অ্যালবাট্রোজ কি সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্যের প্রতীক?

Diomedeidae গোত্রের অন্তর্গত একপ্রকার সামুদ্রিক পাখি অ্যালবাট্রোজ। এই পাখি মূলত অ্যান্টার্কটিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, প্রশান্ত মহাসাগরের আশেপাশে দেখা যায়। প্রাচীনকাল থেকে নাবিকদের মধ্যে এই পাখি নিয়ে রয়েছে নানা রকম বিশ্বাস। কারো মতে- এই পাখি সৌভাগ্যের বাহক, কেউবা একে চিনত ঘোর বিপদের চিহ্ন হিসেবে। কেন এমন ভাবনা তৈরি হলো? আসলেই কি ভাগ্যের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক আছে? এ ব্যাপারে জানার আগে অ্যালবাট্রোজ নিয়ে সাধারণ কিছু তথ্য জেনে নেয়া যাক।

 

দৈত্যাকার এই পাখিকে মনে করা হয় মেরুদণ্ডী প্রাণীদের মধ্যে সবচেয়ে দক্ষ ভ্রমণকারী। এরা শত শত মাইল একটানা উড়ে পাড়ি দিতে পারে। জীবনের বেশিরভাগ সময় এরা আকাশেই ব্যয় করে, প্রজননের সময় মাটিতে নেমে আসে। এর বৈশিষ্ট্যের কথা বলতে গেলে প্রথমেই বলতে হবে, এর বিশালাকার ডানার কথা। একেকটি ডানা প্রায় ১২ ফুট পর্যন্ত লম্বা। এরা স্কুইড, মাছ, কাঁকড়া এবং আরো কিছু জলজ প্রাণী খেয়ে বেঁচে থাকে। এখন পর্যন্ত এর মোট ২২টি প্রজাতি শনাক্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে কয়েকটি প্রজাতি বিলুপ্তির পথে এবং আরো কয়েকটি সংকটাপন্ন। অ্যালবাট্রোজ বছরে কেবল একটি ডিম পাড়ে। ডিম পাড়ার তিন সপ্তাহের মধ্যে বাচ্চা হয়, এবং আরো তিন সপ্তাহ বাবা-মা ছানার দেখভাল করে। প্রায় ৩-১০ মাসের মধ্যে বাচ্চাগুলো উড়তে শিখে যায়, এবং একসময় বাসা ছেড়ে উড়ে চলে যায়।

এখন পর্যন্ত শনাক্ত করা সবচেয়ে বয়স্ক পাখিটিও একটি অ্যালবাট্রোজ। ৭০ বছর বয়স্ক পাখিটির নাম উইসডম। ১৯৫৬ সালে প্রাণীবিদ Chandler Robbins এর পায়ে রিং পরান। পাখিটি তার জীবদ্দশায় প্রায় সাত লাখ মাইলের মতো সামুদ্রিক পথ পাড়ি দিয়েছে, এবং বর্তমানে তীরে ফিরে এসেছে ডিম পাড়ার জন্য। রিং পরানোর পর প্রায় ৪০ বার ডিম পেড়েছে পৃথিবীর বয়স্কতম এই পাখি, যার সর্বশেষ ডিমটি পেড়েছে ২০২১ সালের পহেলা ফেব্রুয়ারি ।

সামুদ্রিক পাখি অ্যালবাট্রোজ । ছবি : সংগৃহীত

সামুদ্রিক পাখি অ্যালবাট্রোজ । ছবি : সংগৃহীত

অ্যালবাট্রোজ সম্পর্কে প্রচলিত একটি প্রবাদ হচ্ছে- ‘An albatross around your neck’ , যা মূলত ভয়ানক দুর্ভাগ্য বোঝাতে ব্যবহার করা হয়। অ্যালবাট্রোজ মূলত একটি সামুদ্রিক পাখি, যাকে প্রাচীনকালে নাবিকরা সৌভাগ্যের প্রতীক মনে করত। তখন বেশিরভাগ নাবিক ছিল কুসংস্কারাচ্ছন্ন। তারা বিশ্বাস করত- অ্যালবাট্রোজ মৃত নাবিকদের আত্মা ধারণ করে এবং জাহাজগুলোকে যেকোনো দুর্ভাগ্য থেকে রক্ষা করে। কিছু নাবিক আবার একে দুর্ভাগ্যের প্রতীকও মনে করত। তারা ভাবত- অ্যালবাট্রোজ জাহাজের পিছু নেয়া মানে কোনো না কোনো নাবিকের মৃত্যু হওয়া। সৌভাগ্য হোক বা দুর্ভাগ্য, অ্যালবাট্রোজ হত্যা করা ছিল নিষিদ্ধ। সবাই বিশ্বাস করত- অ্যালবাট্রোজকে হত্যা করলে জাহাজের ওপর অভিশাপ নেমে আসবে। ব্রিটিশ লেখক স্যামুয়েল টেইলর কোলরিজের কবিতা ‘The Rime of the Ancient Mariner’ অ্যালবাট্রোজের সৌভাগ্য এবং দুর্ভাগ্যের দিক একইসাথে তুলে ধরে।

 

কবিতার শুরুতে এক বৃদ্ধ নাবিক একজন যুবককে ডাকে তার গল্প শোনানোর জন্য। যুবকটি একটি বিয়ের দাওয়াতে যাচ্ছিল। মাঝপথে বৃদ্ধ নাবিক তার পথ আটকে ফেলে। শুরুতে শুনতে না চাইলেও নাবিকের উজ্জ্বল চোখ দেখে যুবকটি আর না করতে পারেনা। লেখকের ভাষায়,

The Wedding-Guest sat on a stone:
He cannot choose but hear;
And thus spake on that ancient man,
The bright-eyed Mariner.

বৃদ্ধ নাবিক তার কোনো এক সমুদ্রযাত্রার গল্প শুরু করে। সেই যাত্রায় শুরুতে সমুদ্র ছিল শান্ত। আকাশ একদম পরিষ্কার ছিল এবং আবহাওয়া একদম অনুকূলে ছিল। হঠাৎ করে প্রকৃতি উত্তাল হয়ে ওঠে। সমুদ্রে দৈত্যাকার একটি ঝড় ওঠে, আর জাহাজটি তার পথ থেকে দক্ষিণ দিকে সরে যায়। ঝড়ের কবলে পড়ে তারা কুয়াশা আর বরফে ঢাকা সমুদ্রের মধ্যে গিয়ে আটকা পড়ে।

সামুদ্রিক পাখি অ্যালবাট্রোজ । ছবি : সংগৃহীত

সামুদ্রিক পাখি অ্যালবাট্রোজ । ছবি : সংগৃহীত

তখনই একটি অ্যালবাট্রোজ জাহাজের চারপাশে উড়তে শুরু করে। নাবিকরা একে সৌভাগ্যের প্রতীক মনে করে খুশি হয়ে ওঠে। পাখিটিকে নাবিকরা খাবার দেয়া শুরু করে, একইসাথে বরফ কেটে এগিয়ে চলে জাহাজ। কিন্তু কুয়াশা তখনো কেটে যায়নি। এর মধ্যে একদিন বৃদ্ধ নাবিকটি তার ক্রস বো দিয়ে পাখিটিকে মেরে ফেলে। প্রথমে নাবিকরা ক্ষুদ্ধ হয়ে ওঠে এমন কান্ডের জন্য। কিন্তু পাখিটিকে মেরে ফেলার পরপরই দেখা যায় আবহাওয়া ভালো হতে শুরু করে এবং কুয়াশা কেটে যায়। এতে নাবিকরা আবার তাকে বাহবা দিতে থাকে।

 

এরপর একদিন বাতাস থেমে যায়। জাহাজের পালে বাতাস না থাকায় সমুদ্রে আটকা পড়ে নাবিকেরা। দিনের পর দিন তারা সমুদ্রের বুকে ভেসে বেড়ায়। তাদের পানীয় জল শেষ হয়ে যায়। চারপাশে পানি থাকা সত্ত্বেও পান করার মতো এক ফোঁটা পানি থাকে না। লেখকের বর্ণনার এই অংশটুকু অনেকেরই চেনা।

Water, water every where,
Nor any drop to drink.

নাবিকেরা তাদের দুর্দশার জন্য অ্যালবাট্রোজের হত্যাকারীকে দায়ী করে। তাকে বারবার অভিশাপ দেয় এবং তার গলায় মৃত অ্যালবাট্রোজটি ঝুলিয়ে দেয়। এখান থেকেই ‘An albatross around your neck’ প্রবাদের উৎপত্তি।

সামুদ্রিক পাখি অ্যালবাট্রোজ । ছবি : সংগৃহীত

সামুদ্রিক পাখি অ্যালবাট্রোজ । ছবি : সংগৃহীত

তখন পশ্চিম দিক থেকে একটি জাহাজকে তাদের দিকে আসতে দেখা যায়। জাহাজ নিকটবর্তী হবার পর দেখা গেল তা ছিল জীবন-মৃত্যুর জাহাজ। জাহাজের মধ্যে নাবিকদের জীবন নিয়ে জুয়া খেলা হচ্ছিল। খেলায় সিদ্ধান্ত হয় সকল নাবিককে মৃত্যু দেয়া হবে এবং যন্ত্রণা থেকে মুক্ত করা হবে। কিন্তু পাখি হত্যাকারী বৃদ্ধ নাবিককে বাঁচিয়ে রাখা হবে। বেঁচে থাকাই হবে তার জন্য শাস্তি। একে একে জাহাজের সকলে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। বেঁচে থাকে শুধু সেই বৃদ্ধ নাবিক, গলায় ঝোলানো মৃত অ্যালবাট্রোজ নিয়ে। চারপাশের মৃত চোখগুলো যেন তাকে অভিশাপ দিচ্ছিল, আশেপাশে অদ্ভুত সব জীব ভেসে বেড়াচ্ছিল, দুর্বিষহ এক জীবন নিয়ে নাবিক ভেসে বেড়ায় সমুদ্রে।

 

এরপর একদিন জাহাজের পাশে কিছু সাপ ভেসে বেড়াতে দেখে নাবিক। কোনো অজানা কারণে সাপগুলোর প্রতি তার মনে ভালোবাসা জন্মায়, এবং পাপের চিহ্ন মৃত অ্যালবাট্রোজ তার গলা থেকে খুলে পড়ে। শাস্তি থেকে মুক্তি পেয়ে নাবিক তার জন্মভূমিতে ফিরে আসে। পাপের প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে তার এই ঘটনা মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। স্রষ্টার সৃষ্টিকে ভালোবাসার মাধ্যমে স্রষ্টার নৈকট্য লাভ করা সম্ভব- এই বাণী সবার কাছে পৌঁছে দেয়।

 

প্রকৃতপক্ষে, ভাগ্যের সাথে পাখির সম্পৃক্ততা কুসংস্কার ছাড়া আর কিছুই নয়। প্রাচীনকাল থেকে নাবিকদের মুখে মুখে চলে আসা মিথগুলো থেকে ‘অ্যালবাট্রোজ সৌভাগ্যের প্রতীক’ এই চিন্তার উৎপত্তি। লেখক স্যামুয়েল টেইলর কোলরিজের কবিতায় পাখির সাথে সৌভাগ্য কিংবা দুর্ভাগ্যের সম্পর্ক ছাপিয়ে স্রষ্টার সৃষ্টিকে ভালোবাসার বার্তাই ফুটে উঠেছে।  সূএ:ডেইলি বাংলাদেশ

Facebook Comments Box

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



» শিক্ষার্থীরা না বুঝেই কোটা নিয়ে আন্দোলন করছে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

» বিশেষ অভিযান চালিয়ে মাদকবিরোধী অভিযানে বিক্রি ও সেবনের অপরাধে ১৩জন গ্রেপ্তার

» কোটাবিরোধী আন্দোলনকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলার ইচ্ছা নেই : কাদের

» দেশের অর্থনীতি এখন যথেষ্ট শক্তিশালী : প্রধানমন্ত্রী

» বঙ্গভবন অভিমুখে গণপদযাত্রায় আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা

» জমি থেকে বৃষ্টির পানি বের করতে গেলে কৃষকে কাদায় ফেলে হত্যা

» সীমান্ত পারাপার রোমানিয়ায় আটক ৭৩৫, শীর্ষে বাংলাদেশিরা

» ভিকারুননিসার ১৬৯ শিক্ষার্থীর ভর্তি বাতিলই থাকছে

» জমি নিয়ে বিরোধের জেরে প্রতিপক্ষের হামলায় মাছ ব্যবসায়ী খুন

» দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে রপ্তানি বাণিজ্য প্রসারের বিকল্প নেই: রাষ্ট্রপতি

উপদেষ্টা – মো: মোস্তাফিজুর রহমান মাসুদ,বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটি। (দপ্তর সম্পাদক)  
উপদেষ্টা -মাকসুদা লিসা
 সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ,
ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন,
ব্যাবস্থাপনা সম্পাদকঃ মো: শফিকুল ইসলাম আরজু,
নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

 

 

আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন:ই-মেইল : [email protected]

মোবাইল :০১৫৩৫১৩০৩৫০

Desing & Developed BY PopularITLtd.Com
পরীক্ষামূলক প্রচার...

অ্যালবাট্রোজ কি সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্যের প্রতীক?

Diomedeidae গোত্রের অন্তর্গত একপ্রকার সামুদ্রিক পাখি অ্যালবাট্রোজ। এই পাখি মূলত অ্যান্টার্কটিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, প্রশান্ত মহাসাগরের আশেপাশে দেখা যায়। প্রাচীনকাল থেকে নাবিকদের মধ্যে এই পাখি নিয়ে রয়েছে নানা রকম বিশ্বাস। কারো মতে- এই পাখি সৌভাগ্যের বাহক, কেউবা একে চিনত ঘোর বিপদের চিহ্ন হিসেবে। কেন এমন ভাবনা তৈরি হলো? আসলেই কি ভাগ্যের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক আছে? এ ব্যাপারে জানার আগে অ্যালবাট্রোজ নিয়ে সাধারণ কিছু তথ্য জেনে নেয়া যাক।

 

দৈত্যাকার এই পাখিকে মনে করা হয় মেরুদণ্ডী প্রাণীদের মধ্যে সবচেয়ে দক্ষ ভ্রমণকারী। এরা শত শত মাইল একটানা উড়ে পাড়ি দিতে পারে। জীবনের বেশিরভাগ সময় এরা আকাশেই ব্যয় করে, প্রজননের সময় মাটিতে নেমে আসে। এর বৈশিষ্ট্যের কথা বলতে গেলে প্রথমেই বলতে হবে, এর বিশালাকার ডানার কথা। একেকটি ডানা প্রায় ১২ ফুট পর্যন্ত লম্বা। এরা স্কুইড, মাছ, কাঁকড়া এবং আরো কিছু জলজ প্রাণী খেয়ে বেঁচে থাকে। এখন পর্যন্ত এর মোট ২২টি প্রজাতি শনাক্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে কয়েকটি প্রজাতি বিলুপ্তির পথে এবং আরো কয়েকটি সংকটাপন্ন। অ্যালবাট্রোজ বছরে কেবল একটি ডিম পাড়ে। ডিম পাড়ার তিন সপ্তাহের মধ্যে বাচ্চা হয়, এবং আরো তিন সপ্তাহ বাবা-মা ছানার দেখভাল করে। প্রায় ৩-১০ মাসের মধ্যে বাচ্চাগুলো উড়তে শিখে যায়, এবং একসময় বাসা ছেড়ে উড়ে চলে যায়।

এখন পর্যন্ত শনাক্ত করা সবচেয়ে বয়স্ক পাখিটিও একটি অ্যালবাট্রোজ। ৭০ বছর বয়স্ক পাখিটির নাম উইসডম। ১৯৫৬ সালে প্রাণীবিদ Chandler Robbins এর পায়ে রিং পরান। পাখিটি তার জীবদ্দশায় প্রায় সাত লাখ মাইলের মতো সামুদ্রিক পথ পাড়ি দিয়েছে, এবং বর্তমানে তীরে ফিরে এসেছে ডিম পাড়ার জন্য। রিং পরানোর পর প্রায় ৪০ বার ডিম পেড়েছে পৃথিবীর বয়স্কতম এই পাখি, যার সর্বশেষ ডিমটি পেড়েছে ২০২১ সালের পহেলা ফেব্রুয়ারি ।

সামুদ্রিক পাখি অ্যালবাট্রোজ । ছবি : সংগৃহীত

সামুদ্রিক পাখি অ্যালবাট্রোজ । ছবি : সংগৃহীত

অ্যালবাট্রোজ সম্পর্কে প্রচলিত একটি প্রবাদ হচ্ছে- ‘An albatross around your neck’ , যা মূলত ভয়ানক দুর্ভাগ্য বোঝাতে ব্যবহার করা হয়। অ্যালবাট্রোজ মূলত একটি সামুদ্রিক পাখি, যাকে প্রাচীনকালে নাবিকরা সৌভাগ্যের প্রতীক মনে করত। তখন বেশিরভাগ নাবিক ছিল কুসংস্কারাচ্ছন্ন। তারা বিশ্বাস করত- অ্যালবাট্রোজ মৃত নাবিকদের আত্মা ধারণ করে এবং জাহাজগুলোকে যেকোনো দুর্ভাগ্য থেকে রক্ষা করে। কিছু নাবিক আবার একে দুর্ভাগ্যের প্রতীকও মনে করত। তারা ভাবত- অ্যালবাট্রোজ জাহাজের পিছু নেয়া মানে কোনো না কোনো নাবিকের মৃত্যু হওয়া। সৌভাগ্য হোক বা দুর্ভাগ্য, অ্যালবাট্রোজ হত্যা করা ছিল নিষিদ্ধ। সবাই বিশ্বাস করত- অ্যালবাট্রোজকে হত্যা করলে জাহাজের ওপর অভিশাপ নেমে আসবে। ব্রিটিশ লেখক স্যামুয়েল টেইলর কোলরিজের কবিতা ‘The Rime of the Ancient Mariner’ অ্যালবাট্রোজের সৌভাগ্য এবং দুর্ভাগ্যের দিক একইসাথে তুলে ধরে।

 

কবিতার শুরুতে এক বৃদ্ধ নাবিক একজন যুবককে ডাকে তার গল্প শোনানোর জন্য। যুবকটি একটি বিয়ের দাওয়াতে যাচ্ছিল। মাঝপথে বৃদ্ধ নাবিক তার পথ আটকে ফেলে। শুরুতে শুনতে না চাইলেও নাবিকের উজ্জ্বল চোখ দেখে যুবকটি আর না করতে পারেনা। লেখকের ভাষায়,

The Wedding-Guest sat on a stone:
He cannot choose but hear;
And thus spake on that ancient man,
The bright-eyed Mariner.

বৃদ্ধ নাবিক তার কোনো এক সমুদ্রযাত্রার গল্প শুরু করে। সেই যাত্রায় শুরুতে সমুদ্র ছিল শান্ত। আকাশ একদম পরিষ্কার ছিল এবং আবহাওয়া একদম অনুকূলে ছিল। হঠাৎ করে প্রকৃতি উত্তাল হয়ে ওঠে। সমুদ্রে দৈত্যাকার একটি ঝড় ওঠে, আর জাহাজটি তার পথ থেকে দক্ষিণ দিকে সরে যায়। ঝড়ের কবলে পড়ে তারা কুয়াশা আর বরফে ঢাকা সমুদ্রের মধ্যে গিয়ে আটকা পড়ে।

সামুদ্রিক পাখি অ্যালবাট্রোজ । ছবি : সংগৃহীত

সামুদ্রিক পাখি অ্যালবাট্রোজ । ছবি : সংগৃহীত

তখনই একটি অ্যালবাট্রোজ জাহাজের চারপাশে উড়তে শুরু করে। নাবিকরা একে সৌভাগ্যের প্রতীক মনে করে খুশি হয়ে ওঠে। পাখিটিকে নাবিকরা খাবার দেয়া শুরু করে, একইসাথে বরফ কেটে এগিয়ে চলে জাহাজ। কিন্তু কুয়াশা তখনো কেটে যায়নি। এর মধ্যে একদিন বৃদ্ধ নাবিকটি তার ক্রস বো দিয়ে পাখিটিকে মেরে ফেলে। প্রথমে নাবিকরা ক্ষুদ্ধ হয়ে ওঠে এমন কান্ডের জন্য। কিন্তু পাখিটিকে মেরে ফেলার পরপরই দেখা যায় আবহাওয়া ভালো হতে শুরু করে এবং কুয়াশা কেটে যায়। এতে নাবিকরা আবার তাকে বাহবা দিতে থাকে।

 

এরপর একদিন বাতাস থেমে যায়। জাহাজের পালে বাতাস না থাকায় সমুদ্রে আটকা পড়ে নাবিকেরা। দিনের পর দিন তারা সমুদ্রের বুকে ভেসে বেড়ায়। তাদের পানীয় জল শেষ হয়ে যায়। চারপাশে পানি থাকা সত্ত্বেও পান করার মতো এক ফোঁটা পানি থাকে না। লেখকের বর্ণনার এই অংশটুকু অনেকেরই চেনা।

Water, water every where,
Nor any drop to drink.

নাবিকেরা তাদের দুর্দশার জন্য অ্যালবাট্রোজের হত্যাকারীকে দায়ী করে। তাকে বারবার অভিশাপ দেয় এবং তার গলায় মৃত অ্যালবাট্রোজটি ঝুলিয়ে দেয়। এখান থেকেই ‘An albatross around your neck’ প্রবাদের উৎপত্তি।

সামুদ্রিক পাখি অ্যালবাট্রোজ । ছবি : সংগৃহীত

সামুদ্রিক পাখি অ্যালবাট্রোজ । ছবি : সংগৃহীত

তখন পশ্চিম দিক থেকে একটি জাহাজকে তাদের দিকে আসতে দেখা যায়। জাহাজ নিকটবর্তী হবার পর দেখা গেল তা ছিল জীবন-মৃত্যুর জাহাজ। জাহাজের মধ্যে নাবিকদের জীবন নিয়ে জুয়া খেলা হচ্ছিল। খেলায় সিদ্ধান্ত হয় সকল নাবিককে মৃত্যু দেয়া হবে এবং যন্ত্রণা থেকে মুক্ত করা হবে। কিন্তু পাখি হত্যাকারী বৃদ্ধ নাবিককে বাঁচিয়ে রাখা হবে। বেঁচে থাকাই হবে তার জন্য শাস্তি। একে একে জাহাজের সকলে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। বেঁচে থাকে শুধু সেই বৃদ্ধ নাবিক, গলায় ঝোলানো মৃত অ্যালবাট্রোজ নিয়ে। চারপাশের মৃত চোখগুলো যেন তাকে অভিশাপ দিচ্ছিল, আশেপাশে অদ্ভুত সব জীব ভেসে বেড়াচ্ছিল, দুর্বিষহ এক জীবন নিয়ে নাবিক ভেসে বেড়ায় সমুদ্রে।

 

এরপর একদিন জাহাজের পাশে কিছু সাপ ভেসে বেড়াতে দেখে নাবিক। কোনো অজানা কারণে সাপগুলোর প্রতি তার মনে ভালোবাসা জন্মায়, এবং পাপের চিহ্ন মৃত অ্যালবাট্রোজ তার গলা থেকে খুলে পড়ে। শাস্তি থেকে মুক্তি পেয়ে নাবিক তার জন্মভূমিতে ফিরে আসে। পাপের প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে তার এই ঘটনা মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। স্রষ্টার সৃষ্টিকে ভালোবাসার মাধ্যমে স্রষ্টার নৈকট্য লাভ করা সম্ভব- এই বাণী সবার কাছে পৌঁছে দেয়।

 

প্রকৃতপক্ষে, ভাগ্যের সাথে পাখির সম্পৃক্ততা কুসংস্কার ছাড়া আর কিছুই নয়। প্রাচীনকাল থেকে নাবিকদের মুখে মুখে চলে আসা মিথগুলো থেকে ‘অ্যালবাট্রোজ সৌভাগ্যের প্রতীক’ এই চিন্তার উৎপত্তি। লেখক স্যামুয়েল টেইলর কোলরিজের কবিতায় পাখির সাথে সৌভাগ্য কিংবা দুর্ভাগ্যের সম্পর্ক ছাপিয়ে স্রষ্টার সৃষ্টিকে ভালোবাসার বার্তাই ফুটে উঠেছে।  সূএ:ডেইলি বাংলাদেশ

Facebook Comments Box

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ আপডেট



সর্বাধিক পঠিত



উপদেষ্টা – মো: মোস্তাফিজুর রহমান মাসুদ,বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটি। (দপ্তর সম্পাদক)  
উপদেষ্টা -মাকসুদা লিসা
 সম্পাদক ও প্রকাশক :মো সেলিম আহম্মেদ,
ভারপ্রাপ্ত,সম্পাদক : মোঃ আতাহার হোসেন সুজন,
ব্যাবস্থাপনা সম্পাদকঃ মো: শফিকুল ইসলাম আরজু,
নির্বাহী সম্পাদকঃ আনিসুল হক বাবু

 

 

আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন:ই-মেইল : [email protected]

মোবাইল :০১৫৩৫১৩০৩৫০

Design & Developed BY ThemesBazar.Com