ছবি সংগৃহীত
অনলাইন ডেস্ক : ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র তার কঠিন সামরিক শক্তি এবং আন্তর্জাতিক সফট পাওয়ার; উভয় ক্ষেত্রেই একটি অপূরণীয় পতনের মুখোমুখি হয়েছে। ৪ নভেম্বর ‘আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী জাতীয় দিবস’ এবং ইরিানি ‘জাতীয় শিক্ষার্থী দিবস’ উপলক্ষ্যে প্রদত্ত এক বিশেষ বার্তায় তিনি এ কথা বলেন।
১৯৭৯ সালে ইমেলে ইরানি বিপ্লবী শিক্ষার্থীদের হাতে মার্কিন দূতাবাস দখল এবং মার্কিন-জায়নবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইরানি জাতির চলমান বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধকে স্মরণ করে এই বার্তা প্রকাশ করা হয়।
ইসলামি বিপ্লবের নেতা তার বার্তার শুরুতে বলেন, আজকের দিনটি ‘সত্য ও মিথ্যার ফ্রন্ট’ এবং ‘নিপীড়িত ও নিপীড়কদের ফ্রন্টে’র মধ্যকার সংঘাতের ইতিহাসকে সামনে নিয়ে এসেছে। এই বছর ১৩ই আবান (৪ নভেম্বর) ইরানি জাতি অপরাধী যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থানের প্রয়োজনীয়তা অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারছে। তবে শত্রুর ক্রমবর্ধমান বৈরিতা এবং দেশের দৃঢ় প্রতিরোধের ইতিহাস পর্যালোচনা করা ভবিষ্যতের পথের জন্য একটি দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে।
ইরানি জাতির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অবিচারের সূচনা সাত দশকেরও বেশি আগে ১৯৫৩ সালের ১৯ আগস্ট (২৮শে মোরদাদ) ক্যু ঘটানোর মাধ্যমে, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল ইরানের জাতীয় সম্পদ, বিশেষ করে তেল লুণ্ঠন করা। পরবর্তী দশকগুলোতে সাভাক গঠন করে এক শ্বাসরুদ্ধকর নিরাপত্তা পরিবেশ তৈরি করা হয় এবং বিপ্লবের ঠিক প্রাক্কালে নিজেদের পুতুল সরকারকে টিকিয়ে রাখতে তারা সব ধরনের চক্রান্ত চালায়।
বিপ্লবের বিজয়ের পর থেকে আমেরিকার বৈরী আচরণ অব্যাহত রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন, ক্যু-র চক্রান্ত, বুদ্ধিজীবী ও সাধারণ নাগরিকদের ওপর এমইকে-এর নৃশংস হামলায় সহায়তা, প্রথম চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধে বাথ পার্টিকে সরাসরি সমর্থন, ইরানের যাত্রীবাহী বিমান ভূপাতিত করা, দীর্ঘমেয়াদী ও কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও সহিংসতায় ইন্ধন দেওয়া এবং দেশের জাতীয় বীর জেনারেল কাসেম সোলেইমানিকে হত্যা করা যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ বৈরিতার অংশ। উপরন্তু, সম্প্রতি দ্বিতীয় ও তৃতীয় চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধে সরাসরি সামরিক আক্রমণ চালিয়ে ইরানের বহু বিজ্ঞানী, সামরিক কমান্ডার, শিশু এবং সর্বোপরি ইসলামি বিপ্লবের মহান নেতাকে শহীদ করা হয়েছে।
আয়াতুল্লাহ খামেনি উল্লেখ করেন, সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো সব ধরণের আন্তর্জাতিক ভণ্ডামি পরিত্যাগ করে ইরানের অখণ্ডতা বিনষ্ট করা, রাজনৈতিক ব্যবস্থার পতন ঘটানো এবং প্রাচীন ইরানি সভ্যতাকে ধ্বংস করার প্রকাশ্য লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নেমেছে। কিন্তু প্রতিবারই তারা ইরানি জাতির দৃঢ় প্রতিরোধের দেয়ালের মুখোমুখি হয়েছে। আমেরিকার এই ভুল হিসাব-নিকাশ এবং অহংকারী ভ্রান্তি শেষ পর্যন্ত মার্কিন জনগণ ও তাদের আঞ্চলিক অনুগত সরকারগুলোর ওপর বিপুল ক্ষতির বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে।
বর্তমানে পারস্য উপসাগর, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের অপরাজিত থাকার পৌরাণিক কাহিনীকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছে। এটি একই সাথে বিদেশি শক্তির ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোর দুর্বলতা এবং সংকটকালে নিজের অনুগতদের রক্ষায় বড় শক্তিগুলোর অক্ষমতা ও অবিশ্বস্ততাকে উন্মোচিত করেছে। তৃতীয় চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধে আমেরিকার আগ্রাসনের জবাবে পারস্য উপসাগরে ইরানের শক্ত অবস্থান এবং আঞ্চলিক মার্কিন ঘাঁটিগুলো ধ্বংস করার পদক্ষেপ মূলত আঞ্চলিক পরিসরে আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে এক প্রাথমিক জিহাদ। আমেরিকার পক্ষ থেকে এমন আগ্রাসনের পুনরাবৃত্তি ঘটলে ইরানের জবাব আরও ব্যাপক ও বিস্তৃত হবে।
তিনি বলেন, ফিলিস্তিন, লেবানন, ইরাক ও ইয়েমেনজুড়ে বিস্তৃত ‘প্রতিরোধ ফ্রন্টে’র এই কৌশলগত ও বীরত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলো একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থার সূচনা করছে। কারণ যখনই সত্যের ফ্রন্ট আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে অবিচল থাকে, তখন মিথ্যা বা বাতিলের পরাজয় ও পিছু হটা অনিবার্য হয়ে পড়ে, ঠিক যেমনটি পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, নিশ্চয়ই বাতিল বিলুপ্ত হওয়ারই বিষয় (সূরা বনি ইসরাইল: ৮১)।
আয়াতুল্লাহ খামেনি কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যদি এখনো কেউ মনে করে যে আমেরিকার রাজনৈতিক দল বা উপদলের পরিবর্তনের মাধ্যমে তাদের বৈরী আচরণের পরিবর্তন ঘটবে কিংবা ছাড় দিয়ে মার্কিন বৈরিতা থামানো যাবে, তবে তারা চরম ভুল ধারণার মধ্যে রয়েছে। গ্রেট শয়তান (যুক্তরাষ্ট্র) ইরানের নিকট থেকে কেবল নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ চায়। শত্রুর সামনে সামান্যতম নতি স্বীকারের মানসিকতাও শহীদদের রক্তের মাধ্যমে অর্জিত বিশাল সাফল্যকে ধ্বংস করে দেবে এবং শত্রুকে আরও বড় ধরনের যুদ্ধ ও আগ্রাসনে উৎসাহিত করবে।
পূর্ণাঙ্গ প্রতিরোধ ও আত্মরক্ষার একমাত্র উপায় হিসেবে তিনি আরও শক্তিশালী ইরান কৌশলকে অব্যাহত রাখার ওপর জোর দেন। জাতীয় ঐক্য, সামাজিক সংহতি এবং জনগণের কল্যাণে সরকারি কর্মকর্তাদের নিবেদিত সেবাকে এই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি বলে তিনি ঘোষণা করেন।
বার্তার শেষভাগে তরুণ ও শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে তিনি হতাশা ও নিরাশাবাদকে চূর্ণ করে আমরা পারি এই আত্মবিশ্বাস ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের হাতিয়ারে সজ্জিত হয়ে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ার আহ্বান জানান। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, আল্লাহর অশেষ রহমতে ইরানি জাতি খুব শীঘ্রই চূড়ান্ত বিজয় ও সমৃদ্ধি অর্জন করবে এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তির পতন আরও ত্বরান্বিত হবে।
সূত্র: তাসনিম নিউজ








