সংগৃহীত ছবি
অনলাইন ডেস্ক : সরকারবিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরান। এরই মধ্যে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর দমন-পীড়নে সহিংস হয়ে উঠেছে এই আন্দোলন। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, চলমান বিক্ষোভে শুধুমাত্র রাজধানী তেহরানেই দুই শতাধিক বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে আরও অনেকে।
মার্কিন প্রভাবশালী সাময়িকী টাইম ম্যাগাজিন এক প্রতিবেদনে এমনটি দাবি করেছে। তবে নিহতের সংখ্যা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করতে পারেনি মার্কিন সংবাদমাধ্যমটি।
অন্যদিকে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাগচি অভিযোগ করেছেন, দেশটির ‘শান্তিপূর্ণ আন্দোলন’কে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সহিংস তুলে করে তুলেছে।
শুক্রবার লেবানন সফরে গিয়েছিলেন সৈয়দ আরাগচি সংবাদমাধ্যম এএফপিকে সাক্ষাৎকারে বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছে যে, তারা বিক্ষোভে হস্তক্ষেপ করেছে এবং এটা সত্য। মূলত তাদের হস্তক্ষেপের কারণেই জনগণের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন সহিংস হয়ে উঠেছে।”
৫০ বছরে ইরান কাঁপানো যত আন্দোলন
বিগত ৫০ বছরে একের পর এক বড় বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে গেছে পশ্চিম এশিয়ার দেশ ইরান, যা দেশটির রাজনীতি ও সমাজকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।
ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বড় বিক্ষোভগুলো তুলে ধরা হলো।
১৯৭৯: ইসলামি বিপ্লব
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের আগে ইরানে শিক্ষার্থী, তেলশ্রমিকসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ রাজনৈতিক স্বাধীনতার দাবিতে রাস্তায় নামে। এসব আন্দোলনের চাপে পড়েন তৎকালীন স্বৈরশাসক শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি, যিনি মারাত্মক অসুস্থ অবস্থায় শেষ পর্যন্ত দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।
ফেব্রুয়ারিতে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে বিপ্লব সফল হয় এবং তার নিয়ন্ত্রণে একটি কঠোর শিয়া ধর্মতান্ত্রিক সরকার গঠিত হয়। নতুন সরকার হাজার হাজার মানুষকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। এরপর ১৯৮০–এর দশকের ইরান-ইরাক যুদ্ধের রক্তক্ষয়ী পরিস্থিতি ও কঠোর দমন-পীড়নের কারণে বহু বছর বড় ধরনের বিক্ষোভ থেমে যায়।
১৯৯৯: শিক্ষার্থী আন্দোলন
‘চেইন মার্ডার’ নামে পরিচিত একাধিক হত্যাকাণ্ডে ক্ষুব্ধ হয়ে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে।
এই আন্দোলনে অন্তত তিনজন নিহত হন এবং প্রায় ১ হাজার ২০০ জনকে আটক করা হয়।
২০০৯: গ্রিন মুভমেন্ট
২০০৯ সালের গ্রীষ্মে প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদের পুনর্নির্বাচনকে কারচুপির মাধ্যমে করা হয়েছে— এমন অভিযোগ তোলে সংস্কারপন্থি বিরোধীরা।
এরপর কয়েক মাস ধরে সারাদেশে লাখো মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেয়, যা ‘গ্রিন মুভমেন্ট’ নামে পরিচিত হয়। নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর দমন অভিযানে কয়েক ডজন মানুষ নিহত হন এবং হাজার হাজার মানুষ গ্রেফতার হন।
২০১৭–২০১৮: অর্থনৈতিক বিক্ষোভ
খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য নগদ সহায়তা কমানোর সরকারি পরিকল্পনার প্রতিবাদে বিক্ষোভ শুরু হয়। ইরানের মাশহাদ শহর থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন দ্রুত বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।
এই ঘটনায় ২০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন এবং শতাধিক মানুষ গ্রেফতার হন।
২০১৯: জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি নিয়ে বিক্ষোভ
সরকার ভর্তুকিপ্রাপ্ত পেট্রলের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিলে দেশজুড়ে তীব্র বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় বহু পেট্রল পাম্প, ব্যাংক ও দোকানপাটে আগুন দেওয়া হয়।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই আন্দোলনে ৩০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার পুরো দেশে ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দেয়।
২০২২: মাহসা আমিনি আন্দোলন
২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে ২২ বছর বয়সী মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর বিক্ষোভ শুরু হয়। হিজাব সঠিকভাবে না পরার অভিযোগে নৈতিকতা পুলিশের হেফাজতে নেওয়ার পর তার মৃত্যু হয়।
জাতিসংঘের তদন্তকারীরা পরে জানান, তার মৃত্যুর পেছনে শারীরিক নির্যাতনের দায় ইরানের ওপর বর্তায়। কয়েক মাসব্যাপী দমন অভিযানে ৫০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন এবং ২২ হাজারের বেশি মানুষ আটক হন। তবুও আজও অনেক নারী হিজাব পরতে অস্বীকৃতি জানিয়ে যাচ্ছেন।
২০২৫–২৬: রিয়াল সংকট ও বিক্ষোভ
নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর হওয়া এবং ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের পর ইরানের অর্থনীতি চরম সংকটে পড়েছে। এতে দেশটির মুদ্রা রিয়ালের মান ধসে পড়েছে— এক ডলারের দাম দাঁড়ায় ১৪ লাখ রিয়ালে।
এরপরই বিক্ষোভ শুরু হয়। বৃহস্পতিবার রাতে বিক্ষোভকারীরা রাতের সমাবেশের ডাক দিলে সরকার ইন্টারনেট ও টেলিফোন যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ করে দেয়। রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত আন্দোলন চলছিল, যা এরই মধ্যে ব্যাপক সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। সূত্র: গালফ নিউজ








