মুক্তির স্বপ্ন ভাঙে বাস্তবতার ঘায়ে

সংগৃহীত ছবি

 

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : যদি বলা যায় যে মৌলবাদিতা ও মাস্তানি আসলে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ, তাহলে উভয় পক্ষই তেড়ে আসবে মারতে। এবং তখনই একটা প্রমাণ হাতেনাতে পাওয়া যাবে যে ওই ধারণাটা মোটেই মিথ্যে নয়। দুটোই রোগ বটে। রোগীর পক্ষে বিপজ্জনক, জাতির পক্ষে ক্ষতিকর। মৌলবাদিতা ও মাস্তানি এরা উভয়েই উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্কহীন, জীবনের স্বাভাবিক ধারাপ্রবাহ থেকে বিচ্যুত। উৎপাদনবিরোধী তারা, ধারাপ্রবাহের অন্তরায়। আপাত-দূরত্বের আড়ালে কাছাকাছি তারা, একই রকম অসহিষ্ণু ও উচ্ছৃঙ্খল। জন্ম তাদের সমাজের একই আবিলতায়।

আমেরিকায় মৌলবাদের তৎপরতা শুরু হয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে। হতাশায় উদারনীতি ও আধুনিকতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল কিছু মানুষ, যারা বলতে চেয়েছিল মোক্ষ রয়েছে বাইবেলে প্রত্যাগমনে। বিবর্তনবাদ পড়ানো যাবে না বিদ্যালয়ে, এ দাবিও তুলেছিল তারা। কিন্তু এই মৌলবাদের সঙ্গে মৌলিক পার্থক্য আছে আমাদের দেশের মৌলবাদের। এখানে সে নিরীহ নয়, আদালতে যায় না। বরং তেড়ে আসে। মৌলবাদ যে কত ভয়ংকর হতে পারে, দেখেছি আমরা একাত্তরে; তখন সে ঘাতক হয়েছিল, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ছত্রছায়ায়।

মৌলবাদীদের তৎপরতা আবার বৃদ্ধি পাচ্ছে, যেমন বৃদ্ধি পাচ্ছে মাস্তানদের দৌরাত্ম্য; প্রায় একই মাত্রায়, বলতে গেলে। এ নিয়ে চিন্তিত অনেকেই, উদ্বিগ্ন ভীষণভাবে। গালমন্দও কম হচ্ছে না। কিন্তু এরা থামছে না, বরং যেন শক্তিশালীই হচ্ছে ক্রমাগত। একে নির্মূল করতে চাইলে এই শক্তির উৎস কোথায়, সেটা দেখা দরকার সর্বাগ্রে।

কুসংস্কার বলি, ভাববাদিতা বলি, মৌলবাদের লক্ষণ যেসব, সবই থাকে মানুষের মনে। উগ্রতার বসবাসও সেখানেই, এটা বলতে কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু মানুষের মনটা থাকে কোথায়? প্রয়োজনীয় প্রশ্ন সেটাই। মন যে স্বাধীন নয়, সে যে নিয়ন্ত্রিত হয় বস্তুগত অবস্থান দ্বারাই, সেটা না বুঝলে আমরা কিছুই বুঝতে পারব না, মৌলবাদকেও নয়। মৌলবাদ সমাজ ও রাষ্ট্রের বাস্তবিক অবস্থার মধ্যেই পুষ্ট হচ্ছে, সেখান থেকেই নিয়ন্ত্রণ করছে মানুষের মনকে। মনের যা অবদানের, তা কখনোই শক্তিশালী হতো না যদি আনুকূল্য না পেত সমাজ ও রাষ্ট্রের।

মৌলবাদীরা বলে তারা বিপ্লব চায়। জানে, এ যুগ বিপ্লবের যুগ। এখন বিপ্লবের বিরোধিতা করলে মানুষের কাছে যাওয়া যাবে না। এমনকি ভাত-কাপড়ের কথাও বলে আজকাল, গণতন্ত্রের দাবি তো তোলেই। সবকিছুর পেছনে অভিপ্রায় যেটি, তা হচ্ছে বিপ্লবকে ঠেকিয়ে রাখা। বিপ্লবের কথা বলেই বিপ্লবকে প্রতিহত করবে। যেমন রাজনীতি করার মধ্য দিয়েই মানুষকে পরিণত করবে অরাজনৈতিক প্রাণীতে। অরাজনৈতিক হলে মানুষ আর মানুষ থাকে না; দেবতা হয়, কিংবা হয় পশু। দেবতা হলে অসুবিধা ছিল না, আকাশে থাকত, কিন্তু পশু হয় বলেই বিপদ ঘটায়। পশু সমাজ মানে, সমাজের পরিবর্তন চায় না। পশু মানুষ হলে তার লাভলোকসানের হিসাব করা কঠিন। কিন্তু মানুষ পশু হলে সমাজ যে অচল হয়, তাতে সন্দেহের অবকাশ দেখি না।

দেশে একদিকে মৌলবাদ প্রবল হচ্ছে, অন্যদিকে প্রকৃত গণতন্ত্র আসছে না। এ দুটি বিচ্ছিন্ন নয় পরস্পর থেকে। গণতন্ত্র পাকিস্তানেও ছিল না, এখনো নেই। মৌলবাদ পাকিস্তানি আমলেও বাড়ছিল, এখনো বাড়ছে। গণতন্ত্র তো কেবল ভোট নয়, যদিও সে ভোটও বটে। গণতন্ত্র হচ্ছে মানুষের মৌলিক অধিকার, এবং সেই সঙ্গে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ। আজ অধিকারও নেই, মূল্যবোধও নেই। যার ফলে পরমতসহিষ্ণুতার অভাব। অভাব সহনশীলতার। যা থেকে বোঝা যায় যে সামন্তবাদ গণতন্ত্রের শত্রু এবং মৌলবাদের মিত্র। গণতন্ত্র নেই বলেই মৌলবাদের এত বাড়বাড়ন্ত। সামন্তবাদে ভক্তি, আনুগত্য, অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কার ইত্যাদির প্রশ্রয় থাকে। তার প্রবণতা স্বৈরাচারমুখী। মৌলবাদও এসবকে আশ্রয় করেই তাজা থাকে। এবং এদের পোক্ত করে প্রাণপণে।

অর্থনীতিতে পুরোপুরি পুঁজিবাদ এসে গেছে। না মেনে উপায় নেই, এখন উৎপাদন হয় মুনাফার স্বার্থে; বিক্রি হয় বাজারে। দ্বন্দ্ব এখন শ্রমের সঙ্গে পুঁজির। কিন্তু এই পুঁজিবাদ সামন্তবাদের বুক চিড়ে বেরিয়ে আসেনি, যার জন্য এর নানা অঙ্গে সামন্তবাদী মূল্যবোধগুলো বিরাজমান। হাতে দেখি আংটি, বুকের ভিতর গভীর অদৃষ্টবাদ, মস্তিষ্কে হামাগুড়ি দেয় নানাবিধ বৈজ্ঞানিকতা ও কুসংস্কার। অন্যদিকে আমাদের বুর্জোয়ারাও জাতীয় চরিত্রের নন, মুৎসুদ্দি চরিত্রের। একসময় পরাধীনতা অত্যন্ত স্থূলভাবে সত্য ছিল আমাদের জন্য। এখন সত্য পরনির্ভরতা। ঋণ, সাহায্য, দান, অনুদান, আমদানি, রপ্তানি, সব দিকের পরনির্ভরতা। ফল দাঁড়াচ্ছে এই যে কেবল দরিদ্ররাই ভূমিহীন নয় বুর্জোয়ারাও ঠিকই ভূমিহীন। তাদের আস্থা নেই নিজের ওপর। তারাও দাঁড়িয়ে নেই আত্মশক্তির ভূমিতে। ভূমিহীনের পক্ষে অদৃষ্টবাদী না হয়ে উপায় কী, উপায় কোথায় হন্যে হয়ে অবলম্বন না খুঁজে? এই আত্মআস্থাহীন, অদৃষ্টবাদিতা, এই করুণাপ্রার্থী পরনির্ভরতা- এরা উভয়েই মৌলবাদের পৃষ্ঠপোষক।

দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে স্বাধীনতা কাউকেই স্বাধীন করল না; না ধনীকে, না গরিবকে। গরিবকে যে স্বাধীন করবে না সেটা স্বাভাবিক, কিন্তু ধনীও স্বাধীন হতে পারেনি। সে যে ধনী হয়েছে, সেটা কিসের জোরে? অদৃষ্টের জোরেই বটে। সেটাই বিশ্বাস করতে হয়। বিশ্বাস করাতে হয় অন্যকেও। নইলে তো মানতে হয় যে বড়লোক হওয়ার জন্য সে লোক ঠকিয়েছে, চুরিচামারি করেছে, লিপ্ত হয়েছে নানাবিধ অপরাধ ও দুর্নীতিতে। যে স্বীকৃতি তার পক্ষে মোটেই সম্মানজনক নয়। রহস্যই ধর্মের দিকে টানে মানুষকে। অজ্ঞেয়র ব্যাখ্যা ধর্ম দিয়ে করা যায়। কিন্তু এই যে নিতান্ত জাগতিক রহস্য, রাজনীতির ক্ষেত্রে যার নাম ষড়যন্ত্র, সমাজের ক্ষেত্রে দুর্নীতি, অর্থনীতিতে লুণ্ঠন, তার ব্যাখ্যাতেও দৈবের অনুগ্রহ তথা অদৃষ্টকে খাড়া করাই সন্তোষজনক। সত্য প্রচ্ছন্ন থাকে, অক্ষুণ্ন থাকে মানসম্মান।

গরিবের তো সাংস্কৃতিক জীবন নেই বললেই চলে। বিনোদন নেই, বিলাপ ভিন্ন। কিন্তু ধনীরই বা সুস্থ সাংস্কৃতিক জীবন কোথায়? পশ্চিমের পথ ধরেছে কেউ কেউ। অনেকে পারেনি। বাধা এসেছে সংস্কার থেকে, হয়তো বা পরিবার থেকেও। সে ক্ষেত্রে ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে বিনোদনের এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতার বিষয় করে তোলা সুবিধাজনক বৈকি। সেই ঘটনা ঘটছে যে তা বর্ণনাবাহুল্য দিয়ে প্রমাণের অপেক্ষা রাখে না। এত দেখছি চতুষ্পার্শ্বেই।

তা ছাড়া এ-ও মানতে হবে যে নৈতিক শিক্ষার সূত্রগুলো আমরা ধর্মের কাছ থেকেই পাব বলে আশা করি। কিন্তু বুর্জোয়াদের ধর্মচর্চায় তো ধার্মিকতার নামগন্ধ নেই। প্রকৃত ধার্মিকতায় আধ্যাত্মিকতা থাকে, সেখানে পরিচ্ছন্নতা পাওয়া যায়; কখনো কখনো তা মরমিবাদী হয়ে ওঠে বটে, তবে প্রায়শ মানুষের প্রতি বিদ্বেষ না জাগিয়ে ভালোবাসা জাগায়। প্রকৃত ধার্মিকের গুণ এগুলো। তিনি অন্যকে করুণা করতে পারেন, কিন্তু ঘৃণা করেন না। অন্যের ওপর নিজের মত চাপাতে যাবেন, এ আগ্রহ গড়ে উঠলেও তাকে তিনি দমন করেন। কিন্তু বুর্জোয়াদের ধর্মচর্চায় এসব গুণ অন্তর্হিত। তার ভিত কোনো দিক দিয়েই দার্শনিক নয়। সর্বতোভাবে বস্তুবাদী। মাক্স ওয়েবাররা দেখিয়েছেন যে ইউরোপে একসময় ধর্ম পুঁজিবাদের বিকাশে সাহায্য করেছে। সেটা ছিল ধর্মের একটি প্রগতিশীল ভূমিকা। কেমন করে করল? করল মানুষকে সঞ্চয়ী ও বিলাসবিমুখ করে। আমাদের বুর্জোয়াদের ধর্ম ওই ভূমিকা পালন করে না। পারবে না করতে। এ বুর্জোয়া পুঁজি সৃষ্টি করেনি; সুযোগ পেয়ে হাতিয়ে নিয়েছে মাত্র। আর ধর্ম যখন মৌলবাদীর হাতে পড়ে, তখন সে একেবারেই ধার্মিক থাকে না, মাস্তানে পারিণত হয়। মৌলবাদী নিজে ধর্মের অনুশীলন করুক না-করুক, অন্যে করছে কি না, এ বিষয়ে ভীষণ রক্তচক্ষু হয়ে থাকে। তার উদ্দেশ্য ধার্মিকতার সৃষ্টি নয়, মানুষের অগ্রগতি প্রতিহত করা। কায়েমি স্বার্থের দালাল সে; অসংশোধনীয় রূপে।

মৌলবাদীরা বলে ধর্মের সাহায্যে সমাজে শৃঙ্খলা আনবে। তা যদি সম্ভব হতো তবে পাকিস্তানি সৈন্যরা অমন বিশৃঙ্খল হতো না। বস্তুত মৌলবাদীদের আসল চেহারা যদি কেউ দেখতে চান একাত্তরের আলবদরদের মধ্যে তা দেখতে পাবেন, যে চেহারা পাকিস্তানি সৈন্যদের তুলনায়ও জঘন্য ছিল।

মুক্তিযুদ্ধ ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। সম্ভব হয়নি। সম্ভব যে হবে না তার লক্ষণ একেবারে শুরুতেই দেখা দিয়েছিল। ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ যখন করা হলো, সব ধর্মের অবাধ, অর্থাৎ আরও বেশি চর্চা। ইহজাগতিকতার চর্চা এগোল না সেই তুলনায়। তার একটা বড় কারণ ব্যর্থতা। মানুষের মুক্তির স্বপ্ন ভেঙে খান খান হয়ে গেল, বাস্তবতার ঘায়ে। বাস্তবিক ব্যর্থতার ছবি সমস্ত আশাকে গ্রাস করে ফেলবে মনে হচ্ছে।

লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।  সূএ : বাংলাদেশ প্রতিদিন

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



» খালেদা জিয়াকে লন্ডনে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে পরিবার: তারেক রহমানের উপদেষ্টা

» নির্বাচন করতে চাইলে উপদেষ্টাদের এখনই পদত্যাগ করা উচিত : সাইফুল হক

» এমন দোয়া ও ভালোবাসা পাওয়া পরম সৌভাগ্যের: খালেদা জিয়া সম্পর্কে আজহারী

» যখন বুঝবো সব ঠিক আছে, তখন তারেক রহমান দেশে আসবেন: দুদু

» খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা ‘ক্রিটিক্যাল তবে স্থিতিশীল’: ডা. তাসনিম জারা

» হাসপাতালে না গিয়ে নিজ অবস্থানে থেকে খালেদা জিয়ার জন্য দোয়ার অনুরোধ রিজভীর

» হাসপাতালে গিয়ে খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের খোঁজ নিলেন মামুনুল হক

» হাসিনার ফাঁসি দেখা পর্যন্ত আল্লাহ যেন খালেদা জিয়াকে বাঁচিয়ে রাখেন: হাসনাত আব্দুল্লাহ

» খালেদা জিয়ার খোঁজ নিতে এভারকেয়ারে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা

» উপদেষ্টা পরিষদের বিশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত

 

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ,

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন,

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন: ই-মেইল : [email protected],

মোবাইল :০১৫৩৫১৩০৩৫০

Desing & Developed BY PopularITLtd.Com
পরীক্ষামূলক প্রচার...

মুক্তির স্বপ্ন ভাঙে বাস্তবতার ঘায়ে

সংগৃহীত ছবি

 

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : যদি বলা যায় যে মৌলবাদিতা ও মাস্তানি আসলে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ, তাহলে উভয় পক্ষই তেড়ে আসবে মারতে। এবং তখনই একটা প্রমাণ হাতেনাতে পাওয়া যাবে যে ওই ধারণাটা মোটেই মিথ্যে নয়। দুটোই রোগ বটে। রোগীর পক্ষে বিপজ্জনক, জাতির পক্ষে ক্ষতিকর। মৌলবাদিতা ও মাস্তানি এরা উভয়েই উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্কহীন, জীবনের স্বাভাবিক ধারাপ্রবাহ থেকে বিচ্যুত। উৎপাদনবিরোধী তারা, ধারাপ্রবাহের অন্তরায়। আপাত-দূরত্বের আড়ালে কাছাকাছি তারা, একই রকম অসহিষ্ণু ও উচ্ছৃঙ্খল। জন্ম তাদের সমাজের একই আবিলতায়।

আমেরিকায় মৌলবাদের তৎপরতা শুরু হয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে। হতাশায় উদারনীতি ও আধুনিকতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল কিছু মানুষ, যারা বলতে চেয়েছিল মোক্ষ রয়েছে বাইবেলে প্রত্যাগমনে। বিবর্তনবাদ পড়ানো যাবে না বিদ্যালয়ে, এ দাবিও তুলেছিল তারা। কিন্তু এই মৌলবাদের সঙ্গে মৌলিক পার্থক্য আছে আমাদের দেশের মৌলবাদের। এখানে সে নিরীহ নয়, আদালতে যায় না। বরং তেড়ে আসে। মৌলবাদ যে কত ভয়ংকর হতে পারে, দেখেছি আমরা একাত্তরে; তখন সে ঘাতক হয়েছিল, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ছত্রছায়ায়।

মৌলবাদীদের তৎপরতা আবার বৃদ্ধি পাচ্ছে, যেমন বৃদ্ধি পাচ্ছে মাস্তানদের দৌরাত্ম্য; প্রায় একই মাত্রায়, বলতে গেলে। এ নিয়ে চিন্তিত অনেকেই, উদ্বিগ্ন ভীষণভাবে। গালমন্দও কম হচ্ছে না। কিন্তু এরা থামছে না, বরং যেন শক্তিশালীই হচ্ছে ক্রমাগত। একে নির্মূল করতে চাইলে এই শক্তির উৎস কোথায়, সেটা দেখা দরকার সর্বাগ্রে।

কুসংস্কার বলি, ভাববাদিতা বলি, মৌলবাদের লক্ষণ যেসব, সবই থাকে মানুষের মনে। উগ্রতার বসবাসও সেখানেই, এটা বলতে কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু মানুষের মনটা থাকে কোথায়? প্রয়োজনীয় প্রশ্ন সেটাই। মন যে স্বাধীন নয়, সে যে নিয়ন্ত্রিত হয় বস্তুগত অবস্থান দ্বারাই, সেটা না বুঝলে আমরা কিছুই বুঝতে পারব না, মৌলবাদকেও নয়। মৌলবাদ সমাজ ও রাষ্ট্রের বাস্তবিক অবস্থার মধ্যেই পুষ্ট হচ্ছে, সেখান থেকেই নিয়ন্ত্রণ করছে মানুষের মনকে। মনের যা অবদানের, তা কখনোই শক্তিশালী হতো না যদি আনুকূল্য না পেত সমাজ ও রাষ্ট্রের।

মৌলবাদীরা বলে তারা বিপ্লব চায়। জানে, এ যুগ বিপ্লবের যুগ। এখন বিপ্লবের বিরোধিতা করলে মানুষের কাছে যাওয়া যাবে না। এমনকি ভাত-কাপড়ের কথাও বলে আজকাল, গণতন্ত্রের দাবি তো তোলেই। সবকিছুর পেছনে অভিপ্রায় যেটি, তা হচ্ছে বিপ্লবকে ঠেকিয়ে রাখা। বিপ্লবের কথা বলেই বিপ্লবকে প্রতিহত করবে। যেমন রাজনীতি করার মধ্য দিয়েই মানুষকে পরিণত করবে অরাজনৈতিক প্রাণীতে। অরাজনৈতিক হলে মানুষ আর মানুষ থাকে না; দেবতা হয়, কিংবা হয় পশু। দেবতা হলে অসুবিধা ছিল না, আকাশে থাকত, কিন্তু পশু হয় বলেই বিপদ ঘটায়। পশু সমাজ মানে, সমাজের পরিবর্তন চায় না। পশু মানুষ হলে তার লাভলোকসানের হিসাব করা কঠিন। কিন্তু মানুষ পশু হলে সমাজ যে অচল হয়, তাতে সন্দেহের অবকাশ দেখি না।

দেশে একদিকে মৌলবাদ প্রবল হচ্ছে, অন্যদিকে প্রকৃত গণতন্ত্র আসছে না। এ দুটি বিচ্ছিন্ন নয় পরস্পর থেকে। গণতন্ত্র পাকিস্তানেও ছিল না, এখনো নেই। মৌলবাদ পাকিস্তানি আমলেও বাড়ছিল, এখনো বাড়ছে। গণতন্ত্র তো কেবল ভোট নয়, যদিও সে ভোটও বটে। গণতন্ত্র হচ্ছে মানুষের মৌলিক অধিকার, এবং সেই সঙ্গে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ। আজ অধিকারও নেই, মূল্যবোধও নেই। যার ফলে পরমতসহিষ্ণুতার অভাব। অভাব সহনশীলতার। যা থেকে বোঝা যায় যে সামন্তবাদ গণতন্ত্রের শত্রু এবং মৌলবাদের মিত্র। গণতন্ত্র নেই বলেই মৌলবাদের এত বাড়বাড়ন্ত। সামন্তবাদে ভক্তি, আনুগত্য, অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কার ইত্যাদির প্রশ্রয় থাকে। তার প্রবণতা স্বৈরাচারমুখী। মৌলবাদও এসবকে আশ্রয় করেই তাজা থাকে। এবং এদের পোক্ত করে প্রাণপণে।

অর্থনীতিতে পুরোপুরি পুঁজিবাদ এসে গেছে। না মেনে উপায় নেই, এখন উৎপাদন হয় মুনাফার স্বার্থে; বিক্রি হয় বাজারে। দ্বন্দ্ব এখন শ্রমের সঙ্গে পুঁজির। কিন্তু এই পুঁজিবাদ সামন্তবাদের বুক চিড়ে বেরিয়ে আসেনি, যার জন্য এর নানা অঙ্গে সামন্তবাদী মূল্যবোধগুলো বিরাজমান। হাতে দেখি আংটি, বুকের ভিতর গভীর অদৃষ্টবাদ, মস্তিষ্কে হামাগুড়ি দেয় নানাবিধ বৈজ্ঞানিকতা ও কুসংস্কার। অন্যদিকে আমাদের বুর্জোয়ারাও জাতীয় চরিত্রের নন, মুৎসুদ্দি চরিত্রের। একসময় পরাধীনতা অত্যন্ত স্থূলভাবে সত্য ছিল আমাদের জন্য। এখন সত্য পরনির্ভরতা। ঋণ, সাহায্য, দান, অনুদান, আমদানি, রপ্তানি, সব দিকের পরনির্ভরতা। ফল দাঁড়াচ্ছে এই যে কেবল দরিদ্ররাই ভূমিহীন নয় বুর্জোয়ারাও ঠিকই ভূমিহীন। তাদের আস্থা নেই নিজের ওপর। তারাও দাঁড়িয়ে নেই আত্মশক্তির ভূমিতে। ভূমিহীনের পক্ষে অদৃষ্টবাদী না হয়ে উপায় কী, উপায় কোথায় হন্যে হয়ে অবলম্বন না খুঁজে? এই আত্মআস্থাহীন, অদৃষ্টবাদিতা, এই করুণাপ্রার্থী পরনির্ভরতা- এরা উভয়েই মৌলবাদের পৃষ্ঠপোষক।

দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে স্বাধীনতা কাউকেই স্বাধীন করল না; না ধনীকে, না গরিবকে। গরিবকে যে স্বাধীন করবে না সেটা স্বাভাবিক, কিন্তু ধনীও স্বাধীন হতে পারেনি। সে যে ধনী হয়েছে, সেটা কিসের জোরে? অদৃষ্টের জোরেই বটে। সেটাই বিশ্বাস করতে হয়। বিশ্বাস করাতে হয় অন্যকেও। নইলে তো মানতে হয় যে বড়লোক হওয়ার জন্য সে লোক ঠকিয়েছে, চুরিচামারি করেছে, লিপ্ত হয়েছে নানাবিধ অপরাধ ও দুর্নীতিতে। যে স্বীকৃতি তার পক্ষে মোটেই সম্মানজনক নয়। রহস্যই ধর্মের দিকে টানে মানুষকে। অজ্ঞেয়র ব্যাখ্যা ধর্ম দিয়ে করা যায়। কিন্তু এই যে নিতান্ত জাগতিক রহস্য, রাজনীতির ক্ষেত্রে যার নাম ষড়যন্ত্র, সমাজের ক্ষেত্রে দুর্নীতি, অর্থনীতিতে লুণ্ঠন, তার ব্যাখ্যাতেও দৈবের অনুগ্রহ তথা অদৃষ্টকে খাড়া করাই সন্তোষজনক। সত্য প্রচ্ছন্ন থাকে, অক্ষুণ্ন থাকে মানসম্মান।

গরিবের তো সাংস্কৃতিক জীবন নেই বললেই চলে। বিনোদন নেই, বিলাপ ভিন্ন। কিন্তু ধনীরই বা সুস্থ সাংস্কৃতিক জীবন কোথায়? পশ্চিমের পথ ধরেছে কেউ কেউ। অনেকে পারেনি। বাধা এসেছে সংস্কার থেকে, হয়তো বা পরিবার থেকেও। সে ক্ষেত্রে ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে বিনোদনের এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতার বিষয় করে তোলা সুবিধাজনক বৈকি। সেই ঘটনা ঘটছে যে তা বর্ণনাবাহুল্য দিয়ে প্রমাণের অপেক্ষা রাখে না। এত দেখছি চতুষ্পার্শ্বেই।

তা ছাড়া এ-ও মানতে হবে যে নৈতিক শিক্ষার সূত্রগুলো আমরা ধর্মের কাছ থেকেই পাব বলে আশা করি। কিন্তু বুর্জোয়াদের ধর্মচর্চায় তো ধার্মিকতার নামগন্ধ নেই। প্রকৃত ধার্মিকতায় আধ্যাত্মিকতা থাকে, সেখানে পরিচ্ছন্নতা পাওয়া যায়; কখনো কখনো তা মরমিবাদী হয়ে ওঠে বটে, তবে প্রায়শ মানুষের প্রতি বিদ্বেষ না জাগিয়ে ভালোবাসা জাগায়। প্রকৃত ধার্মিকের গুণ এগুলো। তিনি অন্যকে করুণা করতে পারেন, কিন্তু ঘৃণা করেন না। অন্যের ওপর নিজের মত চাপাতে যাবেন, এ আগ্রহ গড়ে উঠলেও তাকে তিনি দমন করেন। কিন্তু বুর্জোয়াদের ধর্মচর্চায় এসব গুণ অন্তর্হিত। তার ভিত কোনো দিক দিয়েই দার্শনিক নয়। সর্বতোভাবে বস্তুবাদী। মাক্স ওয়েবাররা দেখিয়েছেন যে ইউরোপে একসময় ধর্ম পুঁজিবাদের বিকাশে সাহায্য করেছে। সেটা ছিল ধর্মের একটি প্রগতিশীল ভূমিকা। কেমন করে করল? করল মানুষকে সঞ্চয়ী ও বিলাসবিমুখ করে। আমাদের বুর্জোয়াদের ধর্ম ওই ভূমিকা পালন করে না। পারবে না করতে। এ বুর্জোয়া পুঁজি সৃষ্টি করেনি; সুযোগ পেয়ে হাতিয়ে নিয়েছে মাত্র। আর ধর্ম যখন মৌলবাদীর হাতে পড়ে, তখন সে একেবারেই ধার্মিক থাকে না, মাস্তানে পারিণত হয়। মৌলবাদী নিজে ধর্মের অনুশীলন করুক না-করুক, অন্যে করছে কি না, এ বিষয়ে ভীষণ রক্তচক্ষু হয়ে থাকে। তার উদ্দেশ্য ধার্মিকতার সৃষ্টি নয়, মানুষের অগ্রগতি প্রতিহত করা। কায়েমি স্বার্থের দালাল সে; অসংশোধনীয় রূপে।

মৌলবাদীরা বলে ধর্মের সাহায্যে সমাজে শৃঙ্খলা আনবে। তা যদি সম্ভব হতো তবে পাকিস্তানি সৈন্যরা অমন বিশৃঙ্খল হতো না। বস্তুত মৌলবাদীদের আসল চেহারা যদি কেউ দেখতে চান একাত্তরের আলবদরদের মধ্যে তা দেখতে পাবেন, যে চেহারা পাকিস্তানি সৈন্যদের তুলনায়ও জঘন্য ছিল।

মুক্তিযুদ্ধ ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। সম্ভব হয়নি। সম্ভব যে হবে না তার লক্ষণ একেবারে শুরুতেই দেখা দিয়েছিল। ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ যখন করা হলো, সব ধর্মের অবাধ, অর্থাৎ আরও বেশি চর্চা। ইহজাগতিকতার চর্চা এগোল না সেই তুলনায়। তার একটা বড় কারণ ব্যর্থতা। মানুষের মুক্তির স্বপ্ন ভেঙে খান খান হয়ে গেল, বাস্তবতার ঘায়ে। বাস্তবিক ব্যর্থতার ছবি সমস্ত আশাকে গ্রাস করে ফেলবে মনে হচ্ছে।

লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।  সূএ : বাংলাদেশ প্রতিদিন

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



সর্বাধিক পঠিত



 

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ,

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন,

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন: ই-মেইল : [email protected],

মোবাইল :০১৫৩৫১৩০৩৫০

Design & Developed BY ThemesBazar.Com