ছবি সংগৃহীত
মোস্তফা কামাল : ভোগান্তি কমানোর দাওয়াই দেখিয়ে, ডিজিটালের কথা শুনিয়ে টাল বানিয়ে চালু করা বিদ্যুতের প্রিপেইড মিটার দিনকে দিন ‘গলার কাঁটা’ হয়ে গ্রাহকদের ঘাড় মটকাচ্ছে। মিটার ভাড়া, ডিমান্ড চার্জ, ভ্যাটের তাড়নায় আহ-উহ করতেও যেন মানা। ব্যবহৃত ইউনিটের সংখ্যা বাড়লে বিদ্যুতের দামের ধাপো বাড়তে থাকে। অনেকে বুঝতে পারেন না। ভুল রিচার্জ ও মিটার লক তো আছেই। রীতিমতো এক চাতুরির শিকার গ্রাহকরা।
দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রিপেইড মিটার ব্যবহারকারীদের সাধারণ অভিযোগ- এক হাজার টাকা রিচার্জের পর পুরো অর্থ ব্যালেন্সে দেখা যায় না। বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি গুলোকে এ নিয়ে কোনো কোনো জবাব দিতে হয় না। তবে, মনগড়া ব্যাখ্যা শোনায়।
ব্যাখ্যায় বলা হয়- রিচার্জকৃত অর্থ থেকে পূর্ববর্তী বকেয়া, ডিমান্ড চার্জ, ভ্যাট বা অন্যান্য চার্জ সমন্বয় করা হয়। এ সমন্বয় যে আসলে কী, তা বোঝার জো নেই। অথচ এ কথিত ডিজিটালের আগে অ্যানালগ মিটার জমানায় যেখানে মাসিক বিল দেড় হাজার টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, সেখানে প্রিপেইড নামের ডিজিটালে খরচ আরো বেড়েছে। সেই সাথে ভুতুড়ে বিলের খড়গ। ক্ষেত্রবিশেষে তা হাজার ছাড়িয়ে লাখেও চলে যাচ্ছে। অবস্থা বেশি বেগতিক হয়ে গেলে বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ তখন ঘটনাকে ব্যাখ্যা দেয় প্রযুক্তিগত ত্রুটি, ডেটা এন্ট্রি সমস্যা বা মিটার রিডিংয়ের ভুল হিসাবের অজুহাতে। ভেতরগতভাবে গোটা ব্যবস্থাটিই চুরি-জোচ্চুরির আয়োজন।
মিটারের সফটওয়্যার এমনভাবে কোডিং করা হয়, বিদ্যুৎ ব্যবহারের স্ল্যাব সামান্য বাড়লেই অস্বাভাবিক হারে বিল কাটা শুরু হয়। বাসা তালাবদ্ধ থাকলেও ব্যালেন্স চলে যায় মাইনাসে। রাঙামাটিতে এক দিনমজুরের ৬৪ হাজার, কুমিল্লায় ১ লাখ ৬৭ হাজার টাকা বিল আসার পর এ নিয়ে ক’দিন একটু মাতামাতির পর বিষয়টি আড়াল করে ফেলা হয়। সেইসাথে দুই হাজার টাকার সস্তা ও নিম্নমানের চাইনিজ মিটার এনে তাতে মেইড ইন বাংলাদেশ লিখে জাতির ঘাড়ে সাড়ে সাত হাজার টাকায় চাপিয়ে দেয়াও সম্ভব হয়েছে!
সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী ও তার সিন্ডিকেট (হেক্সিং কোম্পানি) ভুয়া এলসি, ভুয়া ট্রেনিং আর সেবার নামে প্রায় ৫’শ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করে দিতে পেরেছে। এমন অসম্ভবকে সম্ভব করার দেশে গ্রাহক পর্যায়ে ২০-২৪ ডিজিটের পিন নাম্বার চাপতে গিয়ে ৩ বার ভুল হলেই মিটার লক। মাত্র এক-দুই দিনের জন্য মিটার রিচার্জ করতে ভুলে গেলেই কোনো পূর্ব সতর্কবার্তা ছাড়া ঘরের বাতি নিভে যায় এবং লাইন কেটে যায়। এরপর বিদ্যুৎ অফিসের লোক না আসা পর্যন্ত ঘণ্টার পর ঘণ্টা অন্ধকারে থাকা বোনাস হয়রানি।
গ্রাহক আন্দোলনের মুখে সরকার এক পর্যায়ে মিটারের মাসিক ভাড়া বাতিল করলেও, সফটওয়্যার টেম্পারিংয়ের মাধ্যমে এ সিন্ডিকেটের বছরে হাজার দেড়েক কোটি টাকা চুরি ঠিকই জায়েজ হয়ে যায়। অথচ অ্যানালগের বদলে ডিজিটালে টাল বানাতে গিয়ে শোনানো হয়েছিল কতো মনোহরি কথা। বিদ্যুৎ অপচয় রোধ হবে, বিল ব্যবস্থাপনা সহজ হবে, আরো কত লোভ-প্রলোভন। সেই ডিজিটাল ক্রমেই এক চরম বিড়ম্বনা ও দীর্ঘশ্বাসের নাম।
অ্যানালগ বা প্রথাগত পোস্টপেইড মিটার ব্যবহারকারীদের বিল পরিশোধে দেরি হলেও বিদ্যুৎ সংযোগ সঙ্গে সঙ্গে বিচ্ছিন্ন করা হয় না। প্রিপেইড মিটারের ক্ষেত্রে তা বিপরীত। বিপিডিবি, ডিপিডিসি, ডেসকো, নেসকোসহ সকল বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিই প্রিপেইড মিটারেই রিচার্জ প্রক্রিয়া দাম সমন্বয়ের জাঁতাকলে শত শত ডিজিটের টোকেন নাম্বার গ্রাহকদের যাতনায় কাঁদাচ্ছে। অনেক মিটারের ব্যালেন্স শেষ হওয়ার আগে লাল বাতি জ্বলা বা অ্যালার্ম দেয়ার ব্যবস্থা থাকলেও বহুতল ভবনের নিচে বা সুবিধাজনক জায়গায় মিটার না থাকায় তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা সবার জন্য সম্ভব হয় না।
বক্সে বন্দি মিটারে কখন লাল বাতি জ্বলল, তা গ্রাহক বুঝতে পারেন হঠাৎ ভেল্কির মতো বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর। প্রিপেইড মিটারের ভেতরে থাকা ছোট ব্যাটারিটিও আবাসিক ব্যবহারকারীদের জন্য আরেক ভোগান্তির মেশিন। ব্যাটারি আর পাঞ্চ কার্ডের আমলাতান্ত্রিক আরেক ফাঁদ। সাধারণত লোডশেডিং বা বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় এই ব্যাটারিটি মিটারে পাওয়ার সাপ্লাই দেয়। কোনো কারণে এটির চার্জ কমে গেলে মিটারে পর্যাপ্ত টাকা থাকার পরও এটি পুরো বাড়ির বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধের ম্যাজিক দেখায়। প্রযুক্তিতে অনভিজ্ঞ ও বয়স্কদের জন্য কখনো কখনো ২০০ থেকে ৩০০ সংখ্যার দীর্ঘ পিন কোড টাইপ করা চরম বিভ্রান্তিতে ফেলে। টাইপ করার সময় একটি মাত্র সংখ্যা ভুল বা বাদ পড়লে আবার শুরু থেকে শুরু করতে হয় পুরো প্রক্রিয়াটি। এ যাতনা থেকে মুক্তি পেতে গ্রাহকদের শরণাপন্ন হতে হয় স্থানীয় অফিসে টেকনিশিয়ানের কাছে। এ গোলযোগ রাতে বা ছুটির দিনে ঘটলে ভোগান্তির মাত্রা আরো অবধারিত। আর মিটার পাঞ্চের কার্ড পুরোনো বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে নতুন কার্ড পেতে আপদের ওপর বিপদের আরেক আমলাতান্ত্রিক বেদনা।
সাধারণ একটি রিচার্জে ১৬ বা ২০ ডিজিটের কোড আসে, ওই কোড মিটারে ঢোকালেই মিটারে টাকা যুক্ত হয়। বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি কিংবা ট্যারিফ পরিবর্তন হলে টোকেনের আকার বিশাল হয়ে যায়। এর কারণ এই দীর্ঘ কোডের ভেতর অনেকগুলো ভিন্ন ভিন্ন ‘কমান্ড’ বা তথ্য লুকানো থাকে। প্রিপেইড মিটারগুলো কোনো অনলাইন সার্ভারের সঙ্গে প্রতি সেকেন্ডে যুক্ত থাকে না । তাই মিটারের ভেতরে থাকা চিপকে জানাতে হয় যে, এখন থেকে প্রথম ইউনিট থেকে শুরু করে পরবর্তী ইউনিটগুলোর দাম কত টাকা করে কাটা হবে। আগের কোনো বকেয়া থাকলে বা প্রতি মাসের ফিক্সড ডিমান্ড চার্জ ও মিটার ভাড়া জমে থাকলে সেই হিসাবও এই কোডের ভেতর ঢুকিয়ে দেয়া হয়। বাংলাদেশে এ দুরবস্থার বিপরীতে প্রিপেইড মিটার ব্যবস্থা উন্নত দেশগুলোতে ঠিকই বিলিং ও ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা এনেছে। আর এখানে গোটা বিষয়টিউ প্রকারান্তরে ঠকবাজি। চার্জ-রিচার্জের সময় ট্যাক্স, সার্ভিস ফি, ডিমান্ড চার্জ, মিটার রেন্টসহ নানা খাতে অতিরিক্ত অর্থ কেটে নেয়ার এক ধুম। হিসাব ব্যবস্থাও অস্বচ্ছ। মিটার স্ক্রিনে দেখানো তথ্যও গ্রাহকদের কাছে দুর্বোধ্য। তাদের পক্ষে পক্ষে বোঝা কঠিন কোন খাতে কত টাকা গেছে।
বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তিকে উন্নয়ন, স্বচ্ছতা বলা হলেও এখানে রীতিমতো ঠকবাজির আয়োজন। প্রযুক্তির ব্যবহার তখনই উন্নয়ন হবে যখন প্রশাসন স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও গ্রাহকবান্ধব হয়। নইলে চোর-জোচ্চোরদের জয়ই অবধারিত। আর ভোগান্তিই হবে গ্রাহকদের নিয়তি। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দামের সাথে জনজীবন, পণ্যের বাজারের ওঠানামা বিষয়টা বুঝতে অর্থনীতির পাকা বুঝবান হতে হয় না।
গ্যাস-বিদ্যুতের ভোগান্তি ও দাম বৃদ্ধি মানুষের জীবনযাত্রার পাশাপাশি গোটা অর্থনীতিকে কেবল কাহিল করতেই থাকবে। এমনিতেই সিস্টেম লস বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতেই বেশি ব্যবহৃত শব্দ। এর সোজা অর্থ চুরি। সিস্টেম লসের নামে বিদ্যুতের চুরিটি করা হয় উৎপাদন কেন্দ্র থেকে গ্রাহকের কাছে পৌঁছানোর পথে পথে। যা জায়েজ করা হয় কারিগরি ত্রুটির আড়ালে। অবৈধ সংযোগ, মিটার টেম্পারিং, বিলিং জালিয়াতিকে সিস্টেম লসের খাতায় দেখিয়ে বৈধতা দেওয়ার এ চেষ্টা রোখার কথা বারবার আলোচনায় এলেও আজতক কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। সিস্টেম লসের নামে বিদ্যুৎ চোররা কোনো না কোনোভাবে প্রণোদনা হাতিয়ে নেয়। তারা ভীষণ সংগঠিত। গ্রাহকরা সংগঠিত নয়। সরকারও চোরদের সাথে পেরে ওঠে না। অ্যানালগ আর ডিজিটাল সবদিকেই চুরি-দুর্নীতির দরজা-জানালা তাদের চেনা।
লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন । সূএ: বাংলাদেশ প্রতিদিন








