ছবি সংগৃহীত
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী :সেদিন বৃষ্টির ভিতর রিকশাওয়ালা বলল, তার গাড়িটা ভারি ডিস্টার্ব করছে, একে বদলে নেবে পথে। রিকশার মালিকের আস্তানায় গেল, না পেয়ে মালিকের স্ত্রীকে বলে এলো, ‘বলবেন রিকশায় ডিফেক্ট আছে, রিটার্ন করতে হবে।’ নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া গেল যে সে একেবারে অশিক্ষিত নয়, কিছুটা লেখাপড়া আছে তার। কিন্তু একে কি উন্নতি বলবেন আপনি? বলবেন কি যে নবযুগ এসে গেছে বাংলাদেশে? শিক্ষিত লোকেরা এখন রিকশা চালাচ্ছে। রিকশাচালকরা শিক্ষিত হচ্ছে- এমন হলে তা-ও বুঝতাম কিন্তু শিক্ষিতরা অন্য কোনো কাজ না পেয়ে রিকশাচালক হচ্ছে- এ খবরে উল্লসিত হব কেন?
যথার্থ উন্নতি হচ্ছে বুঝতাম, যদি দেখতাম শহর থেকে রিকশা উঠে গেছে, মিনিটে মিনিটে পাওয়া যাচ্ছে বাস এবং এককালে যারা রিকশা চালাত তাদের বিকল্প ও মানবিক কর্মের সংস্থান হয়ে গেছে। চমৎকার!
তা তো হবে না। তা তো হওয়ার নয়। সংগ্রাম চলছে। চলবে। তা, চলতে থাকুক সংগ্রাম, কিন্তু ইতোমধ্যে মানুষ বসবাস করছে কোথায়? কোথায় তারা থাকে? থাকবে? বাংলা ভাষায় আমরা ঘর ও বাড়ির মধ্যে তেমন একটা তফাত করি না। যা ঘর তা-ই বাড়ি। অনেকটা ঘর নিয়ে একটা বাড়ি- এমন একটা সংজ্ঞা দাঁড় করাতে পারি হয়তো কিন্তু তা ঠিক দাঁড়িয়ে থাকে না। ঘরবাড়ি ও বাড়িঘর একাকার হয়ে যায়। ঘরের বদলে বাড়ি এবং বাড়ির বদলে ঘর ব্যবহার করা যায় খুব সহজে। বাড়িওয়ালাকে কিছুতেই ঘরওয়ালা বলা যাবে না। ভয়ে। পাছে উচ্ছেদ করে দেয়। এর বাইরে ঘরই বাড়ি হয়ে যাবে। মেয়েরা স্বামীর ঘর করে, বাড়ি করে না। মানুষের ঘরই পোড়ে, বাড়ি পোড়ে না। বাড়িটা অস্পষ্ট হতে পারে, ঘরটা খুবই নির্দিষ্ট। ‘ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো’ শেখ মুজিব বলেছিলেন একাত্তরে। বাড়িতে বাড়িতে দুর্গ গড়ার কথা বলেননি। বললে কথাটার তেমন জোর থাকত না, কথাটা যেন বাস্তবসম্মতও হতো না। না, ঘর হলেই চলে, চলে যায়, বাড়ির দরকার নেই। আমরা ঘর বাঁধতে চাই, ঘর ভাঙাকে ভীষণ ডরাই, ঘর পুড়ে গেলে সর্বস্বান্ত হয়ে পথে এসে দাঁড়াই। ঘরই বাড়ি আমাদের জন্য, কোনোমতে একটা ঘর হলেই বেঁচে যাই। তার চেয়ে বড় কিছু দরকার নেই। আমরা লোভী নই। আমরা বড়ই সংযমী জাতি।
কী অসম্ভব সামান্য আমাদের বাসগৃহগুলো। টিন দিয়ে বানিয়েছে যারা, তারা মহা সৌভাগ্যবান। লাখ লাখ মানুষ হোগলাপাতা, মুলিবাঁশ, নারকেলের ডাল- এসব দিয়ে ঘর বানিয়ে থাকে। অনেকের তা-ও নেই। খোলা আকাশের নিচে প্রকাশ্য বসবাস। একে কি স্বাধীনতা বলে? ওই স্বাধীনতা উপলক্ষে বহু মানুষ উদ্বাস্তু হয়েছে এ দেশের। সাতচল্লিশে একবার, একাত্তরে একবার। ভয়াবহ ছিল সেই দুটি ঘটনা। কিন্তু মানুষের উদ্বাস্তু হওয়া তো কেবল ওই বিশেষ দুটি সময়ের ঘটনা নয়, প্রতিনিয়ত উদ্বাস্তু হচ্ছে মানুষ। প্রতিদিন। গ্রাম থেকে শহরে আসছে কচুরিপানার মতো ভাসতে ভাসতে। কচুরিপানারও একটা সৌন্দর্য আছে, মানুষের এই অন্তহীন শোভাযাত্রায় সেই সৌন্দর্যটুকুও নেই। কোথায় যায় এত মানুষ? কোথায় থাকে? ঘরবাড়ি আছে কি? জিজ্ঞেস করার লোক নেই। উত্তর দেওয়ার লোক আরও কম। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সংবিধান বলছে, প্রতিটি নাগরিকের জন্য নিজ নিজ গৃহে নিরাপত্তা লাভের অধিকার থাকবে। অত্যন্ত সুন্দর প্রতিশ্রুতি। কিন্তু আছে কি? নিরাপত্তা পরে হবে, গৃহ আছে কি? সুন্দর, অসুন্দর, সুশ্রী, কুশ্রী, সংস্কৃতিবান, সংস্কৃতিহীন, যা-ই হোক ঠাঁই আছে কি মাথা গোঁজার? মূল প্রশ্ন তো সেটাই। সংবিধান বলছে, ‘রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হইবে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক বিকাশের মাধ্যমে উৎপাদন শক্তির ক্রমবৃদ্ধির সাধন এবং জনগণের জীবনযাত্রার বস্তুগত ও সংস্কৃতিগত মানের দৃঢ় উন্নতিসাধন, যাতে নাগরিকদের জন্য নিম্নলিখিত বিষয়সমূূহ অর্জন নিশ্চিত করা যায়। অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা’ তালিকায় আরও বিষয় আছে সেগুলো থাক, প্রাথমিক প্রয়োজনগুলো মিটেছে কি? রাষ্ট্রের যাত্রা সমাজতন্ত্রাভিমুখী হওয়ার কথা ছিল, হয়নি। আমরা জানি, আমরা এখন পুঁজিবাদী। কিন্তু এমনকি ঘোরতর পুঁজিবাদী দেশও তো মৌলিক চাহিদাগুলো মেটানোর জন্য অনেক রকম পদক্ষেপ নেয়। আমাদের এখানে নেওয়া হচ্ছে কি? অন্ন, বস্ত্র, চিকিৎসা, শিক্ষা সবই প্রয়োজন, কিন্তু বাসস্থানও তো প্রয়োজন মানুষের। সে মানুষ তো মানুষ নয়, যার কোনো আশ্রয় নেই। মানুষ পাখি হতে চায় ঠিকই, কিন্তু পাখি তো মানুষ নয়। ছিল না, হবে না কখনো। না, ঘর নেই মানুষের। ভূমিহীনের নেই, ভিক্ষুকের নেই, রোজগেরে বালকদের নেই। এমন কি সেই সরকারি কর্মচারীটিরও নেই- আগামীকাল যিনি অবসর নেবেন চাকরি থেকে। অবসর তাঁকে ব্যস্ত করবে। এমন ব্যস্ত, যা তিনি কর্মজীবনে কোনো দিন ছিলেন না। আগামীকাল অস্থির, বিপন্ন, দিগ্ভ্রান্ত হবেন তিনি, ঘরের অভাবে। ঘরের খোঁজে।
কেউ কেউ করেছে। ঘর নয়, বাড়িই করেছে বড় বড়। এক পুরুষের বাড়িঘর সেসব। সাতচল্লিশের আগে এই ঢাকা শহরে কারোই উল্লেখযোগ্য বাড়িঘর ছিল না। মা-বাবা গ্রামে থাকতেন, বড়জোর টিনের ঘরে। সাতচল্লিশের পর বাড়ি হলো কারও কারও। কারও কারও একাত্তরের পরে। সে-ও এক পুরুষের কারবার। আগের পুরুষের খোঁজ করুন, খবর পাবেন না। এসি দূরের কথা, টেলিফোনই দেখেনি আগের পুরুষ। বলা বাহুল্য এসব বাড়িঘর ইট দিয়ে যতটা গড়া নয়, প্রতারণা দিয়ে গড়া তার চেয়ে বেশি। পরিশ্রমের জোরে ধনী হবে- এ যদি সম্ভব হতো বাংলাদেশে তাহলে এখানে ধনীর সংখ্যা হতো কয়েক কোটি। আর যদি উত্তরাধিকার ধনী হওয়ার পথ হতো, তাহলে এ দেশে ধনী খুঁজে পাওয়া ভার হতো।
স্বাধীনতা বাংলাদেশের মানুষকে কিছু সুযোগ অবশ্যই এনে দিয়েছে। যেমন বিদেশে যাওয়া। আগে এমন সুযোগ ছিল না। বড়জোর করাচি-লাহোর-পিন্ডি যেত কেউ কেউ। এখন যাচ্ছে লন্ডন, ওয়াশিংটনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। হাজার হাজার মানুষ পৃথিবীর যেখানেই সুযোগ পাচ্ছে, ছুটে যাচ্ছে। কিন্তু যেখানেই যাক, কেবল যে পাসপোর্ট নিয়ে যাচ্ছে সঙ্গে তা নয়, গৃহের স্বপ্ন ও স্মৃতিও নিয়ে যাচ্ছে সঙ্গে করে। ঘড়বাড়ি থাকে সঙ্গেই; বহন করে চলে শামুকের মতো পিঠে না হলেও ক্যাঙারুর মতো বুকের ভিতর বটে। বিদেশের উপার্জন দিয়ে দেশে একটি ঘর তৈরি করব- এই থাকে স্বপ্ন। করেও। ওভাবেই বেশ কিছু বাড়িঘর তৈরি হচ্ছে। বাড়ি না থাকার স্মৃতিটা থাকে, একেবারে অনিবার্যভাবে। তাড়া করে। স্মৃতিই স্বপ্নকে প্রবল করে। এ তো খুবই সত্য কথা যে গৃহহীনরাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় গৃহী। কেননা তারা ঘর খোঁজে এবং ঘর নেই যেহেতু, তাই দুয়ার দিয়ে শোয়। বিদেশিরা আমাদের মিসকিন বলে, ঘৃণা করে, সর্বনিম্ন বেতন দেয় কিন্তু আমরা পড়ে থাকি সেখানেই। পাসপোর্ট হয়তো ভুয়া কারও, কারও ভিসা হয়তো ঠিক নেই। ভয়ে ভয়ে থাকি কখন না জানি তাড়িয়ে দেয়। তাড়িয়ে দিলেই সর্বনাশ। আমাদের ঘর নেই। আমরা ঘর করব কী দিয়ে? বিদেশিরা জানে, আমাদের ঘরের খবর। তাই বেতন দেয় সবচেয়ে কম। পরিশ্রম করিয়ে নেয় সবচেয়ে বেশি। জানে, যা-ই দিক আমরা রাজি হয়ে যাব। যে মুসলিম উম্মাহর সদস্য আমরা, তারাও মুসলমান ভাই বলে এতটুকু খাতির করে না। বিধর্মী আমেরিকানদের বেতন দেয় সর্বোচ্চ, স্বধর্মী বাংলাদেশিদের দেয় সর্বনিম্ন। দেশে যদি ঘর থাকত তাহলে ওই দশা হতো না। আমরা দর-কষাকষি করতাম। বলতাম, ‘না, পোষাবে না, মাফ করবেন, অন্য লোক দেখুন।’ আমরা পারি না। বিদেশে পারি না, দেশেও পারি না। যুগ যুগ ধরে আমরা নিরাশ্রয়ী গৃহী। আউলবাউলরা ওই পথে গেছেন বুঝি ঘর পাননি বলেই। অনেকেই আধ্যাত্মিক হয়েছেন সংসার থেকে পলায়নের অভিপ্রায়ে। ঘর নেই, সংসার করেন কী করে? এখনো সেই গৃহহীন দশাই আমাদের। আমাদের কে মর্যাদা দেবে? অথচ বিদেশিরা যখন আসে এ দেশে-কোথায় রাখব তাদের, ভেবে পাই না। কেননা তারা আশ্রয়দাতা, আমরা নিরাশ্রয়।
সামগ্রিকভাবে বঙ্গভূমি আগেও পশ্চাদপদই ছিল। পূর্ববঙ্গ ছিল জঙ্গলের ভিতরে জঙ্গল। বঙ্গ গেছে, পূর্ব পাকিস্তান গেল, বাংলাদেশ হয়েছে, বদল হয়েছে রাষ্ট্রের; কিন্তু মানুষ এখনো এখানে তার ঘর খুঁজে পায়নি। বাঙালি মুসলমান আগে বাঙালি, না আগে মুসলমান- এই বিতর্ক একসময় ছিল আজও যে নেই তা-ও নয়। আজ সে বাঙালিই হতে চায়, নাগরিকত্বে বাংলাদেশি। কিন্তু তার যে ঘর নেই তার কী হবে? একসময় সরকারি উদ্যোগে কেবল তার কর্মচারীদের জন্য হলেও কিছু আবাসিক প্রকল্প বাস্তবায়িত করা হয়েছিল। আজ সেই উদ্যোগটিও সেভাবে নেই। গৃহনির্মাণ ঋণদান সংস্থা ঋণ দেয় অল্প কয়েকজনকে। তা-ও বন্ধ করে দেয় মাঝেমধ্যেই। সমবেত উদ্যোগ ছাড়া ঘর হবে না। ঘর ব্যক্তির, কিন্তু বাঁধতে হবে অপরের সাহায্যে, নইলে নয়। কিন্তু সমবেত উদ্যোগের ঐতিহ্য তো আমাদের নেই। একসঙ্গে কাজ করা অসম্ভব। সমবায় সমিতিগুলো অনেক দিন ধরেই আছে। তবে নামেই প্রধানত শুধু, কাজে নেই। ব্যক্তি বিনিয়োগ করতে যে চায় না তা নয়, খুবই চায়। কিন্তু কোথায় বিনিয়োগ করবে খুঁজে পায় না। সমাজ সাহায্য করে না, রাষ্ট্র যে এগিয়ে আসবে তা আসে না। উল্টো বরং বাধা দেয়। শিল্পে বিনিয়োগ বিপজ্জনক, দোকানপাটেই তাই টাকা খাটে। কিন্তু কয়টা আর দোকান চলবে? কিনবে কে? সন্তানসন্ততিতে বিনিয়োগ করে লোকে। আর করে বাড়িতে। বাড়ি তৈরির আগ্রহ খুবই প্রবল। কিন্তু ওই তো সমস্যা। তৈরি থেকে শুরু করে রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিবেশ সংরক্ষণ পর্যন্ত কোনো পর্যায়েই সমাজ ও রাষ্ট্রের সহযোগিতা পাওয়া যায় না। অন্তরায় পাওয়া যায় বরং পদে পদে। ফলে ঘরের সমস্যা মেটে না কিছুতেই।
প্রয়োজন গৃহায়নের ব্যাপক রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ। গ্রামের মানুষ যাতে উচ্ছেদ হয়ে শহরে এসে ভাসমান জনগোষ্ঠীতে পরিণত না হয়, সেটা দেখা দরকার। গ্রামে থেকেই যাতে তারা শহরের সুযোগসুবিধা পায়, বিশেষভাবে পায় উপার্জনের পথ- সেদিকটায় দৃষ্টি দেওয়া অত্যাবশ্যক। সেই সঙ্গে গ্রামীণ গৃহায়নের কর্মসূচি নেওয়া চাই। অনুরূপভাবে শহরের মানুষের জন্যও রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নিতে হবে। লোকে যাতে থাকার জায়গা পায় এবং থাকার জায়গা যাতে ঝুপড়ি না হয়ে ঘর হয়। রাষ্ট্র এমনি এমনি এ কাজ করবে না। চাপ দিতে হবে। সেই চাপ রাজনৈতিক চাপ। নইলে ভবিষ্যৎ কী? উন্নতি তো দূরের কথা।
আশার বিষয় যে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য, সদ্য ঘোষিত জাতীয় বাজেটে সবার জন্য উন্নয়ন ও সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষায় বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে কি মানুষের ন্যূনতম বাসস্থানের প্রশ্নটি আসবে না? পায়ের নিচে এক টুকরো নিজস্ব মাটি, মাথার ওপর নিরাপত্তার ছাউনি মানুষের মৌলিক অধিকার। নতুন বাজেটে সরকার নিশ্চয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় রেখেছে।
♦ লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় । সূএ : বাংলাদেশ প্রতিদিন








