ছবি সংগৃহীত
অনলাইন ডেস্ক : ইরান যুদ্ধ শুরুর আগেই তখনকার মার্কিন জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক তুলশি গ্যাবার্ড মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সম্ভাব্য যুদ্ধের পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়েছিলেন।
যুদ্ধ শুরুর কয়েকদিন আগে তুলশি হ্যাবার্ড ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এক ব্রিফিঙে বলেছিলেন, ইউএস ইন্টেলিজেন্স সঠিকভাবে পূর্বাভাস দিয়েছে যে ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা করা হলে সম্ভবত একটি আরও কট্টরপন্থী শাসনব্যবস্থার সূত্রপাত হবে, যারা পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনে আগ্রহী।
মঙ্গলবার মার্কিন গণমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে গোয়েন্দাদের পূর্বাভাসের কথা তুলে ধরা হয়েছে। তবে মার্কিন গোয়েন্দাদের পূর্বাভাসকে পাত্তা না দিয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর উস্কানিতে ইরান যুদ্ধে জড়িয় পড়েন ট্রাম্প।
নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে বোঝাতে পেরেছিলেন, ইরান এখন সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় আছে। এখন হামলা করলে ইরানের শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা সম্ভব এবং ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র বানানোর প্রক্রিয়া থেকে সরিয়ে আনাও সম্ভব। তাতে ডোনাল্ড ট্রাম্প শান্তির দূত হিসেবে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হবেন।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর সময় ট্রাম্পের ধারণা ছিল ছয় সপ্তাহের মধ্যে যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটানো সম্ভব হবে। কিন্তু ছয় মাস পরও যুদ্ধের সমাপ্তি দেখা যাচ্ছে না। বরং যত দিন যাচ্ছে, মার্কিন গোয়েন্দাদের পূর্ভাবাস অক্ষরে অক্ষরে সত্যি প্রমাণিত হচ্ছে। আর যুত্তরাষ্ট্র জড়িয়ে পড়ছে একের পর এক ভুলে জালে।
ট্রাম্প ইসরায়েলের যুদ্ধের লক্ষ্যকে সমর্থন করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার কয়েক দিন আগে, তার তৎকালীন গোয়েন্দা প্রধান তুলশি গ্যাবার্ড আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থার মূল্যায়নগুলো তুলে ধরে ট্রাম্পকে সতর্ক করে বলেছিলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের পক্ষ থেকে সামরিক উত্তেজনা বাড়ালে ইরান বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে অস্থিতিশীল করে তোলার চেষ্টা করবে এবং হরমুজ প্রণালী বন্ধ করতে তড়িঘড়ি করবে।
গ্যাবার্ড সতর্ক করেছিলেন, তেহরান মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন মার্কিন সেনা এবং তাদের অংশীদারদের ওপর আঘাত হানার পথ বেছে নেবে, যা মিত্রদের কাছে আমেরিকার সংকল্প ও নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলবে।
অনুরূপ সতর্কবার্তা ট্রাম্প তার অন্যান্য শীর্ষ সামরিক নেতাদের কাছ থেকেও পেয়েছিলেন। তারা তাকে বলেছিলেন, একটি যুদ্ধের ফলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হবে, অস্ত্রের মজুদ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হবে এবং অতিরিক্ত চাপে থাকা বাহিনীর প্রস্তুতিতে সমস্যা দেখা দেবে। মার্কিন গোয়েন্দাদের সমস্ত সতর্কবার্তাই এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অচলাবস্থায় পরিণত হয়েছে।
ইরানে কট্টরপন্থী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস-আইআরজিসি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন এবং হরমুজ প্রণালীর মধ্য দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। হামলার প্রথম দিনেই ইরানের শীর্ষ ধর্মীয় নেতা আলী খামেনি মারা গেলেও তার ছেলের মোজতবা খামেনি নেতৃত্বধীন নতুন শাসনব্যবস্থায় নতি স্বীকারের কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না। এই দীর্ঘায়িত অচলাবস্থার কারণে ট্রাম্প প্রশাসন এখন কোনো পারমাণবিক চুক্তি ছাড়াই, কেবল এই হরমুজ প্রণালী খুলে দিতে পারাকেই নিজেদের বিজয় বলে ভাবছে, যদিও সেটাও এখন সুদুর পরাহতই মনে হচ্ছে।
গোয়েন্দাদের সতর্কবার্তা আমলে না নেয়ার পরিণতি এখন কড়ায় কন্ডায় গুনতে হচ্ছে ট্রাম্পকে। প্রায় ছয় মাস ধরে চলা এই যুদ্ধ আমেরিকার গোলাবারুদের মজুদও খালি করে ফেলেছে বলে জানা গেছে। ফলে ট্রাম্প এখন ইরানের অর্থনীতিকে গুঁড়িয়ে দিতে নিষেধাজ্ঞা এবং স্থায়ী অবরোধের ওপর নির্ভর করে একটি ‘অপেক্ষা করো এবং দেখো’ কৌশল অবলম্বন করছেন ট্রাম্প। তিনি যুক্তি দেখাচ্ছেন যে, তার এই কৌশল ইসলামিক শাসনব্যবস্থাকে তার পায়ে এসে লুটিয়ে পড়তে বাধ্য করবে।
তবে এই যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তেলের মজুদ কমে গেছে। যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ১৮ জন মার্কিন সেনাসহ ৩ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এটি এখন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রিপাবলিকানদের জয়ের সম্ভাবনাকে কঠিন করে তুলছে। ট্রাম্পের আর শান্তির দূত হওয়া হয়নি বরং ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা এখন প্রেসিডেন্ট মেয়াদের সর্বনিম্ন স্তরে নেমে এসেছে।
হোয়াইট হাউসের কিছু প্রাক্তন কর্মকর্তা এবং জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের বিশ্বাস, ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি চিরতরে পুরোপুরি বন্ধ করার কোনো সহজ চুক্তি পাওয়ার পথ নেই। নিউক্লিয়ার থ্রেট ইনিশিয়েটিভ-এর ডেপুটি ভাইস প্রেসিডেন্ট এরিক ব্রুয়ার, যিনি ডেমোক্র্যাট এবং রিপাবলিকান উভয় প্রশাসনেই কাজ করেছেন, ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে বলেন, ‘এসব কিছুরই পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব ছিল এবং পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘কোনো স্পষ্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছাড়াই এই যুদ্ধ শুরু করা হয়েছিল; এই অকাট্য সত্য থেকে শুরু করে যুদ্ধ শেষ করার প্রচেষ্টায় ভুলভাবে পরিচালিত কূটনীতি পর্যন্ত আপনি একটি স্পষ্ট যোগসূত্র খুঁজে পাবেন।’








