তিনি বলেন, “ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র- দুই পক্ষই আলোচনায় ফেরার সম্ভাব্য প্রবেশমূল্য নির্ধারণ করছে।”
কামেলের মতে, উভয় পক্ষই সর্বাত্মক যুদ্ধ এড়িয়ে চলতে চায়। কিন্তু একই সঙ্গে নিজ নিজ দেশের জনগণের সামনে দুর্বল হিসেবে হাজির হওয়ার ঝুঁকিও কোনও পক্ষ নিতে পারছে না। ফলে কূটনৈতিক সমঝোতার পথ খোলা থাকলেও প্রকাশ্যে কঠোর অবস্থান বজায় রাখছে ওয়াশিংটন ও তেহরান।
আলোচনার আগে শক্ত অবস্থান
কামেল মনে করেন, বর্তমান অচলাবস্থার অন্যতম কারণ হলো দুই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান- উভয় দেশের নেতৃত্বকেই নিজেদের জনগণের কাছে দৃঢ় অবস্থান তুলে ধরতে হচ্ছে।
এর ফলে আলোচনার টেবিলে বসার আগে প্রতিপক্ষের কাছ থেকে কী ধরনের ছাড় আদায় করা হবে, তার একটি প্রাথমিক কাঠামো তৈরির চেষ্টা চলছে।
অর্থাৎ, বর্তমান উত্তেজনা পুরোপুরি কূটনৈতিক পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত নয়। বরং সম্ভাব্য আলোচনার আগে দুই পক্ষই নিজেদের দর-কষাকষির অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে।
ইরানের ‘সার্বভৌম প্রতিরোধ’ ভাবনা
বর্তমান সংকট বুঝতে ইরানের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতাকেও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি বলে মনে করেন কামেল।
তার মতে, অনেক ইরানি বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘সার্বভৌম প্রতিরোধ’-এর দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেন। অর্থাৎ, বিদেশি চাপের মুখে দেশের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার বিষয়টি ইরানের জনগণের একটি বড় অংশের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ফলে যেকোনও কূটনৈতিক আলোচনায় এই বিষয়টি উপেক্ষা করা হলে সমঝোতার সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
কামেলের মতে, ইরানের সঙ্গে আলোচনায় শুধু পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা বা সামরিক ইস্যু বিবেচনা করলেই হবে না; বরং তেহরানের নিরাপত্তাবোধ, সার্বভৌমত্বের ধারণা এবং দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতাকেও আলোচনার অংশ করতে হবে।
নাকভির তেহরান সফর কতটা প্রভাব ফেলবে?
এদিকে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভির তেহরান সফর নিয়েও মন্তব্য করেছেন কামেল।
তার মতে, পাকিস্তানসহ তৃতীয় কোনও পক্ষ মধ্যস্থতা করে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করলেও মূল কাঠামোগত সমস্যাগুলো সমাধান না হলে তাদের প্রভাব খুবই সীমিত থাকবে।
অর্থাৎ, কেবল বার্তা আদান-প্রদান বা সাময়িক উত্তেজনা প্রশমনের উদ্যোগ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বিরোধের মৌলিক কারণগুলো নিয়ে সমঝোতা প্রয়োজন।
পাকিস্তান সাম্প্রতিক সময়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছে। তবে এই ধরনের উদ্যোগ সফল করতে হলে দুই পক্ষকেই আলোচনায় বাস্তবসম্মত ছাড় দেওয়ার মানসিকতা দেখাতে হবে।
যুদ্ধ জেতার চেয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা কঠিন
কামেলের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এমন একটি সমঝোতায় পৌঁছানো, যাতে উভয় পক্ষই নিজেদের স্বার্থ রক্ষা হয়েছে বলে মনে করতে পারে।
তিনি বলেন, “যুদ্ধ জেতার চেয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা অনেক বেশি কঠিন।”
এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি মূলত বোঝাতে চেয়েছেন, সামরিক শক্তি দিয়ে প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলা তুলনামূলকভাবে সহজ হলেও দীর্ঘস্থায়ী শান্তির জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সমঝোতা, পারস্পরিক আস্থা এবং কঠিন আপস।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অচলাবস্থাও সেই কঠিন বাস্তবতারই প্রতিফলন। দুই পক্ষই একে অপরকে ছাড় দিতে বাধ্য করতে চাপ বাড়াচ্ছে, কিন্তু একই সঙ্গে এমন পর্যায়ে যেতে চাইছে না, যেখানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়ে সর্বাত্মক যুদ্ধে রূপ নেয়।
ফলে সামনের দিনগুলোতে কূটনৈতিক দর-কষাকষির পাশাপাশি সামরিক ও রাজনৈতিক চাপও অব্যাহত থাকতে পারে। আর শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিলে ফিরতে হলে দুই পক্ষকেই নিজেদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অবস্থান এবং অপর পক্ষের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের উদ্বেগ- দুটিই বিবেচনায় নিতে হবে। সূত্র: আল-জাজিরা








