ভোট না দেওয়া: ইসলামের দৃষ্টিতে দায় ও দায়িত্ব

ছবি সংগৃহীত

 

ধর্ম ডেস্ক : গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় নির্বাচন একটি অপরিহার্য প্রক্রিয়া। প্রচলিত ব্যবস্থায় ভোটকে কেবল ক্ষমতায় যাওয়ার হাতিয়ার বা আধিপত্য অর্জনের মাধ্যম মনে করা হলেও ইসলামের দৃষ্টিতে এর গুরুত্ব অত্যন্ত গভীর। ভোট দেওয়া কেবল একটি নাগরিক অধিকারই নয়, বরং এটি একটি ধর্মীয় আমানত ও সাক্ষ্য প্রদান।

ভোটের শরয়ি হাকিকত: তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দিক

বিখ্যাত আলেমে দ্বীন হজরত মুফতি মুহাম্মাদ শফী (রহ.)-এর দালিলিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইসলামের দৃষ্টিতে একটি ভোটের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে-
১. সাক্ষ্য প্রদান (শাহাদত): ভোটার যখন কাউকে ভোট দেন, তখন তিনি পরোক্ষভাবে এই সাক্ষ্য দেন যে, ওই ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট পদের জন্য যোগ্য এবং নীতিবান।
২. সুপারিশ (সিফারিশ): ভোটার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জন্য রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যাওয়ার সুপারিশ করছেন। কোরআনুল কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘যে ভালো সুপারিশ করবে সে তার নেকির ভাগী হবে, আর যে মন্দ সুপারিশ করবে সে মন্দের হিস্যা পাবে।’ (সুরা নিসা: ৮৫)
৩. প্রতিনিধিত্বের ক্ষমতা প্রদান (ওকালত): ভোট দেওয়ার অর্থ হলো নিজের পক্ষ থেকে ওই ব্যক্তিকে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া। ফলে নিয়মতান্ত্রিকভাবে তার কর্মকাণ্ডের নৈতিক দায়ভার ভোটারের ওপরও বর্তায়।

সাক্ষ্যের গুরুত্ব ও সতর্কতা

ভোটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘শাহাদাত’ বা সাক্ষ্য। যদি কোনো অযোগ্য, নীতিভ্রষ্ট বা জনস্বার্থবিরোধী ব্যক্তিকে জেনে-বুঝে ভোট দেওয়া হয়, তবে শরিয়তের দৃষ্টিতে এটি ‘মিথ্যা সাক্ষ্য’ হিসেবে গণ্য হতে পারে। আর ইসলামে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া অন্যতম কবিরা গুনাহ।
সহিহ বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী, রাসুলুল্লাহ (স.) মিথ্যা সাক্ষ্যকে অত্যন্ত কঠিন অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। হাফেজ শামসুদ্দীন জাহাবি (রহ.)-এর মতে, অযোগ্য ব্যক্তিকে ভোট দেওয়ার মাধ্যমে একজন ভোটার যেমন সত্য গোপন করেন, তেমনি পরোক্ষভাবে জননিপীড়নের পথ প্রশস্ত করার ঝুঁকিতে থাকেন।

ভোট না দিলে কি গুনাহ হবে?

অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে- যদি যোগ্য প্রার্থী খুঁজে না পাওয়া যায়, তবে কি ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকা যাবে? সমকালীন ফকিহ ও আলেমদের মতে, এমন পরিস্থিতিতেও ভোটদান থেকে বিরত থাকা বুদ্ধিমত্তার পরিচয় নয়। এর কারণসমূহ হলো-

মন্দের ভালো বেছে নেওয়া: যদি কোনো আসনেই আদর্শ প্রার্থী না থাকে, তবে প্রার্থীদের মধ্যে যিনি তুলনামূলক কম ক্ষতিকর বা যার মাধ্যমে মানুষের কল্যাণের সামান্যতম আশা আছে, তাকে বেছে নেওয়া শরিয়তের একটি মূলনীতি।
অধিকতর ক্ষতি ঠেকানো: নাগরিক হিসেবে ভোট না দেওয়ার ফলে যদি এমন কোনো ব্যক্তি বিজয়ী হন যিনি ধর্ম, সমাজ ও মানুষের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারেন, তবে সেই ক্ষতির দায় এড়ানো কঠিন। তাই বৃহত্তর অনিষ্ট রোধে ভোটারাধিকার প্রয়োগ করা একটি নৈতিক দায়িত্ব।

গণতান্ত্রিক পদ্ধতির নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এটিই বর্তমানে আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থার বাস্তবতা। একজন সচেতন নাগরিক ও মুমিন হিসেবে ভোট প্রয়োগে উদাসীন থাকা সমীচীন নয়। অনেক আলেমের মতে, ভোট না দিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রকে অযোগ্য নেতৃত্বের হাতে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তের দায় থেকেও একজন মানুষ পুরোপুরি মুক্ত থাকতে পারেন না। তাই বিবেক-বুদ্ধি খাটিয়ে ‘মন্দের ভালো’ অথবা ‘কম ক্ষতিকর’ প্রার্থীকে ভোট দেওয়া এবং সামাজিক ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করা প্রতিটি ভোটারের নৈতিক ও ঈমানি দায়িত্ব।

বি.দ্র.: এই লেখাটি মূলত ইসলামি ফিকহ ও ওলামায়ে কেরামের মতামতের আলোকে একটি বিশ্লেষণ। ভোট প্রদান বা বর্জনের বিষয়ে সমকালীন প্রেক্ষাপটে আলেমদের মধ্যে আরও বিস্তারিত বা ভিন্নতর ব্যাখ্যা থাকতে পারে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



» ভোট না দেওয়া: ইসলামের দৃষ্টিতে দায় ও দায়িত্ব

» নতুন নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সাবেক স্পিকারের শপথ পড়ানোর সুযোগ নেই : আইন উপদেষ্টা

» রাজধানীতে ২ শিশু সহ একই পরিবারের ৪ জনের মরদেহ উদ্ধার

» নির্বাচনের দিন চলবে অতিরিক্ত মেট্রোরেল, তবে বন্ধ থাকবে কয়েকটি স্টেশন

» মেট্রোপলিটন পুলিশের পৃথক অভিযানে ১৭ জন গ্রেপ্তার

» সংশয়…. .

» ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনে দু’দিনে ডিএমপির ১৫৬১ মামলা

» নির্বাচনকালীন সময়ে সংবাদকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের আহ্বান সম্পাদক পরিষদের

» পুরনো রাজনীতি আর দেখতে চাই না: শফিকুর রহমান

» তারেক রহমানের উদ্দেশ্যে বিদিশার খোলা চিঠি

 

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ,

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন,

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন: ই-মেইল : [email protected],

মোবাইল :০১৫৩৫১৩০৩৫০

Desing & Developed BY PopularITLtd.Com
পরীক্ষামূলক প্রচার...

ভোট না দেওয়া: ইসলামের দৃষ্টিতে দায় ও দায়িত্ব

ছবি সংগৃহীত

 

ধর্ম ডেস্ক : গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় নির্বাচন একটি অপরিহার্য প্রক্রিয়া। প্রচলিত ব্যবস্থায় ভোটকে কেবল ক্ষমতায় যাওয়ার হাতিয়ার বা আধিপত্য অর্জনের মাধ্যম মনে করা হলেও ইসলামের দৃষ্টিতে এর গুরুত্ব অত্যন্ত গভীর। ভোট দেওয়া কেবল একটি নাগরিক অধিকারই নয়, বরং এটি একটি ধর্মীয় আমানত ও সাক্ষ্য প্রদান।

ভোটের শরয়ি হাকিকত: তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দিক

বিখ্যাত আলেমে দ্বীন হজরত মুফতি মুহাম্মাদ শফী (রহ.)-এর দালিলিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইসলামের দৃষ্টিতে একটি ভোটের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে-
১. সাক্ষ্য প্রদান (শাহাদত): ভোটার যখন কাউকে ভোট দেন, তখন তিনি পরোক্ষভাবে এই সাক্ষ্য দেন যে, ওই ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট পদের জন্য যোগ্য এবং নীতিবান।
২. সুপারিশ (সিফারিশ): ভোটার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জন্য রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যাওয়ার সুপারিশ করছেন। কোরআনুল কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘যে ভালো সুপারিশ করবে সে তার নেকির ভাগী হবে, আর যে মন্দ সুপারিশ করবে সে মন্দের হিস্যা পাবে।’ (সুরা নিসা: ৮৫)
৩. প্রতিনিধিত্বের ক্ষমতা প্রদান (ওকালত): ভোট দেওয়ার অর্থ হলো নিজের পক্ষ থেকে ওই ব্যক্তিকে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া। ফলে নিয়মতান্ত্রিকভাবে তার কর্মকাণ্ডের নৈতিক দায়ভার ভোটারের ওপরও বর্তায়।

সাক্ষ্যের গুরুত্ব ও সতর্কতা

ভোটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘শাহাদাত’ বা সাক্ষ্য। যদি কোনো অযোগ্য, নীতিভ্রষ্ট বা জনস্বার্থবিরোধী ব্যক্তিকে জেনে-বুঝে ভোট দেওয়া হয়, তবে শরিয়তের দৃষ্টিতে এটি ‘মিথ্যা সাক্ষ্য’ হিসেবে গণ্য হতে পারে। আর ইসলামে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া অন্যতম কবিরা গুনাহ।
সহিহ বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী, রাসুলুল্লাহ (স.) মিথ্যা সাক্ষ্যকে অত্যন্ত কঠিন অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। হাফেজ শামসুদ্দীন জাহাবি (রহ.)-এর মতে, অযোগ্য ব্যক্তিকে ভোট দেওয়ার মাধ্যমে একজন ভোটার যেমন সত্য গোপন করেন, তেমনি পরোক্ষভাবে জননিপীড়নের পথ প্রশস্ত করার ঝুঁকিতে থাকেন।

ভোট না দিলে কি গুনাহ হবে?

অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে- যদি যোগ্য প্রার্থী খুঁজে না পাওয়া যায়, তবে কি ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকা যাবে? সমকালীন ফকিহ ও আলেমদের মতে, এমন পরিস্থিতিতেও ভোটদান থেকে বিরত থাকা বুদ্ধিমত্তার পরিচয় নয়। এর কারণসমূহ হলো-

মন্দের ভালো বেছে নেওয়া: যদি কোনো আসনেই আদর্শ প্রার্থী না থাকে, তবে প্রার্থীদের মধ্যে যিনি তুলনামূলক কম ক্ষতিকর বা যার মাধ্যমে মানুষের কল্যাণের সামান্যতম আশা আছে, তাকে বেছে নেওয়া শরিয়তের একটি মূলনীতি।
অধিকতর ক্ষতি ঠেকানো: নাগরিক হিসেবে ভোট না দেওয়ার ফলে যদি এমন কোনো ব্যক্তি বিজয়ী হন যিনি ধর্ম, সমাজ ও মানুষের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারেন, তবে সেই ক্ষতির দায় এড়ানো কঠিন। তাই বৃহত্তর অনিষ্ট রোধে ভোটারাধিকার প্রয়োগ করা একটি নৈতিক দায়িত্ব।

গণতান্ত্রিক পদ্ধতির নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এটিই বর্তমানে আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থার বাস্তবতা। একজন সচেতন নাগরিক ও মুমিন হিসেবে ভোট প্রয়োগে উদাসীন থাকা সমীচীন নয়। অনেক আলেমের মতে, ভোট না দিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রকে অযোগ্য নেতৃত্বের হাতে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তের দায় থেকেও একজন মানুষ পুরোপুরি মুক্ত থাকতে পারেন না। তাই বিবেক-বুদ্ধি খাটিয়ে ‘মন্দের ভালো’ অথবা ‘কম ক্ষতিকর’ প্রার্থীকে ভোট দেওয়া এবং সামাজিক ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করা প্রতিটি ভোটারের নৈতিক ও ঈমানি দায়িত্ব।

বি.দ্র.: এই লেখাটি মূলত ইসলামি ফিকহ ও ওলামায়ে কেরামের মতামতের আলোকে একটি বিশ্লেষণ। ভোট প্রদান বা বর্জনের বিষয়ে সমকালীন প্রেক্ষাপটে আলেমদের মধ্যে আরও বিস্তারিত বা ভিন্নতর ব্যাখ্যা থাকতে পারে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



সর্বাধিক পঠিত



 

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ,

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন,

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন: ই-মেইল : [email protected],

মোবাইল :০১৫৩৫১৩০৩৫০

Design & Developed BY ThemesBazar.Com