ছবি সংগৃহীত
মোস্তফা কামাল গণমাধ্যমের কোনো প্রশ্ন নিলেন না ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন। শুধু জানিয়ে দিলেন নির্বাচন ও নির্বাচনের জন্য তাঁদের উতল অপেক্ষার কথা। মানুষের ভোটে নির্বাচিত যেকোনো সরকারের সঙ্গে কাজ করতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তুতি ও অপেক্ষার কথাও জানান রাষ্ট্রদূত। তা-ও জানালেন নির্বাচন কমিশনে গিয়ে।
বুধবার দুপুরে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে সাক্ষাতে যান ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন। কথা বলেন সমসাময়িক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে।
আলোচনার মূল ফোকাসে ছিল আসন্ন নির্বাচন। উল্টেপাল্টে ব্যালট পেপারের আকার-আকৃতি দেখেন তিনি।
তাঁর আগ্রহদৃষ্টে সিইসি বিস্তারিত জানান কমিশনের প্রস্তুতির বিষয়াদি। এতে সন্তোষ প্রকাশ করেন ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন। এর বাইরে বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু বাড়তি আগ্রহ রয়েছে। নির্বাচনে স্বতন্ত্র পর্যবেক্ষক দল পাঠাবে যুক্তরাষ্ট্র।
পর্যবেক্ষণে বের হবেন তাদের ঢাকাস্থ দূতাবাস কর্মকর্তারাও। এই তথ্যের সোর্স ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ। তিনি এও পরিষ্কার করে জানান, নির্বাচন কমিশনের তালিকাভুক্ত ‘প্রথাগত (ফরমাল) অবজার্ভার’ নয়, নিজস্ব উদ্যোগে ভোটের অবস্থা দেখবে মার্কিনরা। নির্বাচন সামনে রেখে খুব ক্রুশিয়াল সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ১৯তম রাষ্ট্রদূত হিসেবে ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন ঢাকায় আসেন গত ১২ জানুয়ারি। বাংলাদেশ বিষয়ে অনেক হোমওয়ার্ক তাঁর।
ভোটের কাউন্ট ডাউনের এই সময়ে তাঁর এমন বক্তব্য ও দূতাবাসের প্রস্তুতি কেবল যুক্তরাষ্ট্রের একার নয়, বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও স্থিতিশীলতা প্রত্যাশী আরো অনেক দেশ ও সংস্থার বার্তা অভিন্ন। ঢাকাস্থ বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক মিশনগুলোই আসন্ন নির্বাচন নিয়ে তৎপর। বিভিন্ন দলের নেতাদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক চলছে। সরকারের নির্বাচনসংশ্লিষ্ট মহলের সঙ্গে দেনদরবারও বেশ। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা কূটনীতিকদের তৎপরতার কিছু কিছু গণমাধ্যমে আসছে।
প্রেসকে এড়িয়ে বা না জানিয়ে অনানুষ্ঠানিক ওঠাবসাও চলছে। চীনসহ এশিয়া অঞ্চলের কূটনীতিকরা দলীয় প্রধানদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করছেন। বৈঠকের বাইরে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা বড় দুই রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ রাখছেন। বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার হয়ে কূটনীতিকদের মূল চাওয়া সুষ্ঠু নির্বাচন ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে গণতান্ত্রিক উত্তরণ। নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে স্থিতিশীল পরিস্থিতিতে স্বস্তিতে কাজ করার আগ্রহ তাঁরা বেশ ক্লিয়ার অ্যান্ড লাউডেই বলছেন। এ নিয়ে সরকার ও রাজনৈতিক কোনো পক্ষেরই অনাগ্রহ নেই। সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন না হলে এর জের ও পরিণতি সম্পর্কে কোনো কোনো দেশের কূটনীতিকরা সতর্কবার্তাও দিয়ে চলছেন। তাই সবারই প্রত্যাশার পারদে সুষ্ঠু নির্বাচন, নির্বাচিত-সাংবিধানিক সরকারের কাছে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর এবং স্থিতিশীল দেশ। এ তাগিদ ও আকাঙ্ক্ষায় আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর তিন দিন আগেই জেলাভিত্তিক পর্যবেক্ষকদল পাঠিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন। ৫৬ জনের প্রতিনিধিদল দুজনের গ্রুপে ভাগ হয়ে দেশের সব জেলা পরিদর্শনে রয়েছে। বিভিন্ন খুঁটিনাটি বিষয়েও চোখ-চশমা ফেলছে। নোট নিচ্ছে। সরকার ও কয়েকটি দলের কনসার্ন জায়গায় অবহিত করছে।
নির্বাচনের কেন্দ্রবিন্দুতে মানবাধিকার সুরক্ষিত রাখার আহবান জানিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাগনেস ক্যালামার্ড তো প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে চিঠিই লিখে ফেলেছেন। বাংলাদেশের সব মানুষের মানবাধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এখনো বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে বলে অভিমত দেওয়া হয়েছে চিঠিটিতে। ২৬ জানুয়ারি লেখা এই চিঠি অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ওয়েবসাইটেও প্রকাশ করা হয়েছে। চিঠিতে অ্যাগনেস ক্যালামার্ড লিখেছেন—‘বাংলাদেশ যখন অন্তর্বর্তী সরকারের তত্ত্বাবধানে ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে, ঠিক সেই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আপনাকে এই চিঠি লিখছি। এই সময়টি একদিকে যেমন দায়িত্বের, তেমনি জনগণের আস্থা পুনর্গঠন, সুশাসন জোরদার এবং মানবাধিকার ও আইনের শাসনের পূর্ণ সম্মান নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগও বটে।’ ক্যালামার্ড আরো লিখেছেন, অতীতে ধারাবাহিক সরকারগুলোর অধীনে বাংলাদেশে গুরুতর ও ধারাবাহিক মানবাধিকার লঙ্ঘন ঘটেছে, যার মধ্যে রয়েছে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্বিচার আটক, নির্যাতন ও অমানবিক আচরণ, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও সংগঠনের অধিকারে বিধি-নিষেধ এবং সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও নাগরিক সমাজের সদস্যদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ। এসব লঙ্ঘন ঘটেছে সংকুচিত নাগরিক পরিসর, দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় কর্মীদের দায়মুক্তির প্রেক্ষাপটে।
তিনি আরো লিখেছেন, এই প্রেক্ষাপটে মানবাধিকার রক্ষা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গঠনমূলক সংলাপের অংশ হিসেবে নির্বাচন সামনে রেখে মৌলিক অধিকার সুরক্ষা বিষয়ে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের উদ্বেগ ও সুপারিশ তুলে ধরতে চাই। ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ নির্ধারিত নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ—যেখানে দেশটি এমন এক ভবিষ্যতের পথে অগ্রসর হতে পারে, যেখানে সব মানুষের অধিকার ও মর্যাদা শুধু স্বীকৃতই নয়, বরং লালিতও হবে। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদ (আইসিসিপিআর), নির্যাতনবিরোধী কনভেনশন (সিএটি) এবং অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদের (আইসিইএসসিআর) পক্ষভুক্ত হলেও আইন, নীতি ও বাস্তব প্রয়োগে এসব মানদণ্ড কার্যকর করতে এখনো বাধা রয়ে গেছে। নির্বাচনের আগে মত প্রকাশের স্বাধীনতা, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও সংগঠনের স্বাধীনতা—যা আইসিসিপিআরের ১৯, ২১ ও ২২ অনুচ্ছেদে সুরক্ষিত, তা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলেও মনে করিয়ে দেওয়া হয় চিঠিটিতে। বলার অপেক্ষা রাখছে না, চিঠিটির শব্দ ও বাক্যে স্পষ্ট বাংলাদেশের নির্বাচন ও পরিস্থিতির দিকে কোন মাত্রার চাহনি সংস্থাটির। নির্বাচন ঘনিয়ে এলে বরাবর বিদেশি কূটনীতিকদের চোখ-চাহনি থাকলেও এবারের পরিপ্রেক্ষিত বেশ ভিন্ন। এবার সরকার আর বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বিদেশি কূটনীতিকদের যোগাযোগ, বৈঠক, নানা বিষয়ে তাগিদ ও পর্যক্ষেণ কেবল রেওয়াজ নয়, বাড়তি আরো অনেক কিছু।
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন । সূএ: বাংলাদেশ প্রতিদিন








