তার মতে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে চলমান অচলাবস্থা মূলত একটি উচ্চঝুঁকির ‘অর্থনৈতিক চিকেন গেম’, যেখানে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রই পিছু হটতে পারে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে গিন্সবার্গ বলেন, ইরানের ওপর সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের নীতি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নতুন নয়। তবে বর্তমান পরিস্থিতি আগের যেকোনও সময়ের চেয়ে ভিন্ন। কারণ, এখন কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি সরাসরি সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এবং ইরান তার অর্থনীতি সচল রাখতে প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকেও কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
গিন্সবার্গের ভাষায়, “হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি এই সংঘাতের মধ্যে চলে এসেছে। একই সঙ্গে ইরান তার অর্থনীতি টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকেও পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন।”
তবে তার সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো- ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের পর যুক্তরাষ্ট্রের সামনে আসলে কী ধরনের সমাধানের পরিকল্পনা রয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। তার মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের বর্তমান নীতিতে একটি সুস্পষ্ট চূড়ান্ত লক্ষ্য দেখা যাচ্ছে না।
“এই প্রশাসনের কোনও শেষ লক্ষ্য আছে- এমন পরিস্থিতি আমরা দেখছি না। প্রেসিডেন্ট আসলে কী করতে পরিকল্পনা করছেন, তা আমরা জানি না,” বলেন গিন্সবার্গ।
তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত যে বিষয়টি সবচেয়ে স্পষ্ট, তা হলো ট্রাম্প প্রশাসন দীর্ঘমেয়াদি চাপ ও সহনশীলতার একটি অভিযানে নেমেছে।
গিন্সবার্গ এই কৌশলকে অভিহিত করেছেন ‘অভূতপূর্ব সহনশীলতার অভিযান’ হিসেবে।
অর্থনৈতিক চাপেই কি নত হবে ইরান?
ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা, বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহে বাধা এবং গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও জ্বালানি পথ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তেহরানকে চাপের মুখে ফেলার চেষ্টা করছে ওয়াশিংটন। কিন্তু শুধু অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে ইরানকে তার অবস্থান পরিবর্তনে বাধ্য করা যাবে কি না, তা নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করেছেন গিন্সবার্গ।
তিনি বর্তমান পরিস্থিতিকে দুই পক্ষের মধ্যে একটি উচ্চঝুঁকির মুখোমুখি অবস্থানের সঙ্গে তুলনা করেন। তার মতে, দুই পক্ষই নিজেদের অবস্থানে অনড় থেকে দেখছে- সংঘর্ষ অনিবার্য হওয়ার আগে কে আগে সরে দাঁড়ায়।
“এটি অনেকটা অর্থনৈতিক ‘চিকেন গেম’-এর মতো। সংঘর্ষের আগে দুই পক্ষের মধ্যে কে রাস্তার পাশ থেকে সরে যাবে- সেটিই প্রশ্ন,” বলেন তিনি।
গিন্সবার্গের আশঙ্কা, শেষ পর্যন্ত ইরান নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনই আগে সমঝোতার পথে যেতে বাধ্য হতে পারে।
“আমার মনে হয়, শেষ পর্যন্ত ইরান সরকার পিছু হটার আগে ট্রাম্প প্রশাসনই নতি স্বীকার করবে,” বলেন সাবেক এই মার্কিন রাষ্ট্রদূত।
হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব
গিন্সবার্গের মন্তব্যের পেছনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো হরমুজ প্রণালির কৌশলগত গুরুত্ব। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ এই প্রণালি দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে যায়। ফলে প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে যেকোনও বড় ধরনের সংকট বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে।
ইরান দীর্ঘদিন ধরেই হরমুজ প্রণালিকে তার কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপ যত বাড়ছে, ততই এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথকে ঘিরে উত্তেজনাও বাড়ছে।
এ অবস্থায় ওয়াশিংটনের জন্য চ্যালেঞ্জ শুধু ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বজায় রাখা নয়; একই সঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা এবং সম্ভাব্য আঞ্চলিক সংঘাত এড়ানোও জরুরি হয়ে উঠেছে।
‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতির সীমাবদ্ধতা
ইরানের বিরুদ্ধে ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতি ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। এর লক্ষ্য হলো অর্থনৈতিকভাবে তেহরানকে এমন অবস্থায় নিয়ে যাওয়া, যাতে দেশটির সরকার তার পররাষ্ট্রনীতি ও নিরাপত্তা নীতিতে ছাড় দিতে বাধ্য হয়।
তবে গিন্সবার্গের বক্তব্য থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, অর্থনৈতিক চাপ যতটা দ্রুত ইরানকে নত করবে বলে ওয়াশিংটন আশা করছে, বাস্তবে পরিস্থিতি ততটা সরল নয়। দীর্ঘমেয়াদি চাপের মুখেও ইরান যদি তার কৌশলগত অবস্থান ধরে রাখে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রকেই বিকল্প পথ খুঁজতে হতে পারে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি, জ্বালানি সরবরাহ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলো এই অচলাবস্থাকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফলে অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমে ইরানকে চাপে ফেলার পাশাপাশি সেই চাপের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সামাল দেওয়াও ওয়াশিংটনের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গিন্সবার্গের মূল্যায়ন অনুযায়ী, বর্তমান সংকটে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো একটি সুস্পষ্ট সমাপ্তি-কৌশলের অভাব। চাপ প্রয়োগের পর কীভাবে আলোচনায় ফিরবে, কোন শর্তে সমঝোতা হবে এবং শেষ পর্যন্ত কী ধরনের রাজনৈতিক সমাধান চায়- এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর না থাকলে দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক চাপ উল্টো যুক্তরাষ্ট্রের ওপরই কৌশলগত চাপ তৈরি করতে পারে। সূত্র: আল-জাজিরা








