সংগৃহীত ছবি
জিল্লুর রহমান : ১. ইতিহাস যখন পণ্যে পরিণত হয়
বাংলাদেশে ইতিহাসের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক বরাবরই জটিল। মুক্তিযুদ্ধ ছিল একসময় জাতির নৈতিক ভিত্তি, আত্মপরিচয়ের মূল স্তম্ভ। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই ইতিহাস রাজনীতির বাজারে ঢুকে পড়েছিল। মুক্তিযুদ্ধ হয়ে উঠেছিল ক্ষমতার বৈধতার সনদ, বিরোধীদের চুপ করানোর অস্ত্র, শাসনের অলংকার। পনেরো-ষোলো বছর ধরে আমরা দেখেছি কীভাবে একটি মহাকাব্যিক সংগ্রামকে রাজনৈতিক পণ্যে পরিণত করা হয়েছিল।
আজ একই আশঙ্কা ঘিরে ধরছে জুলাইয়ের গণ অভ্যুত্থানকে। জুলাই ছিল মানুষের ক্ষোভের বিস্ফোরণ। বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো তরুণদের সাহসিকতা। রাজপথে নামা সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষা-আর কোনো দমনপীড়ন নয়, আর কোনো অন্যায় নয়। সেই আন্দোলনের দুটি স্পষ্ট দাবি ছিল : বৈষম্যের অবসান এবং সরকারের পতন। কিন্তু বিপ্লবের পর আমরা যে নতুন বয়ান শুনতে শুরু করলাম-সংস্কার কমিশন, ঐকমত্য কমিশন, নতুন নতুন রাজনৈতিক ভাষ্য-এসব অনেকটাই আন্দোলনের মাঠের আলোচনার অংশ ছিল না।
আজ জুলাইয়ের গল্পও মঞ্চে উঠে যাচ্ছে, পোস্টারে ছাপা হচ্ছে, বক্তৃতায় বিক্রি হচ্ছে। বিপ্লবের স্মৃতি, শহীদের রক্ত, ছাত্রদের সাহস-সবকিছু যেন নতুন এক ব্র্যান্ড। ইতিহাস আবারও বাজারে ঢুকে পড়ছে।
বিশ্ব রাজনীতিতে ইতিহাসকে পণ্যে পরিণত করার এই প্রবণতা নতুন নয়। লাতিন আমেরিকায় বিপ্লবী আন্দোলনের নাম ব্যবহার করে বহু সরকার ক্ষমতায় এসেছে, আফ্রিকায় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ব্যবহার করে বহু শাসক নিজের কর্তৃত্বকে বৈধতা দিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে আরব বসন্তের বয়ানও অনেক দেশে ক্ষমতার অলংকারে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ এখন সেই একই পথে হাঁটছে কি না, এই প্রশ্নটাই আজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সমস্যা ইতিহাসে নয়, সমস্যাটা হলো ইতিহাসের সঙ্গে মানুষের জীবনের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেলে। যে বয়ান মানুষের দুঃখকষ্ট, নিরাপত্তা, সম্মান আর ন্যায়ের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে না, তা একসময় ক্লান্ত করে তোলে। তখন বিপ্লবও স্মৃতির জাদুঘরে বন্দি হয়ে যায়। এখান থেকেই শুরু হয় রাষ্ট্রের বড় সংকট। কারণ ইতিহাস যখন পণ্যে পরিণত হয়, তখন রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়ে।
২. ক্ষমতার চেয়ার ও ভাঙা রাষ্ট্র
ইতিহাসের পণ্যে রূপান্তরের পরের ধাপটা প্রায় স্বাভাবিক নিয়মেই আসে-ক্ষমতার চেয়ার। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি নিষ্ঠুর সত্য আছে : যে লঙ্কায় যায়, সে-ই রাবণ হয়ে ফেরে। বিরোধী দলে থাকলে মহাকাব্যিক সংগ্রামসবাই গণতন্ত্রের কথা বলে, ক্ষমতায় গেলে সবাই শাসকের ভাষায় কথা বলে। মুখ বদলায় না, অবস্থান বদলায়। ফলে রাষ্ট্রের চরিত্র বদলায় না, শুধু শাসকের নাম বদলায়।
এই বাস্তবতা শুধু বাংলাদেশের নয়। আফ্রিকায় বহু মুক্তিযুদ্ধের নেতা ক্ষমতায় গিয়ে স্বৈরশাসকে পরিণত হয়েছেন, লাতিন আমেরিকায় গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নায়করা ক্ষমতায় গিয়ে একনায়ক হয়েছেন, এমনকি ইউরোপেও আমরা দেখেছি কীভাবে জনপ্রিয়তাবাদী নেতারা ক্ষমতার স্বাদ পেয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দুর্বল করেছেন। বাংলাদেশেও একই চিত্র। রাজনৈতিক নেতা হোক কিংবা নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি-ক্ষমতার কাছাকাছি গেলে মুখ বদলায় না, অবস্থান বদলায়। ফলে রাষ্ট্রের চরিত্র বদলায় না, শুধু শাসকের নাম বদলায়।
এই নৈতিক সংকটের নগ্ন রূপ আমরা দেখেছি সাম্প্রতিক সময়ের কয়েকটি ঘটনায়। দেশের দুইটি প্রথিতযশা সংবাদপত্রের কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ ছিল কেবল একটি অপরাধ নয়, এটি ছিল মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত। প্রশ্ন হলো, তখন রাষ্ট্র কোথায় ছিল? আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোথায় ছিল? ঘটনার পর সবাই দুঃখ প্রকাশ করল, বিবৃতি দিল, ফোন করল। কিন্তু যা হওয়ার, তা তো হয়ে গেছে। রাষ্ট্র যখন নাগরিকের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, তখন ক্ষমতার দুঃখ প্রকাশ আর নাগরিকের ক্ষত শুকাতে পারে না।
আরও ভয়ংকর হলো মব কালচারকে নানাভাবে বৈধতা দেওয়ার প্রবণতা। একটি তথাকথিত স্থিতিশীল দেশে, ছয় মাস পর ধানমন্ডি ৩২-এর ঐতিহাসিক স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো-সবার সামনে, প্রকাশ্যে। কেউ থামাল না। কেউ দাঁড়াল না। রাষ্ট্র যদি নিজেই ভিড়ের হাতে আইন তুলে দেয়, তাহলে নাগরিক কোথায় যাবে?
এখানেই ইতিহাসের পণ্যে পরিণত হওয়া আর ক্ষমতার চেয়ার এক হয়ে যায়। ইতিহাসকে যারা বিক্রি করে, তারাই একসময় রাষ্ট্রকে নিজের সম্পত্তি ভাবতে শুরু করে।
৩. রাজপথ, ক্যাম্পাস আর পরিচয়ের রাজনীতি
রাষ্ট্র যখন দুর্বল হয়, তখন রাজপথে নতুন শক্তির উত্থান ঘটে। বাংলাদেশেও সেটাই হচ্ছে। ধর্মভিত্তিক রাজনীতি আবার সংগঠিত হচ্ছে। যারা একসময় প্রান্তিক ছিল, তারা আবার জায়গা করে নিচ্ছে জনসমাবেশে, মিছিলে, বক্তৃতায়। ধর্মীয় আবেগ রাজনীতির প্রধান ভাষা হয়ে উঠছে।
বিশ্ব রাজনীতিতেও আমরা এই প্রবণতা দেখছি। ইউরোপে অভিবাসনবিরোধী ডানপন্থি দলগুলোর উত্থান, আমেরিকায় ধর্মীয় রক্ষণশীলতার পুনরুত্থান, মধ্যপ্রাচ্যে ইসলামপন্থি রাজনীতির পুনর্গঠন-সবখানেই পরিচয়ের রাজনীতি নতুন করে শক্তিশালী হচ্ছে।
বাংলাদেশেও তার ব্যতিক্রম নেই। এই প্রবণতার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে ক্যাম্পাস রাজনীতিতেও। সাম্প্রতিক বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচন, বিশেষ করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচন, দেখিয়েছে-নতুন প্রজন্ম পুরোনো দলীয় রাজনীতির বাইরে বিকল্প খুঁজছে। তারা আবাসনসংকট, নিরাপত্তা, পরিবহন, শিক্ষার মান-এই বাস্তব সমস্যাগুলোর সমাধান চায়।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে এটি ঐতিহ্যগতভাবে জাতীয় রাজনীতির প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। এখানে শিক্ষার্থীরা যেভাবে সংগঠিত হচ্ছে, যেসব ইস্যুকে সামনে আনছে-তা দেখায়, রাজনীতিকে তারা আর কেবল স্লোগানের জায়গা হিসেবে দেখতে চায় না।
কিন্তু একই সঙ্গে দেখা যাচ্ছে পরিচয়ের রাজনীতিও শক্তিশালী হচ্ছে। আদর্শের বদলে পরিচয় যখন রাজনীতির মূল ভাষা হয়ে ওঠে, তখন নাগরিক হয়ে ওঠার বদলে মানুষ হয়ে ওঠে অনুসারী। তখন ইতিহাস, রাষ্ট্র আর সমাজ-সবকিছুই বিভক্ত হয়ে পড়ে।
এই জায়গায় জুলাইয়ের বয়ান, ক্ষমতার চেয়ার আর রাজপথের রাজনীতি এক হয়ে যায়। ইতিহাসকে পণ্যে বানানো হয়, ক্ষমতা সেই পণ্যের মালিক হয়, আর রাজপথে জন্ম নেয় নতুন বিভাজন।
৪. এক ভাইয়ের শোক ও সম্পর্কের মানে
এই রাষ্ট্র, রাজনীতি, বিপ্লব আর ক্ষমতার ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে জীবন কখনো কখনো হঠাৎ খুব ব্যক্তিগত হয়ে ওঠে। ১০ জানুয়ারি ছিল আমার ছোট বোন কামরুন নাহারের (শিল্পী) একাদশ মৃত্যুবার্ষিকী। ঢাকা কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ছিল ও। শিক্ষকতা ছিল ওর জীবন, ছাত্রছাত্রীরা ছিল ওর পরিবার। কিন্তু আমার কাছে ও শুধু একজন শিক্ষাবিদ ছিল না-ও ছিল আমার ছোট বোন, মাত্র দুই বছরের ছোট হলেও আমার সন্তানের মতো, আমার জীবনের নীরব শক্তি।
ভাইবোনের সম্পর্ক পৃথিবীর সবচেয়ে অদ্ভুত সম্পর্কগুলোর একটি। এখানে বন্ধুত্ব আছে, অভিভাবকত্ব আছে, শাসন আছে, ভালোবাসা আছে, আবার অদ্ভুত এক নির্ভরশীলতাও আছে। ভাই বড় হলে সে শুধু ভাই থাকে না, সে হয়ে ওঠে আশ্রয়। আর বোন ছোট হলে সে শুধু বোন থাকে না, সে হয়ে ওঠে সংসারের প্রাণ।
শিল্পী ছিল সেই রকমই। সংসারের সবচেয়ে প্রাণচঞ্চল মানুষ। পড়াশোনা, শিক্ষকতা, সংসার-সবকিছু সামলে ও যেন সবার ভিতরে আলো জ্বালিয়ে রাখত। আজও অনেক সময় মনে হয়, কোনো খবর শোনাতে গেলে প্রথমেই ওর কথা মনে পড়ে। কোনো আনন্দে ফোন করতে ইচ্ছা করে। কোনো দুঃখে পাশে বসতে ইচ্ছা করে।
মৃত্যু মানুষকে নিয়ে যায় না, স্মৃতিকে রেখে যায়। স্মৃতি কখনো কাঁদায়, কখনো শক্ত করে। এগারো বছর হয়ে গেল, কিন্তু ভাইবোনের সম্পর্কের জায়গাটা আজও শূন্যই রয়ে গেছে। এই শূন্যতা আমাকে বারবার মনে করিয়ে দেয়-রাষ্ট্রের সঙ্গে যেমন সম্পর্ক দরকার, ইতিহাসের সঙ্গে যেমন সম্পর্ক দরকার, তেমনি মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কই শেষ পর্যন্ত আমাদের মানুষ করে তোলে।
রাষ্ট্র যখন নাগরিকের সঙ্গে সম্পর্ক হারায়, রাজনীতি যখন মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক হারায়, ইতিহাস যখন মানুষের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে-তখন সমাজ ভিতর থেকে ভেঙে যায়। ঠিক যেমন একটি পরিবার ভেঙে যায় যখন ভাইবোনের কণ্ঠ হঠাৎ থেমে যায়।
শেষ কথা
বাংলাদেশ আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে ইতিহাস আবার নতুন করে লেখা হচ্ছে। প্রশ্ন হলো-এই ইতিহাস কে লিখবে? ক্ষমতা, না মানুষ?
জুলাইয়ের বিপ্লব যদি মানুষের জীবনে ন্যায়ের নিশ্চয়তা না আনে, তাহলে সেটি কেবল স্মৃতির অ্যালবামে বন্দি হয়ে যাবে। যদি রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদল না হয়, তাহলে ক্ষমতার চেয়ার আগের মতোই মানুষকে গ্রাস করবে। যদি রাজনীতির মাঠ পরিচয়ের দখলে চলে যায়, তাহলে গণতন্ত্র দুর্বল হবে। আর যদি আমরা সম্পর্কের মূল্য ভুলে যাই, তাহলে রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার-সব জায়গাতেই শূন্যতা তৈরি হবে।
ইতিহাসকে পণ্যে পরিণত করা যায়। ক্ষমতাকে দখল করা যায়। কিন্তু মানুষের হৃদয়ের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক গড়া যায় না জোর করে। সেই সম্পর্ক গড়ে ওঠে ন্যায়ে, বিশ্বাসে আর দায়বদ্ধতায়।
ভাইবোনের সম্পর্ক যেমন কোনো চুক্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না, রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্কও তেমনই। তা জন্ম নেয় ভালোবাসা আর দায়িত্ববোধ থেকে। আমরা কি আবারও ইতিহাসকে বিক্রি করব? নাকি ইতিহাসকে মানুষের মুক্তির ভাষা বানাব?
এই প্রশ্নের উত্তরই ঠিক করে দেবে-বাংলাদেশ আগামী দিনে একটি ন্যায্য রাষ্ট্র হবে, নাকি একটি ক্ষমতাকেন্দ্রিক ব্যবস্থা। এই হলো চতুর্মাত্রা। চারটি দিক কিন্তু ভবিষ্যৎ একটাই।
লেখক : প্রেসিডেন্ট, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ।সূএ : বাংলাদেশ প্রতিদিন








