মোজাম্মেলের পাচারের টাকায় বেনজীরদের বিলাসী জীবন

ফাইল ছবি

 

অনলাইন ডেস্ক : পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি গাজী মো. মোজাম্মেল হক রাজধানীর অভিজাত এলাকা থেকে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়েছেন; কিন্তু এসব সম্পদ আবার তিনি একা ভোগ করছেন না। এর ভাগ অন্য সহকর্মীদের মধ্যে বিলি-বণ্টনও করছেন! তাঁর সম্পদের ভাগ পাওয়া ব্যক্তিদের তালিকায় সাবেক প্রভাবশালী পলাতক আইজিপি বেনজীর আহমেদ থেকে শুরু করে আরো বেশ কয়েকজন দুর্নীতিবাজ ও বিতর্কিত পুলিশ কর্মকর্তাও রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন পলাতক সাবেক ডিআইজি হারুন-অর-রশিদ, পুলিশের বিশেষ শাখার প্রধান (এসবি) মনিরুল ইসলামসহ অন্তত পলাতক ১০ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, যাঁরা বিদেশে বসে মোজাম্মেলের টাকায় বিলাসী জীবন যাপন করছেন। এর বাইরেও বেশ কয়েকজন উচ্চ পর্যায়ের পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাকে টাকা পাঠাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

ক্ষমতার অপব্যবহারে সম্পদের পাহাড় : দীর্ঘদিন ধরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করা গাজী মোজাম্মেল হক নিজের প্রভাব খাটিয়ে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। এই নিয়ে এর আগে গণমাধ্যমে ফলাও করে খবর ছাপা হয়েছে। এসব খবর পর্যালোচনা ও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, সরকারি দায়িত্ব পালনের আড়ালে তিনি গড়ে তুলেছেন এক অদৃশ্য সাম্রাজ্য। তাঁর বিরুদ্ধে জমি দখল, জোরপূর্বক ক্রয়, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ এবং প্রভাব বিস্তার করে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

রূপগঞ্জ, কুমিল্লার মেঘনা এবং সুনামগঞ্জের একাধিক ভুক্তভোগী জানিয়েছেন তাঁদের প্রতি জুলুমের কথা। তাঁদেরই একজন রূপগঞ্জের হাজি সোলাইমান মিয়া। ডিআইজি মোজাম্মেলের মালিকানাধীন আনন্দ হাউজিংয়ে দাঁড়িয়ে গতকাল বলেন, ‘আমার এখানে মাছের প্রজেক্ট ছিল। সেগুলোও মোজাম্মেল মাছসহ ভরাট করে ফেলেছে। আমাদের ভাই-বোনের জমিসহ আট বিঘা জমি এভাবে দখল করে নিয়েছে। আজ পর্যন্ত এর কোনো ক্ষতিপূরণ পাইনি। থানা, পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সসহ সব জায়গায় গিয়েছি, কোনো প্রতিকার মেলেনি। বর্তমানে আমি শাক-সবজি বিক্রি করে চলি। আমার ছেলে রাজমিস্ত্রির কাজ করে। অথচ এই সম্পদ দখল না হলে আমরা ভালো থাকতাম আর্থিকভাবে।’

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, মোজাম্মেলের উপার্জিত বিপুল অর্থের একটি বড় অংশ বিদেশে পাচার করা হয়েছে বলে অনেকে অভিযোগ করেছে। এই অর্থ ব্যবহার করে তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের বিদেশে বাড়ি, গাড়ি এবং বিলাসবহুল জীবনযাপনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এমনকি ব্যবসা-বাণিজ্যও সম্প্রসারিত করা হচ্ছে। তবে বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে ‘বেনজীর পরিবার’।

জানা গেছে, এই বেনজীর পরিবার বলতে শুধু তাঁর নিজস্ব পরিবারের সদস্যরাই নয়, তাঁর অধীন কাছের পলাতক পুলিশের কর্মকর্তারাও রয়েছেন। তাঁরা মোজাম্মেলের অর্থায়নেই পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতসহ ইউরোপ, আমেরিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বিলাসবহুল জীবন যাপন করছেন। সেখানে তাঁরা দামি অ্যাপার্টমেন্ট, বিলাসবহুল গাড়ি এবং উচ্চমানের জীবনযাত্রার সুবিধা ভোগ করছেন।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, আবাসন প্রতিষ্ঠানের নামের সঙ্গে ‘পুলিশ’ (আনন্দ পুলিশ হাউজিং সোসাইটি) শব্দ যুক্ত করা হয়েছে ব্যাবসায়িক সুবিধার জন্য। এই প্রকল্পে বেনজীর আহমেদকে একটি প্লট উপহার দিয়েছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা মোজাম্মেল। সেখানে তিনি বাড়িও করেছিলেন। বেনজীরের সেই বাড়ি দুর্নীতি দমন কমিশন এরই মধ্যে জব্দ করেছে।

সূত্র আরো বলছে, শুধু ক্ষমতা দেখানোর জন্যই বেনজীরকে একটি প্লট দিয়ে রেখেছিলেন পুলিশের এই চতুর কর্মকর্তা। মোজাম্মেল শুধু ক্ষমতার ফ্লেভার নেওয়ার জন্য বেনজীরকে ওই আবাসনে প্লট দিয়েছেন। আর বেনজীরের নামের পুরোদস্তুর অপব্যবহার করেছেন তিনি।

উল্লেখ্য, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ বর্তমানে নজিরবিহীন দুর্নীতির অভিযোগে পলাতক রয়েছেন। অবৈধ সম্পদ অর্জন ও মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে দুদক তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করেছে, যার পরিপ্রেক্ষিতে আদালত তাঁর সম্পদ জব্দের আদেশ দিয়েছেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। বেনজীর ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে দেশের বিভিন্ন জেলায় বিপুল পরিমাণ জমি, গুলশানে ফ্ল্যাট এবং বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে শেয়ারসহ শত শত কোটি টাকার সম্পদ থাকার তথ্য গণমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। মামলার তদন্ত শুরু হওয়ার পর তিনি সপরিবারে দেশ ত্যাগ করেছেন এবং বর্তমানে তিনি পলাতক রয়েছেন। পুলিশের সাবেক এই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অত্যন্ত দাপুটে পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং বর্তমানে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হয়ে আন্তর্জাতিক নজরদারিতে রয়েছেন। একাধিক সূত্র জানায়, বিদেশে বসবাসরত বেনজীরসহ অন্য পলাতক সাবেক এই পুলিশ কর্মকর্তাদের আয়ের কোনো বৈধ উৎস নেই, তবু তাঁদের জীবনযাত্রা অত্যন্ত ব্যয়বহুল।

মোজাম্মেলের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো তথাকথিত ‘আনন্দ পুলিশ হাউজিং সোসাইটি’। নামের সঙ্গে ‘পুলিশ’ শব্দটি যুক্ত থাকলেও প্রকল্পটির সঙ্গে সরকারি কোনো অনুমোদন বা সরাসরি সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের।

স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, এই প্রকল্পের জন্য ব্যাপকভাবে জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে জোরপূর্বক। অনেক ক্ষেত্রে মানুষকে ভয় দেখানো হয়েছে, এমনকি মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর হুমকিও দেওয়া হয়েছে। ফলে বাধ্য হয়ে অনেকেই তাঁদের পৈতৃক জমি ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন।

গাজী মোজাম্মেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে তাঁর বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, ক্ষমতার প্রভাব ব্যবহার করে তিনি নিজেকে আইনের ঊর্ধ্বে রাখার চেষ্টা করছেন।

অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, মোজাম্মেল একা নন, তাঁর সঙ্গে জড়িত রয়েছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। এই চক্রের সদস্যরা বিভিন্ন পর্যায়ে প্রশাসন, ব্যবসা ও রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তাঁদের সহায়তায় অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনা করা সহজ হয়েছে।

এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ, পাচার ও বিনিয়োগের একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। ফলে বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত দুর্নীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যায় রূপ নিয়েছে।

এ ধরনের অভিযোগ সরকারের ভাবমূর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে দুর্নীতি দমন এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতির সঙ্গে এসব ঘটনা সাংঘর্ষিক। তাঁরা বলছেন, দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন করা না হলে জনগণের আস্থা আরো কমে যাবে। সুধীসমাজ এবং সচেতন নাগরিকরা এরই মধ্যে এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছেন।

তাঁদের মতে, গাজী মোজাম্মেলের সম্পদের উৎস, বিদেশে অর্থপাচারের পথ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা জরুরি। একই সঙ্গে বিদেশে থাকা সম্পদ শনাক্ত করে তা ফেরত আনার উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলা হচ্ছে।

অপরাধ বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ উমর ফারুক বলেন, তাঁদের ওপরে কোনো ধরনের মনিটরিং নেই। যেমন—আগে কী সম্পদের মালিক ছিলেন? চাকরি করে কেমন সম্পদের মালিক হয়েছেন? এগুলো দেখা উচিত। তাঁরা নিজেদের নামে কিছু করেন না। সব করেন নামে-বেনামে। এতে আইনগত কোনো ভূমিকা কিংবা যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া যায় না, কিন্তু অন্যরাও উৎসাহিত হচ্ছে। তাঁরা জানেন এসব করলেও তাঁদেরও কিছু হবে না। দুদকের যে বিস্তর ভূমিকা নেওয়া দরকার ছিল তা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় হচ্ছে না। তাই এসব রোধে সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কার্যকর ভূমিকা ও সার্বক্ষণিক মনিটরিং জরুরি। সৌজন্যে : কালের কণ্ঠ

 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



» সংশোধনী নয়, সংস্কার পরিষদের কমিটি হলে সমান সদস্য রাখার শর্তে একমত বিরোধীদল: জামায়াত আমির

» সংবিধান সংশোধনে কমিটি গঠনের প্রস্তাব স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর, সমান সদস্য চায় বিরোধী দল

» এপ্রিল থেকেই চালু হচ্ছে ডিজিটাল ‘ফুয়েল পাস’ ব্যবস্থা

» বাংলা নববর্ষ উদযাপনে সমন্বয় কমিটি গঠন

» বলিভিয়াকে হারিয়ে ৪০ বছর পর বিশ্বকাপে উঠল ইরাক

» রাশিয়ায় বিমান বিধ্বস্ত হয়ে ২৯ জন নিহত

» কুয়েত বিমানবন্দরে ইরানি ড্রোন হামলা, জ্বলছে জ্বালানি ডিপো

» শাহ আমানতে আরও ৪ ফ্লাইট বাতিল

» পার্বতীপুর টার্মিনালে পৌঁছেছে ৭ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল

» মোজাম্মেলের পাচারের টাকায় বেনজীরদের বিলাসী জীবন

 

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ,

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন,

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

 

ইমেল: [email protected]

ফোন নাম্বার : ০১৫৩৫১৩০৩৫০,

Desing & Developed BY PopularITLtd.Com
পরীক্ষামূলক প্রচার...

মোজাম্মেলের পাচারের টাকায় বেনজীরদের বিলাসী জীবন

ফাইল ছবি

 

অনলাইন ডেস্ক : পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি গাজী মো. মোজাম্মেল হক রাজধানীর অভিজাত এলাকা থেকে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়েছেন; কিন্তু এসব সম্পদ আবার তিনি একা ভোগ করছেন না। এর ভাগ অন্য সহকর্মীদের মধ্যে বিলি-বণ্টনও করছেন! তাঁর সম্পদের ভাগ পাওয়া ব্যক্তিদের তালিকায় সাবেক প্রভাবশালী পলাতক আইজিপি বেনজীর আহমেদ থেকে শুরু করে আরো বেশ কয়েকজন দুর্নীতিবাজ ও বিতর্কিত পুলিশ কর্মকর্তাও রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন পলাতক সাবেক ডিআইজি হারুন-অর-রশিদ, পুলিশের বিশেষ শাখার প্রধান (এসবি) মনিরুল ইসলামসহ অন্তত পলাতক ১০ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, যাঁরা বিদেশে বসে মোজাম্মেলের টাকায় বিলাসী জীবন যাপন করছেন। এর বাইরেও বেশ কয়েকজন উচ্চ পর্যায়ের পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাকে টাকা পাঠাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

ক্ষমতার অপব্যবহারে সম্পদের পাহাড় : দীর্ঘদিন ধরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করা গাজী মোজাম্মেল হক নিজের প্রভাব খাটিয়ে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। এই নিয়ে এর আগে গণমাধ্যমে ফলাও করে খবর ছাপা হয়েছে। এসব খবর পর্যালোচনা ও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, সরকারি দায়িত্ব পালনের আড়ালে তিনি গড়ে তুলেছেন এক অদৃশ্য সাম্রাজ্য। তাঁর বিরুদ্ধে জমি দখল, জোরপূর্বক ক্রয়, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ এবং প্রভাব বিস্তার করে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

রূপগঞ্জ, কুমিল্লার মেঘনা এবং সুনামগঞ্জের একাধিক ভুক্তভোগী জানিয়েছেন তাঁদের প্রতি জুলুমের কথা। তাঁদেরই একজন রূপগঞ্জের হাজি সোলাইমান মিয়া। ডিআইজি মোজাম্মেলের মালিকানাধীন আনন্দ হাউজিংয়ে দাঁড়িয়ে গতকাল বলেন, ‘আমার এখানে মাছের প্রজেক্ট ছিল। সেগুলোও মোজাম্মেল মাছসহ ভরাট করে ফেলেছে। আমাদের ভাই-বোনের জমিসহ আট বিঘা জমি এভাবে দখল করে নিয়েছে। আজ পর্যন্ত এর কোনো ক্ষতিপূরণ পাইনি। থানা, পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সসহ সব জায়গায় গিয়েছি, কোনো প্রতিকার মেলেনি। বর্তমানে আমি শাক-সবজি বিক্রি করে চলি। আমার ছেলে রাজমিস্ত্রির কাজ করে। অথচ এই সম্পদ দখল না হলে আমরা ভালো থাকতাম আর্থিকভাবে।’

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, মোজাম্মেলের উপার্জিত বিপুল অর্থের একটি বড় অংশ বিদেশে পাচার করা হয়েছে বলে অনেকে অভিযোগ করেছে। এই অর্থ ব্যবহার করে তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের বিদেশে বাড়ি, গাড়ি এবং বিলাসবহুল জীবনযাপনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এমনকি ব্যবসা-বাণিজ্যও সম্প্রসারিত করা হচ্ছে। তবে বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে ‘বেনজীর পরিবার’।

জানা গেছে, এই বেনজীর পরিবার বলতে শুধু তাঁর নিজস্ব পরিবারের সদস্যরাই নয়, তাঁর অধীন কাছের পলাতক পুলিশের কর্মকর্তারাও রয়েছেন। তাঁরা মোজাম্মেলের অর্থায়নেই পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতসহ ইউরোপ, আমেরিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বিলাসবহুল জীবন যাপন করছেন। সেখানে তাঁরা দামি অ্যাপার্টমেন্ট, বিলাসবহুল গাড়ি এবং উচ্চমানের জীবনযাত্রার সুবিধা ভোগ করছেন।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, আবাসন প্রতিষ্ঠানের নামের সঙ্গে ‘পুলিশ’ (আনন্দ পুলিশ হাউজিং সোসাইটি) শব্দ যুক্ত করা হয়েছে ব্যাবসায়িক সুবিধার জন্য। এই প্রকল্পে বেনজীর আহমেদকে একটি প্লট উপহার দিয়েছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা মোজাম্মেল। সেখানে তিনি বাড়িও করেছিলেন। বেনজীরের সেই বাড়ি দুর্নীতি দমন কমিশন এরই মধ্যে জব্দ করেছে।

সূত্র আরো বলছে, শুধু ক্ষমতা দেখানোর জন্যই বেনজীরকে একটি প্লট দিয়ে রেখেছিলেন পুলিশের এই চতুর কর্মকর্তা। মোজাম্মেল শুধু ক্ষমতার ফ্লেভার নেওয়ার জন্য বেনজীরকে ওই আবাসনে প্লট দিয়েছেন। আর বেনজীরের নামের পুরোদস্তুর অপব্যবহার করেছেন তিনি।

উল্লেখ্য, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ বর্তমানে নজিরবিহীন দুর্নীতির অভিযোগে পলাতক রয়েছেন। অবৈধ সম্পদ অর্জন ও মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে দুদক তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করেছে, যার পরিপ্রেক্ষিতে আদালত তাঁর সম্পদ জব্দের আদেশ দিয়েছেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। বেনজীর ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে দেশের বিভিন্ন জেলায় বিপুল পরিমাণ জমি, গুলশানে ফ্ল্যাট এবং বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে শেয়ারসহ শত শত কোটি টাকার সম্পদ থাকার তথ্য গণমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। মামলার তদন্ত শুরু হওয়ার পর তিনি সপরিবারে দেশ ত্যাগ করেছেন এবং বর্তমানে তিনি পলাতক রয়েছেন। পুলিশের সাবেক এই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অত্যন্ত দাপুটে পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং বর্তমানে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হয়ে আন্তর্জাতিক নজরদারিতে রয়েছেন। একাধিক সূত্র জানায়, বিদেশে বসবাসরত বেনজীরসহ অন্য পলাতক সাবেক এই পুলিশ কর্মকর্তাদের আয়ের কোনো বৈধ উৎস নেই, তবু তাঁদের জীবনযাত্রা অত্যন্ত ব্যয়বহুল।

মোজাম্মেলের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো তথাকথিত ‘আনন্দ পুলিশ হাউজিং সোসাইটি’। নামের সঙ্গে ‘পুলিশ’ শব্দটি যুক্ত থাকলেও প্রকল্পটির সঙ্গে সরকারি কোনো অনুমোদন বা সরাসরি সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের।

স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, এই প্রকল্পের জন্য ব্যাপকভাবে জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে জোরপূর্বক। অনেক ক্ষেত্রে মানুষকে ভয় দেখানো হয়েছে, এমনকি মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর হুমকিও দেওয়া হয়েছে। ফলে বাধ্য হয়ে অনেকেই তাঁদের পৈতৃক জমি ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন।

গাজী মোজাম্মেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে তাঁর বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, ক্ষমতার প্রভাব ব্যবহার করে তিনি নিজেকে আইনের ঊর্ধ্বে রাখার চেষ্টা করছেন।

অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, মোজাম্মেল একা নন, তাঁর সঙ্গে জড়িত রয়েছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। এই চক্রের সদস্যরা বিভিন্ন পর্যায়ে প্রশাসন, ব্যবসা ও রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তাঁদের সহায়তায় অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনা করা সহজ হয়েছে।

এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ, পাচার ও বিনিয়োগের একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। ফলে বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত দুর্নীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যায় রূপ নিয়েছে।

এ ধরনের অভিযোগ সরকারের ভাবমূর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে দুর্নীতি দমন এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতির সঙ্গে এসব ঘটনা সাংঘর্ষিক। তাঁরা বলছেন, দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন করা না হলে জনগণের আস্থা আরো কমে যাবে। সুধীসমাজ এবং সচেতন নাগরিকরা এরই মধ্যে এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছেন।

তাঁদের মতে, গাজী মোজাম্মেলের সম্পদের উৎস, বিদেশে অর্থপাচারের পথ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা জরুরি। একই সঙ্গে বিদেশে থাকা সম্পদ শনাক্ত করে তা ফেরত আনার উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলা হচ্ছে।

অপরাধ বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ উমর ফারুক বলেন, তাঁদের ওপরে কোনো ধরনের মনিটরিং নেই। যেমন—আগে কী সম্পদের মালিক ছিলেন? চাকরি করে কেমন সম্পদের মালিক হয়েছেন? এগুলো দেখা উচিত। তাঁরা নিজেদের নামে কিছু করেন না। সব করেন নামে-বেনামে। এতে আইনগত কোনো ভূমিকা কিংবা যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া যায় না, কিন্তু অন্যরাও উৎসাহিত হচ্ছে। তাঁরা জানেন এসব করলেও তাঁদেরও কিছু হবে না। দুদকের যে বিস্তর ভূমিকা নেওয়া দরকার ছিল তা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় হচ্ছে না। তাই এসব রোধে সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কার্যকর ভূমিকা ও সার্বক্ষণিক মনিটরিং জরুরি। সৌজন্যে : কালের কণ্ঠ

 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



সর্বাধিক পঠিত



 

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ,

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন,

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

 

ইমেল: [email protected]

ফোন নাম্বার : ০১৫৩৫১৩০৩৫০,

Design & Developed BY ThemesBazar.Com