ছবি সংগৃহীত
মোস্তফা কামাল গুজব, মিথ্যাকে সত্য, সত্যকে মিথ্যা, এমনকি দিনকে রাত বানিয়ে ফেলার ম্যাজিক মেশিন স্বাভাবিক যাপিত জীবনকেই বিষাক্ত করে তুলেছে। যে বা যারা এর ছোবলের শিকার হয়েছে তারাই হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করছে এ বিষের কী যন্ত্রণা! এবারের ভোট এর যন্ত্রণা ও চ্যালেঞ্জে পড়বে—এমন শঙ্কা সিইসি আরো আগেই করে রেখেছেলেন। স্বয়ং প্রধান উপদেষ্টাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বাস্তবে এখন তা শঙ্কা-উদ্বেগের চেয়েও মারাত্মক পর্যায়ে।
মাঠের চিত্র ভয়ংকর। যে যা পারছে, করছে। কে কখন কাকে টার্গেট করে এআই দিয়ে কী বানিয়ে ছেড়ে দিচ্ছে রোখা যাচ্ছে না। মানুষ বিভ্রান্ত হচ্ছে, গোলমাল বাধছে; উদ্দেশ্য সাধন হয়ে যাচ্ছে মহলবিশেষের।
দেশ, সরকার, নির্বাচন কমিশন, প্রার্থী, ভোটার সর্বোপরি জনগণ সবাই এ সাইবার গজবের শিকার। ভোটের দিন পর্যন্ত তা কোথায় গড়াবে, ধারণা করতেও গা শিউরে উঠছে পারিপার্শ্বিকতা নিয়ে চিন্তা করা সচেতন মানুষের।
ভুয়া তথ্য ও বিভ্রান্তি মোকাবেলায় জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয়, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার সহায়তা চেয়েছে সরকার। এ ছাড়া ভুয়া তথ্য, বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট ও গুজব প্রতিরোধে আগামী জাতীয় নির্বাচন পর্যন্ত একটি বিশেষ সেল গঠন করেছে জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সি—এনসিএসএ।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং, প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ-পিআইবি, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা-বাসস, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন-বিটিআরসি এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীগুলোর সঙ্গেও সমন্বয় করছে এনসিএসএ। নির্বাচনে ভুয়া তথ্য ও গুজব ঠেকাতে কাজ করছে অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডিও। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীগুলোর সাইবার সিকিউরিটি বিভাগকে সর্বোচ্চ সতর্ক ও তৎপর থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু চেষ্টায় কুলাচ্ছে না। থামানো যাচ্ছে না অপতথ্য ও গুজবের স্রোত।
ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমার স্ক্যানারের পরিসংখ্যান বলছে, নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, গুজব ও ডিপফেক ভিডিওতে সয়লাব হচ্ছে অনলাইন। শুধু গত ডিসেম্বরেই ৪৪৬টি রাজনৈতিক ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে প্রতিষ্ঠানটি। বছর কয়েক আগেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স-এআই ছিল দূর ভবিষ্যতের একটি কাল্পনিক বিষয়। এখন তা দৈনন্দিন জীবনের অংশ হতে চলেছে। হাতে হাতে মোবাইল। দুনিয়া ডিজিটাল। মানুষও ডিজিটাল। অচিন্তনীয় এত পদ্ধতি মানুষের মস্তিষ্ককেও নিয়ন্ত্রণ করে ফেলছে। তা জীবনযাত্রাকে সহজ ও উন্নত করছে। আর এর অপব্যবহার হয়ে উঠেছে যত নষ্টের কারণ।
এআইর শব্দগত মানে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স। আর্টিফিশিয়াল অর্থ কৃত্রিম। ইন্টেলিজেন্স অর্থ বুদ্ধিমত্তা। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অর্থ হচ্ছে এককথায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। তা সুনিপুণ দক্ষতার পরিচায়ক। মুহূর্তের মধ্যে যেকোনো ফলাফল বা ব্যাখ্যা সহজেই লিখে দিতে পারে। এআই এমন একটি পদ্ধতি যা মানুষের মতো অথবা মানুষের থেকেও বেশি এডভান্স চিন্তা-ভাবনা করতে সক্ষম। বর্তমান বিশ্বে এআই শব্দটি খুব প্রচলিত একটি বিষয়। দ্রুতই এর জনপ্রিয়তা বেড়েই চলেছে। বিভিন্ন ক্রিটিক্যাল চিন্তা-ভাবনা ও পরিকল্পনার মাধ্যমে, সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর ডাটা এনালাইসিস করে উন্নত অ্যালগরিদম ব্যবহার করে ডাটা প্রসেসিং করাই মূলত এর কাজ। তাই স্বাভাবিকভাবেই এর প্রতি সবার আগ্রহ বেশি। মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ এবং বিশ্লেষণ করতে সক্ষম বলে এর অপব্যবহারের পক্ষশক্তি নির্বাচন সামনে রেখে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে মিথ্যা তথ্য বা ফেক নিউজ তৈরি করা তাদের কাছে বেশ সহজ। ‘ডিপফেক’ ভিডিও বা ছবি তৈরির মাধ্যমে রাজনৈতিক ও সামাজিক উদ্দেশ্যে ভুল তথ্য প্রচার করা হচ্ছে। এটি নির্বাচনী প্রক্রিয়া এবং সামাজিক অস্থিরতার ক্ষেত্রে বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য স্পষ্ট নীতিমালা এবং আইন তৈরি করা জরুরি, যাতে এর অপব্যবহার প্রতিরোধ করা যায়। সরকারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে এর নিয়ন্ত্রণের জন্য একযোগে কাজ না করলে সামনে বিপদের ঘনঘটা। সব কিছুর উপকারের পাশাপাশি কিছু অপকারও থাকে। এটাই প্রকৃতির নিয়ম। তবে উপকারের তুলনায় এর অপকারিতা অনেক কম বলা যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে ভুলবশত যদি এর ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে, তাহলে এটি মানুষকে নিজের শত্রু ভাবতে পারে যা মানবজাতির জন্য বিপজ্জনকও হয়ে উঠছে। যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক, স্লোভাকিয়া, আর্জেন্টিনা, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, পোল্যান্ড, বুলগেরিয়া, তাইওয়ান, জাম্বিয়া, ফ্রান্সের মতো দেশের নির্বাচনগুলোতেও এর অপব্যবহার হয়েছে। বাংলাদেশের ২০২৪ সালের ডামি নির্বাচনেও হয়েছে। আক্রান্ত বা ক্ষতিগ্রস্তদের তা জানতে জানতে সরকারের বিদায়ক্ষণ ঘনিয়ে আসে। যদিও ২০২৫ সালের শুরুতে এআই এত উন্নত ও সহজলভ্য ছিল না। সহজলভ্যতার কারণে এবার কী হতে পারে, সেই উৎকণ্ঠা এখন বিভিন্ন মহলে।
ডিজিটাল সাক্ষরতার করুণ অবস্থার কারণে বাংলাদেশে নির্বাচন কমিশন, প্রার্থী, দল, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী যেকোনো কিছু নিয়ে মন্দ কিছু ছড়ালে তা রোখা কঠিন। এখন এআই দিয়ে এমনভাবে ভুয়া ভিডিও, অডিও এবং ছবি তৈরি করা যাচ্ছে, যা একেবারে আসলের মতো মনে হয়। একে বলা হয় ডিপফেক। আরেকটি ধরন হলো ‘চিপফেক’। দেশে অপতথ্য ছড়াতে ডিপফেক ও চিপফেকের বেশ কিছু কৌশল ব্যবহৃত হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে সত্য ছবি বা ভিডিওর সঙ্গে বিভ্রান্তিকর বা ভিন্ন অর্থবাহী ক্যাপশন জুড়ে দেওয়া; সত্য বক্তব্যের অংশবিশেষ কেটে বা প্রসঙ্গ বদলে ভিন্ন অর্থ তৈরি করা; সম্পূর্ণ মনগড়া বক্তব্য বা উদ্ধৃতি নির্দিষ্ট ব্যক্তির নামে চালিয়ে দেওয়া, পুরনো ছবি, ভিডিও বা খবরকে সাম্প্রতিক ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা ইত্যাদি। নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় রাজনৈতিক অপতথ্য ছড়ানোর মাত্রা বাড়ছে। বিভিন্ন দলের শীর্ষ ও আলোচিত নেতা-নেত্রীরা ভুগতে শুরু করেছেন। গণমাধ্যমের ফটোকার্ড, টিভি স্ক্রল বা নিউজ পোর্টালের ডিজাইনের আদলে ভুয়া গ্রাফিকস বানানোর ধুম পড়েছে। মনগড়া তথ্য, সংখ্যা, পরিসংখ্যান, স্ক্রিনশট দিলেই মানুষের নজর কাড়ছে। এসবের ভিউ তথা বাজার বেশ গরম।
এসব তৈরির জন্য বড় দপ্তর লাগে না। তার পরও নির্বাচন সামনে রেখে বিভিন্ন জায়গায় গোপন অফিস থেকে এগুলোর মেকিং চলছে। আর নিরাপদে বিদেশে থেকে চিহ্নিত কিছু ব্যক্তি নিয়মিত বাংলাদেশের বিভিন্ন বিষয়ে ফেসবুক, ইউটিউব ও অন্যান্য মাধ্যম ব্যবহার করে মিথ্যা ও অপতথ্য ছড়ান, সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে অপপ্রচার চালান, উসকানি দেন। চাইলেই তা রোখা সম্ভব নয়। চেষ্টা করে অপতথ্য ছড়িয়ে দেওয়া অ্যাকাউন্ট ও পেজ শনাক্ত করা সম্ভব হলেও পেছনে কারা, তা বের করা কঠিন। গুজব-অপতথ্য ছড়ানোর সঙ্গে মোটাদাগে দুই শ্রেণির মানুষ জড়িত। এক শ্রেণি রাজনৈতিক অথবা আদর্শিকভাবে উৎসাহিত। অন্য শ্রেণিটি টাকার বিনিময়ে কাজটি করে। গুজব এবং অপতথ্যের বাজার বরাবরই ভালো। অপতথ্যের গতি বেশি। সত্য তথ্যের চেয়ে তা দ্রুত ছড়ায়, বাজারও পায়। অনেকে তা বেশি বিশ্বাস করে। মিথ্যাও যার পক্ষে যায় তার কাছে তা সুখকর। বিপক্ষে গেলে তখনই গুজব-অপতথ্যের নিন্দা করে। যে কারণে অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে রাজনৈতিক দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতারাও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো গুজবকে ভিত্তি ধরে বক্তব্যও দিচ্ছেন।
ফেসবুকের ভুয়া ফটোকার্ডের সূত্র ধরে আলোচনার বাজার জমান। মূল ধারার কিছু সংবাদমাধ্যমও কখনো কখনো এসব ভুয়া খবরকে আমলে নিয়ে প্রকাশ করছে। শুনতে কঠিন মনে হলেও বলতে হয়, কোনো সমাজে যখন খবর আর গুজব এক হয়ে যায়, যখন সমাজের বিরাট অংশের মানুষ গুজবকে খবর বলে বিশ্বাস করে, তখন সেখানে প্রথমে মার খায় সাংবাদিকতার নীতি এবং নৈতিক সাংবাদিকতা। প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখা করা তথা দৃশ্যত শিক্ষিত মানুষজনও কখনো কখনো কোনটা খবর, কোনটা বেখবর, কোনটা প্রোপাগান্ডা, কোনটা গুজব—সেটি বুঝতে পারে না। এ সুযোগেই তো জনপ্রিয় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের লোগোর আদলে লোগো তৈরি করে ছড়ানো হচ্ছে নানা ধরনের ফেইক নিউজ। বাজার বুঝেই কামবেলা, প্রথম আলু, জনকষ্ট, চেন্নাই টোয়েন্টিফোর, জানিনা টিভি ইত্যাদি। অর্থাৎ মূলধারার টেলিভিশন ও সংবাদপত্রের আদলে ডিজাইন করে ভুল, বিভ্রান্তিকর ও মিথ্যা তথ্য দিয়ে ফটোকার্ডের এই বাজার। অসংখ্য মানুষ তা বিশ্বাস করছে। কারণ প্রথম দেখায় এটা বুঝতে পারা কঠিন যে আসলেই এসব ফটোকার্ড ভুয়া, নাকি সঠিক। শুধু তা-ই নয়, মূলধারার পত্রিকা বা টিভির হুবহু নাম, লোগো ও ডিজাইনেও এ রকম ভুল ও বিভ্রান্তিকর ফটোকার্ড বানিয়ে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। বেশি ভাইরাল হওয়ার পর জানা যাচ্ছে, এগুলো ফেইক। এআই দিয়ে তৈরি সংবাদ প্রডাক্ট আর ফেইক ফটোকার্ডের এ বিষাক্ত মহামারি সমাজে যে অস্থিরতা তৈরি করে চলছে, তা নির্বাচনের সৌন্দর্য নষ্ট করছে। মূলধারার সংবাদমাধ্যমকেও একটা বাজে সন্ধিক্ষণে এনে দিচ্ছে।
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট
ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন । সূএ: বাংলাদেশ প্রতিদিন








