ছবি সংগৃহীত
ফাইজুস সালেহীন:একই সঙ্গে গভীর বেদনা, অন্তহীন কান্না এবং অশেষ গৌরবচিহ্নিত আমাদের দিনপঞ্জিকার দুটি তারিখ ২৫ ও ২৬ মার্চ। যারা বলেন, একাত্তর আবার কী, একাত্তরের প্রজন্ম ইতিহাসের নিকৃষ্ট প্রজন্ম-এই দিনগুলো ফিরে ফিরে আসে তাদের আঁতে ঘা দেওয়ার জন্য। তারা যন্ত্রণাবিদ্ধ হন, আত্মগত পাপ তাদের হয়তো শরবিদ্ধ করে। করুণা করা ছাড়া তাদের জন্য আমরা আর কী করতে পারি।
পরিতাপের বিষয়, স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও জাতিসংঘ ১৯৭১ সালের গণহত্যার স্বীকৃতি দেয়নি। সংবাদের এই অংশটুকু নিয়ে স্বাধীনতাবিরোধীদের ডুগডুগি বাজাবার কোনো সুযোগ নেই। জাতিসংঘের স্বীকৃতি না মেলার কারণ এই নয়, একাত্তরে বাংলাদেশে কোনো গণহত্যা হয়নি! এই স্বীকৃতি না পাওয়ার কারণ ঘাতক পাকিস্তান ও তার একাত্তরের মিত্র দেশগুলোর অব্যাহত বিরোধিতা। পাকিস্তান এবং তার এদেশীয় দোসররা এখন পর্যন্ত গণহত্যার বিষয়টি সাদামনে স্বীকার করে নেয়নি। ক্ষমাও চায়নি। পাকিস্তান একাত্তরের গণহত্যার জন্য ক্ষমা চাইলে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে সহজেই একাত্তরের গণহত্যার স্বীকৃতির পথে কোনো কূটনৈতিক বাধা থাকবে না। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির নেতিবাচক ভূমিকাও দুর্ভাগ্যজনক। এই শ্রেণিটির ক্রমাগত অবিমৃশ্যকারিতার ফলে এখনো কিছু বাজে লোক মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে বিষোদ্গার করতে কুণ্ঠিতবোধ করছে না। চব্বিশের ৫ আগস্টের পর তারা সাপের পাঁচ পা দেখতে শুরু করেছিল। ভাবতে শুরু করেছিল, তারাই বাংলাদেশের রাজনীতির মেইন স্ট্রিম হয়ে গেছে। ত্রয়োদশ সাধারণ নির্বাচনে তারা বড় ধরনের ধাক্কা খেলেও নীতিতে অটল রয়েছে।
জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক সরকার গঠিত হওয়ার পর দেশ গঠনের কাফেলায় যুক্ত হওয়ার পরিবর্তে তারা আন্দোলনের হুমকি দিয়ে চলেছে। তারা দেশ গঠন এবং জাতীয় জীবনের মূল সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের পথে সহযোগিতার পরিবর্তে জুলাই সনদ নিয়ে পড়ে আছে। জুলাই সনদের মূল বিষয়টিই হচ্ছে সংবিধান। বিদ্যমান শাসনতন্ত্র বাংলাদেশের কোনো সমস্যা নয়, যদিও কোনো কোনো সংশোধনী গণতন্ত্রের পথে বিঘ্ন সৃষ্টি করেছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান সংশোধন করায় বিরাট সমস্যা তৈরি করেছিল। সেই সংশোধনীর সুবিধা গ্রহণ করে আওয়ামী লীগ বিনা ভোটে বা রাতের ভোটে দীর্ঘকাল ক্ষমতা আঁকড়ে ছিল। শেখ হাসিনা হয়ে উঠেছিলেন কর্তৃত্ববাদী একনায়ক। কর্তৃত্ববাদের আমব্রেলার নিচে সমবেত রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, রাজনৈতিক সুশীল, সাংবাদিক ও আমলারা ‘রাজা যত বলেন, পারিষদ বলেন শতগুণ’-ধরনের বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হয়ে উঠেছিলেন। এদের মধ্যে হ্যানস ক্রিশ্চিয়ান এন্ডারসনের স্যাটায়ায়া রূপকথা দ্য এমপেরর’স নিউ ক্লথ গল্পের সেই সরল শিশুটির মতো সত্যবাদী একজনও ছিলেন না। সেই গল্পটি নিশ্চয়ই অনেকের জানা আছে।
একদা প্রবল প্রতাপশালী এক নৃপতি তার পারিষদের উদ্দেশে বললেন, আমাকে এমন একজন তাঁতি এনে দাও, যে আমাকে মখমলের এমন এক পোশাক বুনে দিতে পারবে, যা কোনো খারাপ লোকের দৃষ্টিগোচর হবে না। এবং যে পারবে, তাকে পুরস্কার দেওয়া হবে সহস্র স্বর্ণমুদ্রা। তথাস্তু! রাজ্যময় ঢেঁড়া বাজিয়ে এই সন্দেশ এলান করে দেওয়া হলো। পরদিন মিহিন থেকেও মিহিন মখমলের পোশাক নিয়ে শত শত তাঁতি এসে ভিড় করলেন প্রাসাদের সিংহদুয়ারে। কেবল একজন এলেন খালি হাতে। এক এক করে তাঁতিদের ডাক পড়তে লাগল দরবারে। রাজা একটি পোশাক হাতে নেন আর নাকচ করে দেন। সব শেষে এলেন খালি হাতে সেই জোলা। তিনি এসে রাজাকে বললেন, গোস্তাকি মাফ হয় আলামপনা।
তা বেশ! আলামপনা! অনুমতি প্রার্থনা করি, কানে কানে দুটো কথা বলার। বেশ তো! বলো দেখি কী কথা! বলে রাজা কাত হয়ে কান বাড়িয়ে দিলেন।
তাঁতি জাহাপনার কানে কানে বলল, এ এক আশ্চর্য পোশাক হে রাজন। কিন্তু কোনো বোকার সন্তান এই পোশাক দেখতে তো পাবেই না, ছুঁয়েও স্পর্শসুখ লাভ করবে না।
রাজা বললেন। বাহ্! বাহ্! এ তো দারুণ ব্যাপার! তা দেখাও দেখি তোমার সেই অত্যাশ্চর্য মখমল।
আজব কারিগর তার খালি দুই হাতে এমন ভান করলেন যেন তিনি একটি ইস্তিরি করা পোশাক ধরে রেখেছেন। হাঁটু গেড়ে বসে তিনি রাজার হাতে তুলে দিলেন সেই অদৃশ্য পোশাক। পোশাকটি হাতে নিয়ে রাজার মুখ লজ্জায় লাল হয়ে গেল। হায় আল্লা তিনি নিজেও তো পোশাকটি দেখতে পাচ্ছেন না। হাতে যে ধরেছেন তা-ও টের পাচ্ছেন না। তাহলে তিনি নিজেও কী বোকার সন্তান? রাজা বোকা হলে প্রজারা মানবে কেন!
অবিলম্বে রাজা ঢোক গিলে নিজেকে সামলে নিয়ে ফিকে হাসি দিয়ে সভাসদের উদ্দেশে বললেন, সত্যিই এ এক দারুণ পোশাক! তোমরা কি আমার অভিনব পোশাকটি দেখতে পাচ্ছ? সভাসদ সবাই প্রথমে মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। পরে সমস্বরে বলল, জি হুজুর! আমরা দেখতে পাচ্ছি। সত্যিই এ এক দারুণ পোশাক। নজর খুব সূক্ষ্ম না হলে দেখা কঠিন! কে না হতে চায় জ্ঞানী সুশীল!
অতঃপর তাঁতি রাজাকে পোশাক পরিয়ে দেওয়ার ভান করলেন। রাজা এখন সম্পূর্ণ নগ্ন। কিন্তু সভাসদ বলল, বাহ্! বাহ্! কী দারুণ! কী দারুণ!
এখন এই অত্যাশ্চর্য পোশাকটি পরে প্রজাসাধারণকে দর্শন দেবেন মহারাজ। রাজ্যজুড়ে ঢেঁড়া পিটিয়ে ঘোষণা করা হলো, আজ রাজা এক অলৌকিক পোশাক পরে এই পথে নগর পরিভ্রমণ করবেন। প্রজাগণকে আন্ডাবাচ্চাসহ পথিপার্শ্বে যথাসময়ে সারিবদ্ধভাবে দণ্ডায়মান থাকতে আদেশ করা হলো। শর্ত থাকে কোনো গর্দভ প্রজা এই অত্যাশ্চর্য পোশাকটি দেখতে পাবে না। যে দেখতে না পাবে, সেই বোকা প্রজার গর্দান নেওয়া হবে। এতে কোনো করুণা বা কার্পণ্য করা হবে না। এই রাজ্যে কোনো বোকার স্থান হবে না।
অতঃপর হাতির পিঠে চড়ে নগ্ন রাজা নগর পরিভ্রমণে বের হলেন। দুপাশে দণ্ডায়মান পুরবাসী করতালি দিয়ে বলতে লাগল, আরে বাহ্! বাহ্! কী দারুণ এক মখমলের পোশাক পরেছেন মহান রাজা। আফসোস বোকা লোকেরা তা দেখতে পাচ্ছে না। ঠিক সেই সময়ে এক সরল শিশু হাততালি দিয়ে বলতে লাগল, আহা কী মজা! কী মজা! হাতির পিঠে ন্যাংটা মহারাজা! সেই সত্যবাদী সরল শিশুর চিৎকারে পুরবাসী সংবিৎ ফিরে পেল। সমস্বরে সবাই বলতে লাগল, হ্যাঁ! হ্যাঁ! সত্যই আমাদের রাজা নিবস্ত্র হয়ে গেছেন। কে আছ রাজাকে পোশাক দাও!
রাজা লজ্জিত ও ক্রোধান্বিত হলেন। কোথায় সেই হতচ্ছাড়া জোলা! ওই প্রতারক জোলাকে হাজির কর। আমি এখনই উহার গর্দান লইব। তখন সহাস্য বদনে উদয় হলেন সেই বুদ্ধিমান তাঁতি। তার হাতে মোটা কাপড়ের বস্ত্র। তিনি রাজাকে বললেন, অধমের গর্দান নিতে হয় নেবেন। তার আগে জাহাঁপনা, এই পোশাকটি পরে লজ্জা ঢাকুন। তাঁতি রাজাকে মোটা পোশাকটি পরিয়ে দিলেন। সেই পোশাকে লেখা ছিল ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক!’
আমাদের সমাজে সবচেয়ে বেশি অভাব রাজার পারিষদে সত্যবাদী সরল শিশুর। বড় বেশি প্রয়োজন সত্যবাদী সরল শিশুর মতো পারিষদের এবং সুশীলেরও। এই অভাব না ঘটলে, শেখ হাসিনা একনায়ক হয়ে উঠতেন না, এরশাদ নির্বাচিত সরকার হটিয়ে স্বৈরাচারের মুকুট পরতে পারতেন না, বাকশাল এসে সংবিধানের বক্ষ বিদীর্ণ করতে পারত না। এমনকি হিটলার-মুসোলিনিরও জন্ম হতো না।
গল্প হলো। এই গল্প যে যেমন বোঝার বুঝে নেবেন। এবার প্রসঙ্গান্তরে যাওয়া যাক। নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার তার প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন করতে শুরু করেছে এক এক করে। ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে, ধাপে ধাপে। শিগগিরই স্বাস্থ্য কার্ড ও কৃষক কার্ড বিতরণের কাজ শুরু হবে। দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং দলের ভিতরে শুদ্ধি অভিযান শুরু হতে যাচ্ছে। এসব বিষয়ে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করবে বলে শোনা যাচ্ছে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের পদাঙ্ক অনুসরণ করে খাল কাটা কর্মসূচিরও উদ্বোধন হয়েছে। গৃহীত সব কর্মসূচি গণমুখী; জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট। তবে বলতে দ্বিধা নেই, সব ভালোর মধ্যে সবচেয়ে ভালো ও গঠনমুখী কর্মসূচিটি হলো খাল কাটা। জিয়াউর রহমানের খাল কাটা কর্মসূচি কৃষি উৎপাদন ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ বিনির্মাণে দৃষ্টিগ্রাহ্য অবদান সৃষ্টি করেছিল। সেচব্যবস্থার অভূতপূর্ব সম্প্রসারণ ঘটেছিল। জিয়াউর রহমান সম্ভবত চীনের হোয়াংহো নদী খনন প্রকল্প থেকে প্রেরণা লাভ করেছিলেন। ১৯৫০ দশকে চীন হোয়াংহো ও আরও কয়েকটি নদী খনন প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে কৃষিতে বিপ্লব এনেছিল। কৃষি উৎপাদনের পাশাপাশি বনায়ন, জলবিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পায়ন, আবাদি জমি সম্প্রসারণসহ আমূল পরিবর্তন নিয়ে এসেছিল। বিপ্লব-উত্তর চীনের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে হোয়াংহো নদী খনন প্রকল্প ছিল সর্ববৃহৎ ও সবচেয়ে কার্যকর কর্মসূচি। হোয়াংহো বা ইয়েলো রিভার প্রবাহকে তখন বলা হতো চীনের দুঃখ। খনন প্রকল্প বাস্তবায়নের পর সেই হোয়াংহোই চীনের অর্থনীতির প্রাণপ্রবাহে রূপান্তরিত হয়েছিল। আমাদের দেশেও প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান খাল খনন কর্মসূচির বিপ্লবের সূত্রপাত করেছিলেন। এরশাদ ক্ষমতায় এসে সেই কর্মসূচি বন্ধ করে দেন। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ব-দ্বীপ পরিকল্পনার আওতায় ক্যাপিটাল ড্রেজিং প্রকল্প গ্রহণ করলেও পরে তা মাটি ও বালুখেকোদের করতলগত হয়ে যায়। নদীর দুই পারে লাখ লাখ হেক্টর আবাদি জমি বেরোবে বলে সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছিল। বলা হয়েছিল দুপারে ওয়াকওয়ে নির্মাণ ও বনায়ন করা হবে। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে বালু ও মাটি তুলে নদীর দুই পারে হাজার হাজার হেক্টর জমি দখল করে বালু ও মাটি খলা বানানো হয়েছে। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে মাটি ও বালুর অন্যায্য ব্যবসার মাধ্যমে আত্মনং বৃদ্ধির কাজে। তা না হলে ডেল্টা প্ল্যান চীনের মতোই দেশ গঠনে ভূমিকা রাখতে পারত। কিন্তু সেদিকে সরকারের মনোযোগ ছিল না।
আমরা আশা করি, আওয়ামী লীগের ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের মতো ফাঁপা কাজের আর পুনরাবৃত্তি ঘটবে না। খাল কাটা কর্মসূচি দেশ গঠনে ফলপ্রসূ হোক-এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক। সূএ : বাংলাদেশ প্রতিদিন









