ছেলেখেলা অবশ্য ছেলেদেরই মানায়। সে খেলা দুপুরে ভালো, কি বিকালে-এই রকম সময় বিবেচনার দ্বারা তাড়িত না হতেও পারে। কিন্তু বয়স্ক ও সুশীল ব্যক্তিদের ছেলেখেলা, সে তো ভিন্ন ঘটনা। তার তো সময়-অসময় থাকবার কথা।

আমার নিজের জন্য ছেলেখেলার এই তুলনাটা মোটেই কষ্টকল্পনা নয়। একদা নিতান্ত কষ্টের মধ্য দিয়েই তুলনাটির যথার্থতার বিষয়ে অবহিত হতে হয়েছিল আমাকে। স্মরণ করলে হাসি পায়, দুঃখ তো লাগেই।

সময়টা ছিল আইউব খানের সামরিক শাসনের। তিনি একটি নতুন ধরনের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হয়েছিলেন। নাম দিয়েছিলেন বুনিয়াদি গণতন্ত্র। নির্বাচন হবে ধাপে ধাপে। প্রথমে নির্বাচিত হবেন বুনিয়াদি গণতন্ত্রীরা। তাঁরা নির্বাচন করবেন সংসদ সদস্য পদে। এবং পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের ৪০ হাজার করে ৮০ হাজার বুনিয়াদি গণতন্ত্রী নির্বাচিত করবেন প্রেসিডেন্ট।

আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও নিকটাত্মীয়কে এলাকার কয়েকজন বুনিয়াদি গণতন্ত্রী বলেছিলেন সংসদ নির্বাচনের জন্য প্রার্থী হতে। তাঁরা ভোট দেবেন, অন্যদের ভোটও এনে দেবেন। খরচের জন্য চিন্তা নেই। কয়েকজন তো মাত্র ভোটার, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে তেমন টাকাপয়সা লাগবে না। ওই যাতায়াত বাবদ যা কিছু খরচা। বন্ধুটি ছিলেন এলাকার নামকরা স্কুলের হেডমাস্টার। স্থানীয় অভিভাবক এবং বন্ধুর আত্মীয়স্বজন অনেকেই উৎসাহ দিলেন দাঁড়াতে। তাঁর মতো সৎ ও যোগ্য প্রার্থী কাকেই বা পাওয়া যাবে? তা ছাড়া তাঁর রয়েছে অনেক ছাত্র এবং বিপুল জনপ্রিয়তা।

আমি নিজেও যে উৎসাহ দিইনি তেমনও নয়। আজ থেকে অনেক বছর আগের ঘটনা ওটি। নির্বাচন কী জিনিস তখনো তেমন বুঝে উঠিনি। অল্প কিছু ভোটার, প্রার্থী হবেন বেশ কয়েকজন, ভোট ভাগাভাগি হবে, তার ভিতর দিয়ে যোগ্যতা ও জনপ্রিয়তার কারণে আমার বন্ধুটি বিজয়ী হবেন-এমন ভরসা আমাদের খুবই ছিল। বন্ধুর নিজেরও ছিল, নইলে দাঁড়াতে সম্মত হবেন কেন?

কিন্তু মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পরই দেখা গেল চিত্র ভিন্ন রকমের। প্রথমে মনে হয়েছিল পরিস্থিতি আমাদের অনুকূলে বটে, নইলে প্রার্থীদের একজন, বড় গোছের ব্যবসায়ী তিনি, কেন আগ বাড়িয়ে প্রস্তাব পাঠাবেন যে বন্ধুটি যদি তাঁর প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেন, তাহলে ক্ষতিপূরণ হিসেবে বন্ধুটিকে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য বিলেতে পাঠাবার ব্যাপারে অর্থ সাহায্যদানে প্রস্তুত আছেন। প্রস্তাব শুনে আমাদের মনোবল গেল বেড়ে। তবে সেটা বেশি দিন অক্ষুণœ রাখা সহজ হলো না।

ভোটারদের কাছে যাওয়া হলো। কয়েকবার আমিও গেলাম, তাঁর নিকট সঙ্গী হিসেবে, তাঁকে চাঙা রাখতে। দেখি বুনিয়াদি গণতন্ত্রীদের দুরকম আচরণ, দুদলে বিভক্তই বলা চলে।

একদল ভীষণ ভারিক্কি, সহজে মুখ খোলে না, যত খুলতে অসম্মত হয়, তত বৃদ্ধি পায় আমাদের রক্তচাপ। বুঝে উঠতে পারি না তাদের গভীর গহনে কোন মনোভাব লুক্কায়িত; পক্ষে নাকি বিপক্ষে। আরেক দলের আচরণ অত্যন্ত প্রগলভ। এত বেশি প্রশংসা করেন আমাদের প্রার্থীর যে আমরা ভরসা করতে সাহস পাই না। আপনি শিক্ষিত, যোগ্য, সৎ, আদর্শ শিক্ষক; আপনার মতো প্রার্থী আমাদের মতো লোকেরা পাবে কোথায়? আপনি অবশ্যই নির্বাচিত হবেন ইত্যাদি ইত্যাদি। শুনি, কিন্তু আস্থা আসে না।

চরম অভিজ্ঞতা হলো ভোটের দিন। অল্প কয়েকটি ভোটকেন্দ্র। প্রার্থীসহ আমি উপস্থিত ছিলাম একটিতে। দেখি নানা রকমের উত্তেজনা। এমনকি দাঙ্গা বাধাবার কানাঘুষা। বুঝলাম সুবিধা হবে না। ম্রিয়মাণ অবস্থায় অত্যন্ত খাপছাড়াভাবে আমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে স্থানীয় স্কুলের একজন শিক্ষকের কৌতূহল হয়েছিল হয়তো। তিনি এগিয়ে এসে পরিচিত হলেন। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা দিয়ে জীবন শুরু করেছি জানতে পেরে যে মন্তব্যটি করলেন সেটি আমার জন্য স্মরণীয়, ‘তা এই খেলায় আপনি কেন এসেছেন?’

ভোট শেষে দুপুরের পরে নৌকায় করে যখন ফিরছি, তখন বন্ধুর চেহারা দেখেই বুঝেছি আশা করবার কোনো কারণ নেই। কিন্তু তাই বলে এতটা যে খারাপ হবে আমরা ভাবতে পারিনি। সর্বনিম্ন তো বটেই, তার বাক্সে সর্বসাকল্যে ভোট পড়েছে মাত্র দুইটি। আর জয়ী হয়েছেন সেই ব্যবসায়ী ভদ্রলোক, যিনি আমার হেডমাস্টার বন্ধুটিকে বিদেশে পাঠাতে চেয়েছিলেন। ব্যবসায়ীর জন্য ছেলেখেলা, কিন্তু আমাদের জন্য মৃত্যু। বিশেষ করে আমাদের প্রার্থীটির জন্য। লজ্জায় তিনি স্কুল ছেড়েছেন, গ্রাম ছেড়েছেন, শহরে এসে চাকরি নিয়েছেন আমলার। বলেছেন অবশ্য ভালোই হয়েছে। কিন্তু সেই বলাটা সেই সময়ে ছিল কান্নার নামান্তর।

সেই যে স্কুলের শিক্ষকটি বলেছিলেন এ খেলা অন্যরকম, এখানে সবাইকে মানায় না, তাঁর সেই পর্যবেক্ষণের সত্যতা এখন অনেক বেশি উজ্জ্বল। নির্বাচন এখনো খেলা ঠিকই, কিন্তু মোটেই ছেলেখেলা নয়। বলা যায় টাকার খেলাই আসলে। এবং সে খেলা কতটা যে ভয়ংকর হতে পারে তা প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে নানাভাবে নিজেকে জানান দিতে থাকে, নির্বাচনের আগে এবং পরে। কেবল ভোট কেনাবেচা নয়, মনোনয়নও কেনাবেচা চলে এবং ফল প্রকাশের পর নানা ধরনের হিংস্রতা দেখা দেয়; নির্বাচনের দিনেও হিংস্রতা অনিবার্য হয়ে উঠত যদি না সেনাবাহিনীর তৎপরতা থাকত।

এই খেলায় নিরীহ মানুষ নাক গলাবে কোন সাহসে? তাদের দৌড় তো ওই ভোট দেওয়া পর্যন্ত। কিন্তু আমাদের সুশীল সমাজ অর্থাৎ ভদ্রলোক গোষ্ঠী দেখছি দলবেঁধে সাহস করে এগিয়ে এসেছেন। দল বাঁধতে পেরেছেন বলেই যে সাহসী হয়েছেন সেটা বুঝি। তবে তাঁরা যদি আমাদের মতো দলছুট মানুষদের বলবার সাহস দেন, তাহলে ওই কথাটাই বলব, এই লেখার শুরুতে যা উল্লেখ করেছি, অর্থাৎ ভয়ংকর রকমের তপ্ত দ্বিপ্রহরে তাদের কাজটা মনে হচ্ছে নিতান্ত ছেলেমানুষি। ছেলেমানুষিই বলব, কেননা অন্য কথা ভাবাটা আরও অসম্মানজনক হবে। কোনো বিশেষ পরিকল্পনার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে তাদের মতো বিজ্ঞ, বিচক্ষণ ও সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিবর্গ নির্বাচনের জন্য যোগ্য প্রার্থী খুঁজতে দুপুরবেলা লণ্ঠন হাতে রাস্তায় বের হয়েছেন-এমন চিন্তাকে মনের প্রান্ত দেশেও প্রবেশাধিকার দিতে চাই না। যেজন্য ধরে নিচ্ছি কাজটা নিছক ছেলেমানুষিই, গুরুতর কিছু নয়।

হ্যাঁ, তাঁরা যোগ্য প্রার্থী খুঁজে পাবেন ঠিকই, কিন্তু তাঁদের মনোনীত প্রার্থীরা নির্বাচিত হবেন বলে যদি তাঁরা ভরসা করে থাকেন, তা হলে ওটাই হচ্ছে প্রথম জায়গা, যেখানে তাঁদের ছেলেমানুষি প্রকাশ পাবে। নির্বাচিত হতে হলে টাকা লাগবে। অন্য প্রার্থীরা প্রত্যেকে যদি পাঁচ কোটি করে ঢালেন, তাহলে আমাদের প্রার্থী তিন কোটিও খরচ করবেন না; এমন হলে তারা নির্বাচিত হতে পারবেন এমন ভরসা করা নিতান্তই বোকামি। আর যদি তিন কোটি খরচ করেন কোনো প্রার্থী, তাহলে অন্যরা কেন আমরাই তো ভ্রু কুঁচকাব। অত টাকা পেলেন কোথায়? যোগ্য নিশ্চয়ই তাই পেয়েছেন, কিন্তু সৎ পথে কি অত টাকার মালিক হওয়াটা সম্ভব? তা হলে?

আমাদের এই রাষ্ট্র জনগণের, সংবিধান তাই বলে; ইতিহাসও সেই রকমেরই রায় দেয়। বলে যে জনগণই যুদ্ধ করে এই রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা ঘটিয়েছে। কিন্তু ওই মালিকানাটা তো কাগজেপত্রে মাত্র। বাস্তব সত্যটা হলো এই যে রাষ্ট্র জনগণের স্বার্থ দেখে না, স্বার্থ দেখে শাসকশ্রেণির এবং শাসকশ্রেণিকে পুষ্ট করতে গিয়ে রাষ্ট্র নিষ্পেষণ চালায় জনগণের ওপর। সন্দেহ আছে কী যে কখনো কখনো রাষ্ট্রই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী প্রতিষ্ঠান। সংসদে নির্বাচিত হওয়ার জন্য যাঁরা তৎপর হন, তাঁরা ভান করেন যে তারা মালিক হতে চাচ্ছেন না, হতে চাচ্ছেন রাষ্ট্রের ম্যানেজার। কিন্তু নির্বাচিত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা মাত্র, হওয়ার পর পরই ছদ্মবেশটা ফেলে দিয়ে তারা রাষ্ট্রের মালিক হয়ে যান। এবং কে কতটা ভাগ নেবেন তা নিয়ে নিজেদের মধ্যে ঝগড়া-ফ্যাসাদ পাকিয়ে ফেলেন। রাষ্ট্রের চরিত্রে বদল এনে একে জনগণের হাতে তুলে দেবেন এ চিন্তা সংসদ সদস্যদের কল্পনার ধারেকাছেও থাকে না। তাঁরা চান, রাষ্ট্র যেমন আছে তেমনি থাকুক এবং তাঁদের সেবা করুক।

♦লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সূএ: বাংলাদেশ প্রতিদিন

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



সর্বাধিক পঠিত



 

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ,

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন,

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

 

ইমেল: [email protected]

ফোন নাম্বার : ০১৫৩৫১৩০৩৫০,

Design & Developed BY ThemesBazar.Com