ভোগ্যবস্তুতে পরিণত কেন নারী-শিশু

ছবি সংগৃহীত

 

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী :  হিংস্রতা, মানুষের পশু প্রবৃত্তি মাত্রা ছাড়াচ্ছে। ঘরের ভিতরে তিন মাস বয়সের শিশুর বিপদের খবরও বড় খবরের অংশ বটে। তবে তাই বলে তা কিন্তু ছোট খবর নয়। যেমন এই খবরটি, যার শিরোনাম ‘বাচ্চারে থামা, নইলে মাইরা ফালামু।’ ভিতরের খবর, আওয়াজটি শুধু হুমকি ছিল না, ঘটনাটি সত্যি সত্যি ঘটেছে। ঢাকার মিরপুরের বর্ধনবাড়ি এলাকায় মায়ের পাশে শুয়ে শিশুটি কান্নাকাটি করছিল। তাতে যুবক স্বামীটির ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। বিরক্ত হয়ে তিনি শিশুটির মাকে ধমক দিয়ে শিশুর কান্না থামাতে বলেন। শিশুসন্তানের কান্না থামাতে মা প্রাণপণ চেষ্টা করেন, সফল হননি। ওই ব্যক্তি তখন শিশুটিকে সত্যি সত্যি গলা টিপে মেরে ফেলেন। যুবকটি ইতিঃপূর্বে মাদক মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। ঘটনার এক সপ্তাহ আগে জামিনে ছাড়া পান এবং তিন মাসের সন্তানসহ মেয়েটিকে বিয়ে করেন। পরবর্তী ঘটনা সংবাদ হয়েছে গণমাধ্যমে।

ইতালিপ্রবাসী বড় ভাই খুন করেছেন আপন ছোট ভাইকে এবং খুনের ছবি ভিডিওতে ধারণ করে পাঠিয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশে, পরিবারের সদস্যদের কাছে। কারণ অন্য কিছু নয়, ভাইয়ে ভাইয়ে বিরোধ। বড় ভাই হুমায়ূন কবির ইতালিতে যান ১১ বছর আগে। ছোট ভাইকেও তিনি-ই সেখানে নিয়ে যান, ৩ বছর হবে। বড় ভাই হুমায়ূনের দুই স্ত্রী। প্রথম স্ত্রীকে তালাক দিলে ছোট ভাই নয়ন আপত্তি করেন। বড় ভাইকে নয়ন যে টাকা দিয়েছিলেন, তা-ও ফেরত চান। ছোট ভাইয়ের বড় রকমের এই স্পর্ধা বড় ভাইয়ের পক্ষে হজম করা কঠিন হওয়াতেই ছোট ভাইকে তিনি খুন করেন। মুন্সিগঞ্জ নিবাসী তাদের পিতা দেলোয়ার ফকির স্বভাবতই পুত্র-হত্যার বিচার চেয়েছেন। কিন্তু কার কাছে? উল্লেখ্য ওই পিতার একমাত্র কন্যার স্বামীও থাকেন ইতালিতে।

স্ত্রী ও দুই ছেলেকে নিজ হাতে হত্যা করেছেন অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী এক বাংলাদেশি। তবে পালাননি, নিজেই খবর দিয়েছেন পুলিশকে। বয়স তার ৪৭। না, স্ত্রীর কোনো অপরাধ ছিল না। অপরাধ ছিল তাদের দুই ছেলেরই। যাদের একজনের বয়স ৫, অন্যজনের ১২। জন্মাবধি তারা অসুস্থ ছিল; আক্রান্ত ছিল অটিজমে। ঘটনা সিডনি শহরের। ধারণা করা হচ্ছে যে বাংলাদেশি ভদ্রলোক অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ারই আরেক শহর, পার্থে-ঘটা একটি দৃষ্টান্তের দ্বারা। গত জানুয়ারিতে ঘটনাটি ঘটে। অস্ট্রেলিয়ান এক দম্পতি তাদের দুই অটেস্টিক পুত্র (বয়স ১৪ ও ১৬) হত্যা করেন। অসুস্থ সন্তানের দায়ভার সারা জীবন বহন করাতে নিশ্চয়ই তাদেরও আপত্তি ছিল। অনুপ্রেরণাদানকারী এবং অনুপ্রাণিত দুই ঘটনার ভিতর অবশ্য কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। অস্ট্রেলিয়ান দম্পতি সন্তান-হত্যার পর আর জীবিত থাকেনি। আত্মহত্যা করে পুত্র-হত্যাজনিত গ্লানির অবসান ঘটিয়েছে। তুলনায় বাংলাদেশির ঘটনাটি যে কিছুটা উন্নত কিংবা মানবেতর; সেটা না-মেনে উপায় নেই।

পাশাপাশি খবর এই রকমের যে কাপাসিয়ার ফোরকান মিয়া তার স্ত্রী, তিন কন্যাসন্তান ও শ্যালককে (অর্থাৎ মোট পাঁচজনকে) নেশাজাতীয় দ্রব্যের সাহায্যে ঘুম পাড়িয়ে নিজ হাতে জবাই করেন। তার অভিযোগ স্ত্রী পরকীয়ায় লিপ্ত ছিলেন; এবং প্রেমিকের মাধ্যমে ফোরকানের কষ্টার্জিত টাকা বেহাত হয়ে যেত। এ নিয়ে তিনি নাকি স্ত্রীর বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগও করেন। তবে ফোরকান নিজেও যে মাদকাসক্ত ছিলেন তার প্রমাণ পাওয়া গেছে।

নওগাঁর খবর। সেখানে দুই সন্তানসহ এক দম্পতির রক্তাক্ত লাশ পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে যে হত্যাকাণ্ডের কারণ জমিজমার ভাগাভাগি নিয়ে পারিবারিক বিরোধ। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিহত হাবিবুর রহমানের পিতা, দুই বোন ও এক বোনের ছেলেকে হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ।

ওদিকে গণপিটুনিও চলছে। মানিকগঞ্জে শিশুহত্যার ঘটনায় গণপিটুনিতে নিহত হয়েছে দুজন। সেই সঙ্গে একজন গুরুতর আহত। ঘটনার বিবরণ এই রকমের : বনপারিল গ্রামের মুকুল মিয়ার ৯ বছর বয়সি কন্যা আতিকা গিয়েছিল প্রতিবেশী এক পরিবারের বিয়েবাড়িতে। বিকালবেলা সে বাড়িতে ফিরছিল। তার কানে ছিল স্বর্ণের দুল, গলায় স্বর্ণের চেইন। ওই দুই বস্তুর লোভেই হবে, তাকে অপহরণ করা হয়। আতিকা নিখোঁজ হয়েছে, এ খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে; মাইকিংও করা হয়। খোঁজাখুঁজিতে বাড়ির পাশের ভুট্টাখেতে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় আতিকার লাশ পাওয়া গেছে। প্রতিবেশী এক শিশু জানায় যে নাঈম (১৫) নামের এক কিশোরের সঙ্গে আতিকাকে সে দেখেছে কথা বলতে। প্রথমে অস্বীকার করলেও পরে নাঈম তার অপরাধ স্বীকার করে এবং তার দেখানো ভুট্টাখেতেই মৃত অবস্থায় আতিকাকে পাওয়া যায়। পুলিশ অভিযুক্ত পুত্র, তার পিতা ও পিতার এক ভাইকে আটক করে। খবরটি ছড়িয়ে পড়লে ক্ষিপ্ত জনতা অভিযুক্ত নাঈমদের বাড়ি ঘেরাও করে। গণপ্রহারে নাঈমের পিতা অটোরিকশাচালক পান্নু মিয়া (৪৫) ও তার ভাই ফজলু মিয়া (২৮) নিহত হন। অভিযুক্তের এক ভাইও গুরুতর আহত। নাঈম হেফাজতে রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের প্রয়োজন পড়েছিল।

গত ২৬ মে বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত কয়েকটি খবর ছিল এই রকম : ১. চুয়াডাঙ্গায় এক যুবকের (২১) দ্বারা সত্তর-উত্তীর্ণ বৃদ্ধা ধর্ষিত। মহিলা নিজেই মামলা করেছেন। বেড়াতে গিয়েছিলেন তিনি মেয়ের বাড়িতে। ফেরার সময় ভ্যানগাড়ি থেকে নামেন শহরের এক হাসপাতালের সামনে। রাত তখন ১২টা হবে। তার সঙ্গে তরকারি ও মাংসে ভরা একটি ব্যাগ ছিল। পরিচিত এক যুবক এগিয়ে আসেন ব্যাগটি বহন করে মহিলাকে বাসায় পৌঁছে দেবেন এই প্রস্তাব নিয়ে। মহিলা সম্মত হন। পরবর্তী ঘটনা সম্পর্কে মহিলার অভিযোগ একা পেয়ে যুবকটি তাকে ধর্ষণ করেন। অভিযুক্ত যুবকটিকে যথারীতি আটক করেছে পুলিশ। ২. যশোরের কেশবপুরে প্রতিবেশীর বাড়িতে টিভি দেখতে গিয়েছিল এক শিশু। সেখানেই সে ধর্ষিত হয়েছে। ৩. নাটোরে সপ্তম শ্রেণির এক ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে আটক করা হয়েছে দুজনকে। তারা পরস্পর পিতা এবং পুত্র। মেয়েটির বাড়ির পাশের দোকানে কাজ করত পিতা ও পুত্র দুজনেই। রাতে নিজেদের বাড়িতে মেয়েটি একাই ছিল। সেই সুযোগে পিতা মেয়েটির ঘরে ঢোকে এবং তাকে ধর্ষণ করে। পরের দিন সকালে দোকানে কাজে এসে তার পুত্রও মেয়েটির একাকিত্বের সুযোগ নেয়। এবং আগের রাতে বাবা যা করেছে সকালে ছেলেও সে কাজই সম্পন্ন করেন। [পিতার পথ ধরে আগুয়ান হতে পুত্রের আনুগত্যে কোনো ঘাটতি দেখা যায়নি।] ৪. গাজীপুরের শ্রীপুরে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন মসজিদের এক ইমাম। স্থানীয় লোকজন ইমামকে তাঁর বাড়ি থেকে ধরে এনে পুলিশে সোপর্দ করে। ৫. হবিগঞ্জে দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ১০ বছরের এক শিশু বিকালবেলা দোকানে যাচ্ছিল। পথিমধ্যে গ্রামেরই এক বাসিন্দা তার এক সঙ্গীর সঙ্গে মিলে শিশুটিকে জঙ্গলে টেনে নিয়ে ধর্ষণ করে। শিশুটির চিৎকার শুনে লোকজন ধাওয়া করলে বীরপুরুষেরা পালিয়ে যায়। অন্য পাষণ্ডদের মতো এই দুটিও নিশ্চয়ই ধরা পড়েছে; কিন্তু ভুক্তভোগীদের যে সর্বনাশটি ঘটে গেছে তার ক্ষতিপূরণ কী কোনোভাবেই সম্ভব?

গত ৭ জুনের দুটি খবর। ময়মনসিংহের ভালুকায় সাত বছরের শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে ৮০ বছর বয়সি বৃদ্ধ গ্রেপ্তার। শিশুটি দোকানে যাচ্ছিল শ্যাম্পু কিনতে। পথিমধ্যে ফালু মিয়া তাকে ফুসলে অন্যত্র নিয়ে ধর্ষণ করে। দ্বিতীয় খবরটি গাইবান্ধার। সেখানে এক কিশোরীকে তার বাড়ির উঠান থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে চার যুবক দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করে। রাত ১২টার দিকে ওই কিশোরী নিজেদের বাড়ির উঠানে দাঁড়িয়ে মোবাইল ফোনে কথা বলছিল। চারটি যুবক পেছন থেকে এসে মুখ চেপে ধরে তাকে পার্শ্ববর্তী বিলের ধারে নিয়ে যায়। তারা তার মোবাইল ফোন কেড়ে নেয় এবং তাকে ধর্ষণ করে। কিশোরীর চিৎকারে লোকজন তাড়া করলে ধর্ষকদের তিনজন ধরা পড়ে, একজন পালিয়ে যায়।  মানিকগঞ্জের খবর, সেখানে ষাট-পেরোনো এক বৃদ্ধ ভিখারিনীক দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করা হয়েছে। ভুক্তভোগী মহিলা থানায় গিয়ে দুই যুবকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। যুবক দুটি গ্রেপ্তার হয়েছে। পরিপূরক খবরও পাওয়া যাচ্ছে। সেটির মর্মবাণী এই যে শিশুর বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার মামলার অভিযুক্তদের শতকরা ৯৮ জনের কোনো শাস্তি হয় না। সংলগ্ন অন্য একটি তথ্য, পানিতে ডুবে দেশে প্রতিদিন গড়ে ১২টি শিশুর মৃত্যু ঘটে।

শিশু ধর্ষণের সংখ্যা যে বাড়ছে সে ব্যাপারটা মোটেই তাৎপর্যহীন নয়। একটি দৈনিক পত্রিকা সাম্প্রতিক ৬৮০টি ধর্ষণের ঘটনা পর্যালোচনা করে দেখেছে, ধর্ষিতাদের ভিতর শিশুদের সংখ্যাই অধিক। বুঝতে অসুবিধা নেই যে দুর্বলের ওপর সবলের নিষ্ঠুরতা অপ্রতিহত হয়ে উঠেছে এবং ভোগবাদিতা এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যে দেখা যাচ্ছে ধর্ষকদের কাছে শিশুরা এখন আর শিশু নেই, ভোগ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। গোটা ব্যবস্থাটা যে পুরোপুরি পিতৃতান্ত্রিক তার বহু প্রমাণ ও নিদর্শনের মধ্যে এটিও একটি। পর্যালোচনায় এটাও ধরা পড়েছে যে ধর্ষকরা অনেক ক্ষেত্রেই ধর্ষিতাদের পূর্বপরিচিত। অর্থাৎ কাছের এবং দূরের ভিতর কোনো ব্যবধান নেই। নির্বিচারে ভোগ করা সম্ভব এবং পরিচিতজনদেরই শিকারে পরিণত করা সহজতর, কারণ অপ্রত্যাশিত আক্রমণে আক্রান্তরা হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। এটাও দেখা গেছে যে বহু ক্ষেত্রে মেয়েরা ধর্ষিত হচ্ছে তাদের বাসগৃহেই। অর্থাৎ মেয়েদের জন্য কোনো স্থানই এখন নিরাপদ নয়। মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীদের বিপদের দৃষ্টান্ত তো বিশ্বে রেকর্ড করেছে, পর্যবেক্ষণও সে কথা বলেছে।

♦ লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়   । সূএ: বাংলাদেশ প্রতিদিন

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



» এনসিপির জুলাই পদযাত্রার দক্ষিণাঞ্চলের শিডিউল পরিবর্তন

» একাত্তরের বিতর্কিত ভূমিকার জন্য ক্ষমা চেয়ে ঐক্যের পথে আসার আহ্বান: মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী

» পাকিস্তান ভাঙার ইচ্ছা ছিল না শেখ মুজিবের, তাই স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি: স্পিকার হাফিজ

» প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার ফল রবিবার

» দেবের কাছাকাছি হতেই স্বামী রাজের সঙ্গে ছন্দপতন শুভশ্রীর!

» ৫ আগস্ট সেনাবাহিনী চুপ থাকলে গৃহযুদ্ধ ঘটতে পারত: আব্দুল হক

» যে সম্মান আমি হারিয়েছি, রাষ্ট্র কি তার দায় নেবে?

» হরমুজ ইস্যুতে আলোচনায় জন্য ওমানে গেলেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী

» দাবিদারদের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করাই ভালো মনে করেছি: তাসনিম জুমা

» শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচার না করতে গণমাধ্যমের প্রতি সরকারের অনুরোধ

 

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ,

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন,

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

 

ইমেল: [email protected]

ফোন নাম্বার : ০১৫৩৫১৩০৩৫০,

Desing & Developed BY PopularITLtd.Com
পরীক্ষামূলক প্রচার...

ভোগ্যবস্তুতে পরিণত কেন নারী-শিশু

ছবি সংগৃহীত

 

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী :  হিংস্রতা, মানুষের পশু প্রবৃত্তি মাত্রা ছাড়াচ্ছে। ঘরের ভিতরে তিন মাস বয়সের শিশুর বিপদের খবরও বড় খবরের অংশ বটে। তবে তাই বলে তা কিন্তু ছোট খবর নয়। যেমন এই খবরটি, যার শিরোনাম ‘বাচ্চারে থামা, নইলে মাইরা ফালামু।’ ভিতরের খবর, আওয়াজটি শুধু হুমকি ছিল না, ঘটনাটি সত্যি সত্যি ঘটেছে। ঢাকার মিরপুরের বর্ধনবাড়ি এলাকায় মায়ের পাশে শুয়ে শিশুটি কান্নাকাটি করছিল। তাতে যুবক স্বামীটির ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। বিরক্ত হয়ে তিনি শিশুটির মাকে ধমক দিয়ে শিশুর কান্না থামাতে বলেন। শিশুসন্তানের কান্না থামাতে মা প্রাণপণ চেষ্টা করেন, সফল হননি। ওই ব্যক্তি তখন শিশুটিকে সত্যি সত্যি গলা টিপে মেরে ফেলেন। যুবকটি ইতিঃপূর্বে মাদক মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। ঘটনার এক সপ্তাহ আগে জামিনে ছাড়া পান এবং তিন মাসের সন্তানসহ মেয়েটিকে বিয়ে করেন। পরবর্তী ঘটনা সংবাদ হয়েছে গণমাধ্যমে।

ইতালিপ্রবাসী বড় ভাই খুন করেছেন আপন ছোট ভাইকে এবং খুনের ছবি ভিডিওতে ধারণ করে পাঠিয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশে, পরিবারের সদস্যদের কাছে। কারণ অন্য কিছু নয়, ভাইয়ে ভাইয়ে বিরোধ। বড় ভাই হুমায়ূন কবির ইতালিতে যান ১১ বছর আগে। ছোট ভাইকেও তিনি-ই সেখানে নিয়ে যান, ৩ বছর হবে। বড় ভাই হুমায়ূনের দুই স্ত্রী। প্রথম স্ত্রীকে তালাক দিলে ছোট ভাই নয়ন আপত্তি করেন। বড় ভাইকে নয়ন যে টাকা দিয়েছিলেন, তা-ও ফেরত চান। ছোট ভাইয়ের বড় রকমের এই স্পর্ধা বড় ভাইয়ের পক্ষে হজম করা কঠিন হওয়াতেই ছোট ভাইকে তিনি খুন করেন। মুন্সিগঞ্জ নিবাসী তাদের পিতা দেলোয়ার ফকির স্বভাবতই পুত্র-হত্যার বিচার চেয়েছেন। কিন্তু কার কাছে? উল্লেখ্য ওই পিতার একমাত্র কন্যার স্বামীও থাকেন ইতালিতে।

স্ত্রী ও দুই ছেলেকে নিজ হাতে হত্যা করেছেন অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী এক বাংলাদেশি। তবে পালাননি, নিজেই খবর দিয়েছেন পুলিশকে। বয়স তার ৪৭। না, স্ত্রীর কোনো অপরাধ ছিল না। অপরাধ ছিল তাদের দুই ছেলেরই। যাদের একজনের বয়স ৫, অন্যজনের ১২। জন্মাবধি তারা অসুস্থ ছিল; আক্রান্ত ছিল অটিজমে। ঘটনা সিডনি শহরের। ধারণা করা হচ্ছে যে বাংলাদেশি ভদ্রলোক অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ারই আরেক শহর, পার্থে-ঘটা একটি দৃষ্টান্তের দ্বারা। গত জানুয়ারিতে ঘটনাটি ঘটে। অস্ট্রেলিয়ান এক দম্পতি তাদের দুই অটেস্টিক পুত্র (বয়স ১৪ ও ১৬) হত্যা করেন। অসুস্থ সন্তানের দায়ভার সারা জীবন বহন করাতে নিশ্চয়ই তাদেরও আপত্তি ছিল। অনুপ্রেরণাদানকারী এবং অনুপ্রাণিত দুই ঘটনার ভিতর অবশ্য কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। অস্ট্রেলিয়ান দম্পতি সন্তান-হত্যার পর আর জীবিত থাকেনি। আত্মহত্যা করে পুত্র-হত্যাজনিত গ্লানির অবসান ঘটিয়েছে। তুলনায় বাংলাদেশির ঘটনাটি যে কিছুটা উন্নত কিংবা মানবেতর; সেটা না-মেনে উপায় নেই।

পাশাপাশি খবর এই রকমের যে কাপাসিয়ার ফোরকান মিয়া তার স্ত্রী, তিন কন্যাসন্তান ও শ্যালককে (অর্থাৎ মোট পাঁচজনকে) নেশাজাতীয় দ্রব্যের সাহায্যে ঘুম পাড়িয়ে নিজ হাতে জবাই করেন। তার অভিযোগ স্ত্রী পরকীয়ায় লিপ্ত ছিলেন; এবং প্রেমিকের মাধ্যমে ফোরকানের কষ্টার্জিত টাকা বেহাত হয়ে যেত। এ নিয়ে তিনি নাকি স্ত্রীর বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগও করেন। তবে ফোরকান নিজেও যে মাদকাসক্ত ছিলেন তার প্রমাণ পাওয়া গেছে।

নওগাঁর খবর। সেখানে দুই সন্তানসহ এক দম্পতির রক্তাক্ত লাশ পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে যে হত্যাকাণ্ডের কারণ জমিজমার ভাগাভাগি নিয়ে পারিবারিক বিরোধ। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিহত হাবিবুর রহমানের পিতা, দুই বোন ও এক বোনের ছেলেকে হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ।

ওদিকে গণপিটুনিও চলছে। মানিকগঞ্জে শিশুহত্যার ঘটনায় গণপিটুনিতে নিহত হয়েছে দুজন। সেই সঙ্গে একজন গুরুতর আহত। ঘটনার বিবরণ এই রকমের : বনপারিল গ্রামের মুকুল মিয়ার ৯ বছর বয়সি কন্যা আতিকা গিয়েছিল প্রতিবেশী এক পরিবারের বিয়েবাড়িতে। বিকালবেলা সে বাড়িতে ফিরছিল। তার কানে ছিল স্বর্ণের দুল, গলায় স্বর্ণের চেইন। ওই দুই বস্তুর লোভেই হবে, তাকে অপহরণ করা হয়। আতিকা নিখোঁজ হয়েছে, এ খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে; মাইকিংও করা হয়। খোঁজাখুঁজিতে বাড়ির পাশের ভুট্টাখেতে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় আতিকার লাশ পাওয়া গেছে। প্রতিবেশী এক শিশু জানায় যে নাঈম (১৫) নামের এক কিশোরের সঙ্গে আতিকাকে সে দেখেছে কথা বলতে। প্রথমে অস্বীকার করলেও পরে নাঈম তার অপরাধ স্বীকার করে এবং তার দেখানো ভুট্টাখেতেই মৃত অবস্থায় আতিকাকে পাওয়া যায়। পুলিশ অভিযুক্ত পুত্র, তার পিতা ও পিতার এক ভাইকে আটক করে। খবরটি ছড়িয়ে পড়লে ক্ষিপ্ত জনতা অভিযুক্ত নাঈমদের বাড়ি ঘেরাও করে। গণপ্রহারে নাঈমের পিতা অটোরিকশাচালক পান্নু মিয়া (৪৫) ও তার ভাই ফজলু মিয়া (২৮) নিহত হন। অভিযুক্তের এক ভাইও গুরুতর আহত। নাঈম হেফাজতে রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের প্রয়োজন পড়েছিল।

গত ২৬ মে বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত কয়েকটি খবর ছিল এই রকম : ১. চুয়াডাঙ্গায় এক যুবকের (২১) দ্বারা সত্তর-উত্তীর্ণ বৃদ্ধা ধর্ষিত। মহিলা নিজেই মামলা করেছেন। বেড়াতে গিয়েছিলেন তিনি মেয়ের বাড়িতে। ফেরার সময় ভ্যানগাড়ি থেকে নামেন শহরের এক হাসপাতালের সামনে। রাত তখন ১২টা হবে। তার সঙ্গে তরকারি ও মাংসে ভরা একটি ব্যাগ ছিল। পরিচিত এক যুবক এগিয়ে আসেন ব্যাগটি বহন করে মহিলাকে বাসায় পৌঁছে দেবেন এই প্রস্তাব নিয়ে। মহিলা সম্মত হন। পরবর্তী ঘটনা সম্পর্কে মহিলার অভিযোগ একা পেয়ে যুবকটি তাকে ধর্ষণ করেন। অভিযুক্ত যুবকটিকে যথারীতি আটক করেছে পুলিশ। ২. যশোরের কেশবপুরে প্রতিবেশীর বাড়িতে টিভি দেখতে গিয়েছিল এক শিশু। সেখানেই সে ধর্ষিত হয়েছে। ৩. নাটোরে সপ্তম শ্রেণির এক ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে আটক করা হয়েছে দুজনকে। তারা পরস্পর পিতা এবং পুত্র। মেয়েটির বাড়ির পাশের দোকানে কাজ করত পিতা ও পুত্র দুজনেই। রাতে নিজেদের বাড়িতে মেয়েটি একাই ছিল। সেই সুযোগে পিতা মেয়েটির ঘরে ঢোকে এবং তাকে ধর্ষণ করে। পরের দিন সকালে দোকানে কাজে এসে তার পুত্রও মেয়েটির একাকিত্বের সুযোগ নেয়। এবং আগের রাতে বাবা যা করেছে সকালে ছেলেও সে কাজই সম্পন্ন করেন। [পিতার পথ ধরে আগুয়ান হতে পুত্রের আনুগত্যে কোনো ঘাটতি দেখা যায়নি।] ৪. গাজীপুরের শ্রীপুরে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন মসজিদের এক ইমাম। স্থানীয় লোকজন ইমামকে তাঁর বাড়ি থেকে ধরে এনে পুলিশে সোপর্দ করে। ৫. হবিগঞ্জে দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ১০ বছরের এক শিশু বিকালবেলা দোকানে যাচ্ছিল। পথিমধ্যে গ্রামেরই এক বাসিন্দা তার এক সঙ্গীর সঙ্গে মিলে শিশুটিকে জঙ্গলে টেনে নিয়ে ধর্ষণ করে। শিশুটির চিৎকার শুনে লোকজন ধাওয়া করলে বীরপুরুষেরা পালিয়ে যায়। অন্য পাষণ্ডদের মতো এই দুটিও নিশ্চয়ই ধরা পড়েছে; কিন্তু ভুক্তভোগীদের যে সর্বনাশটি ঘটে গেছে তার ক্ষতিপূরণ কী কোনোভাবেই সম্ভব?

গত ৭ জুনের দুটি খবর। ময়মনসিংহের ভালুকায় সাত বছরের শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে ৮০ বছর বয়সি বৃদ্ধ গ্রেপ্তার। শিশুটি দোকানে যাচ্ছিল শ্যাম্পু কিনতে। পথিমধ্যে ফালু মিয়া তাকে ফুসলে অন্যত্র নিয়ে ধর্ষণ করে। দ্বিতীয় খবরটি গাইবান্ধার। সেখানে এক কিশোরীকে তার বাড়ির উঠান থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে চার যুবক দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করে। রাত ১২টার দিকে ওই কিশোরী নিজেদের বাড়ির উঠানে দাঁড়িয়ে মোবাইল ফোনে কথা বলছিল। চারটি যুবক পেছন থেকে এসে মুখ চেপে ধরে তাকে পার্শ্ববর্তী বিলের ধারে নিয়ে যায়। তারা তার মোবাইল ফোন কেড়ে নেয় এবং তাকে ধর্ষণ করে। কিশোরীর চিৎকারে লোকজন তাড়া করলে ধর্ষকদের তিনজন ধরা পড়ে, একজন পালিয়ে যায়।  মানিকগঞ্জের খবর, সেখানে ষাট-পেরোনো এক বৃদ্ধ ভিখারিনীক দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করা হয়েছে। ভুক্তভোগী মহিলা থানায় গিয়ে দুই যুবকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। যুবক দুটি গ্রেপ্তার হয়েছে। পরিপূরক খবরও পাওয়া যাচ্ছে। সেটির মর্মবাণী এই যে শিশুর বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার মামলার অভিযুক্তদের শতকরা ৯৮ জনের কোনো শাস্তি হয় না। সংলগ্ন অন্য একটি তথ্য, পানিতে ডুবে দেশে প্রতিদিন গড়ে ১২টি শিশুর মৃত্যু ঘটে।

শিশু ধর্ষণের সংখ্যা যে বাড়ছে সে ব্যাপারটা মোটেই তাৎপর্যহীন নয়। একটি দৈনিক পত্রিকা সাম্প্রতিক ৬৮০টি ধর্ষণের ঘটনা পর্যালোচনা করে দেখেছে, ধর্ষিতাদের ভিতর শিশুদের সংখ্যাই অধিক। বুঝতে অসুবিধা নেই যে দুর্বলের ওপর সবলের নিষ্ঠুরতা অপ্রতিহত হয়ে উঠেছে এবং ভোগবাদিতা এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যে দেখা যাচ্ছে ধর্ষকদের কাছে শিশুরা এখন আর শিশু নেই, ভোগ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। গোটা ব্যবস্থাটা যে পুরোপুরি পিতৃতান্ত্রিক তার বহু প্রমাণ ও নিদর্শনের মধ্যে এটিও একটি। পর্যালোচনায় এটাও ধরা পড়েছে যে ধর্ষকরা অনেক ক্ষেত্রেই ধর্ষিতাদের পূর্বপরিচিত। অর্থাৎ কাছের এবং দূরের ভিতর কোনো ব্যবধান নেই। নির্বিচারে ভোগ করা সম্ভব এবং পরিচিতজনদেরই শিকারে পরিণত করা সহজতর, কারণ অপ্রত্যাশিত আক্রমণে আক্রান্তরা হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। এটাও দেখা গেছে যে বহু ক্ষেত্রে মেয়েরা ধর্ষিত হচ্ছে তাদের বাসগৃহেই। অর্থাৎ মেয়েদের জন্য কোনো স্থানই এখন নিরাপদ নয়। মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীদের বিপদের দৃষ্টান্ত তো বিশ্বে রেকর্ড করেছে, পর্যবেক্ষণও সে কথা বলেছে।

♦ লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়   । সূএ: বাংলাদেশ প্রতিদিন

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



সর্বাধিক পঠিত



 

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ,

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন,

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

 

ইমেল: [email protected]

ফোন নাম্বার : ০১৫৩৫১৩০৩৫০,

Design & Developed BY ThemesBazar.Com