রাজনৈতিক দল যেন বিচারাধীন বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করে

ছবি সংগৃহীত

 

অদিতি করিম:  সাবেক সংসদ সদস্য ও জামায়াত নেতা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের ঘটনাপ্রবাহে যেমন কিছু ইতিবাচক দিক বেরিয়ে এসেছে, তেমনি কিছু বিষয় সাধারণ নাগরিকদের উদ্বিগ্ন করেছে। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সংঘটিত ঘটনাটি সবাই জানেন।

গত বৃহস্পতিবার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লাগেজ পেতে দেরি হওয়ায় কর্মকর্তাদের শাসান মেজর আখতার। ছড়িয়ে পড়া ভিডিও অনুযায়ী, ট্রলি পেতে দেরি হওয়ায় তিনি কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমি কিন্তু পেটাবো ধইরা’, ‘গেট আউট ফ্রম হিয়ার’, ‘ঘাড় ধরে বের করে দিব’, ‘কাজ জানেন না, তদবির করে পোস্টিংয়ে আসবেন’, ‘মাইর খাইতে চান?’। অপর একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, আখতার জমজম কূপের পানির জার একটি ট্রলি থেকে ফেলে দিচ্ছেন।

আখতারুজ্জামান একজন সম্মানিত ও দায়িত্বশীল নাগরিক। তিনি কিশোরগঞ্জ-২ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে টানা দুবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। একাদশ সংসদের প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনে তিনি ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নৌকার প্রার্থীর কাছে হেরে যান। এরপর ২০২৪ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে পরাজিত হন। তিনি একসময় কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি ছিলেন। দলীয় শৃঙ্খলাপরিপন্থী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ২০২২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি তাঁকে পঞ্চমবারের মতো বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়। তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে গত ১৩ ডিসেম্বর জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন।

এরকম একজন ব্যক্তি বিমানবন্দরে যে আচরণ করেছেন, তা অত্যন্ত দুঃখজনক ও অনাকাঙ্ক্ষিত। আমরা জানি, বিমানবন্দরে অনেক সমস্যা আছে। বিশেষ করে একজন যাত্রী নামার পর তাঁর লাগেজ পেতে নানা ভোগান্তির সংবাদ প্রায়ই গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। কিন্তু একজন রাজনৈতিক নেতার প্রতিবাদের ধরন এ রকম হওয়া উচিত নয়। একজন সরকারি কর্মচারীর সঙ্গে এ ধরনের আচরণ কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

বিমানবন্দরের সমস্যা দীর্ঘদিনের। এই সমস্যার পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। একজন ব্যক্তি এজন্য দায়ী নন। আখতারুজ্জামানের ঘটনাটিও তাই বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। একজন সরকারি কর্মচারীকে গালমন্দ করলে কিংবা তাঁকে পেটানোর হুমকি দিলেই রাতারাতি এই সমস্যার সমাধান হবে না।

তাছাড়া, এই জামায়াত নেতা যে ভাষায় কথা বলেছেন, তা কেবল দুঃখজনক নয়, ফৌজদারি অপরাধ। একজন নাগরিক অন্য নাগরিককে পেটানোর হুমকি দিতে পারেন না। সরকারি কাজে বাধা দেওয়াও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তাই আখতারুজ্জামান কেবল ক্ষমতার দম্ভ দেখাননি, তিনি ফৌজদারি অপরাধ করেছেন।

আমাদের সমাজে প্রায়ই দেখা যায়, প্রভাবশালী ব্যক্তিরা এ ধরনের ঘটনা ঘটান। সব জায়গায় তাঁরা অগ্রাধিকার চান। তাঁদের সমস্যা হলেই তাঁরা হুমকি দেন, খারাপ ব্যবহার করেন। এটা অনুচিত হলেও সরকার বা কর্তৃপক্ষ তা উপেক্ষা করে। কিন্তু আমাদের সংবিধানে বলা হয়েছে, আইন সবার জন্য সমান। একজন রাজনীতিবিদ কিংবা সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তি আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পারেন না। আইন অমান্য করতে পারেন না।

আইনের এই সাম্যের নীতি আমাদের দেশে অতীতে অনুসরণ করা হয়নি। সমাজে উঁচু তলার মানুষরা যেন আইনের ঊর্ধ্বে থাকতেন। আইন যেন শুধু সাধারণ নাগরিকদের জন্য। কিন্তু বর্তমান সরকার সেই অবস্থার পরিবর্তন আনতে চাইছে। এজন্যই তারেক রহমান অন্যায় করার জন্য তাঁর দলের বহু নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। এমনকি দলের সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রেক্ষিতে তাঁকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন।

বিমানবন্দরে আখতারুজ্জামানের ঘটনাটিকেও সরকার উপেক্ষা করেনি। প্রকাশ্যে এ ধরনের মব, উচ্ছৃঙ্খল আচরণ এবং হুমকির বিরুদ্ধে স্বাভাবিক আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছে সরকার। এটাই কাম্য। আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে মামলা করা হয় এবং সেই মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এটি কোনো রাজনৈতিক ইস্যু নয়। রাজনৈতিক কারণে নয়, বরং সুনির্দিষ্ট ফৌজদারি অপরাধের কারণে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

তাই আমরা সাধারণ নাগরিকরা আশা করেছিলাম, আইন তার স্বাভাবিক গতিতে চলবে। এই আইনি প্রক্রিয়ায় কোনো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বা চাপ সৃষ্টি করা হবে না। বিশেষ করে আখতারুজ্জামান যে রাজনৈতিক দলের নেতা, সেই দলের পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়, একজন ব্যক্তির অপরাধের দায় দল নেবে না। এই দলের একজন সংসদ সদস্য একটি নারীঘটিত অপকর্মে জড়িয়ে পড়লে তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। তাই আমরা আশা করেছিলাম, এই ঘটনাটিতে জামায়াত হস্তক্ষেপ করবে না। তারা আইনকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দেবে।

কিন্তু আমরা হতাশ হয়েছি। জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, দুইবারের সাবেক সংসদ সদস্য ও একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানকে জনসমক্ষে অপমানিত করার নানা হীন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

রবিবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে ডা. শফিকুর রহমান এ কথা বলেন। ‘কোনো মানুষই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়’ শিরোনামে ফেসবুকে পোস্ট দেন জামায়াতের আমির।

তিনি পোস্টে লিখেছেন, আখতারুজ্জামান বিমানবন্দরে যাত্রীসাধারণের দুর্ভোগ-ভোগান্তি, কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা, অনিয়ম-অন্যায় কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছেন। কার্যত তিনি ভুক্তভোগী যাত্রীসাধারণ, বিশেষ করে বিদেশফেরত প্রবাসীদের প্রতিবাদের কণ্ঠে পরিণত হয়েছেন।

বিচারাধীন একটি মামলা নিয়ে জাতীয় সংসদের বিরোধী দলের নেতা যদি আগেই বক্তব্য দিয়ে দেন, তাহলে তো তা বিচারাধীন বিষয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপ হয়ে যায়। এর ফলে সঠিক বিচার বাধাগ্রস্ত হবে। বিরোধী দলের নেতা একজন দায়িত্বশীল নেতা। তিনি দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে প্রায়ই দেশের জনগণের স্বার্থে কথা বলেন। তাঁর দলের একজন নেতার আইনবহির্ভূত আচরণের বিষয়ে তাঁর কাছে দেশের জনগণ নিরপেক্ষ আচরণ আশা করেছিল।

বিষয়টি এখন আইন ও আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হওয়াটাই বাঞ্ছনীয়। আখতারুজ্জামান বিমানবন্দরে যা করেছেন, তা মব। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এখতিয়ার কারও নেই। এই প্রতিবাদ আরও রুচিশীল ও মার্জিত ভাষায় করা যেত। তাই বিষয়টি রাজনৈতিক নয়।

আমাদের দেশের জনগণের মধ্যে একটি ধারণা আছে যে, রাজনীতিবিদরা অন্যায় করলে তাঁদের বিচার হয় না। এর ফলে রাজনীতি সম্পর্কেই মানুষের মধ্যে একটি নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে। এই ধারণা পরিবর্তন না করতে পারলে গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে না। এজন্য রাজনীতিবিদরা অন্যায় বা অপরাধ করলে তাঁদের রক্ষার জন্য যেন রাজনৈতিক দলগুলো মাঠে না নামে, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

অপরাধীদের একটাই পরিচয়—তারা অপরাধী, তারা কোনো দলের নয়—এই মানসিকতার চর্চা করতে হবে সব রাজনৈতিক দলকে। তাহলেই আমরা সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারব।

তাই আমরা আশা করি, আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ স্বাভাবিক আইনি প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি হবে। সরকার এবং বিরোধী দল কেউই চলমান মামলায় কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করবে না। এটাই আইনের শাসনের মূল ভিত্তি।

অদিতি করিম: লেখক ও নাট্যকার
ইমেইল: auditekarim@gmail.com । সূএ: বাংলাদেশ প্রতিদিন

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



» ভয়ভীতি দেখিয়ে পাটওয়ারীদের কণ্ঠ স্তব্ধ করা যাবে না: নাহিদ

» বিমানবন্দরে লাগেজ চুরি ঠেকাতে লাইভ সিসিটিভির দাবিতে লিগ্যাল নোটিশ

» কুষ্টিয়ায় ৬ হত্যা হানিফসহ আ.লীগের ৪ নেতার সর্বোচ্চ সাজা চাইল প্রসিকিউশন

» ‘ক্ষমতা’র সুযোগ পেয়ে ‘ধন্য’ কোয়েল

» কমলো সোনার দাম

» গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করার কোনো ইচ্ছা সরকারের নেই : তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী

» নানার বাড়ি বেড়াতে গিয়ে পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু

» বড় ভাইয়ের লাঠির আঘাতে ছোট ভাইয়ের মৃত্যু

» বাসচাপায় স্বামী-স্ত্রী নিহত

» সিদ্ধিরগঞ্জে রেলওয়ের জমিতে উচ্ছেদ অভিযান

 

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ,

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন,

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

 

ইমেল: dhakacrimenewsbd@gmail.com

ফোন নাম্বার : ০১৫৩৫১৩০৩৫০,

Desing & Developed BY PopularITLtd.Com
পরীক্ষামূলক প্রচার...

রাজনৈতিক দল যেন বিচারাধীন বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করে

ছবি সংগৃহীত

 

অদিতি করিম:  সাবেক সংসদ সদস্য ও জামায়াত নেতা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের ঘটনাপ্রবাহে যেমন কিছু ইতিবাচক দিক বেরিয়ে এসেছে, তেমনি কিছু বিষয় সাধারণ নাগরিকদের উদ্বিগ্ন করেছে। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সংঘটিত ঘটনাটি সবাই জানেন।

গত বৃহস্পতিবার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লাগেজ পেতে দেরি হওয়ায় কর্মকর্তাদের শাসান মেজর আখতার। ছড়িয়ে পড়া ভিডিও অনুযায়ী, ট্রলি পেতে দেরি হওয়ায় তিনি কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমি কিন্তু পেটাবো ধইরা’, ‘গেট আউট ফ্রম হিয়ার’, ‘ঘাড় ধরে বের করে দিব’, ‘কাজ জানেন না, তদবির করে পোস্টিংয়ে আসবেন’, ‘মাইর খাইতে চান?’। অপর একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, আখতার জমজম কূপের পানির জার একটি ট্রলি থেকে ফেলে দিচ্ছেন।

আখতারুজ্জামান একজন সম্মানিত ও দায়িত্বশীল নাগরিক। তিনি কিশোরগঞ্জ-২ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে টানা দুবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। একাদশ সংসদের প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনে তিনি ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নৌকার প্রার্থীর কাছে হেরে যান। এরপর ২০২৪ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে পরাজিত হন। তিনি একসময় কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি ছিলেন। দলীয় শৃঙ্খলাপরিপন্থী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ২০২২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি তাঁকে পঞ্চমবারের মতো বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়। তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে গত ১৩ ডিসেম্বর জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন।

এরকম একজন ব্যক্তি বিমানবন্দরে যে আচরণ করেছেন, তা অত্যন্ত দুঃখজনক ও অনাকাঙ্ক্ষিত। আমরা জানি, বিমানবন্দরে অনেক সমস্যা আছে। বিশেষ করে একজন যাত্রী নামার পর তাঁর লাগেজ পেতে নানা ভোগান্তির সংবাদ প্রায়ই গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। কিন্তু একজন রাজনৈতিক নেতার প্রতিবাদের ধরন এ রকম হওয়া উচিত নয়। একজন সরকারি কর্মচারীর সঙ্গে এ ধরনের আচরণ কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

বিমানবন্দরের সমস্যা দীর্ঘদিনের। এই সমস্যার পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। একজন ব্যক্তি এজন্য দায়ী নন। আখতারুজ্জামানের ঘটনাটিও তাই বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। একজন সরকারি কর্মচারীকে গালমন্দ করলে কিংবা তাঁকে পেটানোর হুমকি দিলেই রাতারাতি এই সমস্যার সমাধান হবে না।

তাছাড়া, এই জামায়াত নেতা যে ভাষায় কথা বলেছেন, তা কেবল দুঃখজনক নয়, ফৌজদারি অপরাধ। একজন নাগরিক অন্য নাগরিককে পেটানোর হুমকি দিতে পারেন না। সরকারি কাজে বাধা দেওয়াও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তাই আখতারুজ্জামান কেবল ক্ষমতার দম্ভ দেখাননি, তিনি ফৌজদারি অপরাধ করেছেন।

আমাদের সমাজে প্রায়ই দেখা যায়, প্রভাবশালী ব্যক্তিরা এ ধরনের ঘটনা ঘটান। সব জায়গায় তাঁরা অগ্রাধিকার চান। তাঁদের সমস্যা হলেই তাঁরা হুমকি দেন, খারাপ ব্যবহার করেন। এটা অনুচিত হলেও সরকার বা কর্তৃপক্ষ তা উপেক্ষা করে। কিন্তু আমাদের সংবিধানে বলা হয়েছে, আইন সবার জন্য সমান। একজন রাজনীতিবিদ কিংবা সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তি আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পারেন না। আইন অমান্য করতে পারেন না।

আইনের এই সাম্যের নীতি আমাদের দেশে অতীতে অনুসরণ করা হয়নি। সমাজে উঁচু তলার মানুষরা যেন আইনের ঊর্ধ্বে থাকতেন। আইন যেন শুধু সাধারণ নাগরিকদের জন্য। কিন্তু বর্তমান সরকার সেই অবস্থার পরিবর্তন আনতে চাইছে। এজন্যই তারেক রহমান অন্যায় করার জন্য তাঁর দলের বহু নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। এমনকি দলের সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রেক্ষিতে তাঁকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন।

বিমানবন্দরে আখতারুজ্জামানের ঘটনাটিকেও সরকার উপেক্ষা করেনি। প্রকাশ্যে এ ধরনের মব, উচ্ছৃঙ্খল আচরণ এবং হুমকির বিরুদ্ধে স্বাভাবিক আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছে সরকার। এটাই কাম্য। আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে মামলা করা হয় এবং সেই মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এটি কোনো রাজনৈতিক ইস্যু নয়। রাজনৈতিক কারণে নয়, বরং সুনির্দিষ্ট ফৌজদারি অপরাধের কারণে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

তাই আমরা সাধারণ নাগরিকরা আশা করেছিলাম, আইন তার স্বাভাবিক গতিতে চলবে। এই আইনি প্রক্রিয়ায় কোনো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বা চাপ সৃষ্টি করা হবে না। বিশেষ করে আখতারুজ্জামান যে রাজনৈতিক দলের নেতা, সেই দলের পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়, একজন ব্যক্তির অপরাধের দায় দল নেবে না। এই দলের একজন সংসদ সদস্য একটি নারীঘটিত অপকর্মে জড়িয়ে পড়লে তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। তাই আমরা আশা করেছিলাম, এই ঘটনাটিতে জামায়াত হস্তক্ষেপ করবে না। তারা আইনকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দেবে।

কিন্তু আমরা হতাশ হয়েছি। জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, দুইবারের সাবেক সংসদ সদস্য ও একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানকে জনসমক্ষে অপমানিত করার নানা হীন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

রবিবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে ডা. শফিকুর রহমান এ কথা বলেন। ‘কোনো মানুষই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়’ শিরোনামে ফেসবুকে পোস্ট দেন জামায়াতের আমির।

তিনি পোস্টে লিখেছেন, আখতারুজ্জামান বিমানবন্দরে যাত্রীসাধারণের দুর্ভোগ-ভোগান্তি, কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা, অনিয়ম-অন্যায় কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছেন। কার্যত তিনি ভুক্তভোগী যাত্রীসাধারণ, বিশেষ করে বিদেশফেরত প্রবাসীদের প্রতিবাদের কণ্ঠে পরিণত হয়েছেন।

বিচারাধীন একটি মামলা নিয়ে জাতীয় সংসদের বিরোধী দলের নেতা যদি আগেই বক্তব্য দিয়ে দেন, তাহলে তো তা বিচারাধীন বিষয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপ হয়ে যায়। এর ফলে সঠিক বিচার বাধাগ্রস্ত হবে। বিরোধী দলের নেতা একজন দায়িত্বশীল নেতা। তিনি দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে প্রায়ই দেশের জনগণের স্বার্থে কথা বলেন। তাঁর দলের একজন নেতার আইনবহির্ভূত আচরণের বিষয়ে তাঁর কাছে দেশের জনগণ নিরপেক্ষ আচরণ আশা করেছিল।

বিষয়টি এখন আইন ও আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হওয়াটাই বাঞ্ছনীয়। আখতারুজ্জামান বিমানবন্দরে যা করেছেন, তা মব। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এখতিয়ার কারও নেই। এই প্রতিবাদ আরও রুচিশীল ও মার্জিত ভাষায় করা যেত। তাই বিষয়টি রাজনৈতিক নয়।

আমাদের দেশের জনগণের মধ্যে একটি ধারণা আছে যে, রাজনীতিবিদরা অন্যায় করলে তাঁদের বিচার হয় না। এর ফলে রাজনীতি সম্পর্কেই মানুষের মধ্যে একটি নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে। এই ধারণা পরিবর্তন না করতে পারলে গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে না। এজন্য রাজনীতিবিদরা অন্যায় বা অপরাধ করলে তাঁদের রক্ষার জন্য যেন রাজনৈতিক দলগুলো মাঠে না নামে, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

অপরাধীদের একটাই পরিচয়—তারা অপরাধী, তারা কোনো দলের নয়—এই মানসিকতার চর্চা করতে হবে সব রাজনৈতিক দলকে। তাহলেই আমরা সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারব।

তাই আমরা আশা করি, আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ স্বাভাবিক আইনি প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি হবে। সরকার এবং বিরোধী দল কেউই চলমান মামলায় কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করবে না। এটাই আইনের শাসনের মূল ভিত্তি।

অদিতি করিম: লেখক ও নাট্যকার
ইমেইল: auditekarim@gmail.com । সূএ: বাংলাদেশ প্রতিদিন

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



সর্বাধিক পঠিত



 

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ,

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন,

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

 

ইমেল: dhakacrimenewsbd@gmail.com

ফোন নাম্বার : ০১৫৩৫১৩০৩৫০,

Design & Developed BY ThemesBazar.Com