মববাজ দমনের অপেক্ষায় জনতা

ছবি সংগৃহীত

 

মোস্তফা কামাল :নির্বাচন সামনে রেখে এমনিতেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বাড়তি চাপ নিতে হয়। সুষ্ঠু ও নিরাপদ নির্বাচনের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। এবারের পরিস্থিতির রূপ ও বাস্তবতা অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে গুরুতর। তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও ফেলেছে বাড়তি যন্ত্রণায়। সরকারের কড়া নির্দেশনার আলোকে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো মব দমনের চেষ্টায় কোনো কমতি বা ঘাটতি করছে না। কিন্তু চেষ্টায় কুলাচ্ছে না। তারা এক জায়গায় পদক্ষেপ নিলে মববাজরা হামলে পড়ছে আরও কয়েক জায়গায়। মবের সমান্তরালে খুন, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, ছিনতাইয়ের ঘটনাও বাড়ছে। নারী নির্যাতন, পুলিশ আক্রান্ত, মাদক ক্রয়বিক্রয়, চোরাচালান, চুরিসহ বিভিন্ন অপরাধও বাড়বাড়ন্ত। আন্দোলনে দলীয় ক্যাডার রক্ষাকারী বাহিনীর মতো নেতিবাচক ভূমিকার কারণে পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে, তা সত্য। পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম গণমাধ্যমকে বলেন, গেল সরকার ১৬ বছরে পুলিশকে রাজনৈতিক কাজে অতিব্যবহারে নৈতিকভাবে কাবু করে গেছে। কিন্তু মানুষ এ ধরনের অজুহাত আর শুনতে চায় না। পুলিশ রাতারাতি জনবান্ধব হয়ে যাবে, সেই আশাও করে না। তাদের প্রত্যাশা পুলিশ অন্তত পেশাদারত্ব নিয়ে তৎপর হোক। মবসহ চলমান দুষ্টকর্ম প্রতিহত করার কাজে পুলিশের চেষ্টা দৃশ্যমান হোক। তা মানুষকে অল্প হলেও আশা জাগাবে। মববাজ, চাঁদাবাজসহ অপরাধীদের ভয় জাগাবে। মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’-এর একটি প্রতিবেদনে গত এক বছরে দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নাজুক চিত্র উঠে এসেছে। সেখানে মব ভায়োলেন্সের সবিশেষ বর্ণনা রয়েছে। এসেছে মবে ৮৯টি হত্যার কথা। সবচেয়ে বেশি মব ভায়োলেন্সে হত্যা ঘটেছে ঢাকা বিভাগে, ৪৫টি। বলার অপেক্ষা রাখছে না, নির্বাচনের আগে এ মব নিয়ন্ত্রণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ। নির্বাচনের আগে আইন হাতে তুলে নেওয়ার এ মবপ্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ভোট পর্যন্ত পরিস্থিতি কোথায় গড়াবে, তা ভাবনায় ফেলেছে সচেতন মহলকে।

কেন দেশে মববেটিং বা গণপিটুনি এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে, এ নিয়ে সবিস্তারে ভাবার সময় এখন হাতে নেই। এর রহস্য সবারই জানা। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশে একের পর এক মব ভায়োলেন্স বা সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। পর্যালোচনায় দেখা যায়, আগেও মব সহিংসতা ছিল। তবে এখন এটা চরম আকার ধারণ করেছে। কয়েকটি কেস স্টাডিতে দেখা যায়, মবের আগে পরিকল্পিতভাবে ট্যাগ, গুজব, সন্দেহ, চুরির অভিযোগের মতো কিছু নাটকীয়তা সাজানো হয়। সামান্য তর্ক দিয়েও মব জমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। দলবদ্ধ করে কারা মানুষকে কারও ওপর  কীভাবে হামলে দিচ্ছে, তা গোপন থাকছে না। মবের পেছনে থাকছে নানা হীনস্বার্থ। তাই এদিক-ওদিক না ভেবে তা দমাতে হবে শক্ত হাতে। পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এরকম কয়েকটি অ্যাকশন ঘটালে মব দমতে বাধ্য। নইলে মবের মতো ঘটনা ঘটতেই থাকবে। সরকারকে প্রমাণ দিতে হবে, তারা এ ব্যাপারে মুখে নয়, কাজেও শক্ত। মানুষের মধ্যে এ বিশ্বাস আনার দায়িত্ব সরকারের।

শহর-গ্রাম মিলিয়ে যতগুলো মব সৃষ্টি করা হয়েছে, ততবার বিশৃঙ্খল পরিবেশ সৃষ্টি হয়। এটাকে মানুষের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ বলে আশকারা দেওয়ার সুযোগ নেই। এমন আশকারা প্রকারান্তরে মানুষ নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়ার উসকানি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী একা এ উসকানি রুখতে পারবে না। সাধারণ মানুষকে এ ব্যাপারে সচেতন করে তুলতে হবে। বিশেষ করে রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের সচেতন হতে হবে। নির্বাচন সামনে রেখে তাঁদের কর্মকাণ্ড মানুষ একটু বেশি করে দেখছে। পর্যবেক্ষণ করছে।  বেশ কিছু গণমাধ্যম মব সহিংসতার বিরুদ্ধে ভূমিকা রাখছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও টানাপোড়েনের পর বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরকাল অতিক্রম করছে। এই সময়টিকে অনেকেই নতুন সম্ভাবনার সূচনা হিসেবে দেখছেন। একই সঙ্গে সমাজে জমে থাকা নানা ক্ষোভ ও অসন্তোষের প্রকাশও রয়েছে। মহলবিশেষের কাছে এটি মব তথা জনতাকে অনিয়ন্ত্রিত করার সুযোগ। রাষ্ট্রযন্ত্র, সরকার এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এ বাস্তবতাকে অ্যাড্রেস করেছে, এটি ইতিবাচক। কিন্তু অ্যাকশন সেই তুলনায় না হওয়াতেই এত কথা। বর্তমান পরিবর্তনশীল বাস্তবতায় তাদের সামনে নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ এসেছে, যেখানে একদিকে জনমতের চাপ, অন্যদিকে আইনের শাসন বজায় রাখার দায়িত্ব-এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই প্রক্রিয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোকে আরও স্পষ্ট দিকনির্দেশনা, আইনি সুরক্ষা ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা দেওয়ার বিষয় রয়েছে। চব্বিশের ৫ আগস্টের পর দেশের বিভিন্ন এলাকায় যে বিচ্ছিন্ন সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, সেগুলো রাষ্ট্রের জন্য সতর্কবার্তা। এসব ঘটনা দেখিয়ে দেয় যে আইনের শাসন আরও সুসংহত করা এবং জনগণের আস্থা আরও দৃঢ় করা কতটা জরুরি। কেবল দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নয়, পরিস্থিতিটা সবার জন্যই নতুন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তা মোকাবিলার  পেশাদারি, সাহস ও ত্যাগের দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। সময়ের প্রয়োজনে তাদের সক্ষমতা আরও বাড়ানো, আধুনিক প্রশিক্ষণ ও মানসিক সহায়তা জোরদার করা এখন অপরিহার্য। তাদের উদ্যোগ আরও বিস্তৃত ও দৃশ্যমান হলে সমাজে একটি ইতিবাচক বার্তা পৌঁছাবে-রাষ্ট্র সবার জন্য সমানভাবে কাজ করছে। চব্বিশের চাওয়ার সঙ্গে পঁচিশের প্রাপ্তি না মেলায় ছাব্বিশ নিয়ে আশা দেখবে না, তা হয় না। মানুষ আশায় বাঁচে। আশা না থাকলে বেঁচে থাকা নিরর্থক হয়ে যায়। বিদায়ি বছরে নানা অপ্রাপ্তি ও দুর্দশার মাঝে ভর করেছে মব যন্ত্রণা। বছরটিতে তা গজবের মতো চেপে বসে। আইন ও সালিশ কেন্দ্র এর একটি হিসাব দিয়েছে। তাদের হিসাবমতে, ২০২৫ সালে মব সন্ত্রাসে কমপক্ষে ১৯৭ জন নিহত হয়েছে। আগের বছর এ সংখ্যাটি ছিল ১২৮। তার মানে চব্বিশের চেয়ে পঁচিশে মবে মানুষ হত্যা বেড়েছে। বিচারবহির্ভূত হত্যা, হেফাজতে মৃত্যু, সংখ্যালঘু নির্যাতন, রাজনৈতিক সহিংসতায় হত্যা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় ব্যাঘাতসহ অন্যান্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাও বেড়েছে। একদিকে মানুষের মধ্যে নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার আশা, আরেক দিকে এ ধরনের অপরাধের মাত্রা বৃদ্ধি। সাধারণত কোনো দেশে বড় ধরনের গণ আন্দোলনে স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পর নানা অনিয়ম দেখা দেয়। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। তবে চব্বিশের ৫ আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতা একটি চরম ও ধারাবাহিক রূপ ধারণ করেছে। ক্ষমতায় অভিষেকের পর থেকে ভয়মুক্ত একটি নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়ে আসছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসও। তিনি নোবেল জিতেছেন শান্তিতে। শান্তি প্রতিষ্ঠায় দুনিয়ার অশান্ত দেশগুলোতে কাজ করছেন আমাদের সেনাসহ বিভিন্ন রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। দেখাচ্ছেন শান্তি প্রতিষ্ঠায় শক্তিসামর্থ্যরে দৃষ্টান্ত। মানব ইতিহাসে প্রতিটি সভ্যতার মূল আকাঙ্ক্ষা ছিল শান্তি ও নিরাপত্তা। অস্থিরতা, সংঘাত এবং অনিশ্চয়তা যখন বিশ্বজুড়ে এক নিত্যনৈমিত্তিক বাস্তবতা, তখন শান্তির প্রকৃত ভিত্তি খুঁজে বের করা আমাদের জন্য সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।

ইসলাম মানবজাতির জন্য এক পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান হিসেবে ব্যক্তিগত আত্মশুদ্ধি থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার এক সুদূরপ্রসারী পথনির্দেশনা প্রদান করে। এর পরও দেশটির মানুষ কেন থাকবে অশান্তিতে? কেন ভয়ে-অনিরাপদে থাকা? গোটা বিশ্বেই নানা ক্ষেত্রে একটা ভয়-অশান্তি চলছে সত্য। রাজনৈতিক-কূটনৈতিক অস্থিরতার পাশাপাশি অর্থনীতি ও জলবায়ু পরিবর্তন বিশ্বকে নতুন নতুন অভাবিত সংকটে ফেলেছে, তা-ও সত্য। সেই দৃষ্টে আমাদের কেবল অশান্তি আর ভয়েই থাকতে হবে? অভয়-শান্তির দৃষ্টান্ত দুনিয়া থেকে হারিয়ে যায়নি। সেই শরিকানায় আমরা নয় কেন? কেন ঘর থেকে বের হতেও ভয় থাকবে? নির্বাচন সামনে রেখে মানুষের ভয়ের রাজ্যে বসবাস কাম্য নয়। কেউ কোথাও মবে পড়বে, হামলার শিকার হবে, ট্যাগিংয়ের শিকার হবে-তা হতে পারে না। তেমন কিছু ঘটলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নতুন করে কলঙ্কিত হবে। নির্বাচনটিও হবে প্রশ্নবিদ্ধ। ঢাকা, রংপুরসহ কয়েক জায়গায় মব দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কয়েকটি অ্যাকশন শান্তিপ্রিয় মানুষকে আশাবাদী করেছে আরও আগেই।

অজানা কারণে পরবর্তী সময়ে সে ধরনের অ্যাকশন লক্ষ্য করা যায়নি। বিবেকবান মানুষের বিশ্বাস আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী শক্ত হাতে পদক্ষেপে নামলে মব বা যেকোনো কুতৎপরতা দমতে বাধ্য। কারণ কুতৎপরতায় লিপ্তরা কোনোক্রমেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চেয়ে শক্তিমান নয়। তারা জনতার কাছেও ঘৃণিত।

লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট । সূএ: বাংলাদেশ প্রতিদি

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



» রিকশা প্রতীক পেলেন মামুনুল হক

» রাতেই সিলেট যাচ্ছেন তারেক রহমান, সকালে যোগ দেবেন নির্বাচনি জনসভায়

» কক্সবাজারে ১৭ প্রার্থীর মধ্যে প্রতীক বরাদ্দ

» চট্টগ্রাম রুটে ফ্লাইট সংখ্যা বাড়াল নভোএয়ার

» প্রতীক বরাদ্দ কার্যক্রমে কোনো জটিলতা নেই : বিভাগীয় কমিশনার

» বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে : মাহাদী আমিন

» বিএনপির নির্বাচনি থিম সংয়ের উদ্বোধন আজ

» প্রতীক পেলেন রাজশাহীর ৬ আসনের ২৯ প্রার্থী

» বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর ও জুলাই সনদের প্রতি ইতালির সমর্থন

» শত বছরের দিকনির্দেশনা দেবে গণভোট: শিল্প উপদেষ্টা

 

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ,

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন,

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন: ই-মেইল : [email protected],

মোবাইল :০১৫৩৫১৩০৩৫০

Desing & Developed BY PopularITLtd.Com
পরীক্ষামূলক প্রচার...

মববাজ দমনের অপেক্ষায় জনতা

ছবি সংগৃহীত

 

মোস্তফা কামাল :নির্বাচন সামনে রেখে এমনিতেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বাড়তি চাপ নিতে হয়। সুষ্ঠু ও নিরাপদ নির্বাচনের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। এবারের পরিস্থিতির রূপ ও বাস্তবতা অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে গুরুতর। তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও ফেলেছে বাড়তি যন্ত্রণায়। সরকারের কড়া নির্দেশনার আলোকে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো মব দমনের চেষ্টায় কোনো কমতি বা ঘাটতি করছে না। কিন্তু চেষ্টায় কুলাচ্ছে না। তারা এক জায়গায় পদক্ষেপ নিলে মববাজরা হামলে পড়ছে আরও কয়েক জায়গায়। মবের সমান্তরালে খুন, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, ছিনতাইয়ের ঘটনাও বাড়ছে। নারী নির্যাতন, পুলিশ আক্রান্ত, মাদক ক্রয়বিক্রয়, চোরাচালান, চুরিসহ বিভিন্ন অপরাধও বাড়বাড়ন্ত। আন্দোলনে দলীয় ক্যাডার রক্ষাকারী বাহিনীর মতো নেতিবাচক ভূমিকার কারণে পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে, তা সত্য। পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম গণমাধ্যমকে বলেন, গেল সরকার ১৬ বছরে পুলিশকে রাজনৈতিক কাজে অতিব্যবহারে নৈতিকভাবে কাবু করে গেছে। কিন্তু মানুষ এ ধরনের অজুহাত আর শুনতে চায় না। পুলিশ রাতারাতি জনবান্ধব হয়ে যাবে, সেই আশাও করে না। তাদের প্রত্যাশা পুলিশ অন্তত পেশাদারত্ব নিয়ে তৎপর হোক। মবসহ চলমান দুষ্টকর্ম প্রতিহত করার কাজে পুলিশের চেষ্টা দৃশ্যমান হোক। তা মানুষকে অল্প হলেও আশা জাগাবে। মববাজ, চাঁদাবাজসহ অপরাধীদের ভয় জাগাবে। মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’-এর একটি প্রতিবেদনে গত এক বছরে দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নাজুক চিত্র উঠে এসেছে। সেখানে মব ভায়োলেন্সের সবিশেষ বর্ণনা রয়েছে। এসেছে মবে ৮৯টি হত্যার কথা। সবচেয়ে বেশি মব ভায়োলেন্সে হত্যা ঘটেছে ঢাকা বিভাগে, ৪৫টি। বলার অপেক্ষা রাখছে না, নির্বাচনের আগে এ মব নিয়ন্ত্রণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ। নির্বাচনের আগে আইন হাতে তুলে নেওয়ার এ মবপ্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ভোট পর্যন্ত পরিস্থিতি কোথায় গড়াবে, তা ভাবনায় ফেলেছে সচেতন মহলকে।

কেন দেশে মববেটিং বা গণপিটুনি এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে, এ নিয়ে সবিস্তারে ভাবার সময় এখন হাতে নেই। এর রহস্য সবারই জানা। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশে একের পর এক মব ভায়োলেন্স বা সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। পর্যালোচনায় দেখা যায়, আগেও মব সহিংসতা ছিল। তবে এখন এটা চরম আকার ধারণ করেছে। কয়েকটি কেস স্টাডিতে দেখা যায়, মবের আগে পরিকল্পিতভাবে ট্যাগ, গুজব, সন্দেহ, চুরির অভিযোগের মতো কিছু নাটকীয়তা সাজানো হয়। সামান্য তর্ক দিয়েও মব জমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। দলবদ্ধ করে কারা মানুষকে কারও ওপর  কীভাবে হামলে দিচ্ছে, তা গোপন থাকছে না। মবের পেছনে থাকছে নানা হীনস্বার্থ। তাই এদিক-ওদিক না ভেবে তা দমাতে হবে শক্ত হাতে। পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এরকম কয়েকটি অ্যাকশন ঘটালে মব দমতে বাধ্য। নইলে মবের মতো ঘটনা ঘটতেই থাকবে। সরকারকে প্রমাণ দিতে হবে, তারা এ ব্যাপারে মুখে নয়, কাজেও শক্ত। মানুষের মধ্যে এ বিশ্বাস আনার দায়িত্ব সরকারের।

শহর-গ্রাম মিলিয়ে যতগুলো মব সৃষ্টি করা হয়েছে, ততবার বিশৃঙ্খল পরিবেশ সৃষ্টি হয়। এটাকে মানুষের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ বলে আশকারা দেওয়ার সুযোগ নেই। এমন আশকারা প্রকারান্তরে মানুষ নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়ার উসকানি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী একা এ উসকানি রুখতে পারবে না। সাধারণ মানুষকে এ ব্যাপারে সচেতন করে তুলতে হবে। বিশেষ করে রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের সচেতন হতে হবে। নির্বাচন সামনে রেখে তাঁদের কর্মকাণ্ড মানুষ একটু বেশি করে দেখছে। পর্যবেক্ষণ করছে।  বেশ কিছু গণমাধ্যম মব সহিংসতার বিরুদ্ধে ভূমিকা রাখছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও টানাপোড়েনের পর বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরকাল অতিক্রম করছে। এই সময়টিকে অনেকেই নতুন সম্ভাবনার সূচনা হিসেবে দেখছেন। একই সঙ্গে সমাজে জমে থাকা নানা ক্ষোভ ও অসন্তোষের প্রকাশও রয়েছে। মহলবিশেষের কাছে এটি মব তথা জনতাকে অনিয়ন্ত্রিত করার সুযোগ। রাষ্ট্রযন্ত্র, সরকার এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এ বাস্তবতাকে অ্যাড্রেস করেছে, এটি ইতিবাচক। কিন্তু অ্যাকশন সেই তুলনায় না হওয়াতেই এত কথা। বর্তমান পরিবর্তনশীল বাস্তবতায় তাদের সামনে নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ এসেছে, যেখানে একদিকে জনমতের চাপ, অন্যদিকে আইনের শাসন বজায় রাখার দায়িত্ব-এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই প্রক্রিয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোকে আরও স্পষ্ট দিকনির্দেশনা, আইনি সুরক্ষা ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা দেওয়ার বিষয় রয়েছে। চব্বিশের ৫ আগস্টের পর দেশের বিভিন্ন এলাকায় যে বিচ্ছিন্ন সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, সেগুলো রাষ্ট্রের জন্য সতর্কবার্তা। এসব ঘটনা দেখিয়ে দেয় যে আইনের শাসন আরও সুসংহত করা এবং জনগণের আস্থা আরও দৃঢ় করা কতটা জরুরি। কেবল দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নয়, পরিস্থিতিটা সবার জন্যই নতুন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তা মোকাবিলার  পেশাদারি, সাহস ও ত্যাগের দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। সময়ের প্রয়োজনে তাদের সক্ষমতা আরও বাড়ানো, আধুনিক প্রশিক্ষণ ও মানসিক সহায়তা জোরদার করা এখন অপরিহার্য। তাদের উদ্যোগ আরও বিস্তৃত ও দৃশ্যমান হলে সমাজে একটি ইতিবাচক বার্তা পৌঁছাবে-রাষ্ট্র সবার জন্য সমানভাবে কাজ করছে। চব্বিশের চাওয়ার সঙ্গে পঁচিশের প্রাপ্তি না মেলায় ছাব্বিশ নিয়ে আশা দেখবে না, তা হয় না। মানুষ আশায় বাঁচে। আশা না থাকলে বেঁচে থাকা নিরর্থক হয়ে যায়। বিদায়ি বছরে নানা অপ্রাপ্তি ও দুর্দশার মাঝে ভর করেছে মব যন্ত্রণা। বছরটিতে তা গজবের মতো চেপে বসে। আইন ও সালিশ কেন্দ্র এর একটি হিসাব দিয়েছে। তাদের হিসাবমতে, ২০২৫ সালে মব সন্ত্রাসে কমপক্ষে ১৯৭ জন নিহত হয়েছে। আগের বছর এ সংখ্যাটি ছিল ১২৮। তার মানে চব্বিশের চেয়ে পঁচিশে মবে মানুষ হত্যা বেড়েছে। বিচারবহির্ভূত হত্যা, হেফাজতে মৃত্যু, সংখ্যালঘু নির্যাতন, রাজনৈতিক সহিংসতায় হত্যা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় ব্যাঘাতসহ অন্যান্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাও বেড়েছে। একদিকে মানুষের মধ্যে নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার আশা, আরেক দিকে এ ধরনের অপরাধের মাত্রা বৃদ্ধি। সাধারণত কোনো দেশে বড় ধরনের গণ আন্দোলনে স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পর নানা অনিয়ম দেখা দেয়। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। তবে চব্বিশের ৫ আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতা একটি চরম ও ধারাবাহিক রূপ ধারণ করেছে। ক্ষমতায় অভিষেকের পর থেকে ভয়মুক্ত একটি নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়ে আসছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসও। তিনি নোবেল জিতেছেন শান্তিতে। শান্তি প্রতিষ্ঠায় দুনিয়ার অশান্ত দেশগুলোতে কাজ করছেন আমাদের সেনাসহ বিভিন্ন রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। দেখাচ্ছেন শান্তি প্রতিষ্ঠায় শক্তিসামর্থ্যরে দৃষ্টান্ত। মানব ইতিহাসে প্রতিটি সভ্যতার মূল আকাঙ্ক্ষা ছিল শান্তি ও নিরাপত্তা। অস্থিরতা, সংঘাত এবং অনিশ্চয়তা যখন বিশ্বজুড়ে এক নিত্যনৈমিত্তিক বাস্তবতা, তখন শান্তির প্রকৃত ভিত্তি খুঁজে বের করা আমাদের জন্য সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।

ইসলাম মানবজাতির জন্য এক পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান হিসেবে ব্যক্তিগত আত্মশুদ্ধি থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার এক সুদূরপ্রসারী পথনির্দেশনা প্রদান করে। এর পরও দেশটির মানুষ কেন থাকবে অশান্তিতে? কেন ভয়ে-অনিরাপদে থাকা? গোটা বিশ্বেই নানা ক্ষেত্রে একটা ভয়-অশান্তি চলছে সত্য। রাজনৈতিক-কূটনৈতিক অস্থিরতার পাশাপাশি অর্থনীতি ও জলবায়ু পরিবর্তন বিশ্বকে নতুন নতুন অভাবিত সংকটে ফেলেছে, তা-ও সত্য। সেই দৃষ্টে আমাদের কেবল অশান্তি আর ভয়েই থাকতে হবে? অভয়-শান্তির দৃষ্টান্ত দুনিয়া থেকে হারিয়ে যায়নি। সেই শরিকানায় আমরা নয় কেন? কেন ঘর থেকে বের হতেও ভয় থাকবে? নির্বাচন সামনে রেখে মানুষের ভয়ের রাজ্যে বসবাস কাম্য নয়। কেউ কোথাও মবে পড়বে, হামলার শিকার হবে, ট্যাগিংয়ের শিকার হবে-তা হতে পারে না। তেমন কিছু ঘটলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নতুন করে কলঙ্কিত হবে। নির্বাচনটিও হবে প্রশ্নবিদ্ধ। ঢাকা, রংপুরসহ কয়েক জায়গায় মব দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কয়েকটি অ্যাকশন শান্তিপ্রিয় মানুষকে আশাবাদী করেছে আরও আগেই।

অজানা কারণে পরবর্তী সময়ে সে ধরনের অ্যাকশন লক্ষ্য করা যায়নি। বিবেকবান মানুষের বিশ্বাস আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী শক্ত হাতে পদক্ষেপে নামলে মব বা যেকোনো কুতৎপরতা দমতে বাধ্য। কারণ কুতৎপরতায় লিপ্তরা কোনোক্রমেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চেয়ে শক্তিমান নয়। তারা জনতার কাছেও ঘৃণিত।

লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট । সূএ: বাংলাদেশ প্রতিদি

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



সর্বাধিক পঠিত



 

সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ,

ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন,

নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন: ই-মেইল : [email protected],

মোবাইল :০১৫৩৫১৩০৩৫০

Design & Developed BY ThemesBazar.Com