ছবি সংগৃহীত
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী :অভ্যুত্থান ঘটে, বিপ্লবের আওয়াজও কানে আসে। কিন্তু এসব উন্নতির অভ্যন্তরে যে অবনতিটা রয়ে গেছে, তার ধারাবাহিকতায় কোনো ছেদ পড়ে না। দুর্নীতি বাড়তেই থাকে, দুর্নীতির ভয়াবহ সব তথ্য উন্মোচিত হয়। সর্ষের ভিতর ভূত যে নিতান্ত অবাস্তব কল্পনা নয়, সেটা প্রমাণ করে দিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যানের ব্যাপারেও দুর্নীতির অভিযোগের কথা শোনা যাচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকার ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করেছিল।
শিক্ষার ব্যাপারে কোনো কমিশনের কথা ভাবা হয়নি দেখে অনেকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়েছেন। যখনই কোনো অসাংবিধানিক সরকারের অভ্যুদয় ঘটে তখনই, সঙ্গে সঙ্গেই, দেখা যায় একটি শিক্ষা কমিশন গঠিত হচ্ছে; এবং সেই কমিশনের বাস্তবায়িত-অবাস্তবায়িত সুপারিশগুলো অপেক্ষা করতে থাকে পরবর্তী কমিশনের হস্তক্ষেপের জন্য। মাঝখান থেকে নাড়াচাড়ার দরুন গড়বড়ে শিক্ষাব্যবস্থার যে ক্ষতিটা ঘটবার সেটা ঘটে যায়। লক্ষণীয় যে ইংরেজি মাধ্যমের ও মাদ্রাসাপদ্ধতির শিক্ষাব্যবস্থা কিন্তু সংস্কারের ধার ধারে না। তারা হস্তক্ষেপের বাইরে নিরাপদেই রয়ে যায়। বিপদ যা ঘটবার, তা মূলধারারই বিধিলিপি; কারণ সে-ধারা বড়লোকেরও নয়, গরিবেরও নয়, মধ্যবর্তীদের। সেদিক থেকে আমাদের সদ্য বিগত অন্তর্বর্তী সরকার সংযমেরই পরিচয় দিয়েছে বলতে হবে।
তাই বলে মূলধারায় যে বিপদ কেটেছে তা নয়। লেগেই আছে। যেমন এ বছর মেডিকেল শিক্ষার্থীদের আসনসংখ্যা শুনছি শতকরা ৫ ভাগ কমবে। ওদিকে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় পরীক্ষার্থীদের বেশ বড় একটি অংশ শেষ পর্যন্ত পরীক্ষা দিতে আসেনি। একটা কারণ অবশ্য মেয়ে শিক্ষার্থীদের বাল্যবিবাহ। অন্য কারণ অভিভাবকদের অর্থনৈতিক অপারগতা। আর যারা পরীক্ষা দিয়েছে তারাও কিন্তু ভালো ফল করতে পারেনি। পাস করেছে শতকরা ৫৯ জন। যে হার গত ২১ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। বলা হচ্ছে শিক্ষার প্রকৃত মান আসলে ওইটাই। সেটাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ঠেলে ধাক্কিয়ে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে এক শর কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল বিগত আওয়ামী লীগ সরকার। বেলুনটা চুপসে গেছে। কিন্তু পরীক্ষা যারা দিয়েছে তাদের সবারই তো পাস করার কথা, প্রাপ্ত গ্রেডের হেরফের হতে পারে মাত্র। কারণ পরীক্ষা দেওয়ার জন্য নিজেদের প্রতিষ্ঠানের বিবেচনায় যোগ্য বিবেচিত হওয়ার পরেই না তারা পাবলিক পরীক্ষায় শামিল হয়েছে। এতে সরকারের কৃতিত্বের প্রশ্ন আসবে কেন? তবু এসেছিল; আনা হয়েছিল, কারণ ওই সরকার মনে করেছিল পরীক্ষায় বেশি বেশি পাস করলে প্রমাণ হবে যে তাদের ব্যবস্থাপনায় শিক্ষার মানের শনৈ শনৈ উন্নতি ঘটছে। বন্ধনীর মধ্যে উল্লেখ করা যায় যে সাধারণ শিক্ষার্থীরা খারাপ করলেও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা তেমন একটা খারাপ করেনি। হতে পারে এর কারণ মাদ্রাসার শিক্ষকরা তুলনামূলকভাবে অধিক দায়িত্বশীল এবং দয়ালু। শিক্ষার্থীদের অধিক সযত্ন পাঠদান ও নম্বর দিতে ব্যাকুল থাকেন।
শিক্ষকদের প্রসঙ্গ যখন এসেই গেল, তখন এটা স্মরণ করা যাক যে শিক্ষার মান অনেকাংশেই নির্ভর করে শিক্ষকদের মানের ওপর; এবং শিক্ষকদের মান নির্ভর করে তাঁরা বেতন-ভাতা ও সামাজিক মর্যাদা কতটা পাচ্ছেন তার ওপর। মেধাবান মানুষরা শিক্ষক হিসেবে অবশ্যই আসবেন, যদি দেখা যায় যে পেশাগত বেতন-ভাতা এবং সামাজিক মানসম্মান আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। এবং যদি এমন হয় যে শিক্ষক হওয়ার জন্য তদবির করা ও উৎকোচ প্রদানের বাধ্যবাধকতার বিলুপ্তি ঘটেছে। এবং শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়বে যদি যথার্থ ও নিয়মিত সময়োপযোগী শিক্ষক-প্রশিক্ষণের কার্যকর ব্যবস্থা থাকে।
শিক্ষকদের হালটা অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে কেমন ছিল, সেটা তো এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বাসাভাড়া বৃদ্ধি ও উৎসব ভাতার দাবিতে আন্দোলনের সময় তাঁদের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর আচরণে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছিল। সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি দৃশ্যে দেখা গেছে, পুলিশের হাতে প্রহৃত হওয়ার শঙ্কায় আন্দোলনকারী একজন শিক্ষকের হাতজোড়-করা করুণ অনুনয়। অসহায় শিক্ষক তাঁকে প্রহারে উদ্যত এক পুলিশ কনস্টেবলকে কান্নাবিজড়িত কাতর কণ্ঠে বলছেন, ‘স্যার, আমাকে মারবেন না স্যার; আমি একজন শিক্ষক।’ কে কাকে স্যার বলে? আর ওই যে আর্তনাদ, সেটা তো কেবল একজন শিক্ষকের নয়, গোটা শিক্ষাব্যবস্থারই। আন্দোলনকারী শিক্ষকদের শাহবাগ মোড় থেকে বিতাড়িত করার পর রাস্তায় পড়েছিল একটি ভাঙা চশমা। সেটিকেও প্রতীক বিবেচনা করে আমরা অনেক কথাই বলতে পারি। কিন্তু কত আর বলা যায়? শিক্ষকদের অবস্থা অতীতেও সন্তোষজনক ছিল না। তবে এতটা নিচে নেমে গিয়েছিল কি না, তাঁরাই বলতে পারবেন যাঁরা সন্ধান রাখেন।
শিক্ষক যদি এভাবে নত হতে বাধ্য হন, প্রহৃত হন রাস্তায়, দিনের পর দিন রাজপথে ধর্মঘটে থাকাটা যদি হয় শিক্ষকদের বিধিলিপি, তাহলে শিক্ষকের প্রতি শিক্ষার্থীরা তাদের আস্থা ও শ্রদ্ধা বাঁচিয়ে রাখবে কী করে? শিক্ষককে শিক্ষার্থীরা কেবল যে জ্ঞানদাতা হিসেবে দেখতে চায় তা তো নয়, গণ্য করতে চায় ‘বীর’ হিসেবেও। শিক্ষকের সেই ভাবমূর্তি শিক্ষক-শিক্ষার্থী উভয়ের কাছেই ক্ষুণ্ন হয়েছে কেবল যে ধর্মঘট করতে গিয়ে পদদলিত হওয়ার ঘটনায়- তা অবশ্যই নয়, ক্ষুণœ হয় তখনো, যখন ক্লাসের শিক্ষককে শিক্ষার্থীরা কোচিং সেন্টারের শিক্ষক হিসেবে দেখতে পায়। আবার এটাও তো সত্য যে স্বৈরাচারের দোসর হিসেবে চিহ্নিত করে শারীরিকভাবে শিক্ষক-লাঞ্ছনার যেসব ঘটনা ঘটেছিল, তা যে শিক্ষকদের ভাবমূর্তিকেই শুধু মলিন করেছে, তা-ই নয়, গোটা শিক্ষাব্যবস্থার ওপরই আঘাত হেনেছে।
আর শিক্ষকদের নিজেদের মধ্যেও তো এমন হীনচরিত্রের লোকেরা আছে, যাদের বিরুদ্ধে চরম যে অপরাধ, যৌন নির্যাতনের-তার অভিযোগ ওঠে। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও ওই রকমের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছেন, যেটা আমরা যখন তুলনামূলকভাবে অনুন্নত ছিলাম তখন ছিল অকল্পনীয়। নিকট অতীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন পুরুষ শিক্ষক কারাবন্দি হয়েছেন এক পুরুষ ছাত্রকে গৃহে ডেকে নিয়ে যৌন অত্যাচার করার প্রমাণিত অভিযোগের ভিত্তিতে। এমন উন্নতি কে চেয়েছিল? কবে? যদিও যৌন নিপীড়ন এখন জগৎব্যাপীই ব্যাপ্ত।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনকে তো অগ্রাহ্য করার উপায় নেই। তার নতুন প্রতিবেদন বলছে, বিশ্বের পনেরো বা তার বেশি বয়সি প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নারী স্বামী বা ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের হাতে যৌন অথবা শারীরিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন। প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়েছে-এটা হচ্ছে প্রাচীনতম অন্যায়, এবং এ যে কেবল নীতিগত বিষয় তা নয়, মর্যাদা, সমতা ও মানবিকতার জন্য হানিকর বিষয়ও বটে। তা তো বুঝলাম, কিন্তু সভ্যতা অগ্রগতির এই গ্লানিকে মুছে না ফেলে অনবরত যে বৃদ্ধি ঘটিয়ে চলেছে, তার বিহিত কী? আর শিক্ষাঙ্গনেই যদি ওই অনাচার ঘটে তাহলে উন্নতির আর বাকিই বা থাকে কী?
ঘরের ভিতরে সহিংসতার, হত্যার এবং আত্মহত্যার খবর তো অবিরামই পাওয়া যায়। যেমন এই খবরটা, ‘লালবাগে স্ত্রী-শাশুড়ি মিলে ব্যাংক কর্মকর্তাকে গলা কেটে হত্যা।’ পাশাপাশি এটিও কম যায় না। বগুড়ায় স্বামী এক ঘরে ঘুমাচ্ছেন। পাশের ঘরে তাঁর স্ত্রী নিজের দুই শিশুসন্তানকে বঁটি দিয়ে কেটেছেন এবং তারপর নিজেকে ফাঁসিতে ঝুলিয়েছেন। কারণ নাকি দাম্পত্য কলহ। মহিলার স্বামী সেনাবাহিনীর সদস্য, বাড়িতে এসেছিলেন ছুটিতে। রক্তাপ্লুত ওই দৃশ্য অবলোকনে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আরেক খবর, পটুয়াখালীর। সেটা এই রকমের। ঘরে স্বামী-স্ত্রীর ঝুলন্ত লাশ দৃশ্যমান হয়েছে। মৃত স্বামীর ডায়েরিতে লেখা রয়েছে : “মান-সম্মান সব গেছে। বাঁইচা থাইকা কী হবে? আমার পোলার দিকে খেয়াল রাইখেন সবাই। আমার পোলা মা-বাবা ছাড়া এতিম।” প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ‘ঝামেলা’ ছিল।
শিশুরা ঝগড়াঝাঁটি করবে এটা খুবই স্বাভাবিক। হাতাহাতিও ঘটে। কিন্তু নদীতে গোসল করতে নেমে হাতাহাতিটা যে গড়াবে একটি দুটি নয়, চার চারটি গ্রামের সংঘর্ষে; ভাঙচুর হবে বাড়িঘর, লুটপাট হবে জিনিসপত্র, এমন খবর অত্যাধুনিক বটে। তবে তা পাওয়া গেছে। আসলে কেবল প্রাকৃতিক পরিবেশই নয়, মানবিক পরিবেশও এখন ভীষণ উত্তপ্ত, সামান্য অগ্নিকণাই যথেষ্ট ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের জন্য।
শিক্ষা এবং চিকিৎসা তো অবশ্যই, সব জিনিসই এখন পণ্যে পরিণত হয়েছে। বাজারে কিনতে পাওয়া যায়, ভাড়াতে আরও সস্তা। যেমন খুনি। ঢাকার মোহাম্মদপুরে বিএনপির একজন স্থানীয় নেতা প্রতিপক্ষের ভাড়াটে খুনির হাতে প্রাণ হারিয়েছেন। খুনির ভাড়া নাকি ছিল মাত্র ৩০ হাজার টাকা।
কৈশোরে ইমন এবং মামুনের ভিতর প্রবল বন্ধুত্ব ছিল। ঢাকার ধানমন্ডি-মোহাম্মদপুর এলাকায় তারা বড় হয়েছে; কিন্তু ওই যে যুগের হাওয়া- চাঁদাবাজি, জবরদখল, অন্যের কাজে ভাড়া খাটা, এসবের মধ্যে বীরত্বের স্বাক্ষর অঙ্কিত-করা-সেটা তাদের জাপটে, ধরেছিল। তারা মানুষ খুন করেছে অমানুষের মতো; খুনের মামলার আসামি হয়েছে অতিদ্রুত। ২৪ বছর একটানা জেল খাটার পর মামুন মুক্তি পেয়েছিল। ইমনও মুক্তি পায়। ইমন পালিয়ে বিদেশে চলে যায় এবং সেখান থেকে দক্ষ হাতে তার দলকে অপরাধের কাজে পরিচালিত করতে থাকে। ইমন আশা করেছিল অকৃত্রিম বন্ধু মামুন আজীবন তার সঙ্গেই থাকবে। কিন্তু মামুন অন্য দলে যোগ দিচ্ছে এমন খবর সে শুনতে পেয়েছে এবং শুনে ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে চরম শাস্তি দানের ব্যবস্থা করেছে। ভাড়াটে খুনি লাগিয়ে মামুনকে সে হত্যা করেছে।
খুনি পালাবার চেষ্টা করেছিল। ধরা পড়েছে। খবরে প্রকাশ কর্তব্যপালন শেষে খুনিদের মজুরি দেওয়া হয়েছিল মাত্র ২ লাখ টাকা। অন্য সব জিনিসের দাম বেড়েছে এবং মূল্যস্ফীতি ঘটলে যেটা অবধারিত সেটাই ঘটেছে; তবে মানুষের প্রাণের মূল্য পড়ে গেছে। ভাড়াটে খুনিদের এখন সরবরাহ ভালো, দামও তাই কমতির দিকে। সদ্য নির্বাচিত সরকারের শাসনামলে এসব অনাচারের পরিসমাপ্তি ঘটবে বলেই প্রত্যাশা করছি।
♦ লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সূএ: বাংলাদেশ প্রতিদিন








